leadT1ad

‘রাজাকারনির্ভর’ থেকে ‘পরিশুদ্ধ’: অলি আহমদের রাজনৈতিক ভোলবদল

অনির্বাণ মৈত্র
অনির্বাণ মৈত্র

কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। ছবি: সংগৃহীত

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ও মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) অলি আহমদ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতের সাথে নির্বাচনী আসন সমঝোতায় যুক্ত হয়েছেন। তার দল গোটা আওয়ামী লীগ শাসনামলে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে যুক্ত ছিলো এবং সেভাবেই বক্তব্য-বিবৃতি রাখতেন। তিনি বিএনপি সরকারের সাবেক মন্ত্রীও।

নজিরবিহীন গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রায় দেড় বছরের মাথায় সমমনা দলগুলোর মধ্যে যখন নির্বাচনী জোট গঠন নিয়ে দর কষাকষি চলছে, তখন তাঁর দলের শীর্ষ নেতৃত্বেই মতদ্বৈধতা দেখা গেল। নির্বাচনী সমঝোতার ডামাডোলে এলডিপি’র মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। এরপর তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

অন্যদিকে, জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটে যোগদান বিষয়ে অলি আহমদ বলেছেন, ‘আমরা মুক্তিযুদ্ধের শক্তি এবং জুলাইয়ের শক্তি একত্রিত হয়েছি। আমরা আসন সমঝোতা করেছি।’ অলি আহমদ ইতিপূর্বে সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছিলেন তাদের চাওয়া ছিলো ‘অন্তত ৮ থেকে ৯টা’ আসন; কিন্তু বিএনপি তাদের মাত্র একটি আসনে ছাড় দিতে সম্মত হয়েছে। তখন অবশ্য তিনি এককভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিলেন।

বলার অপেক্ষা রাখে না, দলের সভাপতি ও মহাসচিবের এই বিপরীতমুখী যাত্রার পেছনে কোনো আদর্শিক বোঝাপড়া কাজ করেনি; কাজ করেছে নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে সংসদে আসন লাভের আশু আকাঙ্ক্ষা। এর সাথে যদি অলি আহমদের ইতিহাস এবং ঐতিহাসিক বক্তব্যগুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়, তাহলে পুরো ব্যাপারটা আরো কৌতুককর হয়ে ওঠে।

কর্ণেল (অব.) অলি আহমদ ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। তিনি ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন জেড ফোর্সের অধীনে। স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বীর বিক্রম খেতাব প্রদান করে।

রাজনীতিবিদদের কাছে নীতি বা আদর্শের প্রতি অটল থাকার প্রত্যাশা এদেশের মানুষ বহুদিন আগেই ছেড়ে দিয়েছে। নির্বাচন এলেই এ ধরনের দল বদল, এক দল নিয়ে বিভিন্ন জোটের লোফালুফি, প্রলোভন দেখানোর ইতিহাস বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভূরিভূরি।

জিয়াউর রহমান বিএনপি গঠন করলে তিনি সেনাবাহিনীতে তার চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যোগদান করেন। জিয়াউর রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই রাজনীতিবিদ ১৯৯১ সালে গঠিত খালেদা জিয়ার সরকারে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সে সময় বিএনপির সরকার গঠনে জামায়াতের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু, মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের অবস্থান ছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তার পক্ষে। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিন্দা, হেয় প্রতিপন্ন করে বক্তৃতা-বিবৃতির পাশাপাশি তারা রাজাকার-আলবদর-আল শামস বাহিনী গঠন করে গণহত্যায় অংশ নেয়। উল্লেখ্য, ২০০১-২০০৬ সালে খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রীত্বের দ্বিতীয় মেয়াদে জামায়াত সরাসরি সরকারের অংশ ছিলো।

জামায়াতের সাথে সংশ্লিষ্টতা ও দলে স্বাধীনতাবিরোধী মানুষদের সমাবেশ বিএনপির মধ্যেই ক্ষোভ ও নানা প্রশ্ন তৈরি করেছিল। এই ক্ষুব্ধ অংশের অন্যতম নেতা ছিলেন কর্ণেল অলি আহমদ। মহিউদ্দিন আহমদ তার ‘বিএনপি সময় অসময়’ বইতে তাঁর একটি সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করেছেন‌।

৩০শে এপ্রিল, ১৯৯৯ দৈনিক মাতৃভূমি’তে ছাপা এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে রাজাকাররা পাকিস্তানের দালাল ছিল। এ দেশের মা-বোনদের ইজ্জত লুণ্ঠনের ব্যাপারে পাকিস্তানি বাহিনীকে সাহায্য করেছে। রাজাকারদের হাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিরীহ জনগণ, শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, রাজনীতিক খুন হয়েছেন। তাই ওই সময় এ ধরনের ঘৃণিত ব্যক্তিদের সামনে পেলে নিশ্চয়ই ছেড়ে দিতাম না। একবার যে বেইমানি করে বা দালালি করে সে সারা জীবনই বেইমানি ও দালালি করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়।... মাতৃভূমির সঙ্গে যারা বেইমানি করেছে তাদের বিরুদ্ধে হয়তো এখন আমি কোনো ব্যবস্থা নিতে না পারি তবে এখন তাদের সঙ্গে প্রেমপ্রীতিতে আবদ্ধ হওয়ার কোনো কারণ নেই।... বিভিন্ন দলে রাজাকাররা আত্মগোপন করে আছে দেশের জন্য বা দলের জন্য নয়। রাজাকাররা নিজ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দলে আশ্রয় নিয়ে গণতন্ত্রপরিপন্থী কাজে লিপ্ত হয়।...কারণ এ দেশে সঠিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হলে রাজাকারদের অনেককে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলতে হতো, যা হয়েছে জার্মানিতে এবং এখনো হচ্ছে।’

এখানেই শেষ নয়‌। অলি আহমদ সমমনা নেতা-কর্মীদের নিয়ে ২০০৬ সালের ২৭ অক্টোবর বিএনপি থেকে বেরিয়ে এসে এলডিপি গঠন করেছিলেন‌। সেসময় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘বিএনপি এখন রাজাকারনির্ভর একটি রাজনৈতিক দল।’

যে অলি আহমদ বিভিন্ন সময় এই ধরনের কড়া মন্তব্য করেছেন ‘রাজাকার’দের সম্পর্কে, তাদের সঙ্গে ‘প্রেমপ্রীতিতে আবদ্ধ’ হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, জোটবদ্ধ হওয়ার পর বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদের সাম্প্রতিক মন্তব্য হলো, ‘জামায়াত এখন পরিশুদ্ধ। পরিশুদ্ধ না হলে বীরবিক্রম এবং মুক্তিযোদ্ধা তাদের সঙ্গে গেল কীভাবে?’ বাস্তবতা হচ্ছে জামায়াত দলটি অদ্যবধি মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের ভূমিকা নিয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য হাজির করতে পারে নি‌। বরং নিজস্ব পত্রিকা, ছাত্রসংগঠনের নেতৃবৃন্দ, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব থেকে দলের শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত তারা একাত্তর প্রশ্নে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য অব্যাহত রেখেছে।

রাজনীতিবিদদের কাছে নীতি বা আদর্শের প্রতি অটল থাকার প্রত্যাশা এদেশের মানুষ বহুদিন আগেই ছেড়ে দিয়েছে। নির্বাচন এলেই এ ধরনের দল বদল, এক দল নিয়ে বিভিন্ন জোটের লোফালুফি, প্রলোভন দেখানোর ইতিহাস বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভূরিভূরি। সেজন্যই এমপি হওয়ার যাবতীয় সুযোগ-সুবিধার ঝলকানি ম্লান করে দেয় পূর্বের সব বজ্রকঠিন রাজনৈতিক ঘোষণা।

২৪-এর রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলের যে আশা দেখা গিয়েছিল, তাও মোটাদাগে অপসৃয়মান। কর্ণেল (অব.) অলি আহমদের জামায়াতের জোটে যোগদান সেই গড্ডালিকা প্রবাহের ধারায় আরেকটি কৌতুককর উদাহরণ সৃষ্টি করলো মাত্র, যা কি-না আপনাকে মনে করিয়েই দিতে পারে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে বিখ্যাত একটি আধুনিক গান:

‘অলির কথা শুনে বকুল হাসে/ কৈ তাহার মতো/ তুমি আমার কথা শুনে/ হাসো না তো…’

অনির্বাণ মৈত্র: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত