সম্প্রতি ইরানে মার্কিন হামলার চরম উত্তেজনার মধ্যেও যুদ্ধ শুরুর মাত্র তৃতীয় দিনের মাথায় যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস পল কাপুরের বাংলাদেশ সফর করে যাওয়া ওই দেশটির এই মুহূর্তের আগ্রাসী বাণিজ্যনীতি ও চতুর ভূরাজনৈতিক কৌশলের বিষয়টিকেই আরও একবার বিশ্ববাসীর সামনে স্পষ্ট করে তুলল। বাংলাদেশের সদ্যসাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিজেদের বিদায়-সংশ্লিষ্ট নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড-এআরটি) স্বাক্ষর করে গেল, তা এখন বাংলাদেশের জন্য বস্তুতই দীর্ঘমেয়াদি এক বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্যও দেশের স্বার্থ রক্ষা করে এটিকে মোকাবেলা করতে পারাটাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে।
আলোচিত সেই বাণিজ্যচুক্তি ও অন্যান্য ভূরাজনৈতিক বিষয় নিয়ে গত ৪ মার্চ পল কাপুরের সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের বৈঠকের আলোচনা সেই চ্যালেঞ্জকে আরও জটিলতার মধ্যে ফেলে দিল বলেই মনে হচ্ছে। বলে রাখা ভালো, চুক্তিটি স্বাক্ষরের সময়েও খলিলুর রহমানই ছিলেন বাংলাদেশ পক্ষের মূল কুশীলব।
ওই বৈঠকে তিনি মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে এই মর্মে আশ্বস্ত করেছেন যে, ‘বাংলাদেশ সরকার এ চুক্তির বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখবে।’ আর নিজের এ বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে গিয়ে তিনি এটিও বলেছেন যে, ওই চুক্তি স্বাক্ষরের আগে ‘মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি বাংলাদেশের দুটি দলের প্রধানের সঙ্গে নির্বাচনের আগেই কথা বলেছেন। দলগুলো এতে সম্মতি দিয়েছিল’ (সমকাল, ৪ মার্চ ২০২৬)।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর শেষের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরের দৃষ্টিভঙ্গি ও তৎপরতা সামনে ওঠে এসেছে, অন্যদিকে তেমনি তা কিছুটা বিভ্রান্তিরও সৃষ্টি করেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যেসব বৈঠক করেছেন, সেখানে দলগুলো হয়তো দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদারকরণের বিষয়ে নীতিগত সম্মতি ঠিকই ব্যক্ত করেছিল, যেমনটি ক্ষমতায় যাওয়ার লোভে এ দেশের বুর্জোয়া ও সাম্প্রদায়িক দলগুলো সাধারণভাবে করে থাকে। কিন্তু ওই চুক্তির কোনো খসড়া ওই দলগুলোকে দিয়ে সে বিষয়ে তাদের কাছ থেকে লিখিত মতামত বা সম্মতি নেওয়া হয়েছিল—এমনটি জানা যায় না।
এদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন সফরকারী মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বৈঠকের পর বিএনপির পক্ষ থেকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করার কথা বলা হলেও বাণিজ্য চুক্তির বাস্তবায়ন বা নির্বাচনের আগে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে তাদের সম্মতি-অসম্মতির বিষয়ে তারা কিছুই বলেনি। এর মানে হচ্ছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যই তাদের বক্তব্য। অন্যদিকে বৈঠকশেষে জামায়াত বলেছে, তারা ‘চুক্তির ইতিবাচক বিষয়গুলো মেনে নেবে। বাকিগুলো বাদ দেবে’ (প্রথম আলো, ৫ মার্চ ২০২৬)। আর বিএনপির মতো তারাও নির্বাচনের আগে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনে সম্মতিদানের বিষয়ে কিছু বলেনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলোর আলোচনা ও বৈঠক-পরবর্তী বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে এর সারমর্ম দাঁড়ায়, তারা সকলেই বাণিজ্যচুক্তিটিকে বা এআরটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে একমত, যেমনটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ৪ মার্চের বৈঠকশেষে জানিয়েছিলেন। ওই বৈঠকশেষে তাঁকে যখন জিজ্ঞেস করা করা হয়েছিল, এই চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়েছে কিনা, তিনি এর কোনো জবাব না দিয়ে বরং চুক্তির পক্ষে সাফাই গেয়েছেন এই বলে যে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ব্যাপকভিত্তিক আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতেই এটি চূড়ান্ত করা হয়েছে; অর্থাৎ এই চুক্তি পর্যালোচনার কোনো ইচ্ছাই তাদের নেই।
এখন কথা হচ্ছে, দেশ-বিদেশের ব্যাপকসংখ্যক মানুষ যেখানে প্রায় অভিন্ন কণ্ঠে বলছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্যচুক্তি বাংলাদেশের স্বার্থকে ক্ষুণ্ন করেছে, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিসহ (সিপিবি) বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সিপিডির মতো স্বনামধন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান যেখানে চুক্তিটি বাতিলের দাবি জানিয়েছে এবং চুক্তির আওতাধীন তথ্য ও ভাষ্যের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ যেখানে বাণিজ্যস্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রক্ষায় বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্তগ্রহণের এখতিয়ার বাধাগ্রস্ত হবে বলে মনে করা হচ্ছে, সেখানে এ চুক্তি যদি অপর্যালোচিত অবস্থায় বহাল থাকে, তাহলে এর মাধ্যমে দেশের স্বার্থ রক্ষা হবে কেমন করে?
এ প্রসঙ্গে সারাৎসার হিসেবে এ তথ্যটুকু শুধু সামনে আনা যেতে পারে যে, এ চুক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে গম, তুলা, এলএনজি, সয়াবিন ও অন্যান্য কৃষিপণ্য ক্রয় করতে হবে (উদাহরণস্বরূপ: প্রতিটন গম কিনতে হবে ৩৫ ডলার বেশি দিয়ে); এবং সে ক্ষেত্রে আগামী ৫ থেকে ১৫ বছর ধরে তা বাধ্যতামূলকভাবে ক্রয়ের জন্য বিশাল অঙ্কের ন্যূনসীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। তারপর আবার কিনতে হবে বিনা দরপত্রে বহুসংখ্যক উড়োজাহাজ, কিনতে হবে অস্ত্র ও গোলাবারুদ, যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ এবং অন্যান্য আরও নানা সামগ্রী। আর ভয়ঙ্কর ব্যাপার হচ্ছে, এই চুক্তির কারণে বাংলাদেশ অন্য এমন কোনো নন-মার্কেট ইকোনমির সঙ্গে অর্থাৎ রাশিয়া, চীন ইত্যাদি দেশের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করতে পারবে না, যার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এতদসংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে।
এরূপ পরিস্থিতিতে যে চুক্তিকে দেশের সাধারণ মানুষ একবারেই গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করছে না এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়-বিশেষজ্ঞ ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ও সংগঠন যেখানে এটি বাতিলের জন্য উপর্যুপরি দাবি জানিয়ে আসছে, সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী তথা চুক্তি স্বাক্ষরকালীন পররাষ্ট্র উপদেষ্টার পরামর্শ মেনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত দেশের স্বার্থবিরোধী এ বাণিজ্যচুক্তি কোনো পর্যালোচনা ছাড়া হুবহু মেনে নেওয়াটা কি সমীচীন হবে? দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক ও অন্যান্য পেশাজীবীরা দয়া করে এ বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য নিয়ে এগিয়ে এলে একটি ভালো কাজ হবে বলে মনে করি। আর নতুন সরকারেরও উচিত হবে, নিজেদের একেবারে যাত্রাক্ষণেই এ ধরনের একটি রাষ্ট্রস্বার্থবিরোধী চুক্তি মেনে নেওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত থাকা, অর্থাৎ চুক্তিটি পর্যালোচনা করা। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদেও আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। আমরা এ বিষয়ে সরকারের শুভদৃষ্টির অপেক্ষায় রইলাম।
- আবু তাহের খান: অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি; সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়