যন্তরমন্তরের আন্দোলন কি ছড়িয়ে পড়বে ভারতজুড়ে

সুমন সেনগুপ্ত, ইনস্ক্রিপ্ট
সুমন সেনগুপ্ত, ইনস্ক্রিপ্ট

দিল্লি পুলিশ চেষ্টা করছে কীভাবে এই স্বতঃস্ফুর্ত জনজোয়ারকে আটকানো যায়। ছবি: এনডিটিভি থেকে নেওয়া

ভারতীয় প্রকৌশলী ও শিক্ষাবিদ সোনাম ওয়াংচুককে জোর করে আদালতের নির্দেশের দোহাই দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার পরে দিল্লি পুলিশ ভেবেছিল, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনটি হয়ত থেমে যাবে। কিন্তু দেখা গেল, উল্টো এই আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে গেল।

সোনাম ছাড়া আরও যাঁরা অনশন করছিলেন, সমস্ত প্রচারের আলো এসে পড়ল আইসা ছাত্র সংগঠনের তিন শিক্ষার্থীর ওপর। উপরন্তু এই আনশনে যুক্ত হতে দেখা গেল বামপন্থী ছাত্রসংগঠন এসএফআইয়ের আদর্শ এবং ঐশী ঘোষকে। মূল ধারার গণমাধ্যমগুলো বাধ্য হয়ে এবার খবর প্রচার করা শুরু করল। মানুষজনও রাস্তাঘাটে সরব হতে শুরু করল এবং তা সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়তে দেখা গেল।

যখন সোনাম ওয়াংচুককে জোর করে দিল্লি পুলিশ তুলে নিয়ে যায়, সাদা চাদর চাপা দিয়ে এবং তাঁকে দিল্লির সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, তখনই সারা দেশ থেকে সরকারের এই আচরণের বিরোধিতা শুরু হয়। মুম্বাই, রাজস্থান, কলকাতা এমনকি আরএসএসের সদর দপ্তর নাগপুরেও শুরু হয় বিক্ষোভ। যদিও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ এবং শাসকদলের গুন্ডারা আটকানোর চেষ্টা করেছে মানুষের এই স্বতঃস্ফুর্ত বিরোধিতা, কিন্তু তারা পারেনি।

দেশের নানান প্রান্ত থেকে দিল্লির যন্তরমন্তর চত্ত্বরে পৌঁছে যাওয়ার নানান ছবি ও ভিডিও দেখা যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। মুম্বাই তো জনসমুদ্র হয়ে গেছে। অবিচল আছেন অনশনকারীরা। নেহা বোরা, উত্তরাখন্ডের মেয়ে যথেষ্ট দুর্বল, শরীরের অবস্থা সংকটজনক, তবুও অনশন করে চলেছেন আজ ২১ দিন। সঙ্গে আছেন মনীষ এবং আমীন আর আছেন তাঁদের অসংখ্য সহযোদ্ধা ককরোচ পার্টির সমর্থক। পাশে আছেন দেশের বহু মানুষ।

এ যেন নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘হারবার্ট’ উপন্যাসের পুনরাবৃত্তি। হারবার্ট মারা যাওয়ার পরে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্র বুঝতে পারেনি কত বড় বিস্ফোরণ হতে পারে। বিকট সেই বিস্ফোরণের পরে হুঁশ ফেরে রাষ্ট্রের। সোনাম ওয়াংচুককে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময়ে তাঁরা মনে করেছিল এবার আন্দোলনকারীরা থামবে, কিন্তু এই আন্দোলন তো থামার নয়। যে দুর্নীতি চক্র ওই কেন্দ্রীয় পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থার মধ্যে অধিষ্ঠান করে, সেই দুর্নীতি চক্রের অন্যতম মাথা তো কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী নিজে। যে বেসরকারি কোচিং ব্যবস্থা রাজস্থানের কোটা শহরে আছে, তা তো সরকারের মদতেই চলছে, সেই মদতদাতা তো স্বয়ং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী। তাঁর পদত্যাগের দাবী তো ন্যায্য। কিন্তু তাও প্রধানমন্ত্রী তাঁকে সরাচ্ছেন না? কেন?

অনেকে ভাবছেন ধর্মেন্দ্র প্রধানকে রক্ষা করছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। একেবারেই তা নয়, উল্টো ধর্মেন্দ্র প্রধানই প্রধানমন্ত্রীর সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়াচ্ছেন। কারণ আন্দোলনের চাপে যদি ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সরিয়ে দেওয়া হয় তাহলে পরবর্তীতে এই আন্দোলন প্রধানমন্ত্রীর দিকে ঘুরে যাবে না, এই নিশ্চয়তা আছে নাকি? সেই জন্যই শিক্ষামন্ত্রীকে অপসারণ করার থেকে বিরত থাকছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

গতকাল কলকাতার গড়িয়াহাটে বেশ কিছু নাগরিক এবং দিল্লির অনশনকারীদের সমর্থনে প্রতীকি অনশন করেন অন্তত ১০০ জন মানুষ। দিনব্যাপী ওই অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন আরও বহু মানুষ। পথচলতি বহু উৎসুক মানুষ দাঁড়িয়ে শুনছিলেন। তাদের মধ্যে হঠাৎ দেখা গেল একটি মেয়েকে, যার পরনে ছিল একটি কালো টি শার্ট, যাতে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের সেই বিখ্যাত কবিতা লেখা—‘হাম দেখেঙ্গে, লাজিম হ্যায় কি হাম ভি দেখেঙ্গে।’ অর্থ হচ্ছে—আমরা দেখব, নিশ্চিতভাবেই সেই দিন দেখব, আমরাও সেই পরিবর্তনের সাক্ষী হব।

মেয়েটির অনুমতি চেয়ে ছবি তুলতে চাইলাম। সে বলল, মুখ বাদ দিয়ে ছবি তুলতে। ওদিকে দেশের নানান প্রান্ত থেকে খবর আসতে শুরু করেছে। বিজেপির অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিরা এখন বিদ্রোহ করছে এবং তাদের সন্তানরা এখন বিক্ষোভে যোগ দিতে বাড়ি ছেড়ে যাচ্ছে। বিজেপি পরিবারের তরুণরা প্রকাশ্যে ইন্সটাতে পোস্ট করছে এই আন্দোলনের সমর্থনে।

একজন কতটা হতাশ হলে পুলিশকে বলতে পারে—‘আরও মারো আরও মারো, মেরে ফেলো’। হেরে যেতে যেতে আসলে ভারতবর্ষের প্রতিটি যুবক জানে আর কাজকর্ম হবে না, আর চাকরি হবে না, তাই তারা রাস্তায় নেমেছে আজ। নেমে তারা প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে পুলিশের মার খাচ্ছে। নির্মম লাঠিচার্জের শিকার হচ্ছে।

দিল্লি পুলিশ চেষ্টা করছে কীভাবে এই স্বতঃস্ফুর্ত জনজোয়ারকে আটকানো যায়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন মানুষজন উপস্থিত হচ্ছেন আন্দোলনের জায়গায়। প্রখ্যাত অভিনেত্রী শাবানা আজমিকে দেখা যাচ্ছে নেহার পাশে। অভিনেতা প্রকাশ রাজ সরাসরি বলেছেন তিনি এই আন্দোলনে অংশ নেবেন। দীপিকা পডুকোন, সোনাক্ষী সিনহাসহ আরও বেশ কিছু পরিচিত মুখ নেহাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন।

পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু ইনফ্লুয়েন্সারকেও দেখা যাচ্ছে এই লড়াইয়ের সমর্থনে বার্তা দিতে। আগামীকাল মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সংসদ অভিযান যদি দিল্লি পুলিশ আটকানোর চেষ্টা করে, তারা বড় ভুল করবে। এই ছাত্র বিক্ষোভ কিন্তু দাবানলে পরিণত হতে পারে। সেই ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে। দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, আগামীকাল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির ব্যানারে সংসদ অভিযান ‘বেআইনি’। যারা সংসদ অভিযানে অংশ নেবেন তাদের গ্রেপ্তার করা হবে৷ আন্দোলনকারীরা বলছেন, যাবতীয় দমনপীড়ন মোকাবিলা করে সংসদ অভিযান হবেই।

আজ সোমবার (২০ জুলাই) সকাল থেকে সংসদ অভিযান শুরু হওয়ার পরেই দেখা গেল, হাজার হাজার মানুষ হাতে জাতীয় পতাকা, সংবিধানের রূপকার ডা. বি আর আম্বেদকরের ছবি নিয়ে মিছিল শুরু করতে। রাত থেকেই দিল্লি পুলিশ জানিয়ে দিয়েছিল, ছাত্র যুবদের এই মিছিল বেআইনি। যন্তরমন্তর চত্বর এবং সংসদ চত্বরজুড়ে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৬৩ ধারা লাগু করা আছে। অর্থাৎ কোনো রকম জমায়েতই সেখানে করা যাবে না। মিছিল তো দুর অস্ত।

দিল্লি পুলিশ বিভিন্ন ট্রাকে করে পাথর ইট জমা করে রেখেছে। তা সত্ত্বেও মিছিল শুরু হয়। আম্বেদকারের ছবি হাতে ছাত্র যুবরা জয় ভীম, ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগান নিয়ে রাস্তায় হাঁটছে। এদিক ওদিক থেকে খবর আসছে পুলিশ নাকি লাঠিচার্জ শুরু করেছে। তবে যাই হোক না কেন, ছাত্র-যুবদের এই হার না মানা মনোভাব মনে থাকবে।

এর মধ্যে খবর এসেছে আইসার তিনজন যারা অনশন করছিলেন, তারা অনশন ভেঙেছেন। শাবানা আজমি, প্রকাশ রাজ, অঞ্জলি ভরদ্বাজের হাতে অনশন ভঙ্গ হলেও লড়াই আবার নতুন করে শুরু করার অঙ্গীকার করেছেন তাঁরা। আরজিকর আন্দোলনের সময় সরকারে তখন বিজেপি এবং পশ্চিমবঙ্গে তারা বিরোধী দল ছিল, তাই সারারাত আন্দোলন করার জন্য মেট্রো চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আজ দিল্লিতে বিজেপির বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে তাই দিনেরবেলা সব মেট্রো বন্ধ ওখানে। পার্থক্যটা এখানেই। কিন্তু মেট্রোর ষ্টেশনেই শ্লোগান উঠছে, ‘ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করো’।

এই আন্দোলন, এই যুব সমাজকে আর ভুল বোঝানো যাবে না। এমন দৃশ্যও দেখা গেছে, একজন যুবক মার খাচ্ছেন পুলিশের কাছে। একজন কতটা হতাশ হলে পুলিশকে বলতে পারে—‘আরও মারো আরও মারো, মেরে ফেলো’। হেরে যেতে যেতে আসলে ভারতবর্ষের প্রতিটি যুবক জানে আর কাজকর্ম হবে না, আর চাকরি হবে না, তাই তারা রাস্তায় নেমেছে আজ। নেমে তারা প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে পুলিশের মার খাচ্ছে। নির্মম লাঠিচার্জের শিকার হচ্ছে।

বিপুল চক্রবর্তীর সেই কবিতার কথা মনে পড়ে গেল।

‘পা থেকে মাথা পর্যন্ত চাবুকের দাগ যেন থাকে এমনভাবে মারো

দাগ যেন বসে থাকে বেশ কিছুদিন এমন ভাবে মারো

তোমার মারের পালা শেষ হলে

আমাকে যেন ডোরাকাটা বাঘের মতন দেখায়।’

এই আন্দোলন হয়ত শুরু হয়েছে যন্তরমন্তরে। কিন্তু খুব দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়বে প্রান্তে-প্রান্তরে, সেই ইঙ্গিত কিন্তু ইতিমধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে।

  • সুমন সেনগুপ্ত: ভারতীয় লেখক ও রাজনীতি বিশ্লেষক
Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত