রিয়ার এডমিরাল (অবসরপ্রাপ্ত) মুহাম্মদ খুরশেদ আলমের সাক্ষাৎকার
বাংলাদেশের জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হরমুজ দিয়ে আমাদের জাহাজের নির্বিঘ্নে চলাচল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউএন কনভেনশন অন দ্য ল অব দ্য সি বা (UNCLOS) সাপেক্ষে কি কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে পারে বাংলাদেশ? বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ রিয়ার এডমিরাল (অবসরপ্রাপ্ত) মুহাম্মদ খুরশেদ আলম। স্ট্রিমের রিসার্চ ফেলো সানীউজ্জামান পাভেলের সঙ্গে সাক্ষাৎকারটি এখানে পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।
সানীউজ্জামান পাভেল

স্ট্রিম: ইউএন কনভেনশন অন দ্য ল অব দ্য সি বা আনক্লজ সমুদ্র সংবিধান হিসেবে পরিচিত। এতে অন্যান্য অনেক কিছুর সঙ্গে সমুদ্রে সকল দেশের জাহাজের চলাচলের অধিকার লিপিবদ্ধ করা আছে। আনক্লজ-এ আন্তর্জাতিক চলাচলের কী কী অধিকার আছে ও স্ট্রেইট অব হরমুজের ক্ষেত্রে কোনটি প্রযোজ্য?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: আমি প্রথমেই একটু ইতিহাস থেকে কিছু বলে নিতে চাই। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন বা আনক্লজ কিন্তু এই পর্যন্ত তিনটা হয়েছে। প্রথম আনক্লজ ছিল ১৯৫৬ সালে। ১৯৫৬ সালের আনক্লজে ইনোসেন্ট প্যাসেজটা চলে আসে। মানে, এক দেশের টেরিটোরিয়াল সি-এর ভিতর দিয়ে যেহেতু প্রাচীনকাল থেকে জাহাজ উপকূলের খুব কাছে দিয়ে যেত, যাতে বিপদে পড়লে হেল্প নিতে পারে। কাজেই এই টেরিটোরিয়াল সি-এর ভিতর দিয়ে যাওয়া আসার যে ব্যবস্থাটা আমাদের প্রথম আনক্লজ ১৯৫৬ সালে, যেটার নাম জেনেভা কনভেনশন বলা হয়, সেখানে এটা স্বীকৃত ছিল যে যেতে পারবে। তখন কিন্তু টেরিটোরিয়াল সি ছিল মাত্র তিন নটিকাল মাইল।
এটা ট্রেডিশনালি ১৭০২ সাল থেকে তিন নটিকাল মাইলই ছিল। এই ৫৬ সালেও তিন নটিকাল মাইলই থাকলো। ৬০ সালে আরেকটা আনক্লজ হয়, আনক্লজ টু। সেখানে একটা প্রস্তাব করা হয়েছিল যে ঠিক আছে, তিনের পরিবর্তে এটা আমরা ছয় করি টেরিটোরিয়াল সি-তে। কিন্তু এটা পাস হয় নাই। এই কারণে যে ৮৮টা দেশ তাতে যোগ দিয়েছিল। একটা দেশ এর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল। কাজেই ওই আনক্লজ টু বাস্তবে রূপ লাভ করে নাই।
ফাইনালি আনক্লজ ওয়ানটা ১৯৬৪ সালে আইনে পরিণত হল। আইনে পরিণত হওয়ার পরে একটা কথা উঠলো যে ৫৬ সালের যে আইনটা করা হয়েছে, সে সময় বেশিরভাগ দেশ পরাধীন ছিল। কাজেই তাদের কলোনিয়াল মাস্টার্সরা এই আইনটার ওপরে ওই দেশের স্বার্থ নিয়ে আলাপ আলোচনা করেছে। তারা প্রত্যেকটা দেশের চাহিদা অনুযায়ী কারেক্টলি আইনটাকে তুলে ধরতে পারে নাই। যেমন পাকিস্তান, ভারত—এরকম সব দেশ। আমরা ৪৭ সালে স্বাধীনতা পেলেও ৬০-এর পরে কিন্তু বেশিরভাগ দেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে।
এইজন্য ৭৩ সালে আবার জাতিসংঘ সিদ্ধান্ত নিল যে আমরা একটা নতুন আনক্লজ করব। এটা হল আনক্লজ থ্রি। এই আনক্লজ থ্রি নিয়ে ৭৩ সাল থেকে আলাপ আলোচনা শুরু হলো। ফাইনালি ১৯৮২ সালের ১০ই ডিসেম্বর এই আনক্লজ থ্রি বা আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন-৩ পাস হয়। পাস হওয়ার পরে ১০ই ডিসেম্বর এটা জামাইকাতে উন্মুক্ত করা হয় সিগনেচারের জন্য। ১১৮টা দেশ তাতে সাইন করে। আমিও ছিলাম সেখানে বাংলাদেশ থেকে। আমাদের নৌবাহিনী প্রধান ছিলেন। রাষ্ট্রদূত শাহেদ আক্তার ছিলেন। আমরা বাংলাদেশের পক্ষে এটা দস্তখত করি।
এখন এই আইনে প্রথম এই ট্রানজিট প্যাসেজটা আসে। ৫৬ সালের আইনে ট্রানজিট প্যাসেজ ছিল না। এখন আমি যদি আলাদা করে দেখি, তো এই ৮২ সালের আইনটা আইনে পরিণত হয়েছে ৯৪ সালে। এর আগে কিন্তু ৬০টা জাতি বা দেশ এটাকে অনুমোদন করে নাই।
আমরা সাইন করলাম ঠিকই। কিন্তু এটাকে রেটিফাই করলাম ২০০১ সালে। তার মানে আইনটা আমাদের উপরে প্রযোজ্য হয়ে গেল। সাইন করলে এটা লিগালি তেমন প্রযোজ্য হয় না। এটাকে রেটিফাই করতে হয় অথবা অ্যাকসেশন করতে হয়।

এখন এখানে দুইটা জিনিস দেখেন। একটা হল ইনোসেন্ট প্যাসেজ, যেটা ৫৬ সালে আছে। ইনোসেন্ট প্যাসেজ মানে কি? মানে উপকূলীয় দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তা—এই তিনটা জিনিসকে ব্যাহত না করে আপনি ওই দেশের টেরিটোরিয়াল সি-এর ভিতর দিয়ে পাস করতে পারবেন। আভ্যন্তরীণ ইন্টারনাল ওয়াটার একটা জায়গা আছে। পোর্ট ইন্টারনাল ওয়াটারের ভিতরে, পোর্ট থেকেও বের হয়ে যেতে পারবেন। আবার পোর্টেও ঢুকতে পারবেন। এটা ইনোসেন্ট প্যাসেজ।
ইনোসেন্ট প্যাসেজে ১২টা কাজ করা যায় না তা আইনে বলা আছে। যেমন আপনি গোলাবারুদের প্র্যাকটিস করতে পারবেন না। যদি বিমানবাহী জাহাজ হয়, বিমান উড়াতেও পারবেন না, নামাতেও পারবেন না। তারপরে কারেন্সি ইত্যাদি নিয়ে ব্যবসা করতে পারবেন না। কাউকে থ্রেট করতে পারবেন না। স্টেটের পলিটিক্যাল সার্বভৌমত্ব নিয়ে থ্রেট করতে পারবেন না। এরকম কিছু কিছু জিনিস নির্ধারিত করা আছে।
কাজেই আপনার দেশের সীমার ইনোসেন্ট প্যাসেজটা আপনি ইচ্ছা করলে , বন্ধ করতে পারেন। কিন্তু কোনো চার্জের কথা বলা নাই। চার্জের কথা বলা আছে যদি স্পেসিফিক আপনাকে কোনো সার্ভিস দেয়। যেমন আপনি একটা পাইলট পাঠালেন বা একটা ট্রাক পাঠালেন, তার জন্য আপনাকে চার্জ দিতে হবে। যাওয়া আসার জন্য অবাধ এটা ছিল। সাবজেক্ট টু ওই তিনটা কথা—শান্তি, শৃঙ্খলা এবং উপকূলীয় দেশের নিরাপত্তার প্রতি হুমকিস্বরূপ কোনো কিছু করা যাবে না। তাহলে এটা আর মানে বাংলায় যেটা বলে—নিরাপদ অতিক্রমণ বা নিরপরাধ অতিক্রমণ।
৮২ সালের আইনে কি হলো? এলো ট্রানজিট প্যাসেজ। কেন? অনেকগুলো স্ট্রেইট বা প্রণালী আছে। প্রণালী মানে দুই বৃহৎ জলাধারকে সংযুক্ত করছে সরু একটা জলপথ। যেমন মালাক্কা প্রণালী—এদিকে ভারত মহাসাগর, ওদিকে প্যাসিফিক। তারপরে বসফরাস প্রণালী—কৃষ্ণসাগর এবং সি অফ মারমারা। তারপরে হরমুজ প্রণালী—গালফ অব ওমান আর এদিকে অ্যারাবিয়ান সি। এই সবগুলো প্রণালীর ভিতরে সকল জাহাজ ট্রানজিট প্যাসেজ নিতে পারবে। এবং এখানেও কোনো থ্রেট টু কোস্টাল স্টেট করা যাবে না। এয়ারক্রাফটের জন্য কোনো ইনোসেন্ট প্যাসেজ নাই—মানে আমার ১২ মাইলের ভিতর দিয়ে অন্য দেশের প্লেন যেতে পারবে না পারমিশন ছাড়া। কিন্তু ট্রানজিট প্যাসেজে কিন্তু ৮২ সালে যেটা করা হলো বলা হলো যে না, এয়ারক্রাফটও যেতে পারবে। জাহাজও যেতে পারবে। সব ধরনের জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হয়ে গেল। কাজেই দুইটা দুই জিনিস হয়ে গেল।
এখন আমাদের স্পেসিফিক ইস্যুতে যদি আমরা আসি। ১৯৫৯ সালে, আজকে না কিন্তু, তার মানে ৫৬ সালের পরেই, প্রথম আনক্লজ ওয়ান কিন্তু ইরান দস্তখত করে নাই, সইও করে নাই। কিন্তু ১২ নটিকাল মাইল টেরিটোরিয়াল সি তারা দাবি করল। এখন এই হরমুজ প্রণালীর সবথেকে যে সরু জায়গাটা, এটা চওড়ায় আছে ধরেন ৫২ নটিকাল মাইলের মত, কিন্তু সবথেকে সরু জায়গাটা হল ২১ নটিকাল মাইল। ১৯৫৯ সালে ইরান বলল যে এটা আমাদের টেরিটোরিয়াল সি, আমরা ৩ মাইলের পরিবর্তে ১২ মাইল পর্যন্ত টেরিটোরিয়াল সি নিলাম। ওমান ৭২ সালে বলল আমরাও ১২ মাইল নিলাম। ২৪ মাইল থাকলেও দুই দেশে ভাগ করে নিত। তার মানে তাদের টেরিটোরিয়াল সি-এর দাবিটা দুই দেশেরই একে অপরের উপরে ওভারল্যাপিং করে গেল। এই অবস্থায় কিন্তু চলে আসছিল। কিন্তু ইরান কোনোদিনই এটাকে স্পষ্টভাবে ট্রানজিট প্যাসেজ হিসেবে মানেনি।
বসফরাস প্রণালীতে ১৯৩৬ সালের একটা চুক্তি অনুযায়ী তুর্কি ওখান থেকে পয়সা নেয়—৫.৪৩ ডলার পার টন কার্গো। যদিও মালাক্কা প্রণালীতে পয়সা নেওয়া হয় না। হরমুজ দিয়ে ২৫% ব্যবসা বাণিজ্য সারা দুনিয়ার তেল, গ্যাস, হিলিয়াম নানা ধরনের জিনিস এখান থেকে যাওয়া আসা করে। ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে প্রতিবছরই কোনো না কোনো প্রবলেম এখানে হচ্ছিল।
স্ট্রিম: আনক্লজ অনুযায়ী ইরান কি হরমুজ দিয়ে আন্তর্জাতিক অতিক্রমণ বন্ধ করতে পারে?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: আমেরিকা একটা প্লেন ৩৫৫ জন যাত্রীসহ ফেলে দিয়েছিল এই প্রণালীতেই। এর আগেও কয়েকবার ইরান এটাকে বন্ধ করতে চেয়েছে। ওরা বন্ধ করতে দেয়নি। যুদ্ধজাহাজ এসেছে এখানে, কিন্তু যুদ্ধজাহাজে যেতে পারে না। ইরানের মূল বিষয়টা কোন জায়গায়? এখন তো যুদ্ধ অবস্থায় আছে। যাদের বিরুদ্ধে সে যুদ্ধ করছে, তারা তো তার ওই তিনটা শর্ত—শান্তি, শৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তা—এর প্রতি হুমকি। কাজেই যে হুমকি দিচ্ছে, তাকে সে ইনোসেন্ট প্যাসেজ কেন দেবে?
কাজেই যতটুকু লিগাল পজিশনে ইরান এই জায়গাটায় ঠিক আছে। সে তো অলরেডি ডিক্লেয়ার করছে, এই আনক্লজের অনেক আগে থেকেই সে ডিক্লেয়ার করে আসছে যে ১২ মাইল সমুদ্র তার। কাজেই এখানে ইনোসেন্ট প্যাসেজ অ্যাপ্লিকেবল। আমার লিগাল মতামত হলো, যে পজিশনটা ইরান নিয়েছে সেটা লিগালি কারেক্ট।
স্ট্রিম: হরমুজ অতিক্রম করতে দেওয়ার বিপরীতে ইরান কি কর বা অর্থ আদায় করতে পারে?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: এখন হয়তো বলতে পারেন যে হ্যাঁ, সে এখন আবার পয়সাও চাচ্ছে। এখন ইনোসেন্ট প্যাসেজেও কিন্তু পয়সা নেওয়ার কোনো সুযোগ নাই। ট্রানজিট প্যাসেজেও। যদিও তুর্কি নেয়। বাকি আর কোথাও কিন্তু এর সুযোগ নাই।
স্ট্রিম: ইরানি বন্দরে মার্কিন নৌ অবরোধ কি বাংলাদেশসহ যেকোনো নিরপেক্ষ দেশের নিরাপদে হরমুজ অতিক্রমণের অধিকার ক্ষুণ্ণ করতে পারে?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: এখন আমেরিকা ব্লকেড দিয়েছে। অনেকেই বলবে, ব্লকেড তো ঠিক না। না, ব্লকেড কিন্তু একটা আইন আছে। সেটা হলো স্যান রেমো ম্যানুয়াল। সেই ম্যানুয়ালে, লজ অফ আর্মড কনফ্লিক্ট অ্যাট সি ১৯৪৯-এ লিপিবদ্ধ আছে যে সাগরে সমুদ্রযুদ্ধ করতে গেলে কিভাবে করা যাবে। সেখানে ব্লকেড এলাউড। কিন্তু একটা দেশকে যখন ব্লকেড দেবে, তখন তাকে বলতে হবে কোন জায়গা থেকে কোন জায়গা পর্যন্ত ব্লকেড দিল এবং কিভাবে সেটা এনফোর্স করবে। পক্ষপাতিত্ব করা যাবে না। আরেকটা জিনিস, নিউট্রাল শিপিং—তাদেরকে যেতে দিতে হবে।
স্ট্রিম: বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় ইনোসেন্ট প্যাসেজ অধিকার সাপেক্ষে অন্য কোনো দেশের জাহাজ কি আসতে পারবে?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: এই যে কুতুবদিয়া আইল্যান্ড, যেখানে মাতারবাড়ি বন্দরটা হচ্ছে। এই কুতুবদিয়াতে ১৯৮৭ সালে ভারতীয় একটা জাহাজ, ফ্রিগেট নীলগিরি আসলো। এসে ঠিক ১৩ মাইল দূরে অ্যাংকর করলো। করে বলল—আমরা তো ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটারে আছি। ১২ মাইল তোমাদের টেরিটোরিয়াল সি। তো আমরা বললাম, কেন আসছো, কী করতে আসছো? তারা কোনো কিছু আমাদেরকে বলে নাই। বলে যে আমাদের জাহাজ নষ্ট হয়েছে বা নানা ধরনের অজুহাত দেখিয়েছে। ওরা সাত-আট দিন থেকে চলে গেল। আরেকটা জাহাজ আসল। ওইটাও আরো আট-দশ দিন থেকে থাকল। মানে এটা এক ধরনের ডেমনস্ট্রেশন—যে তোমাদের টেরিটোরিয়াল সি আমরা মোটামুটি মানি না।
আমরা এখন যেটা করছি—টেরিটোরিয়াল সি দিয়ে দিয়েছি যে আমাদের এই লাইন, মানে এখান থেকে ১২ মাইল। তাহলে এটা হয়ে গেল আমাদের ইন্টারনাল ওয়াটার। ইন্টারনাল ওয়াটারে কোনো ইনোসেন্ট প্যাসেজ নাই। কাজেই আমরা এমনভাবে করছি, এখন আর কেউ চট্টগ্রাম বন্দরে আসার জন্য যে আমার এটা রাইট আছে ইনোসেন্ট প্যাসেজ—না।
প্রত্যেকটা দেশই চাইবে তার দেশের সার্বিক নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করার জন্য আইন প্রণয়ন করতে। আমরা কিন্তু টেরিটোরিয়াল ওয়াটারস অ্যান্ড মেরিটাইম জোনস অ্যাক্ট করে এটাকে আইনে পরিণত করেছি—একেবারে পার্লামেন্টে পাশ করে। এখন ইটস এ ল। কাজেই এখানে আর আগের মতো বিদেশী কোনো জাহাজ আসার বিষয়টা আগের মতো সহজ না। টেরিটোরিয়াল সি-এর ভিতর দিয়ে যেতে পারবে, কোনো সমস্যা নেই—ওই ১২ মাইল পর্যন্ত।
স্ট্রিম: আনক্লজ-এর ভিত্তিতে বাংলাদেশ কি ইরানের সাথে হরমুজ দিয়ে ইনোসেন্ট প্যাসেজ এর জন্য আলোচনা করতে পারে?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: এখানে একটু গ্যাপ আছে। ৮২ সালের আইনটাকে ইরান এখনো কাস্টমারি ল হিসেবে মানে না। ৫৬ সালেরটা তারা মানে—যেটা তারা সাইনও করেনি, রেটিফাইও করেনি। এখন অবশ্যই যেহেতু তারা একটি সিগনেটারি এবং ১২ মাইল তারা দাবি করছে, তার মানে আইনানুযায়ী তারা ১২ মাইল দাবি করছে। কাজেই এখানে অবশ্যই আমাদের সুযোগ আছে কথা বলার।
এই কথা বলাটা যতটা না জরুরি, তার থেকে বেশি জরুরি হলো—ইনোসেন্ট প্যাসেজ আমাদেরকে না দেওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ ইরানের নাই। কেন নাই? আমরা এমন কোনো দেশ না যে শান্তি নষ্ট করব, বা নিরাপত্তার জন্য হুমকি হব। কাজেই ওই তিনটা বেসিক শর্ত আমরা পূরণ করতে পারি। আমরা যেহেতু তা পারি, লিগালি আমাদের একটি ক্লেইম আছে—আমাদেরকে ইনোসেন্ট প্যাসেজ দিতে হবে। যদি তারা ট্রানজিট প্যাসেজ নাও দেয়। ইনোসেন্ট প্যাসেজের জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী দাবিদার।
স্ট্রিম: বাংলাদেশ যদি ইরানের দাবির সাথে সামঞ্জস্য রেখে হরমুজে ইনোসেন্ট প্যাসেজ রেজিমকে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে কী ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: এখানে আসলে একটা দ্বৈততা থেকে যাচ্ছে। প্রণালী হলে এখানে তারা যদিও ইনোসেন্ট প্যাসেজ চাইছে—আমরা যদি সেটা মেনে নেই, তার মানে উই আর কমপ্রমাইজিং উইথ দ্য স্ট্যান্ডার্ড ল অব দ্য সি। এটা করা মানে হলো—নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে কিছু দাবি আদায় করে নেওয়া, যেহেতু আমাদের তেল-গ্যাস সবই দরকার, এগুলো ছাড়া চলবে না। আরেকটা হলো আন্তর্জাতিক ফোরামে আইনগতভাবে বলা যে আমরা ইনোসেন্ট প্যাসেজ দিচ্ছি।
সবাই কিন্তু এতদিন ইনোসেন্ট প্যাসেজই নিয়েছে। তারা কিন্তু কাউকে ট্রানজিট প্যাসেজ দেয়নি। কিন্তু লিগাল অ্যাসপেক্টে বলতে গেলে আপনি সেটা খোলাখুলি বলতে পারবেন না যে আপনি ইরানের পক্ষে যাচ্ছেন। তবে হ্যাঁ, অবশ্যই আমরা ইরানের সঙ্গে একটা নেগোসিয়েশন করতে পারি।
স্ট্রিম: সব দিক সমন্বয় করে হরমুজে বাংলাদেশের জাহাজ চলাচল নিশ্চিত ও বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষায় কী ধরনের কূটনৈতিক কৌশল নেওয়া যেতে পারে?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: একটা জিনিস বর্তমান সমাজে যেটা দেখছি—মিডিয়া ট্রায়াল। যার ভিজিবিলিটি যত বেশি, সেই কিন্তু মনে হয় যে সফল। কিন্তু একটা জাতির বেলায় রাষ্ট্র পরিচালনা, নিরাপত্তা বাহিনী এবং কূটনীতি—এই তিনটে জিনিস কিন্তু নীরব নিভৃতে কাজ করে। এদের উপায় নাই। যেমন নিরাপত্তা বাহিনী কোনোদিন আপনাকে প্রেস রিলিজ ছাড়া যে কেউ ইচ্ছা করলে আজকের মতামত দিতে পারবে? পারবে না। কূটনীতিকরাও কিন্তু সেরকম।
“বাংলাদেশ ফাস্ট”, এই বাংলাদেশের স্বার্থ বজায় রাখার সঙ্গে সঙ্গে অন্য সবার সঙ্গেই মিলিয়ে চলার মতো একটা কূটনীতি যদি আমরা চালু করতে পারি, তাহলেই আমি মনে করব যে আমাদের কূটনীতির সাফল্য আমরা অর্জন করতে পেরেছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনেক অভিজ্ঞ কূটনীতিবিদ রয়েছেন, আমার বিশ্বাস তারা এটা জানেন ভালো করেই। অবশ্যই তাদেরকে দায়িত্ব দিলে তারা এটা সুচারুভাবে, সঠিকভাবে সম্পাদন করতে পারবেন।
স্ট্রিম: পাকিস্তানের নেতৃত্বে যুদ্ধবিরতির যে উদ্যোগ আন্তর্জাতিকভাবে চলছে তাতে বাংলাদেশেরও কি অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: একটা উদাহরণ দিয়েই বলি—সরকারের প্রশংসা করার জন্য না। ইরাক-ইরান ওয়ার কিন্তু আট বছর চলছে। ইরাককে ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড পুরো সাপোর্ট দিয়েছিল তখন ইরানের বিরুদ্ধেই। সে সময় কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মিডিয়েশন করছিলেন, পাকিস্তান করেনি। তার মানে কি? যে বাংলাদেশের অবস্থান ওই সময় ৮০’র দশকে আরো খারাপ অবস্থানে ছিল। আমরা অর্থনৈতিকভাবে, কূটনৈতিকভাবে আজকের অবস্থার থেকে অনেক নিচে ছিলাম। কিন্তু ইরাক-ইরান যুদ্ধে আমাদের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সাহেব এই মিডিয়েশনে খুব সফলভাবে চেষ্টা করেছিলেন। উনি যদি বেঁচে থাকতেন হয়তোবা সাকসেসফুল করতে পারতেন এটা।
আমি মনে করি না যে আমাদের সেই ক্যাপেবিলিটি নাই বা আমাদের করার মতো দক্ষতা নেই। আমরা আজকে অনেক ভালো পজিশনে আছি। আমাদের পার ক্যাপিটা ইনকাম ভারত থেকেও এখন ভালো, সামনে ইনশাআল্লাহ আরো ভালো হবে। কাজেই এটা হলো ব্যক্তিবিশেষের অভিপ্রায়, চেষ্টা। আমাদের কিন্তু এই জায়গাটায় প্রবলেম, যে জায়গাটায় রাজনীতি। আমাদের ভিতরে যে বিভাজনটা থাকে, এই বিভাজনটা যখন বাইরের দেশে দেখে তখন কিন্তু তারা অন্যরকম মনে করে।
আমরা কথাবার্তা খুবই অপ্রাসঙ্গিক এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে অনেক কিছু বলে ফেলি, যেগুলো বাইরের দুনিয়ার জন্য বলাটা সঠিক না। ভিতরে স্বল্প পরিসরে নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু সব কথাই পত্রপত্রিকায় বলে দিলে এটা কিন্তু কূটনীতিবিদদের জন্য খুব খারাপ। মানে তারা সমস্যায় পড়ে যায়।
কাজেই আমাদের দেশকে যদি আমরা ভালোবাসি তাহলে আমাদেরকে মানতে হবে যে কোনো সরকারই আমাদের এই দেশের সমস্যা এককভাবে, একদিনে বা এক বছরে বা পাঁচ বছরে সমাধান করতে পারবে না। আমাদের সময়ের প্রয়োজন।
পাকিস্তানের আমাদের থেকে যে আর্থিক অবস্থা খুব বেশি ভালো তা কিন্তু না। হ্যাঁ তারা টাকা পায় অন্যান্য দেশ থেকে, কিন্তু আমরা কিন্তু নিজেদের অর্থে, উৎপাদিত অর্থে আমরা বেঁচে আছি। এটা কিন্তু একটা বড় শক্তি। এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে যদি আমরা সামনে এগিয়ে যাই আমার বিশ্বাস যে আমরা আমাদের হৃত গৌরব ফিরে পাব। পুনরায় হয়তো আমাদেরকেও দেখবেন আমরা এরকম ধরনের একটা রোলে চলে যেতে পারবো ইনশাআল্লাহ। আমি আশাবাদী।
স্ট্রিম: স্ট্রেইট অব হরমুজের ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ কী হতে পারে?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: আমেরিকার প্রেসিডেন্ট যে যুদ্ধ ঘোষণা করছে, সে যুদ্ধ কিন্তু ৬০ দিন পরে ওদের সিনেটে যেতে হবে। ৬০ দিন কিন্তু কাছাকাছি আসছে। কাজেই সে যদি ৬০ দিন পরে সিনেটের অ্যাপ্রুভাল না পায় তাহলে যুদ্ধের পরিস্থিতি অন্যরকম দাঁড়াবে। হয়তো অনেক দেশই এটা ওয়েট করছে। এখন যদিও যুদ্ধবিরতি চলছে।
আমার কাছে যেটা মনে হয় যে ইরান এটা কূটনৈতিকভাবে তাদের পজিশন শক্ত করার জন্যই হয়তো একটা পয়সাপাতির ব্যাপারে বলছে। আল্টিমেটলি তারা যে তা নেবে—এটা আমার কাছে মনে হয় না। ইট ইজ এ বার্গেইনিং পয়েন্ট। সব দেশেই করে।
ধরেন এই যে আমরা সমুদ্রসীমার মামলা করেছি। এই মামলায় আমরা এমন যুক্তিতর্ক দিয়েছি যেগুলো আমরা নিজেরাই জানি যে টিকবে না। কিন্তু যুক্তি যদি পাঁচ-ছয়টা দেন, দুই-তিনটা টিকলে আপনার পক্ষে আসবে। কারণ আমাদের যে সমস্যা ছিল সেটা হলো ইকুইডিস্টেন্স, সমদূরত্ব পদ্ধতি আর ন্যায্যতা। কাজেই ন্যায্যতার জন্য আমাদের যে সমস্ত দরকার ছিল, যে সমস্ত যুক্তিতর্ক দেওয়া—তার থেকে আমরা বেশি দিয়েছি জেনে শুনেও যে ওগুলো কাজে আসবে না। কাজেই এখানেও যেহেতু তারা আলাপ আলোচনা করছে, নেগোসিয়েশন করছে দুই পক্ষই দুইদিকে আছে, কাজেই তারা কিছু তো চাইবেই যেটা হয়তো আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে যে এটা অযৌক্তিক বা ইললিগাল। কিন্তু আমার মনে হয় টেবিলে বসলে সামনে, কারণ ডিপ্লোমেসি ছাড়া এই ধরনের পরিস্থিতি থেকে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে কোনোদিন কেউ কাউকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। এখানেও দমিয়ে রাখতে পারবে না বলেই আমি মনে করি।

বাংলাদেশের জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হরমুজ দিয়ে আমাদের জাহাজের নির্বিঘ্নে চলাচল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউএন কনভেনশন অন দ্য ল অব দ্য সি বা (UNCLOS) সাপেক্ষে কি কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে পারে বাংলাদেশ? বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ রিয়ার এডমিরাল (অবসরপ্রাপ্ত) মুহাম্মদ খুরশেদ আলম। স্ট্রিমের রিসার্চ ফেলো সানীউজ্জামান পাভেলের সঙ্গে সাক্ষাৎকারটি এখানে পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।
স্ট্রিম: ইউএন কনভেনশন অন দ্য ল অব দ্য সি বা আনক্লজ সমুদ্র সংবিধান হিসেবে পরিচিত। এতে অন্যান্য অনেক কিছুর সঙ্গে সমুদ্রে সকল দেশের জাহাজের চলাচলের অধিকার লিপিবদ্ধ করা আছে। আনক্লজ-এ আন্তর্জাতিক চলাচলের কী কী অধিকার আছে ও স্ট্রেইট অব হরমুজের ক্ষেত্রে কোনটি প্রযোজ্য?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: আমি প্রথমেই একটু ইতিহাস থেকে কিছু বলে নিতে চাই। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন বা আনক্লজ কিন্তু এই পর্যন্ত তিনটা হয়েছে। প্রথম আনক্লজ ছিল ১৯৫৬ সালে। ১৯৫৬ সালের আনক্লজে ইনোসেন্ট প্যাসেজটা চলে আসে। মানে, এক দেশের টেরিটোরিয়াল সি-এর ভিতর দিয়ে যেহেতু প্রাচীনকাল থেকে জাহাজ উপকূলের খুব কাছে দিয়ে যেত, যাতে বিপদে পড়লে হেল্প নিতে পারে। কাজেই এই টেরিটোরিয়াল সি-এর ভিতর দিয়ে যাওয়া আসার যে ব্যবস্থাটা আমাদের প্রথম আনক্লজ ১৯৫৬ সালে, যেটার নাম জেনেভা কনভেনশন বলা হয়, সেখানে এটা স্বীকৃত ছিল যে যেতে পারবে। তখন কিন্তু টেরিটোরিয়াল সি ছিল মাত্র তিন নটিকাল মাইল।
এটা ট্রেডিশনালি ১৭০২ সাল থেকে তিন নটিকাল মাইলই ছিল। এই ৫৬ সালেও তিন নটিকাল মাইলই থাকলো। ৬০ সালে আরেকটা আনক্লজ হয়, আনক্লজ টু। সেখানে একটা প্রস্তাব করা হয়েছিল যে ঠিক আছে, তিনের পরিবর্তে এটা আমরা ছয় করি টেরিটোরিয়াল সি-তে। কিন্তু এটা পাস হয় নাই। এই কারণে যে ৮৮টা দেশ তাতে যোগ দিয়েছিল। একটা দেশ এর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল। কাজেই ওই আনক্লজ টু বাস্তবে রূপ লাভ করে নাই।
ফাইনালি আনক্লজ ওয়ানটা ১৯৬৪ সালে আইনে পরিণত হল। আইনে পরিণত হওয়ার পরে একটা কথা উঠলো যে ৫৬ সালের যে আইনটা করা হয়েছে, সে সময় বেশিরভাগ দেশ পরাধীন ছিল। কাজেই তাদের কলোনিয়াল মাস্টার্সরা এই আইনটার ওপরে ওই দেশের স্বার্থ নিয়ে আলাপ আলোচনা করেছে। তারা প্রত্যেকটা দেশের চাহিদা অনুযায়ী কারেক্টলি আইনটাকে তুলে ধরতে পারে নাই। যেমন পাকিস্তান, ভারত—এরকম সব দেশ। আমরা ৪৭ সালে স্বাধীনতা পেলেও ৬০-এর পরে কিন্তু বেশিরভাগ দেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে।
এইজন্য ৭৩ সালে আবার জাতিসংঘ সিদ্ধান্ত নিল যে আমরা একটা নতুন আনক্লজ করব। এটা হল আনক্লজ থ্রি। এই আনক্লজ থ্রি নিয়ে ৭৩ সাল থেকে আলাপ আলোচনা শুরু হলো। ফাইনালি ১৯৮২ সালের ১০ই ডিসেম্বর এই আনক্লজ থ্রি বা আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন-৩ পাস হয়। পাস হওয়ার পরে ১০ই ডিসেম্বর এটা জামাইকাতে উন্মুক্ত করা হয় সিগনেচারের জন্য। ১১৮টা দেশ তাতে সাইন করে। আমিও ছিলাম সেখানে বাংলাদেশ থেকে। আমাদের নৌবাহিনী প্রধান ছিলেন। রাষ্ট্রদূত শাহেদ আক্তার ছিলেন। আমরা বাংলাদেশের পক্ষে এটা দস্তখত করি।
এখন এই আইনে প্রথম এই ট্রানজিট প্যাসেজটা আসে। ৫৬ সালের আইনে ট্রানজিট প্যাসেজ ছিল না। এখন আমি যদি আলাদা করে দেখি, তো এই ৮২ সালের আইনটা আইনে পরিণত হয়েছে ৯৪ সালে। এর আগে কিন্তু ৬০টা জাতি বা দেশ এটাকে অনুমোদন করে নাই।
আমরা সাইন করলাম ঠিকই। কিন্তু এটাকে রেটিফাই করলাম ২০০১ সালে। তার মানে আইনটা আমাদের উপরে প্রযোজ্য হয়ে গেল। সাইন করলে এটা লিগালি তেমন প্রযোজ্য হয় না। এটাকে রেটিফাই করতে হয় অথবা অ্যাকসেশন করতে হয়।

এখন এখানে দুইটা জিনিস দেখেন। একটা হল ইনোসেন্ট প্যাসেজ, যেটা ৫৬ সালে আছে। ইনোসেন্ট প্যাসেজ মানে কি? মানে উপকূলীয় দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তা—এই তিনটা জিনিসকে ব্যাহত না করে আপনি ওই দেশের টেরিটোরিয়াল সি-এর ভিতর দিয়ে পাস করতে পারবেন। আভ্যন্তরীণ ইন্টারনাল ওয়াটার একটা জায়গা আছে। পোর্ট ইন্টারনাল ওয়াটারের ভিতরে, পোর্ট থেকেও বের হয়ে যেতে পারবেন। আবার পোর্টেও ঢুকতে পারবেন। এটা ইনোসেন্ট প্যাসেজ।
ইনোসেন্ট প্যাসেজে ১২টা কাজ করা যায় না তা আইনে বলা আছে। যেমন আপনি গোলাবারুদের প্র্যাকটিস করতে পারবেন না। যদি বিমানবাহী জাহাজ হয়, বিমান উড়াতেও পারবেন না, নামাতেও পারবেন না। তারপরে কারেন্সি ইত্যাদি নিয়ে ব্যবসা করতে পারবেন না। কাউকে থ্রেট করতে পারবেন না। স্টেটের পলিটিক্যাল সার্বভৌমত্ব নিয়ে থ্রেট করতে পারবেন না। এরকম কিছু কিছু জিনিস নির্ধারিত করা আছে।
কাজেই আপনার দেশের সীমার ইনোসেন্ট প্যাসেজটা আপনি ইচ্ছা করলে , বন্ধ করতে পারেন। কিন্তু কোনো চার্জের কথা বলা নাই। চার্জের কথা বলা আছে যদি স্পেসিফিক আপনাকে কোনো সার্ভিস দেয়। যেমন আপনি একটা পাইলট পাঠালেন বা একটা ট্রাক পাঠালেন, তার জন্য আপনাকে চার্জ দিতে হবে। যাওয়া আসার জন্য অবাধ এটা ছিল। সাবজেক্ট টু ওই তিনটা কথা—শান্তি, শৃঙ্খলা এবং উপকূলীয় দেশের নিরাপত্তার প্রতি হুমকিস্বরূপ কোনো কিছু করা যাবে না। তাহলে এটা আর মানে বাংলায় যেটা বলে—নিরাপদ অতিক্রমণ বা নিরপরাধ অতিক্রমণ।
৮২ সালের আইনে কি হলো? এলো ট্রানজিট প্যাসেজ। কেন? অনেকগুলো স্ট্রেইট বা প্রণালী আছে। প্রণালী মানে দুই বৃহৎ জলাধারকে সংযুক্ত করছে সরু একটা জলপথ। যেমন মালাক্কা প্রণালী—এদিকে ভারত মহাসাগর, ওদিকে প্যাসিফিক। তারপরে বসফরাস প্রণালী—কৃষ্ণসাগর এবং সি অফ মারমারা। তারপরে হরমুজ প্রণালী—গালফ অব ওমান আর এদিকে অ্যারাবিয়ান সি। এই সবগুলো প্রণালীর ভিতরে সকল জাহাজ ট্রানজিট প্যাসেজ নিতে পারবে। এবং এখানেও কোনো থ্রেট টু কোস্টাল স্টেট করা যাবে না। এয়ারক্রাফটের জন্য কোনো ইনোসেন্ট প্যাসেজ নাই—মানে আমার ১২ মাইলের ভিতর দিয়ে অন্য দেশের প্লেন যেতে পারবে না পারমিশন ছাড়া। কিন্তু ট্রানজিট প্যাসেজে কিন্তু ৮২ সালে যেটা করা হলো বলা হলো যে না, এয়ারক্রাফটও যেতে পারবে। জাহাজও যেতে পারবে। সব ধরনের জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হয়ে গেল। কাজেই দুইটা দুই জিনিস হয়ে গেল।
এখন আমাদের স্পেসিফিক ইস্যুতে যদি আমরা আসি। ১৯৫৯ সালে, আজকে না কিন্তু, তার মানে ৫৬ সালের পরেই, প্রথম আনক্লজ ওয়ান কিন্তু ইরান দস্তখত করে নাই, সইও করে নাই। কিন্তু ১২ নটিকাল মাইল টেরিটোরিয়াল সি তারা দাবি করল। এখন এই হরমুজ প্রণালীর সবথেকে যে সরু জায়গাটা, এটা চওড়ায় আছে ধরেন ৫২ নটিকাল মাইলের মত, কিন্তু সবথেকে সরু জায়গাটা হল ২১ নটিকাল মাইল। ১৯৫৯ সালে ইরান বলল যে এটা আমাদের টেরিটোরিয়াল সি, আমরা ৩ মাইলের পরিবর্তে ১২ মাইল পর্যন্ত টেরিটোরিয়াল সি নিলাম। ওমান ৭২ সালে বলল আমরাও ১২ মাইল নিলাম। ২৪ মাইল থাকলেও দুই দেশে ভাগ করে নিত। তার মানে তাদের টেরিটোরিয়াল সি-এর দাবিটা দুই দেশেরই একে অপরের উপরে ওভারল্যাপিং করে গেল। এই অবস্থায় কিন্তু চলে আসছিল। কিন্তু ইরান কোনোদিনই এটাকে স্পষ্টভাবে ট্রানজিট প্যাসেজ হিসেবে মানেনি।
বসফরাস প্রণালীতে ১৯৩৬ সালের একটা চুক্তি অনুযায়ী তুর্কি ওখান থেকে পয়সা নেয়—৫.৪৩ ডলার পার টন কার্গো। যদিও মালাক্কা প্রণালীতে পয়সা নেওয়া হয় না। হরমুজ দিয়ে ২৫% ব্যবসা বাণিজ্য সারা দুনিয়ার তেল, গ্যাস, হিলিয়াম নানা ধরনের জিনিস এখান থেকে যাওয়া আসা করে। ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় থেকে শুরু করে প্রতিবছরই কোনো না কোনো প্রবলেম এখানে হচ্ছিল।
স্ট্রিম: আনক্লজ অনুযায়ী ইরান কি হরমুজ দিয়ে আন্তর্জাতিক অতিক্রমণ বন্ধ করতে পারে?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: আমেরিকা একটা প্লেন ৩৫৫ জন যাত্রীসহ ফেলে দিয়েছিল এই প্রণালীতেই। এর আগেও কয়েকবার ইরান এটাকে বন্ধ করতে চেয়েছে। ওরা বন্ধ করতে দেয়নি। যুদ্ধজাহাজ এসেছে এখানে, কিন্তু যুদ্ধজাহাজে যেতে পারে না। ইরানের মূল বিষয়টা কোন জায়গায়? এখন তো যুদ্ধ অবস্থায় আছে। যাদের বিরুদ্ধে সে যুদ্ধ করছে, তারা তো তার ওই তিনটা শর্ত—শান্তি, শৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তা—এর প্রতি হুমকি। কাজেই যে হুমকি দিচ্ছে, তাকে সে ইনোসেন্ট প্যাসেজ কেন দেবে?
কাজেই যতটুকু লিগাল পজিশনে ইরান এই জায়গাটায় ঠিক আছে। সে তো অলরেডি ডিক্লেয়ার করছে, এই আনক্লজের অনেক আগে থেকেই সে ডিক্লেয়ার করে আসছে যে ১২ মাইল সমুদ্র তার। কাজেই এখানে ইনোসেন্ট প্যাসেজ অ্যাপ্লিকেবল। আমার লিগাল মতামত হলো, যে পজিশনটা ইরান নিয়েছে সেটা লিগালি কারেক্ট।
স্ট্রিম: হরমুজ অতিক্রম করতে দেওয়ার বিপরীতে ইরান কি কর বা অর্থ আদায় করতে পারে?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: এখন হয়তো বলতে পারেন যে হ্যাঁ, সে এখন আবার পয়সাও চাচ্ছে। এখন ইনোসেন্ট প্যাসেজেও কিন্তু পয়সা নেওয়ার কোনো সুযোগ নাই। ট্রানজিট প্যাসেজেও। যদিও তুর্কি নেয়। বাকি আর কোথাও কিন্তু এর সুযোগ নাই।
স্ট্রিম: ইরানি বন্দরে মার্কিন নৌ অবরোধ কি বাংলাদেশসহ যেকোনো নিরপেক্ষ দেশের নিরাপদে হরমুজ অতিক্রমণের অধিকার ক্ষুণ্ণ করতে পারে?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: এখন আমেরিকা ব্লকেড দিয়েছে। অনেকেই বলবে, ব্লকেড তো ঠিক না। না, ব্লকেড কিন্তু একটা আইন আছে। সেটা হলো স্যান রেমো ম্যানুয়াল। সেই ম্যানুয়ালে, লজ অফ আর্মড কনফ্লিক্ট অ্যাট সি ১৯৪৯-এ লিপিবদ্ধ আছে যে সাগরে সমুদ্রযুদ্ধ করতে গেলে কিভাবে করা যাবে। সেখানে ব্লকেড এলাউড। কিন্তু একটা দেশকে যখন ব্লকেড দেবে, তখন তাকে বলতে হবে কোন জায়গা থেকে কোন জায়গা পর্যন্ত ব্লকেড দিল এবং কিভাবে সেটা এনফোর্স করবে। পক্ষপাতিত্ব করা যাবে না। আরেকটা জিনিস, নিউট্রাল শিপিং—তাদেরকে যেতে দিতে হবে।
স্ট্রিম: বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় ইনোসেন্ট প্যাসেজ অধিকার সাপেক্ষে অন্য কোনো দেশের জাহাজ কি আসতে পারবে?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: এই যে কুতুবদিয়া আইল্যান্ড, যেখানে মাতারবাড়ি বন্দরটা হচ্ছে। এই কুতুবদিয়াতে ১৯৮৭ সালে ভারতীয় একটা জাহাজ, ফ্রিগেট নীলগিরি আসলো। এসে ঠিক ১৩ মাইল দূরে অ্যাংকর করলো। করে বলল—আমরা তো ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটারে আছি। ১২ মাইল তোমাদের টেরিটোরিয়াল সি। তো আমরা বললাম, কেন আসছো, কী করতে আসছো? তারা কোনো কিছু আমাদেরকে বলে নাই। বলে যে আমাদের জাহাজ নষ্ট হয়েছে বা নানা ধরনের অজুহাত দেখিয়েছে। ওরা সাত-আট দিন থেকে চলে গেল। আরেকটা জাহাজ আসল। ওইটাও আরো আট-দশ দিন থেকে থাকল। মানে এটা এক ধরনের ডেমনস্ট্রেশন—যে তোমাদের টেরিটোরিয়াল সি আমরা মোটামুটি মানি না।
আমরা এখন যেটা করছি—টেরিটোরিয়াল সি দিয়ে দিয়েছি যে আমাদের এই লাইন, মানে এখান থেকে ১২ মাইল। তাহলে এটা হয়ে গেল আমাদের ইন্টারনাল ওয়াটার। ইন্টারনাল ওয়াটারে কোনো ইনোসেন্ট প্যাসেজ নাই। কাজেই আমরা এমনভাবে করছি, এখন আর কেউ চট্টগ্রাম বন্দরে আসার জন্য যে আমার এটা রাইট আছে ইনোসেন্ট প্যাসেজ—না।
প্রত্যেকটা দেশই চাইবে তার দেশের সার্বিক নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করার জন্য আইন প্রণয়ন করতে। আমরা কিন্তু টেরিটোরিয়াল ওয়াটারস অ্যান্ড মেরিটাইম জোনস অ্যাক্ট করে এটাকে আইনে পরিণত করেছি—একেবারে পার্লামেন্টে পাশ করে। এখন ইটস এ ল। কাজেই এখানে আর আগের মতো বিদেশী কোনো জাহাজ আসার বিষয়টা আগের মতো সহজ না। টেরিটোরিয়াল সি-এর ভিতর দিয়ে যেতে পারবে, কোনো সমস্যা নেই—ওই ১২ মাইল পর্যন্ত।
স্ট্রিম: আনক্লজ-এর ভিত্তিতে বাংলাদেশ কি ইরানের সাথে হরমুজ দিয়ে ইনোসেন্ট প্যাসেজ এর জন্য আলোচনা করতে পারে?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: এখানে একটু গ্যাপ আছে। ৮২ সালের আইনটাকে ইরান এখনো কাস্টমারি ল হিসেবে মানে না। ৫৬ সালেরটা তারা মানে—যেটা তারা সাইনও করেনি, রেটিফাইও করেনি। এখন অবশ্যই যেহেতু তারা একটি সিগনেটারি এবং ১২ মাইল তারা দাবি করছে, তার মানে আইনানুযায়ী তারা ১২ মাইল দাবি করছে। কাজেই এখানে অবশ্যই আমাদের সুযোগ আছে কথা বলার।
এই কথা বলাটা যতটা না জরুরি, তার থেকে বেশি জরুরি হলো—ইনোসেন্ট প্যাসেজ আমাদেরকে না দেওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ ইরানের নাই। কেন নাই? আমরা এমন কোনো দেশ না যে শান্তি নষ্ট করব, বা নিরাপত্তার জন্য হুমকি হব। কাজেই ওই তিনটা বেসিক শর্ত আমরা পূরণ করতে পারি। আমরা যেহেতু তা পারি, লিগালি আমাদের একটি ক্লেইম আছে—আমাদেরকে ইনোসেন্ট প্যাসেজ দিতে হবে। যদি তারা ট্রানজিট প্যাসেজ নাও দেয়। ইনোসেন্ট প্যাসেজের জন্য বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী দাবিদার।
স্ট্রিম: বাংলাদেশ যদি ইরানের দাবির সাথে সামঞ্জস্য রেখে হরমুজে ইনোসেন্ট প্যাসেজ রেজিমকে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে কী ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: এখানে আসলে একটা দ্বৈততা থেকে যাচ্ছে। প্রণালী হলে এখানে তারা যদিও ইনোসেন্ট প্যাসেজ চাইছে—আমরা যদি সেটা মেনে নেই, তার মানে উই আর কমপ্রমাইজিং উইথ দ্য স্ট্যান্ডার্ড ল অব দ্য সি। এটা করা মানে হলো—নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে কিছু দাবি আদায় করে নেওয়া, যেহেতু আমাদের তেল-গ্যাস সবই দরকার, এগুলো ছাড়া চলবে না। আরেকটা হলো আন্তর্জাতিক ফোরামে আইনগতভাবে বলা যে আমরা ইনোসেন্ট প্যাসেজ দিচ্ছি।
সবাই কিন্তু এতদিন ইনোসেন্ট প্যাসেজই নিয়েছে। তারা কিন্তু কাউকে ট্রানজিট প্যাসেজ দেয়নি। কিন্তু লিগাল অ্যাসপেক্টে বলতে গেলে আপনি সেটা খোলাখুলি বলতে পারবেন না যে আপনি ইরানের পক্ষে যাচ্ছেন। তবে হ্যাঁ, অবশ্যই আমরা ইরানের সঙ্গে একটা নেগোসিয়েশন করতে পারি।
স্ট্রিম: সব দিক সমন্বয় করে হরমুজে বাংলাদেশের জাহাজ চলাচল নিশ্চিত ও বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষায় কী ধরনের কূটনৈতিক কৌশল নেওয়া যেতে পারে?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: একটা জিনিস বর্তমান সমাজে যেটা দেখছি—মিডিয়া ট্রায়াল। যার ভিজিবিলিটি যত বেশি, সেই কিন্তু মনে হয় যে সফল। কিন্তু একটা জাতির বেলায় রাষ্ট্র পরিচালনা, নিরাপত্তা বাহিনী এবং কূটনীতি—এই তিনটে জিনিস কিন্তু নীরব নিভৃতে কাজ করে। এদের উপায় নাই। যেমন নিরাপত্তা বাহিনী কোনোদিন আপনাকে প্রেস রিলিজ ছাড়া যে কেউ ইচ্ছা করলে আজকের মতামত দিতে পারবে? পারবে না। কূটনীতিকরাও কিন্তু সেরকম।
“বাংলাদেশ ফাস্ট”, এই বাংলাদেশের স্বার্থ বজায় রাখার সঙ্গে সঙ্গে অন্য সবার সঙ্গেই মিলিয়ে চলার মতো একটা কূটনীতি যদি আমরা চালু করতে পারি, তাহলেই আমি মনে করব যে আমাদের কূটনীতির সাফল্য আমরা অর্জন করতে পেরেছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনেক অভিজ্ঞ কূটনীতিবিদ রয়েছেন, আমার বিশ্বাস তারা এটা জানেন ভালো করেই। অবশ্যই তাদেরকে দায়িত্ব দিলে তারা এটা সুচারুভাবে, সঠিকভাবে সম্পাদন করতে পারবেন।
স্ট্রিম: পাকিস্তানের নেতৃত্বে যুদ্ধবিরতির যে উদ্যোগ আন্তর্জাতিকভাবে চলছে তাতে বাংলাদেশেরও কি অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: একটা উদাহরণ দিয়েই বলি—সরকারের প্রশংসা করার জন্য না। ইরাক-ইরান ওয়ার কিন্তু আট বছর চলছে। ইরাককে ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড পুরো সাপোর্ট দিয়েছিল তখন ইরানের বিরুদ্ধেই। সে সময় কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মিডিয়েশন করছিলেন, পাকিস্তান করেনি। তার মানে কি? যে বাংলাদেশের অবস্থান ওই সময় ৮০’র দশকে আরো খারাপ অবস্থানে ছিল। আমরা অর্থনৈতিকভাবে, কূটনৈতিকভাবে আজকের অবস্থার থেকে অনেক নিচে ছিলাম। কিন্তু ইরাক-ইরান যুদ্ধে আমাদের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সাহেব এই মিডিয়েশনে খুব সফলভাবে চেষ্টা করেছিলেন। উনি যদি বেঁচে থাকতেন হয়তোবা সাকসেসফুল করতে পারতেন এটা।
আমি মনে করি না যে আমাদের সেই ক্যাপেবিলিটি নাই বা আমাদের করার মতো দক্ষতা নেই। আমরা আজকে অনেক ভালো পজিশনে আছি। আমাদের পার ক্যাপিটা ইনকাম ভারত থেকেও এখন ভালো, সামনে ইনশাআল্লাহ আরো ভালো হবে। কাজেই এটা হলো ব্যক্তিবিশেষের অভিপ্রায়, চেষ্টা। আমাদের কিন্তু এই জায়গাটায় প্রবলেম, যে জায়গাটায় রাজনীতি। আমাদের ভিতরে যে বিভাজনটা থাকে, এই বিভাজনটা যখন বাইরের দেশে দেখে তখন কিন্তু তারা অন্যরকম মনে করে।
আমরা কথাবার্তা খুবই অপ্রাসঙ্গিক এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে অনেক কিছু বলে ফেলি, যেগুলো বাইরের দুনিয়ার জন্য বলাটা সঠিক না। ভিতরে স্বল্প পরিসরে নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু সব কথাই পত্রপত্রিকায় বলে দিলে এটা কিন্তু কূটনীতিবিদদের জন্য খুব খারাপ। মানে তারা সমস্যায় পড়ে যায়।
কাজেই আমাদের দেশকে যদি আমরা ভালোবাসি তাহলে আমাদেরকে মানতে হবে যে কোনো সরকারই আমাদের এই দেশের সমস্যা এককভাবে, একদিনে বা এক বছরে বা পাঁচ বছরে সমাধান করতে পারবে না। আমাদের সময়ের প্রয়োজন।
পাকিস্তানের আমাদের থেকে যে আর্থিক অবস্থা খুব বেশি ভালো তা কিন্তু না। হ্যাঁ তারা টাকা পায় অন্যান্য দেশ থেকে, কিন্তু আমরা কিন্তু নিজেদের অর্থে, উৎপাদিত অর্থে আমরা বেঁচে আছি। এটা কিন্তু একটা বড় শক্তি। এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে যদি আমরা সামনে এগিয়ে যাই আমার বিশ্বাস যে আমরা আমাদের হৃত গৌরব ফিরে পাব। পুনরায় হয়তো আমাদেরকেও দেখবেন আমরা এরকম ধরনের একটা রোলে চলে যেতে পারবো ইনশাআল্লাহ। আমি আশাবাদী।
স্ট্রিম: স্ট্রেইট অব হরমুজের ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যৎ কী হতে পারে?
মুহাম্মদ খুরশেদ আলম: আমেরিকার প্রেসিডেন্ট যে যুদ্ধ ঘোষণা করছে, সে যুদ্ধ কিন্তু ৬০ দিন পরে ওদের সিনেটে যেতে হবে। ৬০ দিন কিন্তু কাছাকাছি আসছে। কাজেই সে যদি ৬০ দিন পরে সিনেটের অ্যাপ্রুভাল না পায় তাহলে যুদ্ধের পরিস্থিতি অন্যরকম দাঁড়াবে। হয়তো অনেক দেশই এটা ওয়েট করছে। এখন যদিও যুদ্ধবিরতি চলছে।
আমার কাছে যেটা মনে হয় যে ইরান এটা কূটনৈতিকভাবে তাদের পজিশন শক্ত করার জন্যই হয়তো একটা পয়সাপাতির ব্যাপারে বলছে। আল্টিমেটলি তারা যে তা নেবে—এটা আমার কাছে মনে হয় না। ইট ইজ এ বার্গেইনিং পয়েন্ট। সব দেশেই করে।
ধরেন এই যে আমরা সমুদ্রসীমার মামলা করেছি। এই মামলায় আমরা এমন যুক্তিতর্ক দিয়েছি যেগুলো আমরা নিজেরাই জানি যে টিকবে না। কিন্তু যুক্তি যদি পাঁচ-ছয়টা দেন, দুই-তিনটা টিকলে আপনার পক্ষে আসবে। কারণ আমাদের যে সমস্যা ছিল সেটা হলো ইকুইডিস্টেন্স, সমদূরত্ব পদ্ধতি আর ন্যায্যতা। কাজেই ন্যায্যতার জন্য আমাদের যে সমস্ত দরকার ছিল, যে সমস্ত যুক্তিতর্ক দেওয়া—তার থেকে আমরা বেশি দিয়েছি জেনে শুনেও যে ওগুলো কাজে আসবে না। কাজেই এখানেও যেহেতু তারা আলাপ আলোচনা করছে, নেগোসিয়েশন করছে দুই পক্ষই দুইদিকে আছে, কাজেই তারা কিছু তো চাইবেই যেটা হয়তো আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে যে এটা অযৌক্তিক বা ইললিগাল। কিন্তু আমার মনে হয় টেবিলে বসলে সামনে, কারণ ডিপ্লোমেসি ছাড়া এই ধরনের পরিস্থিতি থেকে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে কোনোদিন কেউ কাউকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। এখানেও দমিয়ে রাখতে পারবে না বলেই আমি মনে করি।

বিজ্ঞানের জগৎ সাধারণত প্রথাগত নিয়ম, দীর্ঘসূত্রিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ। এখানে উন্নতি পরিমাপ করা হয় দশকে আর খ্যাতি তৈরি হয় ধীরস্থির মতৈক্যের ভিত্তিতে। তবে প্রতি প্রজন্মান্তরে এমন একজন ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে, যিনি তাঁর বৈপ্লবিক চিন্তায় বিজ্ঞানের চিরাচরিত ভিত্তি নাড়িয়ে দেন।
৮ ঘণ্টা আগে
যেকোনো বড় বিপ্লব বা ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর যেমন বিপুল সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়, তেমনি পরক্ষণেই কিছু গভীর সংকট ও সংশয় জনমনে দানা বাঁধতে শুরু করে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের অন্তরে এখন একটিই প্রশ্ন নিরন্তর ঘুরপাক খাচ্ছে—সরকার কি প্রকৃতপক্ষেই জনগণের নাড়ির স্পন্দন বুঝতে পারছে? নাকি
১১ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশে পেপালের আগমনের গল্পটা একটু অদ্ভুত। প্রায় এক দশক ধরে একই কথা বলা হচ্ছে—পেপাল আসছে। প্রতিটি সরকারই এই ঘোষণা দিয়েছে, আবার নীরবে সরেও গেছে।
১ দিন আগে
সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ও অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান। শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনা, অন্তর্বর্তী ও বিএনপি সরকারের বাস্তবায়ন এবং শ্রমিকের অধিকারসহ নানা দিক নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন স্ট্রিমের প্রতিবেদক তৌফিক হাসান
১ দিন আগে