আমীন আল রশীদ

নতুন প্রজন্ম বা ‘জেন-জি’রা আর বাহাত্তরের সংবিধান চায় না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ। রবিবার (২৯ মার্চ) জাতীয় সংসদে মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি নিজেকে জেন-জি প্রজন্মের প্রতিনিধি দাবি করে বলেন, ‘আমি এই সংসদের সর্বকনিষ্ঠ এমপি, বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ এমপি। আপনারা যে জেন-জি প্রজন্মের কথা বলেন, আমি তাদের প্রতিনিধি হয়ে সংসদে কথা বলতে এসেছি। জেন-জিরা কী চায়? জেন-জিরা বাহাত্তরের সংবিধান আর চায় না। তারা জবাব চায়—স্বাধীনতার ৩০ বছর পরে জন্ম নিয়ে আমার মতো যারা সন্তানরা রয়েছে, তারা কেন ভোটাধিকার পায় নাই?’
হান্নান মাসউদ কত শতাংশ জেন-জির প্রতিনিধিত্ব করেন আর জুলাই অভ্যুত্থানের কারণে যারা বেনিফিশিয়ারি; অভ্যুত্থানের পরে যাদের লাইফস্টাইলে অভূতপূর্ব পরিবর্তন এসেছে; যারা নানা কারণে বিতর্কিত হয়েছেন—হান্নান মাসউদ তাদের একজন কি না, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই। তবে সেটি অন্য তর্ক।
সংসদে তার এই বক্তব্যের পরদিন সোমবার জামায়াতের এমপি শফিকুল ইসলাম মাসুদ জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে সরকারি দল বিএনপিকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘যে সংবিধান খালেদা জিয়া ছুড়ে ফেলে দিতে চেয়েছিলেন, সেই বাহাত্তরের সংবিধানের প্রতি সরকারি দলের কেন এত প্রেম জাগ্রত হলো, তা জনগণ জানতে চায়।’
সংসদের বিরোধী দল, বিশেষ করে এনসিপির তরফে বাহাত্তরের সংবিধান নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। এই আলোচনা শুরু হয়েছে এনসিপি গঠনের আগেই। অর্থাৎ জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকেই। জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থাকা যে তরুণরা প্রথমে জাতীয় নাগরিক কমিটি এবং পরে জাতীয় নাগরিক পার্টি গঠন করলেন, তারা শুরু থেকেই দেশের বিদ্যমান সংবিধানকে বাহাত্তরের সংবিধান উল্লেখ করে এটি ছুঁড়ে ফেলা এবং এর কবর রচনার হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছেন। তারা এই সংবিধানকে মুজিববাদী এবং ফ্যাসিস্টের সংবিধান বলেও আখ্যা দিয়েছেন। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে এই মুহূর্তে বাহাত্তরের সংবিধান কি অবিকল বহাল আছে? বাহাত্তরের সংবিধান নিয়ে এই আলোচনার রাজনীতিটা কী?
একটু পেছনে ফেরা যাক। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের পরপরেই নতুন রাষ্ট্রের জন্য সংবিধান প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান গণপরিষদে গৃহীত হয়, যেটি কার্যকর হয় ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর প্রথম বিজয় দিবসে।
সত্তুর সালের নির্বাচনে বিজয়ী সদস্যরা গণপরিষদ গঠন করে একটি বৈধ সরকার গঠন করলেন। তারাই বাংলাদেশ নামে নতুন রাষ্ট্রের জন্য একটি সংবিধান রচনা করেন। এটি ছিল তাদের আইনি ও বৈধ এখতিয়ার।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের পরে ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফেরার পরদিন ‘বাংলাদেশের অস্থায়ী সংবিধান আদেশ’ জারি করেন। এরপর ২০ মার্চ বাংলাদেশের জন্য একটি স্থায়ী সংবিধান রচনার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ’ জারি করা হয়। এই আদেশ অনুসারে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ ও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিতদের নিয়ে বাংলাদেশ গণপরিষদ গঠিত হয়—যাদের ওপর বাংলাদেশের সংবিধান রচনার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। ওই বছরের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের বৈঠক বসে এবং পরদিন ১১ এপ্রিল গঠিত হয় ৩৪ সদস্যের সংবিধান প্রণয়ন কমিটি। যার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ড. কামাল হোসেন। এই কমিটিতে আরও ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, এম আমীর-উল ইসলাম, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রমুখ।
কমিটির বৈঠক বসে একাদিক্রমে ১৭ থেকে ২৯ এপ্রিল, ১০ থেকে ২৫ মে, ৩ থেকে ১০ জুন, ১০ আগস্ট থেকে ১ সেপ্টেম্বর এবং ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর। মোট ৮৫ দিন। তৃতীয় দফার বৈঠকে অর্থাৎ ১০ জুন সংবিধানের একটি পূর্ণাঙ্গ খসড়া অনুমোদিত হয়। সংবিধান প্রণয়ন কমিটির কাছে গণপরিষদের বাইরে থেকে নানা ধরনের পরামর্শ-সংবলিত ৯৮টি স্মারকলিপি আসে। সদস্যদের বিবেচনার জন্য এগুলো বিলি করা হয়।
১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর কমিটির সভাপতি ড. কামাল হোসেন ১৫৩টি অনুচ্ছেদসম্বলিত ৭২ পৃষ্ঠার খসড়া সংবিধান বিল আকারে গণপরিষদের সামনে পেশ করেন। ১৯ অক্টোবর বিলের ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু হয় যা চলে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত। গণপরিষদের ৪৫ জন সদস্য খসড়া সংবিধানের ওপর আলোচনা করেন। খসড়া বিলের ওপর আলোচনা শেষে পরিষদে মোট ১৩৫টি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপিত হয়।
১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর খসড়া সংবিধানের তৃতীয় ও চতুর্থ পাঠ অনুষ্ঠিত হয়। এদিন দুপুরে তুমুল হর্ষধ্বনি ও করতালির মধ্য দিয়ে গৃহীত হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান। ১৪ ও ১৫ ডিসেম্বর গণপরিষদের সদস্যগণ হাতে লেখা সংবিধানের কপিতে স্বাক্ষর করেন। এটি হচ্ছে বাহাত্তরের সংবিধান প্রণয়নের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।
বাস্তবতা হলো, ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর যে সংবিধানটি গণপরিষদে গৃহীত হয়, তার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ ছিল না। এটি যুক্ত করা হয় পঞ্চম সংশোধনীতে। বাহাত্তরের মূল সংবিধানে রাষ্ট্রধর্মেরও কোনো বিধান ছিল না। এটি যুক্ত হয় অষ্টম সংশোধনীতে। এভাবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সংবিধানে ১৭বার সংশোধনী আনা হয়েছে। প্রথম থেকে চতুর্দশ সংশোধনী পর্যন্ত সংবিধানে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছিল, তাতে বাহাত্তরের মূল সংবিধানের অনেক বিধান বাতিল এমনকি বিকৃত করা হয়েছে। ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাহাত্তরের সংবিধানের মূলনীতিসহ অধিকাংশ বিধান ফিরিয়ে আনা হলেও সংবিধানের শুরুতে বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্মসহ যেসব বিধান বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ছিল না, সেগুলো পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় বাতিল করা হয়নি। অর্থাৎ পঞ্চদশ সংশোধনী ছিল বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ফেরার একটা ব্যর্থ চেষ্টা। সেখানে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মূলত নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করেছে।
১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে ধর্মভিত্তিক দলের রাজনীতি করার কোনো সুযোগ ছিল না। জিয়াউর রহমান এই সুযোগ করে দেন। সেই বিধান এখনও আছে আর এই বিধান আছে বলেই স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের বিরোধিতাকারী দল জামায়াতে ইসলামী এখন দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলই শুধু নয়, বরং তারা সংসদের প্রধান বিরোধী দল। সুতরাং যে সংবিধানকে তারা বাহাত্তরের সংবিধান বলছে, সেই সংবিধান এখন দেশে কার্যকর নেই।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ এবং ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারের আগে তার স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের জারি করা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের তফসিলে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এগুলো সংবিধানে যুক্ত করা হয় ২০১১ সালে। সুতরাং, বাহাত্তরের সংবিধান বলতে যা বুঝানো হয়, সেটি কার্যত এখন নেই।
বাহাত্তরের সংবিধানে নিবর্তনমূলক আইনে কোনো নাগরিককে গ্রেপ্তারের বিধান ছিল না। বরং পরবর্তীকালে সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে নিবতর্নমূলক আইনের দরজা উন্মুক্ত করা হয়। যে বিধান এখনও সংবিধানে রয়েছে। সুতরাং এখন সংবিধান যে অবস্থায় আছে, সেটিকে হুবহু বাহাত্তরের সংবিধান বলার সুযোগ নেই।
সারা পৃথিবীতেই সংবিধান সংশোধন বা সময়ে সময়ে হালনাগাদ করার রেওয়াজ আছে। সংবিধান কোনো ধর্মগ্রন্থ নয় যে তাতে কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না। সংবিধান প্রণয়নের পঞ্চাশ বছর পরে অনেক বাস্তবতাই বদলে যেতে পারে। সেই আলোকে সংবিধানের অনেক বিধান পরিবর্তন করতে হতে পারে। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে আনতে পারেন সেই সংশোধনী। এটি সারা পৃথিবীতেই এক গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। বাংলাদেশের নির্বাচিত বৈধ প্রতিনিধিরা ১৯৭২ সালে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে নানারকম সংকটের মধ্যে যে সংবিধান রচনা করলেন, সেটি যে পৃথিবীর সেরা সংবিধান হবে বা হতে হবে, এমন প্রত্যাশা না করাই শ্রেয়। অনেক ভুলত্রুটি কিংবা সীমাবদ্ধতা ওই সংবিধানের থাকতে পারে। প্রয়োজনমাফিক সেখানে সংশোধন, পরিবর্তন, পরিমার্জন হতে পারে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধান ছুড়ে ফেলা বা এই সংবিধানের কবর রচনা করা কিংবা এই সংবিধানকে মুজিববাদী ও ফ্যাসিস্টের সংবিধান বলে আখ্যা দেওয়া ইতিহাসঅজ্ঞ একটি নির্বিচার প্রস্তাব। ১৯৭২ সালে যে সংবিধান রচনা করা হয়, সেখানে স্বাক্ষর ছাড়া আর কোথাও শেখ মুজিবুর রহমানের নাম নেই। সংবিধানে তাকে জাতির পিতার স্বীকৃতি দেওয়া এবং তার ৭ মার্চের ভাষণ ও ২৫ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা সংবিধানে যুক্ত করা হয়েছে ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর সময়ে।
যারা বাহাত্তরের সংবিধান ছুড়ে ফেলতে চায় বা এর কবর রচনা করতে চায়, তাদের এই রাগ ক্ষোভ ও ঘৃণার কারণ কী? তাদের রাগ ও ক্ষোভের জায়গা কি শুধু এই যে সংবিধানটি রচিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ীদের হাতে?
বাস্তবতা হলো, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দলের নাম ছিল আওয়ামী লীগ। পরবর্তীকালে সেই আওয়ামী লীগের স্খলন কিংবা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শেখ মুজিবের ভুলত্রুটি অথবা তার ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু সেই সমালোচনা আর পরবর্তী ইতিহাসের দায় দিয়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ নেই। আর সেই প্রশ্নবিদ্ধ করবার ধারাবাহিকতা হিসেবে ১৯৭২ সালে রচিত সংবিধানের অবমাননারও সুযোগ নেই।

নতুন প্রজন্ম বা ‘জেন-জি’রা আর বাহাত্তরের সংবিধান চায় না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ। রবিবার (২৯ মার্চ) জাতীয় সংসদে মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি নিজেকে জেন-জি প্রজন্মের প্রতিনিধি দাবি করে বলেন, ‘আমি এই সংসদের সর্বকনিষ্ঠ এমপি, বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ এমপি। আপনারা যে জেন-জি প্রজন্মের কথা বলেন, আমি তাদের প্রতিনিধি হয়ে সংসদে কথা বলতে এসেছি। জেন-জিরা কী চায়? জেন-জিরা বাহাত্তরের সংবিধান আর চায় না। তারা জবাব চায়—স্বাধীনতার ৩০ বছর পরে জন্ম নিয়ে আমার মতো যারা সন্তানরা রয়েছে, তারা কেন ভোটাধিকার পায় নাই?’
হান্নান মাসউদ কত শতাংশ জেন-জির প্রতিনিধিত্ব করেন আর জুলাই অভ্যুত্থানের কারণে যারা বেনিফিশিয়ারি; অভ্যুত্থানের পরে যাদের লাইফস্টাইলে অভূতপূর্ব পরিবর্তন এসেছে; যারা নানা কারণে বিতর্কিত হয়েছেন—হান্নান মাসউদ তাদের একজন কি না, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই। তবে সেটি অন্য তর্ক।
সংসদে তার এই বক্তব্যের পরদিন সোমবার জামায়াতের এমপি শফিকুল ইসলাম মাসুদ জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে সরকারি দল বিএনপিকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘যে সংবিধান খালেদা জিয়া ছুড়ে ফেলে দিতে চেয়েছিলেন, সেই বাহাত্তরের সংবিধানের প্রতি সরকারি দলের কেন এত প্রেম জাগ্রত হলো, তা জনগণ জানতে চায়।’
সংসদের বিরোধী দল, বিশেষ করে এনসিপির তরফে বাহাত্তরের সংবিধান নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। এই আলোচনা শুরু হয়েছে এনসিপি গঠনের আগেই। অর্থাৎ জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকেই। জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থাকা যে তরুণরা প্রথমে জাতীয় নাগরিক কমিটি এবং পরে জাতীয় নাগরিক পার্টি গঠন করলেন, তারা শুরু থেকেই দেশের বিদ্যমান সংবিধানকে বাহাত্তরের সংবিধান উল্লেখ করে এটি ছুঁড়ে ফেলা এবং এর কবর রচনার হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছেন। তারা এই সংবিধানকে মুজিববাদী এবং ফ্যাসিস্টের সংবিধান বলেও আখ্যা দিয়েছেন। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে এই মুহূর্তে বাহাত্তরের সংবিধান কি অবিকল বহাল আছে? বাহাত্তরের সংবিধান নিয়ে এই আলোচনার রাজনীতিটা কী?
একটু পেছনে ফেরা যাক। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের পরপরেই নতুন রাষ্ট্রের জন্য সংবিধান প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান গণপরিষদে গৃহীত হয়, যেটি কার্যকর হয় ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর প্রথম বিজয় দিবসে।
সত্তুর সালের নির্বাচনে বিজয়ী সদস্যরা গণপরিষদ গঠন করে একটি বৈধ সরকার গঠন করলেন। তারাই বাংলাদেশ নামে নতুন রাষ্ট্রের জন্য একটি সংবিধান রচনা করেন। এটি ছিল তাদের আইনি ও বৈধ এখতিয়ার।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় অর্জনের পরে ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফেরার পরদিন ‘বাংলাদেশের অস্থায়ী সংবিধান আদেশ’ জারি করেন। এরপর ২০ মার্চ বাংলাদেশের জন্য একটি স্থায়ী সংবিধান রচনার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ’ জারি করা হয়। এই আদেশ অনুসারে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ ও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিতদের নিয়ে বাংলাদেশ গণপরিষদ গঠিত হয়—যাদের ওপর বাংলাদেশের সংবিধান রচনার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। ওই বছরের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের বৈঠক বসে এবং পরদিন ১১ এপ্রিল গঠিত হয় ৩৪ সদস্যের সংবিধান প্রণয়ন কমিটি। যার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ড. কামাল হোসেন। এই কমিটিতে আরও ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, এম আমীর-উল ইসলাম, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রমুখ।
কমিটির বৈঠক বসে একাদিক্রমে ১৭ থেকে ২৯ এপ্রিল, ১০ থেকে ২৫ মে, ৩ থেকে ১০ জুন, ১০ আগস্ট থেকে ১ সেপ্টেম্বর এবং ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর। মোট ৮৫ দিন। তৃতীয় দফার বৈঠকে অর্থাৎ ১০ জুন সংবিধানের একটি পূর্ণাঙ্গ খসড়া অনুমোদিত হয়। সংবিধান প্রণয়ন কমিটির কাছে গণপরিষদের বাইরে থেকে নানা ধরনের পরামর্শ-সংবলিত ৯৮টি স্মারকলিপি আসে। সদস্যদের বিবেচনার জন্য এগুলো বিলি করা হয়।
১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর কমিটির সভাপতি ড. কামাল হোসেন ১৫৩টি অনুচ্ছেদসম্বলিত ৭২ পৃষ্ঠার খসড়া সংবিধান বিল আকারে গণপরিষদের সামনে পেশ করেন। ১৯ অক্টোবর বিলের ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু হয় যা চলে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত। গণপরিষদের ৪৫ জন সদস্য খসড়া সংবিধানের ওপর আলোচনা করেন। খসড়া বিলের ওপর আলোচনা শেষে পরিষদে মোট ১৩৫টি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপিত হয়।
১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর খসড়া সংবিধানের তৃতীয় ও চতুর্থ পাঠ অনুষ্ঠিত হয়। এদিন দুপুরে তুমুল হর্ষধ্বনি ও করতালির মধ্য দিয়ে গৃহীত হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান। ১৪ ও ১৫ ডিসেম্বর গণপরিষদের সদস্যগণ হাতে লেখা সংবিধানের কপিতে স্বাক্ষর করেন। এটি হচ্ছে বাহাত্তরের সংবিধান প্রণয়নের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।
বাস্তবতা হলো, ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর যে সংবিধানটি গণপরিষদে গৃহীত হয়, তার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ ছিল না। এটি যুক্ত করা হয় পঞ্চম সংশোধনীতে। বাহাত্তরের মূল সংবিধানে রাষ্ট্রধর্মেরও কোনো বিধান ছিল না। এটি যুক্ত হয় অষ্টম সংশোধনীতে। এভাবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সংবিধানে ১৭বার সংশোধনী আনা হয়েছে। প্রথম থেকে চতুর্দশ সংশোধনী পর্যন্ত সংবিধানে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছিল, তাতে বাহাত্তরের মূল সংবিধানের অনেক বিধান বাতিল এমনকি বিকৃত করা হয়েছে। ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাহাত্তরের সংবিধানের মূলনীতিসহ অধিকাংশ বিধান ফিরিয়ে আনা হলেও সংবিধানের শুরুতে বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্মসহ যেসব বিধান বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ছিল না, সেগুলো পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় বাতিল করা হয়নি। অর্থাৎ পঞ্চদশ সংশোধনী ছিল বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ফেরার একটা ব্যর্থ চেষ্টা। সেখানে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মূলত নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করেছে।
১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে ধর্মভিত্তিক দলের রাজনীতি করার কোনো সুযোগ ছিল না। জিয়াউর রহমান এই সুযোগ করে দেন। সেই বিধান এখনও আছে আর এই বিধান আছে বলেই স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের বিরোধিতাকারী দল জামায়াতে ইসলামী এখন দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলই শুধু নয়, বরং তারা সংসদের প্রধান বিরোধী দল। সুতরাং যে সংবিধানকে তারা বাহাত্তরের সংবিধান বলছে, সেই সংবিধান এখন দেশে কার্যকর নেই।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ এবং ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারের আগে তার স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের জারি করা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের তফসিলে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এগুলো সংবিধানে যুক্ত করা হয় ২০১১ সালে। সুতরাং, বাহাত্তরের সংবিধান বলতে যা বুঝানো হয়, সেটি কার্যত এখন নেই।
বাহাত্তরের সংবিধানে নিবর্তনমূলক আইনে কোনো নাগরিককে গ্রেপ্তারের বিধান ছিল না। বরং পরবর্তীকালে সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে নিবতর্নমূলক আইনের দরজা উন্মুক্ত করা হয়। যে বিধান এখনও সংবিধানে রয়েছে। সুতরাং এখন সংবিধান যে অবস্থায় আছে, সেটিকে হুবহু বাহাত্তরের সংবিধান বলার সুযোগ নেই।
সারা পৃথিবীতেই সংবিধান সংশোধন বা সময়ে সময়ে হালনাগাদ করার রেওয়াজ আছে। সংবিধান কোনো ধর্মগ্রন্থ নয় যে তাতে কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না। সংবিধান প্রণয়নের পঞ্চাশ বছর পরে অনেক বাস্তবতাই বদলে যেতে পারে। সেই আলোকে সংবিধানের অনেক বিধান পরিবর্তন করতে হতে পারে। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে আনতে পারেন সেই সংশোধনী। এটি সারা পৃথিবীতেই এক গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। বাংলাদেশের নির্বাচিত বৈধ প্রতিনিধিরা ১৯৭২ সালে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে নানারকম সংকটের মধ্যে যে সংবিধান রচনা করলেন, সেটি যে পৃথিবীর সেরা সংবিধান হবে বা হতে হবে, এমন প্রত্যাশা না করাই শ্রেয়। অনেক ভুলত্রুটি কিংবা সীমাবদ্ধতা ওই সংবিধানের থাকতে পারে। প্রয়োজনমাফিক সেখানে সংশোধন, পরিবর্তন, পরিমার্জন হতে পারে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধান ছুড়ে ফেলা বা এই সংবিধানের কবর রচনা করা কিংবা এই সংবিধানকে মুজিববাদী ও ফ্যাসিস্টের সংবিধান বলে আখ্যা দেওয়া ইতিহাসঅজ্ঞ একটি নির্বিচার প্রস্তাব। ১৯৭২ সালে যে সংবিধান রচনা করা হয়, সেখানে স্বাক্ষর ছাড়া আর কোথাও শেখ মুজিবুর রহমানের নাম নেই। সংবিধানে তাকে জাতির পিতার স্বীকৃতি দেওয়া এবং তার ৭ মার্চের ভাষণ ও ২৫ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা সংবিধানে যুক্ত করা হয়েছে ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর সময়ে।
যারা বাহাত্তরের সংবিধান ছুড়ে ফেলতে চায় বা এর কবর রচনা করতে চায়, তাদের এই রাগ ক্ষোভ ও ঘৃণার কারণ কী? তাদের রাগ ও ক্ষোভের জায়গা কি শুধু এই যে সংবিধানটি রচিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ীদের হাতে?
বাস্তবতা হলো, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দলের নাম ছিল আওয়ামী লীগ। পরবর্তীকালে সেই আওয়ামী লীগের স্খলন কিংবা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শেখ মুজিবের ভুলত্রুটি অথবা তার ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু সেই সমালোচনা আর পরবর্তী ইতিহাসের দায় দিয়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ নেই। আর সেই প্রশ্নবিদ্ধ করবার ধারাবাহিকতা হিসেবে ১৯৭২ সালে রচিত সংবিধানের অবমাননারও সুযোগ নেই।

গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্যের আড়ালে প্রায় ৬৮ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে—গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই)-এর এই তথ্য বেশ উদ্বেগজনক। এমনকি এটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা। কেন না এই তথ্য কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এর ভেতর আছে নানান অপূর্ণতা।
৪ ঘণ্টা আগে
রাজনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি খুব সহজে বদলায় না। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে সুস্থ ধারার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার অভাব। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পরে যে সুযোগ এসেছিল তার সদ্ব্যবহার আমরা করতে পারিনি। তবে বিভিন্ন সময় প্রচেষ্টা যে ছিল না, তা কিন্তু নয়। এর পরও সুযোগ এসেছে। সেসবের মধ্যে বোধ হয় জুলা
১৯ ঘণ্টা আগে
হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি রোগ। একজন আক্রান্ত হলে তার থেকে খুব সহজেই ১২-১৮ জনের মাঝে এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। হাম মূলত শ্বাসতন্ত্র বা রেসপিরেটরি সিস্টেমকে আক্রমণ করে শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ভাইরাসের আক্রমণে শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতা যখন কমে যায়, তখন সেকেন্ডারি সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়।
১ দিন আগে
অ্যারিস্টোটলের গণতন্ত্র এক জিনিস, সোভিয়েত গণতন্ত্র এক জিনিস আবার পুঁজিবাদীদের গণতন্ত্র অন্য জিনিস। আমরা আমাদের সংবিধানে এ রকম একটি ধোঁয়াশাপূর্ণ ধারণাকে স্থান দেয়ার ইচ্ছা রাখি না।
১ দিন আগে