leadT1ad

ভোটের ঈদ: দেড় দশক পর গণতন্ত্রের উৎসবে ফেরার অপেক্ষা

মেহেরাব হোসেন
মেহেরাব হোসেন

ভোট উৎসবের প্রতীকী ছবি। এআই জেনারেটেড

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার এক গ্রামে বসে এক বয়স্ক মানুষের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। ভোট নিয়ে জিজ্ঞেস করতেই অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে বললেন, ‘বাপ-দাদার আমলে দেখিছি, ভোটের দিন ঈদের দিনের মতো আনন্দ থাইকতো। এবারও সেইরমই আনন্দ লাগতিছে।’ কথাটা শুনে থমকে গেলাম। গত এক দশকে বাংলাদেশের কোনো নির্বাচনী মাঠে এমন কথা শুনিনি।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট থেকে ভোটার আচরণ নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে একটা কথা বারবার শুনছি, ‘দশ বছর ধরি তো ভোট দিতিই যাই না।’ কেউ বলছেন গিয়েছিলেন, কিন্তু দেখেন সব শেষ। আগেই ভোট পড়ে গেছে। কেউ বলছেন, যাওয়ার দরকারই মনে করেননি। জানতেন, ফল আগে থেকে ঠিক করা। এই হতাশা থেকে এখন যে উৎসাহ দেখছি, সেটা বুঝতে গেলে একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে।

নব্বইয়ের দশকে নির্বাচন মানে ছিল উৎসব। মানুষ সকাল সকাল উঠে ভোটকেন্দ্রে যেতেন। লাইনে দাঁড়িয়ে গল্প হতো। কিন্তু আস্তে আস্তে সেই ছবি বদলে গেল। ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪—প্রতিটা নির্বাচন আগেরটার চেয়ে বেশি ফাঁকা। সরকারি হিসাবে ভোটার এসেছে। কিন্তু মাঠে গেলে কেন্দ্র খালি। নির্বাচন হয়ে দাঁড়াল একটা আনুষ্ঠানিকতা, যেখানে সাধারণ মানুষের কোনো ভূমিকা নেই।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে যে পরিবর্তন এল, তার সবচেয়ে বড় ফল হয়তো এটাই—মানুষ আবার বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে তাদের ভোটের দাম আছে। এক তরুণ বললেন, ‘জীবনে প্রথমবার মনে হচ্চে আমাগের ভোটটা গোনা হবি।’ এই কথাটা ছোট না। গণতন্ত্রের পুরো ভিত্তিই তো এই বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে।

মাঠে গিয়ে দেখছি প্রার্থীদের মধ্যে নড়াচড়া বেশ জোরে। পাবনা-১ আসনে বিএনপির একাধিক নেতা মনোনয়ন চেয়েছিলেন। সবাই নিজের মতো প্রচার করেছেন, মানুষের কাছে গেছেন। এই প্রতিযোগিতাটাই তো সুস্থ রাজনীতির চিহ্ন। জামায়াতের প্রার্থী আগে থেকে ঠিক ছিল। তাঁরা নানা সামাজিক কাজ করছেন, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন, মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরছেন। সবাই বুঝেছেন এবার আসল লড়াই, শুধু দলের নামে ভোট আসবে না।

ভোটাররাও চুপচাপ বসে নেই। কথা বলে দেখছি, তাঁরা হিসাব কষছেন। প্রার্থী কে, কোথাকার মানুষ, এলাকার জন্য কী করতে পারবেন—এসব ভাবছেন। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি শুনছেন, কিন্তু চোখ বুজে বিশ্বাস করছেন না। প্রার্থীর চরিত্র দেখছেন—সৎ কি না, দুর্নীতি করেছেন কি না, বিপদে পাশে দাঁড়ান কি না। এই যাচাই-বাছাই আগের নির্বাচনে এত দেখিনি।

তবে গ্রামের ছবিটা এত সরল না। এখনো অনেক জায়গায় পাড়া বা গোষ্ঠী মিলে ঠিক করে কাকে ভোট দেবে। মাতব্বর বা বয়স্করা বসেন, আলাপ হয়, সিদ্ধান্ত হয়। ‘আমাগের পাড়া থাকি তো অমুককে দিব’—এই কথা এখনো চলে। ব্যক্তি কী চায় সেটা অনেক সময় গৌণ হয়ে যায়। এটা আদর্শ গণতন্ত্রের ছবি না, কিন্তু বাস্তবতা।

ঈদের সঙ্গে তুলনাটা তাই এমনি এমনি না। ঈদে সবাই সমান। ধনী-দরিদ্র এক কাতারে নামাজ পড়েন। ভোটেও তাই হওয়ার কথা। রিকশাওয়ালার ভোট আর ব্যবসায়ীর ভোট সমান। এই সমতার বোধটাই গণতন্ত্রের প্রাণ। যখন সেই বোধ জাগে, তখনই ভোট উৎসব হয়ে ওঠে।

নারীদের বেলায় ব্যাপারটা আরো জটিল। শহরে হয়তো অবস্থা বদলাচ্ছে, কিন্তু গ্রামে? সেখানে এখনো বেশির ভাগ নারী স্বামী বা ছেলের কথায় ভোট দেন। নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কম। একজন বললেন, ‘তোমার চাচা যেখানে কবি সেখানে ভোট দিব।’ অন্য একজন বললেন, ‘ছাওয়ালের ভাত খাই, ছাওয়াল যেখানে কবি, সেখানে ভোটটা দেয়া লাগবি, আমরা তো বাসার বাইরে সেরম যাই না, অত কিছু বুঝিওনা।’

এই পরিস্থিতি একদিনে বদলাবে না। তবে এবার নারী প্রার্থী বেড়েছে, নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। দীর্ঘ পথ, কিন্তু শুরুটা তো হোক।

উদ্বেগ আছে, সেটাও সত্যি। ভোটের আগে কোনো সন্ত্রাসী কার্যক্রম হবে কিনা—তা নিয়ে মানুষ উদ্বিগ্ন।

গ্রামে কথা বলতে গেলে অনেকে জিজ্ঞেস করছেন, আওয়ামী লীগের ভোটটা কোন দিকে যাবে? তারা কি ভোট দেবে, নাকি বসে থাকবে? দিলে কাকে দেবে? এই হিসাবটা অনেকে কষছেন।

সংখ্যালঘুরা চিন্তিত। অর্থনীতি টালমাটাল। গোষ্ঠীতন্ত্র আছে, নারীদের পদে পদে বাধার ব্যাপার আছে। কিন্তু এতকিছুর পরেও মাঠে যে উৎসাহ দেখছি, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। মানুষ বুঝেছে, এই নির্বাচন অন্যরকম। শুধু সরকার বদল না, একটা নতুন শুরু।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস বলেছেন, তিনি চান এই নির্বাচন হোক ‘নবজন্মের মহোৎসব’। কথাটা শুনতে সুন্দর। কিন্তু আসল সত্য হলো—গণতন্ত্র তখনই উৎসব হয়ে ওঠে, যখন মানুষ বিশ্বাস করে তাদের কথার মূল্য আছে। যখন ভোটকেন্দ্রে যাওয়া কেবল একটি দায়িত্ব নয়, বরং আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে। সেই অনুভূতিটা বহুদিন ধরে হারিয়ে গিয়েছিল। এখন মনে হচ্ছে, তা আবার ধীরে ধীরে উঁকি দিচ্ছে।

ঈদের সঙ্গে তুলনাটা তাই এমনি এমনি না। ঈদে সবাই সমান। ধনী-দরিদ্র এক কাতারে নামাজ পড়েন। ভোটেও তাই হওয়ার কথা। রিকশাওয়ালার ভোট আর ব্যবসায়ীর ভোট সমান। এই সমতার বোধটাই গণতন্ত্রের প্রাণ। যখন সেই বোধ জাগে, তখনই ভোট উৎসব হয়ে ওঠে।

১২ ফেব্রুয়ারি সাড়ে ১২ কোটি মানুষ রায় দেবেন। শুধু কে জিতবে, সেই রায় না, বাংলাদেশ কোন পথে যাবে, সেই রায়ও। জুলাই সনদের ওপর গণভোটও হচ্ছে একই দিনে। মানুষ শুধু নেতা বাছছে না, একটা নতুন দেশের নকশায় সই দিচ্ছে।

পাবনার সেই বয়স্ক মানুষটার কথায় ফিরি। বললেন, ‘এবার ভোট দিতি যাওয়া লাগবিই।’ এই ‘যাওয়া লাগবিই’ শব্দটার মধ্যে যে জোর, যে আশা—সেটাই আসল সম্পদ। হ্যাঁ, অনেক সমস্যা আছে, অনেক বাধা আছে। কিন্তু দেড় দশক পর মানুষ আবার ভোটের কথা বলছে আগ্রহ নিয়ে। এটাই এখন সবচেয়ে বড় খবর। এখন দেখার, এই আগ্রহের কতটা সম্মান রাখা যায়।

  • মেহেরাব হোসেন: লেখক
Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত