সুমন সুবহান

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে একই সঙ্গে বইছে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী বাতাস। একদিকে দোহায় দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তি ও হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলছে নিবিড় কারিগরি আলোচনা। অন্যদিকে এই চলমান শান্তি প্রক্রিয়াকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইরানে তৃতীয় দফায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর তীব্র হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
কূটনৈতিক উপায়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বনাম একক সামরিক আগ্রাসনের এই চরম টানাপোড়েনে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ আবারও এক অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক চোরাবালিতে এসে দাঁড়িয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার পরোক্ষ আলোচনার টেবিলে যখন শান্তির সুবাতাস বইছে, ঠিক তখনই তেল আবিবের যুদ্ধংদেহী মনোভাব সমগ্র অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
দোহায় শান্তির সুবাতাস ও ট্রাম্পের কূটনীতি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান পরোক্ষ আলোচনা এখন মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ১ জুলাইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাতারের মধ্যস্থতায় এবং পাকিস্তানের অংশগ্রহণে দোহার এই কারিগরি আলোচনা চলছে। এই আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো গত মাসে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারকের বাস্তবায়ন করা। আলোচনায় ইরানের প্রধান অগ্রাধিকার দুটি, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা এবং কাতারে আটকে থাকা ৬০০ কোটি ডলারের ইরানি সম্পদ ছাড় করানো। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি নির্বিঘ্ন রাখা।
এ লক্ষ্যে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ইতিমধ্যে কাতারের আমিরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ট্রাম্প নিজে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দুই পক্ষের মধ্যকার এই আলোচনা বর্তমানে ‘খুব ভালোভাবে’ এগোচ্ছে। তবে তিনি আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার সক্ষমতা অর্জন করতে দেওয়া হবে না। অন্যদিকে, এ আলোচনা নিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও সম্প্রতি বেশ আশাব্যঞ্জক দাবি করেছেন। তাঁর মতে, নতুন এই সমঝোতার ফলে ইতিমধ্যে ইরানের ওপর থেকে কিছু অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক মুদ্রা-সংক্রান্ত কঠোর বিধিনিষেধ শিথিল হতে শুরু করেছে।
নেতানিয়াহুর পাল্টা সুর ও ট্রাম্পের সতর্কবার্তা
দোহায় যখন শান্তির টেবিল প্রস্তুত, ঠিক তখনই ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১৪-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর চড়ালেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ৩০ জুনের ওই সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালাতে পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। সরকারের সবুজ সংকেত মিললেই এই বাহিনী যেকোনো মুহূর্তে আকস্মিক অভিযান শুরু করবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
নেতানিয়াহুর মতে, ইসরায়েল ইতিমধ্যে দুদফা সুনির্দিষ্ট অভিযানের মাধ্যমে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি থেকে সৃষ্ট বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রয়োজন হলে তারা তৃতীয়বারও হামলা চালাতে দ্বিধা করবে না এবং সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন রয়েছে।
তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সম্ভাব্য কোনো শান্তি চুক্তি ইসরায়েলের জন্য কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক নয়। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের এই একক সামরিক আধিপত্যকামী মনোভাবের বিরুদ্ধে এবার বেশ কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। ট্রাম্প প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘বিবি, কথাবার্তায় সতর্ক থাকুন, তা না হলে খুব শিগগিরই নিজেকে একা অবস্থায় দেখতে হতে পারে।’
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই প্রকাশ্য ও নজিরবিহীন সতর্কবার্তার পর অবশ্য নেতানিয়াহু এই বিষয়ে আর নতুন করে কোনো কঠোর অবস্থান নেননি। তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই মিত্র দেশের ভেতরের কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও দূরত্ব এখন অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
অতীতের সংঘাত ও পরমাণু বিতর্ক
ইসরায়েল ও ইরানের এই সাম্প্রতিক উত্তেজনার সূত্রপাত মূলত ২০২৫ সালের জুনে, যখন জাতিসংঘের পরমাণু তদারকি সংস্থা জানায় যে ইরানের কাছে প্রায় ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে। এই বিশুদ্ধতার মাত্রা ৯০ শতাংশে পৌঁছালে পরমাণু অস্ত্র তৈরি সম্ভব। এমন তথ্যের পরপরই ১১ জুন রাতে ইসরায়েল ইরানে ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ নামে ১২ দিনব্যাপী সামরিক অভিযান চালায়। পরবর্তী সময়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে আরেকটি অভিযান শুরু করলেও মাত্র দু'দিন পর কৌশলগত কারণে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে সরিয়ে নেয়। মূলত এই ঘটনার পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক পথ পরিহার করে তেহরানের সঙ্গে চলমান কূটনীতি ও পরোক্ষ আলোচনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে অদৃশ্য ‘সাইবার যুদ্ধ’
স্থল ও জলপথের সামরিক উত্তেজনা যখন কূটনীতি দিয়ে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে, তখন সাইবার স্পেসে দুই দেশের লড়াই রূপ নিয়েছে প্রলয়ংকরী যুদ্ধে। ১ জুলাই জার্মান সংবাদমাধ্যম ডি ভেল্ট-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলের ন্যাশনাল সাইবার ডিরেক্টরেটের মহাপরিচালক ইয়োসি কারাদি জানান, ২০২৫ সালের জুনে সামরিক অভিযান চলাকালে যেখানে ১ হাজার ৬০০টি ইরানি সাইবার হামলা নথিভুক্ত হয়েছিল, ২০২৬ সালের জুনে এসে সেই সংখ্যা তিন গুণ বেড়ে প্রায় ৪ হাজার ৮০০-তে পৌঁছেছে।
ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ছোট-বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে মূলত এই হামলাগুলো চালানো হচ্ছে। কারাদির মতে, প্রচলিত যুদ্ধক্ষেত্রে সাময়িক যুদ্ধবিরতি থাকলেও, সাইবার স্পেসে আসলে কোনো যুদ্ধবিরতি নেই। যদিও ইরান বরাবরই হ্যাকিংয়ের এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
বর্তমান সংকটের মূল উপাদানগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রধান পক্ষগুলোর অবস্থান ও লক্ষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করছে। যেমন ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন এখন মূলত কূটনীতি ও দোহার পরোক্ষ আলোচনার ওপর জোর দিচ্ছে, যার মূল লক্ষ্য হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে লাগাম টানা। অন্যদিকে পেজেশকিয়ান সরকার কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থনৈতিক সমঝোতা খোঁজার চেষ্টা করছে, যার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে তাদের জব্দকৃত অর্থ মুক্ত করা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা। তবে এই দুই পক্ষের বিপরীতে গিয়ে নেতানিয়াহুর ইসরায়েল প্রশাসন সম্পূর্ণ একলা চলো নীতি এবং তৃতীয় দফা হামলার হুমকি বজায় রেখেছে, যাদের মূল লক্ষ্য যেকোনো মূল্যে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করা।
এই ত্রিমুখী অবস্থান ও সাইবার স্পেসের ক্রমবর্ধমান হামলা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক শান্তি প্রক্রিয়াকে এক জটিল ও সংবেদনশীল সমীকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একদিকে যখন ওয়াশিংটন ও তেহরান আলোচনার টেবিলে বসে বরফ গলানোর চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই তেল আবিবের যুদ্ধংদেহী মনোভাব সেই প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করার ঝুঁকি তৈরি করছে। সাইবার দুনিয়ার এই অদৃশ্য কিন্তু মারাত্মক যুদ্ধ প্রমাণ করে, মাঠপর্যায়ের সেনা প্রত্যাহার বা যুদ্ধবিরতি হলেও ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের তীব্রতা বিন্দুমাত্র কমেনি। দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য মুছে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো ইঙ্গিত করে, এই সংঘাতের প্রভাব শুধু সামরিক বাহিনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সাধারণ মানুষের ডিজিটাল জীবনকেও হুমকির মুখে ফেলছে।
মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের গবেষক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, দোহার এই আলোচনা সফল হলে অঞ্চলে উত্তেজনা কমানোর একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতির মূল প্রশ্নটি হলো—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যদি ১৮ আগস্টের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তিতে পৌঁছাতেও পারে, ইসরায়েলের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবকে ট্রাম্প প্রশাসন শেষ পর্যন্ত কতটা চেপে রাখতে পারবে?
নেতানিয়াহু যদি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সত্যিই তৃতীয়বার ইরানে আকস্মিক হামলা চালিয়ে বসেন, তবে দোহার এই কষ্টার্জিত শান্তি আলোচনা পুরোপুরি ভেস্তে যাবে। ফলশ্রুতিতে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য এক ভয়াবহ, অনিয়ন্ত্রিত ও দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক মহাযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য এক মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে।
এই জটিল সংকটের অবসান মূলত নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক কূটনীতির সাফল্য এবং ইসরায়েলের ওপর মার্কিন প্রশাসনের মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চাপের কার্যকারিতার ওপর।
একদিকে পরমাণু চুক্তির ভবিষ্যৎ এবং অন্যদিকে সাইবার স্পেস থেকে শুরু করে জলপথের অদৃশ্য যুদ্ধ—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। যদি ট্রাম্প প্রশাসন তার মিত্র ইসরায়েলকে একক সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রাখতে ব্যর্থ হয়, তবে আলোচনার টেবিলের সমস্ত অর্জন মাঠপর্যায়ের বারুদের স্তূপে বিলীন হয়ে যাবে। তাই আগামী দিনগুলোতে দোহা প্রক্রিয়ার অগ্রগতি এবং তেল আবিবের সামরিক তৎপরতার ওপরই নির্ভর করছে এই অঞ্চল শান্তির পথে হাঁটবে নাকি ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের দাবানলে পুড়বে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে একই সঙ্গে বইছে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী বাতাস। একদিকে দোহায় দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তি ও হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলছে নিবিড় কারিগরি আলোচনা। অন্যদিকে এই চলমান শান্তি প্রক্রিয়াকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইরানে তৃতীয় দফায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর তীব্র হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
কূটনৈতিক উপায়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বনাম একক সামরিক আগ্রাসনের এই চরম টানাপোড়েনে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ আবারও এক অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক চোরাবালিতে এসে দাঁড়িয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার পরোক্ষ আলোচনার টেবিলে যখন শান্তির সুবাতাস বইছে, ঠিক তখনই তেল আবিবের যুদ্ধংদেহী মনোভাব সমগ্র অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
দোহায় শান্তির সুবাতাস ও ট্রাম্পের কূটনীতি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান পরোক্ষ আলোচনা এখন মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ১ জুলাইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাতারের মধ্যস্থতায় এবং পাকিস্তানের অংশগ্রহণে দোহার এই কারিগরি আলোচনা চলছে। এই আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো গত মাসে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারকের বাস্তবায়ন করা। আলোচনায় ইরানের প্রধান অগ্রাধিকার দুটি, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা এবং কাতারে আটকে থাকা ৬০০ কোটি ডলারের ইরানি সম্পদ ছাড় করানো। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি নির্বিঘ্ন রাখা।
এ লক্ষ্যে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ইতিমধ্যে কাতারের আমিরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ট্রাম্প নিজে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দুই পক্ষের মধ্যকার এই আলোচনা বর্তমানে ‘খুব ভালোভাবে’ এগোচ্ছে। তবে তিনি আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার সক্ষমতা অর্জন করতে দেওয়া হবে না। অন্যদিকে, এ আলোচনা নিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও সম্প্রতি বেশ আশাব্যঞ্জক দাবি করেছেন। তাঁর মতে, নতুন এই সমঝোতার ফলে ইতিমধ্যে ইরানের ওপর থেকে কিছু অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক মুদ্রা-সংক্রান্ত কঠোর বিধিনিষেধ শিথিল হতে শুরু করেছে।
নেতানিয়াহুর পাল্টা সুর ও ট্রাম্পের সতর্কবার্তা
দোহায় যখন শান্তির টেবিল প্রস্তুত, ঠিক তখনই ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১৪-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর চড়ালেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ৩০ জুনের ওই সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালাতে পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। সরকারের সবুজ সংকেত মিললেই এই বাহিনী যেকোনো মুহূর্তে আকস্মিক অভিযান শুরু করবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
নেতানিয়াহুর মতে, ইসরায়েল ইতিমধ্যে দুদফা সুনির্দিষ্ট অভিযানের মাধ্যমে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি থেকে সৃষ্ট বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রয়োজন হলে তারা তৃতীয়বারও হামলা চালাতে দ্বিধা করবে না এবং সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন রয়েছে।
তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সম্ভাব্য কোনো শান্তি চুক্তি ইসরায়েলের জন্য কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক নয়। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের এই একক সামরিক আধিপত্যকামী মনোভাবের বিরুদ্ধে এবার বেশ কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। ট্রাম্প প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘বিবি, কথাবার্তায় সতর্ক থাকুন, তা না হলে খুব শিগগিরই নিজেকে একা অবস্থায় দেখতে হতে পারে।’
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই প্রকাশ্য ও নজিরবিহীন সতর্কবার্তার পর অবশ্য নেতানিয়াহু এই বিষয়ে আর নতুন করে কোনো কঠোর অবস্থান নেননি। তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই মিত্র দেশের ভেতরের কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও দূরত্ব এখন অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
অতীতের সংঘাত ও পরমাণু বিতর্ক
ইসরায়েল ও ইরানের এই সাম্প্রতিক উত্তেজনার সূত্রপাত মূলত ২০২৫ সালের জুনে, যখন জাতিসংঘের পরমাণু তদারকি সংস্থা জানায় যে ইরানের কাছে প্রায় ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে। এই বিশুদ্ধতার মাত্রা ৯০ শতাংশে পৌঁছালে পরমাণু অস্ত্র তৈরি সম্ভব। এমন তথ্যের পরপরই ১১ জুন রাতে ইসরায়েল ইরানে ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ নামে ১২ দিনব্যাপী সামরিক অভিযান চালায়। পরবর্তী সময়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে আরেকটি অভিযান শুরু করলেও মাত্র দু'দিন পর কৌশলগত কারণে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে সরিয়ে নেয়। মূলত এই ঘটনার পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক পথ পরিহার করে তেহরানের সঙ্গে চলমান কূটনীতি ও পরোক্ষ আলোচনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে অদৃশ্য ‘সাইবার যুদ্ধ’
স্থল ও জলপথের সামরিক উত্তেজনা যখন কূটনীতি দিয়ে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে, তখন সাইবার স্পেসে দুই দেশের লড়াই রূপ নিয়েছে প্রলয়ংকরী যুদ্ধে। ১ জুলাই জার্মান সংবাদমাধ্যম ডি ভেল্ট-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলের ন্যাশনাল সাইবার ডিরেক্টরেটের মহাপরিচালক ইয়োসি কারাদি জানান, ২০২৫ সালের জুনে সামরিক অভিযান চলাকালে যেখানে ১ হাজার ৬০০টি ইরানি সাইবার হামলা নথিভুক্ত হয়েছিল, ২০২৬ সালের জুনে এসে সেই সংখ্যা তিন গুণ বেড়ে প্রায় ৪ হাজার ৮০০-তে পৌঁছেছে।
ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ছোট-বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে মূলত এই হামলাগুলো চালানো হচ্ছে। কারাদির মতে, প্রচলিত যুদ্ধক্ষেত্রে সাময়িক যুদ্ধবিরতি থাকলেও, সাইবার স্পেসে আসলে কোনো যুদ্ধবিরতি নেই। যদিও ইরান বরাবরই হ্যাকিংয়ের এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
বর্তমান সংকটের মূল উপাদানগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রধান পক্ষগুলোর অবস্থান ও লক্ষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করছে। যেমন ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন এখন মূলত কূটনীতি ও দোহার পরোক্ষ আলোচনার ওপর জোর দিচ্ছে, যার মূল লক্ষ্য হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে লাগাম টানা। অন্যদিকে পেজেশকিয়ান সরকার কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থনৈতিক সমঝোতা খোঁজার চেষ্টা করছে, যার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে তাদের জব্দকৃত অর্থ মুক্ত করা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা। তবে এই দুই পক্ষের বিপরীতে গিয়ে নেতানিয়াহুর ইসরায়েল প্রশাসন সম্পূর্ণ একলা চলো নীতি এবং তৃতীয় দফা হামলার হুমকি বজায় রেখেছে, যাদের মূল লক্ষ্য যেকোনো মূল্যে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ধ্বংস করা।
এই ত্রিমুখী অবস্থান ও সাইবার স্পেসের ক্রমবর্ধমান হামলা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক শান্তি প্রক্রিয়াকে এক জটিল ও সংবেদনশীল সমীকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একদিকে যখন ওয়াশিংটন ও তেহরান আলোচনার টেবিলে বসে বরফ গলানোর চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই তেল আবিবের যুদ্ধংদেহী মনোভাব সেই প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করার ঝুঁকি তৈরি করছে। সাইবার দুনিয়ার এই অদৃশ্য কিন্তু মারাত্মক যুদ্ধ প্রমাণ করে, মাঠপর্যায়ের সেনা প্রত্যাহার বা যুদ্ধবিরতি হলেও ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের তীব্রতা বিন্দুমাত্র কমেনি। দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য মুছে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো ইঙ্গিত করে, এই সংঘাতের প্রভাব শুধু সামরিক বাহিনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সাধারণ মানুষের ডিজিটাল জীবনকেও হুমকির মুখে ফেলছে।
মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের গবেষক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, দোহার এই আলোচনা সফল হলে অঞ্চলে উত্তেজনা কমানোর একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতির মূল প্রশ্নটি হলো—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যদি ১৮ আগস্টের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তিতে পৌঁছাতেও পারে, ইসরায়েলের এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবকে ট্রাম্প প্রশাসন শেষ পর্যন্ত কতটা চেপে রাখতে পারবে?
নেতানিয়াহু যদি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সত্যিই তৃতীয়বার ইরানে আকস্মিক হামলা চালিয়ে বসেন, তবে দোহার এই কষ্টার্জিত শান্তি আলোচনা পুরোপুরি ভেস্তে যাবে। ফলশ্রুতিতে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য এক ভয়াবহ, অনিয়ন্ত্রিত ও দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক মহাযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য এক মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে।
এই জটিল সংকটের অবসান মূলত নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক কূটনীতির সাফল্য এবং ইসরায়েলের ওপর মার্কিন প্রশাসনের মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চাপের কার্যকারিতার ওপর।
একদিকে পরমাণু চুক্তির ভবিষ্যৎ এবং অন্যদিকে সাইবার স্পেস থেকে শুরু করে জলপথের অদৃশ্য যুদ্ধ—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। যদি ট্রাম্প প্রশাসন তার মিত্র ইসরায়েলকে একক সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রাখতে ব্যর্থ হয়, তবে আলোচনার টেবিলের সমস্ত অর্জন মাঠপর্যায়ের বারুদের স্তূপে বিলীন হয়ে যাবে। তাই আগামী দিনগুলোতে দোহা প্রক্রিয়ার অগ্রগতি এবং তেল আবিবের সামরিক তৎপরতার ওপরই নির্ভর করছে এই অঞ্চল শান্তির পথে হাঁটবে নাকি ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের দাবানলে পুড়বে।
.png)

কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এককেন্দ্রিক ধারায় পরিচালিত হয়ে এসেছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ষোলো বছরের দীর্ঘ শাসনামলে নয়াদিল্লির সঙ্গে ঢাকার কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত নিবিড়।
১৬ ঘণ্টা আগে
ভোক্তাপর্যায়ে এলপিজির দাম এক ধাক্কায় ১২ কেজি সিলিন্ডারে ৩৫৭ টাকা কমানো একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে তার প্রতিফলন দেশের বাজারে ঘটবে—এটাই স্বাভাবিক অর্থনৈতিক নীতি। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই স্বাভাবিক ঘটনাই অনেক সময় অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
১৭ ঘণ্টা আগে
পর্যায়ক্রমিক সরকারগুলোর অধীনে বাংলাদেশের চীন নীতিতে কি মৌলিক কোনো পরিবর্তন এসেছে? নাকি বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাটা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ধারাবাহিক একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে?
১ দিন আগে
বাংলাদেশের একটা গ্রামের ছেলে ব্রাজিলের জার্সি পরে উল্লাস করে, পতাকা ওড়ায় ছাদে, দেয়ালে আঁকে মেসি বা নেইমারের ছবি। এই ভালোবাসার পেছনে যুক্তি খুঁজতে যাওয়াই বৃথা—এটা নিছক আবেগ, আর সেই আবেগই ফুটবলকে বানিয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক ঘটনা।
০২ জুলাই ২০২৬