লেখা:

বাংলাদেশে প্রশাসনের ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু তাদের ওপর নীতিনির্ধারক হিসেবে যারা বসেন, সেই সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ এখনো নিয়মে পরিণত হয়নি। অথচ রাষ্ট্র পরিচালনার মান, নীতির গুণগত মান এবং গণতন্ত্রের সুস্থ বিকাশ—সবকিছুর সঙ্গেই নীতিনির্ধারকদের জ্ঞান, দক্ষতা ও মানসিকতা জড়িত। তাছাড়া নতুন সংসদ সদস্য (৯৯ জন, ৩৩%) এবং প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়েই মন্ত্রী হয়েছেন (৩৩ জন, ৬৬%), এমন ব্যক্তিবর্গের জন্য বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে আমলাতন্ত্রের ওপর অন্ধ আনুগত্য বাড়তে পারে। এটি কোনোভাবেই ইতিবাচক ফল আনবে না।
ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, আমলা—সবার জন্যই পেশাগত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও ক্রমাগত দক্ষতা উন্নয়ন বাধ্যতামূলক। অন্যদিকে রাজনীতিকদের ক্ষেত্রে এটি এখনো মূলত ‘ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা’–নির্ভর। অথচ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ নেতৃত্বে থাকেন এই রাজনীতিবিদরাই। তারাই আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন, নীতি নির্ধারণ ও জবাবদিহি ব্যবস্থার মূল নিয়ন্তা।
বাংলাদেশে প্রথম শ্রেণির সব ক্যাডার কর্মকর্তার জন্য গণপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (পিএটিসি) বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক। এই কোর্সে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, প্রশাসন, সমাজনীতি, অর্থনীতি, আইন, নীতি বিশ্লেষণ ও উন্নয়ন ভাবনা ইত্যাদি শেখানো হয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও একাধিকবার পরিষ্কার করে বলেছেন—যথাযথ প্রশিক্ষণ একজন কর্মীর মনোবল, দক্ষতা ও সার্বিক মানোন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। এ কারণেই ক্যাডার কর্মকর্তাদের দেশ–বিদেশের প্রশিক্ষণ বাড়ানো হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো: যারা আইন বানান ও নীতি ঠিক করেন, তাদের জন্য কেন একই ধরনের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক হবে না? রাষ্ট্রবিজ্ঞান, প্রশাসন, সমাজনীতি, অর্থনীতি, আইন, সংসদীয় কার্যপ্রণালি, নীতি বিশ্লেষণ ও উন্নয়ন ভাবনায় পারদর্শিতা ছাড়া কি একজন সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীকে কল্পনা করা যায়?
নতুন সংসদ সদস্যদের অনেকেই প্রথমবার নির্বাচিত হন। স্বাভাবিকভাবেই সংসদীয় বিধি–বিধান, কার্যপ্রণালি, বিল প্রণয়ন, বাজেট বিশ্লেষণ কিংবা স্থায়ী কমিটির কাজ সম্পর্কে তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকে না। এ কারণেই সম্প্রতি রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের উদ্যোগে নবনির্বাচিত এমপি ও মন্ত্রীদের জন্য দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করেছিল। সেখানে সংসদীয় কার্যপ্রণালি, আচরণবিধি, বিল পর্যালোচনা ও বাজেট বিশ্লেষণ বিষয়ে আলোকপাত করা হয়। নিঃসন্দেহে এটি একটি সময়োপযোগী, বাস্তবসম্মত ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে এই উদ্যোগগুলো এখনো দলীয়, আংশিক ও স্বল্পমেয়াদি।
নতুন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে তারা সংবিধান, রাষ্ট্রের কাঠামো, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সংসদীয় বিধি–বিধান সম্পর্কে কাঠামোবদ্ধ ধারণা পাবেন। পাশাপাশি প্রশ্নোত্তর পর্ব, কমিটি–ব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহার, আইন প্রণয়নের কৌশল, বিলের ভাষা এবং বাজেট বিশ্লেষণ সম্পর্কেও তাদের জ্ঞান বাড়বে। স্থানীয় ও জাতীয় স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিও তারা শিখতে পারবেন। এতে সংসদীয় কাজের মান বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। বিশ্বের অনেক দেশেই সংসদ সদস্যদের জন্য সংসদ–পরিচালিত প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট রয়েছে। সেখানে নবাগতদের জন্য ওরিয়েন্টেশন এবং অভিজ্ঞদের জন্য ক্রমাগত প্রশিক্ষণ চালু থাকে। এসব ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য কেবল দলীয় দক্ষতা বাড়ানো নয়, বরং সংসদীয় পেশাদারিত্ব গড়ে তোলা।
মন্ত্রী হওয়া কখনোই কোনো সাধারণ ‘ডেস্ক জব’ নয়। এটি মূলত রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও দেশ পরিচালনার কাজ। কিন্তু আজকের এই জটিল রাষ্ট্রব্যবস্থায় নেতৃত্বকেও জ্ঞানের ওপর নির্ভর করতে হয়। অর্থনীতি, প্রশাসন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ডিজিটাল রূপান্তর, জলবায়ু ঝুঁকি বা নিরাপত্তা বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা ছাড়া কার্যকর নীতি নির্ধারণ করা কঠিন।
সাম্প্রতিক খবরে জানা গেছে, নবনিযুক্ত সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রীদের অনেকেরই মন্ত্রণালয় পরিচালনা বা বাজেট বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। এ কারণেই দলগুলো এখন প্রশিক্ষণ কর্মশালার দিকে ঝুঁকছে। এসব কর্মশালায় মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো, সিদ্ধান্ত–প্রক্রিয়া এবং নীতি–নথি পড়ার নিয়ম শেখানো হয়। পাশাপাশি প্রকল্প যাচাই–বাছাই, টেন্ডার, আর্থিক শাসন, দুর্নীতি ঝুঁকি, গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনা এবং সংকটকালীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কৌশলও আলোচনা করা হয়। এ ধরনের প্রশিক্ষণ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর বা জাতীয় সংসদের অধীনে কাঠামোবদ্ধ কোর্স হিসেবে চালু হওয়া উচিত। তাহলে মন্ত্রণালয় পরিচালনায় ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা কমবে এবং প্রাতিষ্ঠানিকতা বাড়বে। এর ফলে নীতি–নির্ধারণের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। তখন ব্যক্তি বদলালেও প্রতিষ্ঠান দুর্বল হবে না।
শুধু কারিগরি দক্ষতা নয়; গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা, ভিন্নমত গ্রহণ এবং দলীয় অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের মতো বিষয়গুলোও সংসদ সদস্য–মন্ত্রীদের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের অংশ হওয়া দরকার। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে গণতন্ত্র ও প্রশিক্ষণ সংস্কৃতি দুর্বল। এটি নিয়ে বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, আগে দলীয় নেতারা নিয়মিত ক্লাস নিয়ে কর্মীদের রাজনৈতিক তত্ত্ব, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও সাংবিধানিক কাঠামো বোঝাতেন। এটি রাজনৈতিক কর্মীদের মান বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
আজকের দিনে এই কাজ আরও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে করা প্রয়োজন। দলীয় স্কুল, থিঙ্ক–ট্যাংক ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে এই ধারা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সেখানকার সেরা পাঠগুলোকে চাইলে রাষ্ট্রীয় বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে হলে কেবল ভোটের দিনের দক্ষতা যথেষ্ট নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদে নীতি–নির্ধারণের দক্ষতা, ভিন্নমত শোনা এবং যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া এটি অর্জন করা কঠিন।
সরকার ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার যে লক্ষ্য ঘোষণা করেছে, সেখানে মানবসম্পদ উন্নয়নকে মূল চাবিকাঠি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এজন্যই কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ খাতে বরাদ্দ এবং দেশ–বিদেশে প্রশিক্ষণের পরিসর বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু নীতিনির্ধারক রাজনীতিকরা যদি একই হারে নিজেদের জ্ঞান ও দক্ষতা হালনাগাদ না করেন, তবে মাঠ প্রশাসন আধুনিক হলেও নীতিনির্ধারণ পুরোনো ধারণাতেই আটকে থাকবে। এতে নীতি ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান আরও বড় হবে।
২০২৬ সালে এসে বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রযুক্তি অত্যন্ত দ্রুত বদলাচ্ছে। এই অবস্থায় অ-প্রশিক্ষিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়ে রাষ্ট্র চালানোর ঝুঁকি অনেক বেশি। জলবায়ু সংকট, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা বা আঞ্চলিক কূটনীতি—এসব বিষয়ে অন্তত বুনিয়াদি ধারণা থাকা প্রয়োজন। তা না হলে একজন মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যদের সিদ্ধান্ত অন্যের ওপর নির্ভরশীল ও ক্ষণস্থায়ী হয়ে যায়। এ কারণে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণকে ‘অতিরিক্ত সুবিধা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটিকে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হলে কিছু নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। নবনির্বাচিত সব সংসদ সদস্যদের জন্য সংসদ সচিবালয়ের অধীনে কমপক্ষে ৩–৪ সপ্তাহের বুনিয়াদি কোর্স চালু করা যায়। সেখানে সংবিধান, সংসদীয় কাজ, আইন প্রণয়ন, বাজেট ও গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো থাকবে। বিশেষ করে নতুন মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রীদের জন্য বিশেষ কোর্সের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সেখানে মন্ত্রণালয় পরিচালনা, নীতি বিশ্লেষণ, প্রকল্প–ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি–ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শেখানো হবে। পিএটিসি বা অন্য কোনো জাতীয় প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে এটি করা যেতে পারে। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলো নিজস্ব ‘রাজনৈতিক স্কুল’ চালু করতে পারে। সেখানে দলীয় চিন্তাধারা, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও নৈতিক মানদণ্ড শেখানো হবে। চাইলে এই স্কুলগুলোকে রাষ্ট্রীয় প্রশিক্ষণের সঙ্গেও যুক্ত করা যায়।
প্রশিক্ষণ কোনো জাদুর কাঠি নয়। তবে এটি নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও যুক্তিনির্ভর, তথ্যভিত্তিক এবং বাস্তবসম্মত করে তোলে। এর মাধ্যমে ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি কমে যায়। পাশাপাশি জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যকর শাসন নিশ্চিত করার সক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। তাই নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের জন্য বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কেবল কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটিকে দায়িত্বশীল, দক্ষ এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনার অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।
ড. মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান: জনস্বাস্থ্য ও সমাজনীতি বিষয়ক গবেষক; শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।

বাংলাদেশে প্রশাসনের ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু তাদের ওপর নীতিনির্ধারক হিসেবে যারা বসেন, সেই সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ এখনো নিয়মে পরিণত হয়নি। অথচ রাষ্ট্র পরিচালনার মান, নীতির গুণগত মান এবং গণতন্ত্রের সুস্থ বিকাশ—সবকিছুর সঙ্গেই নীতিনির্ধারকদের জ্ঞান, দক্ষতা ও মানসিকতা জড়িত। তাছাড়া নতুন সংসদ সদস্য (৯৯ জন, ৩৩%) এবং প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়েই মন্ত্রী হয়েছেন (৩৩ জন, ৬৬%), এমন ব্যক্তিবর্গের জন্য বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে আমলাতন্ত্রের ওপর অন্ধ আনুগত্য বাড়তে পারে। এটি কোনোভাবেই ইতিবাচক ফল আনবে না।
ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, আমলা—সবার জন্যই পেশাগত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও ক্রমাগত দক্ষতা উন্নয়ন বাধ্যতামূলক। অন্যদিকে রাজনীতিকদের ক্ষেত্রে এটি এখনো মূলত ‘ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা’–নির্ভর। অথচ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ নেতৃত্বে থাকেন এই রাজনীতিবিদরাই। তারাই আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন, নীতি নির্ধারণ ও জবাবদিহি ব্যবস্থার মূল নিয়ন্তা।
বাংলাদেশে প্রথম শ্রেণির সব ক্যাডার কর্মকর্তার জন্য গণপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (পিএটিসি) বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক। এই কোর্সে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, প্রশাসন, সমাজনীতি, অর্থনীতি, আইন, নীতি বিশ্লেষণ ও উন্নয়ন ভাবনা ইত্যাদি শেখানো হয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও একাধিকবার পরিষ্কার করে বলেছেন—যথাযথ প্রশিক্ষণ একজন কর্মীর মনোবল, দক্ষতা ও সার্বিক মানোন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। এ কারণেই ক্যাডার কর্মকর্তাদের দেশ–বিদেশের প্রশিক্ষণ বাড়ানো হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো: যারা আইন বানান ও নীতি ঠিক করেন, তাদের জন্য কেন একই ধরনের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক হবে না? রাষ্ট্রবিজ্ঞান, প্রশাসন, সমাজনীতি, অর্থনীতি, আইন, সংসদীয় কার্যপ্রণালি, নীতি বিশ্লেষণ ও উন্নয়ন ভাবনায় পারদর্শিতা ছাড়া কি একজন সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীকে কল্পনা করা যায়?
নতুন সংসদ সদস্যদের অনেকেই প্রথমবার নির্বাচিত হন। স্বাভাবিকভাবেই সংসদীয় বিধি–বিধান, কার্যপ্রণালি, বিল প্রণয়ন, বাজেট বিশ্লেষণ কিংবা স্থায়ী কমিটির কাজ সম্পর্কে তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকে না। এ কারণেই সম্প্রতি রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের উদ্যোগে নবনির্বাচিত এমপি ও মন্ত্রীদের জন্য দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করেছিল। সেখানে সংসদীয় কার্যপ্রণালি, আচরণবিধি, বিল পর্যালোচনা ও বাজেট বিশ্লেষণ বিষয়ে আলোকপাত করা হয়। নিঃসন্দেহে এটি একটি সময়োপযোগী, বাস্তবসম্মত ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে এই উদ্যোগগুলো এখনো দলীয়, আংশিক ও স্বল্পমেয়াদি।
নতুন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে তারা সংবিধান, রাষ্ট্রের কাঠামো, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সংসদীয় বিধি–বিধান সম্পর্কে কাঠামোবদ্ধ ধারণা পাবেন। পাশাপাশি প্রশ্নোত্তর পর্ব, কমিটি–ব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহার, আইন প্রণয়নের কৌশল, বিলের ভাষা এবং বাজেট বিশ্লেষণ সম্পর্কেও তাদের জ্ঞান বাড়বে। স্থানীয় ও জাতীয় স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিও তারা শিখতে পারবেন। এতে সংসদীয় কাজের মান বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। বিশ্বের অনেক দেশেই সংসদ সদস্যদের জন্য সংসদ–পরিচালিত প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট রয়েছে। সেখানে নবাগতদের জন্য ওরিয়েন্টেশন এবং অভিজ্ঞদের জন্য ক্রমাগত প্রশিক্ষণ চালু থাকে। এসব ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য কেবল দলীয় দক্ষতা বাড়ানো নয়, বরং সংসদীয় পেশাদারিত্ব গড়ে তোলা।
মন্ত্রী হওয়া কখনোই কোনো সাধারণ ‘ডেস্ক জব’ নয়। এটি মূলত রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও দেশ পরিচালনার কাজ। কিন্তু আজকের এই জটিল রাষ্ট্রব্যবস্থায় নেতৃত্বকেও জ্ঞানের ওপর নির্ভর করতে হয়। অর্থনীতি, প্রশাসন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ডিজিটাল রূপান্তর, জলবায়ু ঝুঁকি বা নিরাপত্তা বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা ছাড়া কার্যকর নীতি নির্ধারণ করা কঠিন।
সাম্প্রতিক খবরে জানা গেছে, নবনিযুক্ত সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রীদের অনেকেরই মন্ত্রণালয় পরিচালনা বা বাজেট বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। এ কারণেই দলগুলো এখন প্রশিক্ষণ কর্মশালার দিকে ঝুঁকছে। এসব কর্মশালায় মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো, সিদ্ধান্ত–প্রক্রিয়া এবং নীতি–নথি পড়ার নিয়ম শেখানো হয়। পাশাপাশি প্রকল্প যাচাই–বাছাই, টেন্ডার, আর্থিক শাসন, দুর্নীতি ঝুঁকি, গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনা এবং সংকটকালীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কৌশলও আলোচনা করা হয়। এ ধরনের প্রশিক্ষণ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর বা জাতীয় সংসদের অধীনে কাঠামোবদ্ধ কোর্স হিসেবে চালু হওয়া উচিত। তাহলে মন্ত্রণালয় পরিচালনায় ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা কমবে এবং প্রাতিষ্ঠানিকতা বাড়বে। এর ফলে নীতি–নির্ধারণের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। তখন ব্যক্তি বদলালেও প্রতিষ্ঠান দুর্বল হবে না।
শুধু কারিগরি দক্ষতা নয়; গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা, ভিন্নমত গ্রহণ এবং দলীয় অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের মতো বিষয়গুলোও সংসদ সদস্য–মন্ত্রীদের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের অংশ হওয়া দরকার। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে গণতন্ত্র ও প্রশিক্ষণ সংস্কৃতি দুর্বল। এটি নিয়ে বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, আগে দলীয় নেতারা নিয়মিত ক্লাস নিয়ে কর্মীদের রাজনৈতিক তত্ত্ব, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও সাংবিধানিক কাঠামো বোঝাতেন। এটি রাজনৈতিক কর্মীদের মান বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
আজকের দিনে এই কাজ আরও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে করা প্রয়োজন। দলীয় স্কুল, থিঙ্ক–ট্যাংক ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে এই ধারা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সেখানকার সেরা পাঠগুলোকে চাইলে রাষ্ট্রীয় বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। গণতন্ত্র শক্তিশালী করতে হলে কেবল ভোটের দিনের দক্ষতা যথেষ্ট নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদে নীতি–নির্ধারণের দক্ষতা, ভিন্নমত শোনা এবং যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া এটি অর্জন করা কঠিন।
সরকার ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার যে লক্ষ্য ঘোষণা করেছে, সেখানে মানবসম্পদ উন্নয়নকে মূল চাবিকাঠি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এজন্যই কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ খাতে বরাদ্দ এবং দেশ–বিদেশে প্রশিক্ষণের পরিসর বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু নীতিনির্ধারক রাজনীতিকরা যদি একই হারে নিজেদের জ্ঞান ও দক্ষতা হালনাগাদ না করেন, তবে মাঠ প্রশাসন আধুনিক হলেও নীতিনির্ধারণ পুরোনো ধারণাতেই আটকে থাকবে। এতে নীতি ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান আরও বড় হবে।
২০২৬ সালে এসে বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রযুক্তি অত্যন্ত দ্রুত বদলাচ্ছে। এই অবস্থায় অ-প্রশিক্ষিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়ে রাষ্ট্র চালানোর ঝুঁকি অনেক বেশি। জলবায়ু সংকট, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা বা আঞ্চলিক কূটনীতি—এসব বিষয়ে অন্তত বুনিয়াদি ধারণা থাকা প্রয়োজন। তা না হলে একজন মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যদের সিদ্ধান্ত অন্যের ওপর নির্ভরশীল ও ক্ষণস্থায়ী হয়ে যায়। এ কারণে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণকে ‘অতিরিক্ত সুবিধা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটিকে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হলে কিছু নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। নবনির্বাচিত সব সংসদ সদস্যদের জন্য সংসদ সচিবালয়ের অধীনে কমপক্ষে ৩–৪ সপ্তাহের বুনিয়াদি কোর্স চালু করা যায়। সেখানে সংবিধান, সংসদীয় কাজ, আইন প্রণয়ন, বাজেট ও গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো থাকবে। বিশেষ করে নতুন মন্ত্রী–প্রতিমন্ত্রীদের জন্য বিশেষ কোর্সের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সেখানে মন্ত্রণালয় পরিচালনা, নীতি বিশ্লেষণ, প্রকল্প–ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি–ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শেখানো হবে। পিএটিসি বা অন্য কোনো জাতীয় প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে এটি করা যেতে পারে। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলো নিজস্ব ‘রাজনৈতিক স্কুল’ চালু করতে পারে। সেখানে দলীয় চিন্তাধারা, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও নৈতিক মানদণ্ড শেখানো হবে। চাইলে এই স্কুলগুলোকে রাষ্ট্রীয় প্রশিক্ষণের সঙ্গেও যুক্ত করা যায়।
প্রশিক্ষণ কোনো জাদুর কাঠি নয়। তবে এটি নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও যুক্তিনির্ভর, তথ্যভিত্তিক এবং বাস্তবসম্মত করে তোলে। এর মাধ্যমে ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি কমে যায়। পাশাপাশি জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যকর শাসন নিশ্চিত করার সক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। তাই নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের জন্য বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কেবল কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটিকে দায়িত্বশীল, দক্ষ এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনার অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।
ড. মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান: জনস্বাস্থ্য ও সমাজনীতি বিষয়ক গবেষক; শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ।

বাংলাদেশের জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হরমুজ দিয়ে আমাদের জাহাজের নির্বিঘ্নে চলাচল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউএন কনভেনশন অন দ্য ল অব দ্য সি বা (UNCLOS) সাপেক্ষে কি কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে পারে বাংলাদেশ? বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ রিয়ার এডমিরাল (অবসরপ্রাপ্ত) মুহাম্মদ খুরশেদ আলম।
১৯ ঘণ্টা আগে
বিজ্ঞানের জগৎ সাধারণত প্রথাগত নিয়ম, দীর্ঘসূত্রিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ। এখানে উন্নতি পরিমাপ করা হয় দশকে আর খ্যাতি তৈরি হয় ধীরস্থির মতৈক্যের ভিত্তিতে। তবে প্রতি প্রজন্মান্তরে এমন একজন ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে, যিনি তাঁর বৈপ্লবিক চিন্তায় বিজ্ঞানের চিরাচরিত ভিত্তি নাড়িয়ে দেন।
১ দিন আগে
যেকোনো বড় বিপ্লব বা ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর যেমন বিপুল সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়, তেমনি পরক্ষণেই কিছু গভীর সংকট ও সংশয় জনমনে দানা বাঁধতে শুরু করে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের অন্তরে এখন একটিই প্রশ্ন নিরন্তর ঘুরপাক খাচ্ছে—সরকার কি প্রকৃতপক্ষেই জনগণের নাড়ির স্পন্দন বুঝতে পারছে? নাকি
১ দিন আগে
বাংলাদেশে পেপালের আগমনের গল্পটা একটু অদ্ভুত। প্রায় এক দশক ধরে একই কথা বলা হচ্ছে—পেপাল আসছে। প্রতিটি সরকারই এই ঘোষণা দিয়েছে, আবার নীরবে সরেও গেছে।
২ দিন আগে