জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের বিচার আইনের শাসনের বড় পরীক্ষা

সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গভীর ক্ষত। নিহতদের পরিবার ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়। রাষ্ট্রেরও দায় হচ্ছে অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু এই ন্যায়বিচারের পথেই যদি অসংখ্য নিরপরাধ মানুষ মিথ্যা মামলা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা মামলা-বাণিজ্যের শিকার হন তাহলে তা বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকে পুনর্গঠনের বদলে আরও দুর্বল করে দেবে।

প্রায় দুই বছরেও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট ১ হাজার ৮৬২টি মামলার মাত্র ১৩ দশমিক ৬৪ শতাংশের তদন্ত শেষ হয়েছে। বাকি ৮৬ শতাংশের বেশি মামলা এখনো তদন্তাধীন। ময়নাতদন্ত ছাড়া দাফন, একই ঘটনাকে ঘিরে একাধিক মামলা, এজাহারের অসংগতি এবং নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্তে বিলম্ব তদন্তকে জটিল ও দীর্ঘায়িত করেছে।

সমস্যার এখানেই শেষ নয়। বহু মামলায় ঢালাওভাবে আসামি করা হয়েছে। ব্যক্তিগত শত্রুতা, ব্যবসায়িক বিরোধ, রাজনৈতিক প্রতিশোধ কিংবা অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে নিরীহ মানুষকে মামলায় জড়ানোর অসংখ্য অভিযোগ সামনে এসেছে। কোনো কোনো মামলার বাদী নিজেই স্বীকার করেছেন যে কারা আসামি হবেন সেই তালিকা অন্যরা তৈরি করে দিয়েছেন। তদন্তে এমন বহু ব্যক্তির মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণও মেলেনি। এই বিষয়গুলো বিচারের গতি মন্থর করছে। সেই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থা প্রতিশোধের হাতিয়ার হতে পারে না। সংবিধান প্রতিটি নাগরিককে আইনের সমান সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারের অধিকার দিয়েছে। কোনো ব্যক্তিকে উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া বছরের পর বছর হত্যা মামলার আসামি করে রাখা, সামাজিকভাবে কলঙ্কিত করা কিংবা মামলা থেকে অব্যাহতির জন্য অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রাখা এক ধরনের নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন।

অন্যদিকে, প্রকৃত অপরাধীদের বিচারও সমান জরুরি। মিথ্যা মামলা ও দুর্বল তদন্তের কারণে প্রকৃত দায়ীরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেলে নিহত ব্যক্তিদের পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে। ফলে নিরপরাধকে মুক্তি দেওয়া এবং প্রকৃত অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করা—এই দুটি লক্ষ্যকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে।

এখন প্রয়োজন তদন্তে গতি আনার পাশাপাশি তার মান নিশ্চিত করা। প্রতিটি মামলা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করতে হবে, শক্ত প্রমাণ ছাড়া কাউকে অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি নেই তাঁদের দ্রুত অব্যাহতি দিতে হবে। একই সঙ্গে মামলা-বাণিজ্য, মিথ্যা তথ্য প্রদান এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিরপরাধ মানুষকে আসামি করার অভিযোগগুলোরও পৃথক তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। বিচারব্যবস্থাকে অপব্যবহার করার দায়ও কোনো অংশে কম অপরাধ নয়।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সেসবের বিচার হওয়া বাংলাদেশের আইনের শাসনের একটি বড় পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় রাষ্ট্র তখনই সফল হবে যখন সে একদিকে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনবে, অন্যদিকে নিরপরাধ মানুষের নাগরিক অধিকারও সমানভাবে রক্ষা করবে। ন্যায়বিচারের প্রকৃত অর্থ কেবল শাস্তি নয়। নির্দোষকে সুরক্ষা দেওয়াও বিচার প্রতিষ্ঠার অপরিহার্য শর্ত। বিচার যদি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে চায় তবে সেটি হতে হবে একই সঙ্গে দৃঢ়, নিরপেক্ষ এবং ন্যায়সঙ্গত।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত