লেখা:

ফুটবল বিশ্বকাপে অংশ নিতে ইরানের জাতীয় ফুটবল দল এখন যুক্তরাষ্ট্রে। তবে তাদের ঘিরে এখনো রয়েছে নানা রাজনৈতিক ও মানবিক সংকট। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর অভিযান, ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ এবং চার মাসব্যাপী ডিজিটাল যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতারব কারণে বহু ইরানি সমর্থক দ্বিধায় পড়েছেন, তারা আসলে কাকে সমর্থন করবেন।
শুধু সমর্থকরাই নয়, দলের খেলোয়াড়দের মধ্যেও চাপ ও অনিশ্চয়তা দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ভিসা ইরানি খেলোয়াড়রা শেষ মুহূর্তে পেয়েছেন। ফলে টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে তারা মেক্সিকোর তিজুয়ানায় অবস্থিত নিজেদের অনুশীলন ক্যাম্পে পৌঁছাতে সক্ষম হন।
এর আগে সম্ভাব্য বৈষম্যমূলক আচরণের আশঙ্কায় দলটির প্রশিক্ষণ ক্যাম্প যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা থেকে সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে ফিফার আনুষ্ঠানিক অনুমোদনও নিতে হয়েছে।
তবে দলটি শেষ পর্যন্ত ক্যাম্পে পৌঁছালেও সমস্যা পুরোপুরি কাটেনি। বেশ কয়েকজন ইরানি ফুটবল সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাননি। এছাড়া ইরানের ফুটবল ফেডারেশন জানিয়েছে, তাদের জন্য নির্ধারিত টিকিট বরাদ্দও অনুমোদন করা হয়নি। ফলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসা অনেক সমর্থক হতাশ হয়েছেন।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে আয়োজক দেশ সরাসরি যুদ্ধে জড়িত একটি অংশগ্রহণকারী দেশের সঙ্গে। ফলে ফুটবল মাঠ শুধু খেলার মঞ্চই নয়, শোক, প্রতিরোধ এবং জাতীয়তাবাদী অনুভূতিরও প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
দেশের অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন ও বাইরের সামরিক সংঘাতের দ্বৈত চাপে থাকা ইরানি প্রবাসীদের সামনে এখন এক কঠিন প্রশ্ন। জাতীয় ফুটবল দলকে সমর্থন করলে কি সেই দমন-পীড়ন করা সরকারকেই সমর্থন জানানো হবে?
যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে বিশ্বের বৃহত্তম ইরানি প্রবাসী সম্প্রদায়ের বসবাস। এ কারণে ইরানি সমাজে শহরটিকে প্রায়ই ‘তেহরাঞ্জেলেস’ নামে ডাকা হয়।
এই প্রবাসী সম্প্রদায়ের অনেকের মধ্যেই ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান সম্পর্কে গভীর ও তীব্র অনুভূতি রয়েছে। তাদের একটি বড় অংশ ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের সময় বা তার পরপরই দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান।
প্রবাসী সমাজের অনেকেই এখনো ক্ষমতাচ্যুত পাহলভি রাজবংশ এবং সাবেক যুবরাজ রেজা পাহলভির প্রতি সমর্থন ও আনুগত্য বজায় রেখেছেন। এমনকি তাদের কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত যৌথ যুদ্ধকেও সমর্থন ও উদযাপন করেছেন।
এই প্রবাসী ইরানি সমাজের মধ্যেই ইরানের জাতীয় ফুটবল দল ফারসি ভাষায় ‘জাতীয় দল’ ‘টিম মেল্লি’ হিসেবে পরিচিত নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে শুধু মাঠের লড়াইয়েই নামবে না, বরং নিজেদেরই জাতিগত ও সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়ের বিভক্ত আবেগেরও মুখোমুখি হবে।
জানুয়ারির বিক্ষোভের স্মৃতি এখনো তাজা থাকায়, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত কিছু ইরানি নাগরিকের মধ্যে ম্যাচকে ঘিরে প্রতিবাদ ও বয়কটের আহ্বান ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ কেউ টিকিট কিনে ইচ্ছাকৃতভাবে আসন খালি রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন, যাতে প্রতিবাদের বার্তা স্পষ্ট হয়। আবার কেউ জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় দুয়ো (বিদ্রূপ প্রতিক্রিয়া) দেওয়া কিংবা ইরানের গোল হলেও উদ্যাপন না করার আহ্বান জানিয়েছেন।
এছাড়া ইরানি-আমেরিকান সম্প্রদায়ের সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, যেন তারা স্টেডিয়ামে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বাইরে অন্য ধরনের ইরানি পতাকা বহনে ফিফার সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু প্রবাসী ইরানি বর্তমান জাতীয় পতাকার সরকারি প্রতীক ঢেকে বা মুছে ফেলার, প্রতীকবিহীন সবুজ-সাদা-লাল পতাকা বহনের কিংবা রাজনৈতিক স্লোগানসংবলিত পোশাক পরার পরামর্শ দিয়েছেন।
অন্যদিকে, কেউ কেউ রাজনৈতিক বার্তাবাহী উল্কি (ট্যাটু) প্রদর্শনের কিংবা খেলনা বা প্রতীকী পুতুল ব্যবহার করে ইরানের নেতাদের ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপনের প্রস্তাবও দিয়েছেন।
এ পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজ একটি বিবৃতি দিয়ে সম্মান বজায় রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমাদের সফরের সময় সেখানে এমন নিশ্চয়তা প্রয়োজন যে, কেউ আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতীকগুলোর অবমাননা করতে পারবে না, বিশেষ করে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) প্রতীকের।’
ইরানের বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে, যা ফিফার নিজস্ব অবস্থানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তাদের প্রথম ‘শান্তি পুরস্কার’ প্রদান করলেও, একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র একটি যুদ্ধে জড়িত থাকা সত্ত্বেও সম্ভাব্য খেলোয়াড় ও দর্শকদের ভিসা না দেওয়ার ঘটনায় তারা কার্যত নীরব রয়েছে।
খেলাধুলা ও রাষ্ট্রনীতির সংঘাত নতুন কোনো বিষয় নয়। ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিক থেকে শুরু করে ১৯৮৪ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক বয়কট পর্যন্ত ইতিহাসে এর বহু উদাহরণ রয়েছে। তবে নিজেদের অবস্থানের সঙ্গে এত স্পষ্ট সাংঘর্ষিক বাস্তবতাকে এতটা উদাসীনভাবে মোকাবিলা করার ঘটনা খুব কমই দেখা গেছে।
খেলাধুলা যখন রাজনৈতিক দাবিদাওয়া এবং প্রতিযোগিতার মঞ্চে পরিণত হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় খেলার নিজস্ব মর্যাদা ও নিরপেক্ষতা। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে বিশ্বমঞ্চে খেলাধুলা কি শুধুই খেলাধুলা, রাজনীতির ঊর্ধ্বে এই ধারণা আদৌ কখনও বাস্তব ছিল, নাকি এটি কেবল একটি উপযোগী কল্পনা?
তবে এখানেই রয়েছে আরেকটি জটিলতা। ইরানি সমাজে ফুটবল এমন একটি অবস্থান দখল করে আছে, যা অনেকের কাছে প্রায় পবিত্রতার পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এর প্রমাণ পাওয়া যায় তেহরানের দুই ঐতিহ্যবাহী ক্লাব পার্সেপোলিস ও এস্তেগলালের সমর্থকদের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, যা বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম উত্তেজনাপূর্ণ ক্লাব দ্বৈরথ হিসেবে বিবেচিত হয়। আবার বিশ্বকাপের আগের আসরগুলোতে ইরান জয় পাওয়ার পর দেশজুড়ে রাস্তায় নেমে মানুষের উচ্ছ্বাসও ফুটবলের প্রতি এই গভীর আবেগেরই প্রতিফলন।
১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রকে হারানোর স্মৃতি কিংবা ২০২২ সালের পুনর্ম্যাচ সবই দেখায়, ফুটবল কত গভীরভাবে ইরানি সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
‘টিম মেল্লি’কে সমর্থন করা দীর্ঘদিন ধরেই ইরানিদের জন্য সম্মিলিত গর্বের একটি উৎস। ধর্ম, রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে এটি এমন একটি ক্ষেত্র, যা বিভিন্ন প্রজন্ম ও মতের মানুষকে একসূত্রে বেঁধে রাখে।
আর ঠিক এই কারণেই লস অ্যাঞ্জেলেস ও সিয়াটলে অনুষ্ঠিত ইরানের তিনটি গ্রুপ ম্যাচ ঘিরে সমর্থকদের সামনে এক কঠিন দ্বিধা তৈরি হয়েছে জাতীয় দলের প্রতি সমর্থন জানানো আর সরকারের প্রতি অবস্থানের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যে, যেখানে আমি অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে বৈশ্বিক রাজনীতি পড়াই, সেখানে ইরানি প্রবাসী সম্প্রদায়ের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। তাদের বক্তব্যে বর্তমান পরিস্থিতির মূল দ্বন্দ্বটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
একজন ফুটবলপ্রেমী শীতল যুদ্ধের সময়কার ক্রীড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতার উদাহরণ টেনে বলেন, ফুটবল অনেক সময় রাজনৈতিক সংঘাত অতিক্রম করে মানুষকে একত্রিত করতে পারে। তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, জানুয়ারির বিক্ষোভ ও পরবর্তী ঘটনার ক্ষত এখনো এতটাই গভীর যে অনেক প্রবাসী ইরানির পক্ষে তা সহজে ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়।
আরেকজন কিছুটা আশাবাদী মনোভাব প্রকাশ করেন। তিনি চান, ইরান বিশ্বকাপে ভালো করুক এবং বিশ্বাস করেন মাঠের সাফল্য হয়তো রাজনৈতিক বিভাজন কিছুটা হলেও কমিয়ে আনতে পারে।
ইরান সরকার এবং সরকারের কিছু সমালোচকের মতে, জাতীয় ফুটবল দলকে রাজনীতির বাইরে রেখেই দেখা উচিত। তাদের দৃষ্টিতে, ফুটবল জাতীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ, যা ক্ষমতাসীনদের প্রতি ব্যক্তিগত মতামত নির্বিশেষে সব ইরানির সম্পদ।
একজন ইরানি কর্মকর্তার মতে, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ জাতির জন্য গর্বের বিষয়। তাই খেলোয়াড়দের প্রতি সমর্থন না দেখানো মানে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য ক্রীড়াবিদদের শাস্তি দেওয়ার শামিল।
ইরানকে নাড়া দেওয়া বিক্ষোভ এবং তার পরবর্তী জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রবাসী ইরানিদের এমন সব প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে, যা ফুটবলের সীমানা অনেক আগেই অতিক্রম করেছে।
কারও দৃষ্টিতে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের কর্মকাণ্ড বিতর্কিত হতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা হলো এটি একটি সমৃদ্ধ ও গর্বিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অধিকারী দেশের সার্বভৌম সরকার। আর মাঠে নামা খেলোয়াড়রা যেমন রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন, তেমনি তারা সেই জাতির সংস্কৃতি ও জনগণেরও প্রতিনিধিত্ব করেন।
তবে যে দেশের সঙ্গে ইরান বর্তমানে যুদ্ধে জড়িত, সেই দেশের মাটিতে এই ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হওয়ায় এটিকে সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ক্রীড়া আসর হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখানে প্রতিটি গোল, প্রতিটি পতাকা এবং এমনকি গ্যালারির প্রতিটি খালি আসনও ৯০ মিনিটের খেলার বাইরেও একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক বার্তা বহন করছে। সে অর্থে, বিশ্বকাপ নতুন কোনো বিভাজন তৈরি করেনি, বরং আগে থেকেই বিদ্যমান একটি বিভক্ত বাস্তবতাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে।
(দ্য কনভারসেশন থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)

ফুটবল বিশ্বকাপে অংশ নিতে ইরানের জাতীয় ফুটবল দল এখন যুক্তরাষ্ট্রে। তবে তাদের ঘিরে এখনো রয়েছে নানা রাজনৈতিক ও মানবিক সংকট। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর অভিযান, ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ এবং চার মাসব্যাপী ডিজিটাল যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতারব কারণে বহু ইরানি সমর্থক দ্বিধায় পড়েছেন, তারা আসলে কাকে সমর্থন করবেন।
শুধু সমর্থকরাই নয়, দলের খেলোয়াড়দের মধ্যেও চাপ ও অনিশ্চয়তা দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ভিসা ইরানি খেলোয়াড়রা শেষ মুহূর্তে পেয়েছেন। ফলে টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে তারা মেক্সিকোর তিজুয়ানায় অবস্থিত নিজেদের অনুশীলন ক্যাম্পে পৌঁছাতে সক্ষম হন।
এর আগে সম্ভাব্য বৈষম্যমূলক আচরণের আশঙ্কায় দলটির প্রশিক্ষণ ক্যাম্প যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা থেকে সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে ফিফার আনুষ্ঠানিক অনুমোদনও নিতে হয়েছে।
তবে দলটি শেষ পর্যন্ত ক্যাম্পে পৌঁছালেও সমস্যা পুরোপুরি কাটেনি। বেশ কয়েকজন ইরানি ফুটবল সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাননি। এছাড়া ইরানের ফুটবল ফেডারেশন জানিয়েছে, তাদের জন্য নির্ধারিত টিকিট বরাদ্দও অনুমোদন করা হয়নি। ফলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসা অনেক সমর্থক হতাশ হয়েছেন।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে আয়োজক দেশ সরাসরি যুদ্ধে জড়িত একটি অংশগ্রহণকারী দেশের সঙ্গে। ফলে ফুটবল মাঠ শুধু খেলার মঞ্চই নয়, শোক, প্রতিরোধ এবং জাতীয়তাবাদী অনুভূতিরও প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
দেশের অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন ও বাইরের সামরিক সংঘাতের দ্বৈত চাপে থাকা ইরানি প্রবাসীদের সামনে এখন এক কঠিন প্রশ্ন। জাতীয় ফুটবল দলকে সমর্থন করলে কি সেই দমন-পীড়ন করা সরকারকেই সমর্থন জানানো হবে?
যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে বিশ্বের বৃহত্তম ইরানি প্রবাসী সম্প্রদায়ের বসবাস। এ কারণে ইরানি সমাজে শহরটিকে প্রায়ই ‘তেহরাঞ্জেলেস’ নামে ডাকা হয়।
এই প্রবাসী সম্প্রদায়ের অনেকের মধ্যেই ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান সম্পর্কে গভীর ও তীব্র অনুভূতি রয়েছে। তাদের একটি বড় অংশ ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের সময় বা তার পরপরই দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান।
প্রবাসী সমাজের অনেকেই এখনো ক্ষমতাচ্যুত পাহলভি রাজবংশ এবং সাবেক যুবরাজ রেজা পাহলভির প্রতি সমর্থন ও আনুগত্য বজায় রেখেছেন। এমনকি তাদের কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত যৌথ যুদ্ধকেও সমর্থন ও উদযাপন করেছেন।
এই প্রবাসী ইরানি সমাজের মধ্যেই ইরানের জাতীয় ফুটবল দল ফারসি ভাষায় ‘জাতীয় দল’ ‘টিম মেল্লি’ হিসেবে পরিচিত নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে শুধু মাঠের লড়াইয়েই নামবে না, বরং নিজেদেরই জাতিগত ও সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়ের বিভক্ত আবেগেরও মুখোমুখি হবে।
জানুয়ারির বিক্ষোভের স্মৃতি এখনো তাজা থাকায়, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত কিছু ইরানি নাগরিকের মধ্যে ম্যাচকে ঘিরে প্রতিবাদ ও বয়কটের আহ্বান ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ কেউ টিকিট কিনে ইচ্ছাকৃতভাবে আসন খালি রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন, যাতে প্রতিবাদের বার্তা স্পষ্ট হয়। আবার কেউ জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় দুয়ো (বিদ্রূপ প্রতিক্রিয়া) দেওয়া কিংবা ইরানের গোল হলেও উদ্যাপন না করার আহ্বান জানিয়েছেন।
এছাড়া ইরানি-আমেরিকান সম্প্রদায়ের সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, যেন তারা স্টেডিয়ামে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বাইরে অন্য ধরনের ইরানি পতাকা বহনে ফিফার সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু প্রবাসী ইরানি বর্তমান জাতীয় পতাকার সরকারি প্রতীক ঢেকে বা মুছে ফেলার, প্রতীকবিহীন সবুজ-সাদা-লাল পতাকা বহনের কিংবা রাজনৈতিক স্লোগানসংবলিত পোশাক পরার পরামর্শ দিয়েছেন।
অন্যদিকে, কেউ কেউ রাজনৈতিক বার্তাবাহী উল্কি (ট্যাটু) প্রদর্শনের কিংবা খেলনা বা প্রতীকী পুতুল ব্যবহার করে ইরানের নেতাদের ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপনের প্রস্তাবও দিয়েছেন।
এ পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজ একটি বিবৃতি দিয়ে সম্মান বজায় রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমাদের সফরের সময় সেখানে এমন নিশ্চয়তা প্রয়োজন যে, কেউ আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতীকগুলোর অবমাননা করতে পারবে না, বিশেষ করে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) প্রতীকের।’
ইরানের বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে, যা ফিফার নিজস্ব অবস্থানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তাদের প্রথম ‘শান্তি পুরস্কার’ প্রদান করলেও, একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র একটি যুদ্ধে জড়িত থাকা সত্ত্বেও সম্ভাব্য খেলোয়াড় ও দর্শকদের ভিসা না দেওয়ার ঘটনায় তারা কার্যত নীরব রয়েছে।
খেলাধুলা ও রাষ্ট্রনীতির সংঘাত নতুন কোনো বিষয় নয়। ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিক থেকে শুরু করে ১৯৮৪ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক বয়কট পর্যন্ত ইতিহাসে এর বহু উদাহরণ রয়েছে। তবে নিজেদের অবস্থানের সঙ্গে এত স্পষ্ট সাংঘর্ষিক বাস্তবতাকে এতটা উদাসীনভাবে মোকাবিলা করার ঘটনা খুব কমই দেখা গেছে।
খেলাধুলা যখন রাজনৈতিক দাবিদাওয়া এবং প্রতিযোগিতার মঞ্চে পরিণত হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় খেলার নিজস্ব মর্যাদা ও নিরপেক্ষতা। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে বিশ্বমঞ্চে খেলাধুলা কি শুধুই খেলাধুলা, রাজনীতির ঊর্ধ্বে এই ধারণা আদৌ কখনও বাস্তব ছিল, নাকি এটি কেবল একটি উপযোগী কল্পনা?
তবে এখানেই রয়েছে আরেকটি জটিলতা। ইরানি সমাজে ফুটবল এমন একটি অবস্থান দখল করে আছে, যা অনেকের কাছে প্রায় পবিত্রতার পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এর প্রমাণ পাওয়া যায় তেহরানের দুই ঐতিহ্যবাহী ক্লাব পার্সেপোলিস ও এস্তেগলালের সমর্থকদের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, যা বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম উত্তেজনাপূর্ণ ক্লাব দ্বৈরথ হিসেবে বিবেচিত হয়। আবার বিশ্বকাপের আগের আসরগুলোতে ইরান জয় পাওয়ার পর দেশজুড়ে রাস্তায় নেমে মানুষের উচ্ছ্বাসও ফুটবলের প্রতি এই গভীর আবেগেরই প্রতিফলন।
১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রকে হারানোর স্মৃতি কিংবা ২০২২ সালের পুনর্ম্যাচ সবই দেখায়, ফুটবল কত গভীরভাবে ইরানি সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
‘টিম মেল্লি’কে সমর্থন করা দীর্ঘদিন ধরেই ইরানিদের জন্য সম্মিলিত গর্বের একটি উৎস। ধর্ম, রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে এটি এমন একটি ক্ষেত্র, যা বিভিন্ন প্রজন্ম ও মতের মানুষকে একসূত্রে বেঁধে রাখে।
আর ঠিক এই কারণেই লস অ্যাঞ্জেলেস ও সিয়াটলে অনুষ্ঠিত ইরানের তিনটি গ্রুপ ম্যাচ ঘিরে সমর্থকদের সামনে এক কঠিন দ্বিধা তৈরি হয়েছে জাতীয় দলের প্রতি সমর্থন জানানো আর সরকারের প্রতি অবস্থানের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যে, যেখানে আমি অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে বৈশ্বিক রাজনীতি পড়াই, সেখানে ইরানি প্রবাসী সম্প্রদায়ের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। তাদের বক্তব্যে বর্তমান পরিস্থিতির মূল দ্বন্দ্বটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
একজন ফুটবলপ্রেমী শীতল যুদ্ধের সময়কার ক্রীড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতার উদাহরণ টেনে বলেন, ফুটবল অনেক সময় রাজনৈতিক সংঘাত অতিক্রম করে মানুষকে একত্রিত করতে পারে। তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, জানুয়ারির বিক্ষোভ ও পরবর্তী ঘটনার ক্ষত এখনো এতটাই গভীর যে অনেক প্রবাসী ইরানির পক্ষে তা সহজে ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়।
আরেকজন কিছুটা আশাবাদী মনোভাব প্রকাশ করেন। তিনি চান, ইরান বিশ্বকাপে ভালো করুক এবং বিশ্বাস করেন মাঠের সাফল্য হয়তো রাজনৈতিক বিভাজন কিছুটা হলেও কমিয়ে আনতে পারে।
ইরান সরকার এবং সরকারের কিছু সমালোচকের মতে, জাতীয় ফুটবল দলকে রাজনীতির বাইরে রেখেই দেখা উচিত। তাদের দৃষ্টিতে, ফুটবল জাতীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ, যা ক্ষমতাসীনদের প্রতি ব্যক্তিগত মতামত নির্বিশেষে সব ইরানির সম্পদ।
একজন ইরানি কর্মকর্তার মতে, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ জাতির জন্য গর্বের বিষয়। তাই খেলোয়াড়দের প্রতি সমর্থন না দেখানো মানে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য ক্রীড়াবিদদের শাস্তি দেওয়ার শামিল।
ইরানকে নাড়া দেওয়া বিক্ষোভ এবং তার পরবর্তী জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রবাসী ইরানিদের এমন সব প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে, যা ফুটবলের সীমানা অনেক আগেই অতিক্রম করেছে।
কারও দৃষ্টিতে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের কর্মকাণ্ড বিতর্কিত হতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা হলো এটি একটি সমৃদ্ধ ও গর্বিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অধিকারী দেশের সার্বভৌম সরকার। আর মাঠে নামা খেলোয়াড়রা যেমন রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন, তেমনি তারা সেই জাতির সংস্কৃতি ও জনগণেরও প্রতিনিধিত্ব করেন।
তবে যে দেশের সঙ্গে ইরান বর্তমানে যুদ্ধে জড়িত, সেই দেশের মাটিতে এই ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হওয়ায় এটিকে সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ক্রীড়া আসর হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখানে প্রতিটি গোল, প্রতিটি পতাকা এবং এমনকি গ্যালারির প্রতিটি খালি আসনও ৯০ মিনিটের খেলার বাইরেও একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক বার্তা বহন করছে। সে অর্থে, বিশ্বকাপ নতুন কোনো বিভাজন তৈরি করেনি, বরং আগে থেকেই বিদ্যমান একটি বিভক্ত বাস্তবতাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে।
(দ্য কনভারসেশন থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)
.png)

একজন নেতার মৃত্যু একটি দলের জন্য শোকের ঘটনা। একই সঙ্গে এটি রাজনৈতিক পরীক্ষাও। নেতা চলে যাওয়ার পর দলটি কী করে, সেটিই প্রমাণ করে সেই নেতার উত্তরাধিকার কতটা গভীর ছিল। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপিও এমন এক পরীক্ষার সামনে। জন্মদিনে দলটি তাঁকে স্মরণ করবে। শ্রদ্ধা জানাবে।
৯ ঘণ্টা আগে
দেশে গত দুই মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক খাদ্য ও জ্বালানি পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব বলছে, এ সময়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমেছে। বাজার বাস্তবতা ও সরকারি পরিসংখ্যানের এই ব্যবধান বিবিএসের তথ্যের মান, স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে পুরনো বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
১৪ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো কৃষি। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতা কৃষির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। গত কয়েক দশকে আমাদের কৃষিতে অভাবনীয় সাফল্য এসেছে। উন্নত জাতের ফসল, সেচ, সার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই দমন ও প্রযুক্তির ব্যবহার এই সাফল্যের পেছনের মূল কারণ।
১৩ আগস্ট ২০২৬
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘিরে নয়াদিল্লির কূটনৈতিক তৎপরতা এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। শুধু সেপ্টেম্বরের ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ নয়, বাংলাদেশ সরকারের প্রধান হিসেবে আলাদা দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণও পেয়েছেন তিনি।
১২ আগস্ট ২০২৬