ধর্মগ্রন্থ বিতরণ থেকে শুরু করে বৃক্ষরোপণ—গণঅভ্যুত্থানের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের কাজ করছিলেন। বইমেলা ও রক্ত-পরীক্ষার আয়োজন করেছিল কোনো কোনো সংগঠন। টানা কয়েক দিনব্যাপী চলেছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বয়ে গিয়েছিল উৎসবের আমেজ। মনে হচ্ছিল, শিক্ষার্থীদের সক্রিয়তায় সত্যিকার অর্থেই জেগে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে আগের মতো ভয়ের কোনো আবহ নেই, বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে গড়ে ওঠা ছোটখাটো আয়নাঘরের বিভীষিকা নেই। ক্রমে দীর্ঘ হচ্ছিল আশাবাদের তালিকা।
শিক্ষার্থীরা গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকেই চাইছিলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের নির্বাচন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-সংসদের গঠনতন্ত্র ছিল মান্ধাতার আমলের। তিন-চার দশক ধরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ায় পুরো ব্যবস্থাটিই আদতে ধসে পড়েছিল। একই ঘটনা ঘটেছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে। গণঅভ্যুত্থানের পর ঘটনাচক্রে আমি যুক্ত হয়েছিলাম ছাত্রসংসদের গঠনতন্ত্র সংস্কার কমিটির সঙ্গে। তখন দেখেছি শিক্ষার্থীরা কত গভীরভাবে নির্বাচন চেয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কাজ করতে চেয়েছেন।
বলতে দ্বিধা নেই, নির্বাচন অনুষ্ঠান হওয়া নিয়ে আমি শতভাগ সংশয়ে ছিলাম। কারণ এই ধরনের নির্বাচনকে বরাবরই গাধার সামনে ঝুলিয়ে রাখা ‘রাজনৈতিক মুলা’র মতো ব্যবহৃত হতে দেখেছি। খুবই আনন্দ ও আশাবাদের ঘটনা এই যে, আমার সমস্ত সংশয়কে মিথ্যে করে দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, শিক্ষার্থীরা দায়িত্বে এসেছেন। শিক্ষার্থীদের আয়োজন করা অনুষ্ঠানে আমি গিয়েছি। আনন্দিত হয়েছি তাদের সৃষ্টিশীল কাজ দেখে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি ও বাস্তবতা ব্যাপকভাবে বদলে গেছে।
ছাত্রসংসদের নেতারা ‘লাঠ্যৌষধি’ প্রয়োগে নেমেছেন। তারা লাঠি হাতে ঘুরছেন। ‘কলার ধরে’ টেনে নামাতে চাইছেন শিক্ষকদের, ‘বেঁধে’ রাখতে চাইছেন। প্রশাসনিক দপ্তরে গিয়ে অশিষ্ট আচরণ করছেন। তাদের ভাষ্যে, তারা চান ‘আওয়ামীপন্থী ও ফ্যাসিস্টের দোসর’ শিক্ষকদের বিচার। কথাগুলো সকল শিক্ষকের উদ্দেশ্যে নয়। কিন্তু তাদের কথায় আহত হয়েছেন পুরো শিক্ষকগোষ্ঠী; আর তা অস্বাভাবিক নয়। কেন না ভাষার যেমন ব্যাকরণ থাকে, আচরণেরও তেমন ব্যাকরণ আছে।
ছাত্র-সংসদের নেতাদের অনেকেই সুস্পষ্টভাবে আচরণিক ব্যাকরণ লঙ্ঘন করছেন। জোর আরোপ কিংবা বলপ্রয়োগের ভাষায় কথা বলতে গিয়ে ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক ও সহজ বিন্যাসকেই তারা নষ্ট করে ফেলছেন। শিষ্টাচারের জায়গাটি ভেঙে পড়ছে বললে মোটেও বাড়িয়ে বলা হবে না। শিক্ষার্থী-শিক্ষক সম্পর্কের ভেতর তৈরি করছে অস্বস্তি; একধরনের ভালো না লাগার বোধও তৈরি করেছে। একসময়, যখন ছাত্র-সংসদ ছিলো না তখন সরকার দলীয় ছাত্রসংগঠনের নেতারা ছিলেন এরকম অস্বস্তির কারণ।
গণঅভ্যুত্থান-উত্তর বাস্তবতায় কোনো অস্বস্তিকর অবস্থা থাকবে না বলেই আমরা ধরে নিয়েছিলাম। কার্যত দেখতে পাচ্ছি, বিগত আমলের সরকার দলীয় সংগঠনের ছাত্রনেতাদের সঙ্গে একালের ছাত্র-সংসদের ‘নির্বাচিত’ নেতাদের আচরণগত পার্থক্য ক্রমশ কমে আসছে। ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ফ্যাসিস্ট নিধনের হুমকি দিচ্ছেন তারা। তাদের শরীরী ভাষায় আছে তীব্র ‘তাচ্ছিল্য’; ধরাকে সরাজ্ঞান করার ভাষা। মনেই হচ্ছে, তারা এক বিশেষ অভিযানে নেমেছেন—‘তেড়ে মেরে ডান্ডা/করে দেবো ঠান্ডা’। অথচ ‘ডান্ডা’ মেরে ঠান্ডা করার যুগ গণ-অভ্যুত্থানের পরই নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার কথা।
শিক্ষার্থীরা চাইছেন অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিচার। অবশ্যই তদন্তসাপেক্ষে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা উচিত। আমরা ভুলে যাাই নি, বিগত দেড় দশকজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ধ্বংস করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই একজন শিক্ষক আর একজন দলীয় রাজনৈতিক কর্মীর মধ্যে পার্থক্য করা যায় নি। তারা কথা বলেছেন দলীয় ক্ষমতার ভাষায়। বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা ও শিক্ষার্থীবিরোধী কর্মকাণ্ডে তারা যুক্ত হয়েছেন। গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল সেই সব শিক্ষকের বিচার। সে লক্ষ্যে ছাত্রসংসদ যুক্তিশীল পদ্ধতি মেনে প্রশাসনের কাছে দাবি পেশ করেছে, বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বলেছে।
এরই মধ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে বিচারের আওতায় এনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীরা বিচারের সর্বশেষ পরিণতি দেখতে চান। ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তাদের দাবি নিঃসন্দেহে যৌক্তিক। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল যেকেউই চাইবেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইন ও নীতিমালা এবং রাষ্ট্রীয় আইন অনুসরণে বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হোক।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ—কর্তৃপক্ষ বিচার নিয়ে টালবাহানা করছে কিংবা ইচ্ছাকৃত দীর্ঘসূত্রিতার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সুবিধা গ্রহণের পথ মসৃণ রাখছে। এ ধরনের অভিযোগ খণ্ডনের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। তাদের উচিত হবে শিক্ষার্থীদের অবিশ্বাসের জায়গাগুলোকে আমলে নিয়ে দরকারি আস্থা ফিরিয়ে আনা। কারণ এও তো ঐতিহাসিকভাবেই সত্য যে, বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের শিক্ষকরা প্রতিটি শাসনামলে নিজেদের স্বার্থকেন্দ্রিক সহাবস্থান অটুট রেখেছেন, দল-মত-আদর্শ নির্বিশেষে নিজেদের ক্ষমতার বলয়কে সম্প্রসারিত করেছেন এবং অব্যাহতভাবে ভোগ করেছেন বহুমাত্রিক সুবিধা।
তাই বলে ‘তিড়িংবিড়িং’ পদ্ধতিতে যাকে-তাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বা ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ বানিয়ে, হুমকিধামকি দিয়ে, মব সৃষ্টি করে, চাপ সৃষ্টি করে বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করলে প্রাপ্তিযোগ কিছু কি ঘটবে? শেষে দেখা যাবে, ‘ফ্যাসিস্ট বাছতে ক্যাম্পাস উজাড়’ দশা উপস্থিত হয়েছে। তাছাড়া লাঠ্যৌষধির আতিশয্যে বিচারপ্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি নষ্ট হবে সংসদ নেতাদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা। ডাকসু, রাকসু কিংবা জাকসুর মতো সংগঠনের নেতাদের প্রতি তৈরি হবে আস্থার সংকট। শিক্ষার্থী সংসদের মূল উদ্দেশ্যই লক্ষ্যচ্যুত হবে। এই কথাগুলো শুনতে হয়তো নেতাদের ভালো লাগবে না। বিগত শাসনামলের সরকার দলীয় সংগঠনের নেতাদেরও ভালো লাগেনি।
আদতে ছাত্রসংসদের কাজ কী? বিশ্ববিদ্যালয়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে তরান্বিত করা, শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে কর্তৃপক্ষ বরাবর দাবি-দাওয়া পেশ করা, বিদ্যায়তনিক পরিবেশ সৃষ্টিতে শিক্ষকদের সহায়তা করা। ক্ষমতাসম্পর্কের ধারাক্রমে এই কাজই তার বা তাদের জন্য নির্ধারিত। এক্ষেত্রে নেতাদের জোর কোথায়? শিক্ষার্থীদের ভোট বা সম্মতি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ভোটের এই জোরই হয়ে উঠেছে ছাত্রসংসদ নেতাদের ক্ষমতাপ্রদর্শনের ভাষা। বিগত আমলের সঙ্গে পার্থক্য হলো, আগের নেতারা ছিলেন অনির্বাচিত। এখনকার নেতারা শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত।
বর্তমান সময়ের নেতৃত্বকে নিজেদের এই বিশিষ্টতাকে বুঝতে হবে। তাদের ভাবতে হবে একজন অপরাধীরও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার আছে। হুমকিধামকির রাজনীতি যদি আবারও শিক্ষার্থী সংসদের আদলে ফেরত আসে, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যাবে, ছাত্রসংসদের নেতারা কি নির্বাচিত ‘লাঠিয়াল’ হয়ে উঠছেন?
লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক