leadT1ad

মুসলিম সাহিত্য সমাজ

মুসলিম সাহিত্য সমাজ ও বাংলাদেশ : আলো নাকি অন্ধকারের কুহক

স্ট্রিম গ্রাফিক

ঢাকা তখনও মফস্বল। বঙ্গভঙ্গের পর ১৯০৭ সালে এলো প্রথম উন্নয়ন পরিকল্পনা; তার চৌদ্দ বছর পর একটা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকায় তখনও ছিল গাড়োয়ানের হাঁকডাক, ছিল নবাব বাড়ির নবাবি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছরের মাথায় ১৯২৬ সালে একটা ঘটনা ঘটে গেল। বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক আর ছাত্রদের সম্মিলনে গড়ে উঠল একটি সংগঠন—মুসলিম সাহিত্য সমাজ। তার বছরখানেক পরেই সংগঠন থেকে প্রকাশ পেল পত্রিকা ‘শিখা’। সেই হিসেবে আমরা দাঁড়িয়ে আছি একশো বছরের এক সময়প্রকোষ্ঠের শেষ বিন্দুতে।

ঢাকায় এখন জ্বলজ্বলে আলো, মাথার ওপর দিয়ে শাঁই শাঁই করে উড়ে যাচ্ছে মেট্রোরেল, উঁচু উঁচু দালানের শীর্ষমুখী অভিসার ঢেকে ফেলছে সমস্ত আকাশ, মেট্রোপলিটন থেকে আমাদের ঢাকাই মন আজ কসমোপলিটনের দিকে; অন্তহীন সভা ও সমাবেশের এই নগরীতে আজ পালিত হচ্ছে মুসলিম সাহিত্য সমাজের শতবর্ষপূর্তি। চোখে পড়ছে বহুরঙা আয়োজন। পত্রিকার পাতায় পাতায় ছাপা হচ্ছে ‘শিখা’র ছবি। মুসলিম সাহিত্য সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গের জীবন ও কীর্তির মূল্যায়ন চোখে পড়ছে খুব। বাংলা একাডেমি আয়োজন করেছে বিরাট এক মহোৎসবের। চমকপ্রদ সব শিরোনামের গবেষণার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

শুনতে পাচ্ছি নিম্নবর্গের ইতিহাসভাবুকেরাও ‘শিখা’র উদযাপনে এদেশে তশরিফ রাখবেন। এককথায় মারহাবা। ‘খোশ আমদেদ’—‘শিখা’র প্রথম সংখ্যায় যেমনটা লিখেছিলেন নজরুল। ঠিক এই মৌসুমে আমার মনে যৎসামান্য কথা—কিছু প্রশ্নও। ‘শিখা’র সেই যুগ থেকে আমরা কি পিছিয়েছি, না এগিয়েছি? প্রশ্নটা বাইনারির মতো শোনালেও না করে উপায় নেই। কেননা আমরা তো এখনো ‘মুসলমান’, ‘ইসলাম’, ‘পূর্ববাংলা’, ‘বাঙালি মুসলমান’ ইত্যাদির শ্লোক আওড়াচ্ছি? কথাগুলো তো তখনও ছিল। পার্থক্য কিছু চোখে পড়ে কি? ভাবি।

ভাবি, কেননা, এই সময়ে এসে আমরা প্রতিদিন হননের মুখোমুখি, মানুষ মারছি, পোড়াচ্ছি, ভাঙছি, জ্বালিয়ে দিচ্ছি ঘরবাড়ি; ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পুড়িয়ে মারছি জ্যান্ত মানুষ; দ্বন্দ্ব করছি ‘প্রগতিশীলতা’ আর ‘রক্ষণশীলতা’র নামে। আবার কণ্ঠনালী ছিঁড়ে স্লোগান তুলছি ‘ইনসাফ’, ‘ইনকিলাব’। ‘ইনকিলাব’ তো তখনও ছিল, ছিল ‘ইনসাফে’র আকুতি। কিন্তু ওই ইনসাফ আর ইনকিলাবের আকুতি নিয়ে হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে বসে আনন্দ, আড্ডা, তর্কও করেছে। যদিও তখনও ছিল সাম্প্রদায়িক হিংসা ও হত্যা। তাহলে এই দেশ, এই ভূমি কতটুকু এগোলো? কেঁপে ওঠে না দ্বিধাতুর মন—মুসলিম সাহিত্য সমাজ কিংবা ‘শিখা’ যে স্বপ্নগুলো দেখেছিল সেগুলো কি ফিকে হয়ে গেছে?

অথচ আমরা তখনও ছিলাম দুঃসময়ের তলানিতে। ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী শাসনের মুঠোর ভেতর আটকা পড়েছিল আমাদের ভাগ্য। ধর্মের নামে তখনও ছিল ধর্ম-ব্যবসায়ী। আবার তারাই হয়ে উঠত সমাজপতি; সেই দুঃসময়-ঘেরা শহরেই মুসলিম সাহিত্য সমাজ এনেছিল অন্য বয়ান। তারা কথা বলেছিল বাঙালি মুসলমানের ‘আত্মপরিচয়’ নিয়ে।

মুসলিম সাহিত্য সমাজের চিন্তকদের কাছে মনে হয়েছিল, ‘পিছিয়ে পড়া’ মুসলমান সমাজকে উঠে আসতে হবে সমকালের জায়গাজমিতে। তাদের গ্রহণ করতে হবে মাতৃভাষা চর্চার দায়দায়িত্ব। সাহিত্যের শক্তি দিয়ে বদলাতে হবে সমাজ। তাদের সঙ্গী হবে চিন্তা ও বুদ্ধি। ‘শিখা’র প্রতিভূরা মূলত নতুন এক ‘রেনেসাঁ’র আয়োজনে মিলিত হয়েছিলেন। বাংলা অঞ্চলে রেনেসাঁ ঘটুক আর না-ই ঘটুক, ‘শিখা’র মাধ্যমে বাঙালি মুসলমান তরুণেরা উজ্জীবনের স্বপ্ন দেখেছিল। তারা দাঁড়িয়েছিল উদারনীতি ও মানবিকতাবাদের ভিত্তিভূমিতে।

সে সময় ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে ছিল বিভক্ত জাতীয়তাবাদ। হিন্দু ও মুসলাম পরিচয়ভিত্তিক সেই জাতীয়তাবাদ আবার অনেকটাই কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ অনুসারী। ‘শিখা’র ঝোঁক না কংগ্রেস, না মুসলিম লীগে। সম্প্রদায়নির্ভর দলীয় রাজনীতির বাইরে মুসলিম সাহিত্য সমাজ তৈরি করতে চেয়েছিল জ্ঞানভিত্তিক সমাজ। ‘মুসলিম’ তার পরিচয়। কিন্তু সেই পরিচয় সাংস্কৃতিক, বড়জোর সংস্কৃতিকেন্দ্রিক রাজনীতির। কিন্তু কোনো অর্থেই দলীয় রাজনীতির ছাপ্পড় দেয়া পথে ‘শিখা’ হাঁটে নি।

‘শিখা’র সেই যুগ থেকে আমরা কি পিছিয়েছি, না এগিয়েছি? প্রশ্নটা বাইনারির মতো শোনালেও না করে উপায় নেই। কেননা আমরা তো এখনো ‘মুসলমান’, ‘ইসলাম’, ‘পূর্ববাংলা’, ‘বাঙালি মুসলমান’ ইত্যাদির শ্লোক আওড়াচ্ছি? কথাগুলো তো তখনও ছিল। পার্থক্য কিছু চোখে পড়ে কি? ভাবি।

বলা ভালো, মুসলিম সাহিত্য সমাজের নামে ‘মুসলমান’’ শব্দটি যুক্ত থাকলেও সংগঠনটির কর্ম-তৎপরতা ছিল সমবায়িক। এ কারণে চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বা মোহিতলাল মজুমদারের জন্য রাখাছিল শ্রদ্ধার আসন। চাঁদা কিংবা অন্যান্য সহায়তা দিয়ে যুক্ত ছিলেন অনেক অমুসলিম।

মুসলিম সাহিত্য সমাজ ও ‘শিখা’র পত্রিকার এক দশকের কর্মকাণ্ডে আমরা দেখি, তাদের চাহিদা ও অবস্থান ছিল বিদ্যমান সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় আধিপত্যবাদের বিপরীতে; তাদের প্রত্যাশা ছিল, প্রথমত, সমকাল উপযোগী ও উন্নত শিক্ষা, দ্বিতীয়ত, সম্প্রদায়নিরপেক্ষ মানবিক সমাজ ও সংস্কৃতি, তৃতীয়ত, প্রথা ও সংস্কারশাসিত সমাজের সামগ্রিক মুক্তি।

কাদের জন্য এই প্রত্যাশা? বাঙালি মুসলমান—যে মুসলমান অখণ্ড বঙ্গের, কিন্তু বিশেষভাবে পূর্ববঙ্গের। কেননা পূর্ববঙ্গে তো বটেই, অখণ্ড বঙ্গে তখনও মুসলমানই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী। বাঙালি মুসলমান বললে কার্যত পূর্ববঙ্গের মুসলমানই প্রধান হয়ে ওঠে। কিন্তু এই প্রাধান্য সত্ত্বেও বাঙালির সামগ্রিক ইতিহাসে ‘মুসলমান’ একটি অধস্তন বর্গ হিসেবেই গড়ে উঠেছিল। মুসলমান সাহিত্য সমাজের সদস্যরা এই বর্গকে খুব ভালো করেই চিনতেন। আর তাই তারা এও বুঝেছিলেন কলকাতায় একটি ‘সওগাত’, ‘মোহাম্মদী’ গড়ে পূর্ববঙ্গের অধস্তনতাকে ঘোচানো যাবে না।

ঢাকার বিপরীতে কলকাতা ছিল সে কালের কেন্দ্রীয় শহর, রাজধানী হলে যা হয়; ছিল ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির শহর। পূর্ববঙ্গের বড়ো বড়ো কবিলেখকরা কলকাতায়ই আস্তানা গেঁড়েছিলেন। ‘শিখা’র লেখকেরা ঢাকায় বানালেন নতুন আস্তানা। এই ঢাকায়ই ‘শিখা’র সমকালে ১৯২৭ সালে বুদ্ধদেব বসুরা করেছিলেন ‘প্রগতি’র মতো পত্রিকা। আমরা দেখব, বাংলা সাহিত্যের আধুনিকায়নের ইতিহাসে ‘প্রগতি’র যতো নামডাক, ‘শিখা’ ঠিক ততোখানিই দূরগ্রহের কোনো সাময়িকী। ভাবতে ইচ্ছে হয়, সামাজিক যে আধুনিকায়ন ‘শিখা’র লেখকেরা চাইলেন তার সঙ্গে কি ফারাক ছিল ‘প্রগতি’-পন্থীদের? কোথাও কোথাও কোনোখানে কেন তাদের দেখা গেল না একই পটভূমিকায়?

আদতে ‘শিখা’ চেয়েছিল উদারমানবিক রেনেসাঁসীয় আধুনিকতার দেশীয় সংস্করণ; ‘প্রগতি’ চেয়েছিল সাহিত্যের পশ্চিম-অনুসারী নিরীক্ষা ও আধুনিকায়ন—সমাজের প্রতি দায়বোধ যার মুখ্য শর্ত নয়। ‘প্রগতি’ খুঁজেছে সেই পশ্চিম, রেনেসাঁস-শিল্পবিপ্লব পেরিয়ে যে পশ্চিম এরইমধ্যে পৌঁছে গেছে আধুনিকতাবাদের চূড়ায়। ‘শিল্পের জন্য শিল্প’—এই প্রণোদনার ভেতর হয়তো ‘শিখা’ কোনো সংবেদনাই খুঁজে পায় নি। সম্ভবত বাঙালি মুসলমানের জন্য এই এক নিয়তি—শিল্পের জন্যে লড়াই করার আগে যাদের দীর্ঘসময় লেগে গেছে রুটি ও রুজির সংগ্রামে। আর তাই তারা যত সহজে ক্ষুধা চিনেছে ততো সহজে শিল্পের শিল্পত্বকে চেনে নি। তবে যখন চিনেছে তখন আনতে চেয়েছে শিল্প ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ভারসাম্য। অবশ্য সে ক্ষেত্রেও অনেক দেরি হয়ে গেছে।

উনিশ শতকের কায়কোবাদ, মীর মশাররফ হোসেনকে বাদ দিলে বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যিক অস্তিত্ব শোকসভার মতোই কৃষ্ণবর্ণ। এমনকি সামাজিক তর্ক-প্রতর্কে অংশ নেয়ার মতো লোকও নেই। মুসলিম সমাজকে তাই মেনে নিতে হয়েছিল যে, ইংরেজি শিক্ষার সঙ্গে দূরত্ব বাঙালি মুসলমানের পিছিয়ে পড়ার বড় একটা কারণ। যাদের সঙ্গে চাকরিবাকরি আর বিদ্যাবুদ্ধির লড়াই তারা—অগ্রসর ব্রাহ্ম-হিন্দুসমাজ ততদিনে সাহিত্যিক আধুনিকতার নতুন নিরীক্ষার কথা ভাবছে। উনিশ শতকের একশো বছরজুড়ে তারা দেখে ফেলেছে হিন্দু কলেজ, সংস্কৃত কলেজ, বেথুন কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান; তারা হরেদরে পত্রিকা ছেপেছে, বই লিখেছে, সভা-সমিতি বানিয়ে সমাজে বৌদ্ধিক ও সাহিত্যিক সংস্কৃতি সৃষ্টিতে দক্ষ হয়ে উঠেছে। কলকাতাকে আশ্রয় করেই গড়ে উঠেছে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ (১৮৯৩), যার আদলে বঙ্গীয় মুসলামান সাহিত্য সমিতি (১৯১১) গড়ে উঠতেও সময় লেগেছে বাড়তি দেড় দশক—তাও আবার কলকাতায়।

‘শিখা’র প্রতিভূরা মূলত নতুন এক ‘রেনেসাঁ’র আয়োজনে মিলিত হয়েছিলেন। বাংলা অঞ্চলে রেনেসাঁ ঘটুক আর না-ই ঘটুক, ‘শিখা’র মাধ্যমে বাঙালি মুসলমান তরুণেরা উজ্জীবনের স্বপ্ন দেখেছিল। তারা দাঁড়িয়েছিল উদারনীতি ও মানবিকতাবাদের ভিত্তিভূমিতে।

সেই সময়, ঢাকা বা পূর্ববঙ্গের জন্য ইতিহাসে রক্ষিত আছে কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’, কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের ‘কবিতাকুসুমাবলী’, কালীপ্রসন্ন ঘোষের ‘বান্ধব’ । কিন্তু যে সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী বাংলার অর্থনীতির প্রাণভোমরা তাদের কোনো সাংস্কৃতিক প্রকাশ নেই—মানে স্বাক্ষর সংস্কৃতির কোনো তৎপরতা নেই। যা আছে, তা হলো কথ্য-ঐতিহ্য আর পুঁথি সাহিত্যের প্রতাপ। অন্যদিকে তখন কলকাতার আধুনিকতা ততদিনে ইউরোপের অভিসারী হয়ে দাঁড়াতে চাইছে নানা রকম বাঁক-বিভঙ্গের মোড়ে। ঢাকায় তখনও একটা মজবুত ভিত্তির সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠানই নেই। ‘শিখা’ সেই শূন্যতাকে পূর্ণ করতে চেয়েছিল। সে কারণেই মুসলিম সাহিত্য সমাজকে বলা চলে পূর্ববঙ্গীয় বাঙালি মুসলমানের আধুনিকায়নের এক শহুরে উদ্যোগ।

প্রশ্ন জাগে, মুসলিম সাহিত্য সমাজ অথবা ‘শিখা’ কি তাহলে উপনিবেশিত মনের প্রকাশ? বাস্তব কারণেই মানতে হবে, এই সংগঠন শুধু নয়, পুরো বাংলাই ছিল ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির অধীন, এর ওপরই প্রতিষ্ঠিত বাংলার শিক্ষার প্রধান আর মান্য কাঠামো। ‘শিখা’ স্রষ্টারা তাহলে যাবেন কোথায়? উপনিবেশিত অবশিষ্ট পৃথিবীর মতোই মুসলিম সাহিত্য সমাজকে বেছে নিতে হয়েছে সংকরায়নের পথ; দেশজের প্রতি টান আর পশ্চিমের আহ্বান—দুইয়ের মধ্যে টানতে হয়েছে অলিখিত সমঝোতা। বিকল্প ছিল আরব-পারস্যের জ্ঞান, শিল্প আর মাদ্রাসা শিক্ষা। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে বাংলা অঞ্চলে সেই বিদ্যাজগতের রূপান্তর ঘটেছিল কিছুটা কমই। বাস্তবতার এই টানাপোড়েনে ‘শিখা’ তাই সাড়া দিয়েছিল সমকালের আহ্বানে, অর্থাৎ পশ্চিম প্রভাবিত বিদ্যা ও জ্ঞানশাস্ত্রের প্রতি। আর এই জ্ঞানের চর্চাকেই তারা বুঝেছেন বুদ্ধির মুক্তি হিসেবে। ‘শিখা'র লেখায় মনে করিয়ে দেয়া হয়েছে ইউরোপীয় রেনেসাঁসের সেই ইতিহাস, যেখানে ইউরোপ নিরন্তর দাতামাত্রা নয়, গ্রহীতাও; স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে ইসলাম ও মুসলমানের দানের কথা, ‘মধ্যযুগে একমাত্র মুসলমানরাই পৃথিবীর সভ্যতা ও কালচার (culture) কে জীবিত রেখেছিল এবং তা'দেরি সাহিত্য, কলা দর্শন বিজ্ঞানের চর্চ্চা ও আবিষ্কার ইউরোপে Renaissance-এর যুগ আনয়ন করেছিল। বাস্তবিক Reason-এর আলোকসম্পাতে উজ্জ্বল করে ধরা, বুদ্ধির কুঞ্জি নিয়ে তার মর্ম্মকোষ থেকে নব নব আবিষ্কারের মণি আহরণ করাই ছিল তৎকালীন মুসলমানের আকুল স্পৃহা।’

যে বাংলাদেশকে আমরা আধুনিক, প্রগতিশীল, সম্প্রদায়নিরপেক্ষতার অবয়বে চিনেছি তার আদিসূত্র মূলত মুসলিম সাহিত্য সমাজ। এর সঙ্গে যুক্ত কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহের হোসেন, আবুল ফজল, মোতাহের হোসেন চৌধুরীর কাজ আমাদের সামনে অক্ষয় সাক্ষ্য। বাঙালি মুসলমানের ইনসাফের প্রশ্নে তারা অবিচল, বাঙালির জাতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রশ্নে তারা দ্বন্দ্বহীন। ধর্মের বাণী মর্মে নিয়েই তাঁরা মুসলামানের সংগীত ও চিত্রকলার কথা ভেবেছেন। অগ্রসর মুসলমানদের অনেকেই এই ভাবনাগুলোর প্রতি সহমর্মী হয়ে উঠেছেন। ফলে অবাক হওয়ার সুযোগ নেই এই ভেবে যে, কাজী নজরুল ইসলাম ধর্মের ভাবকে দিয়েছেন সংগীতের সুর। কিন্তু আজ?

গত দেড় বছরে বহুবার বাউলদের ওপর হামলা করা হয়েছে, ভাঙা হয়েছে সাংস্কৃতিক সংগঠনের কেন্দ্র, বই পুড়িয়ে ভস্মীভূত করা হয়েছে, রাস্তায় প্রকাশ্যে গাছে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছে মানুষ। কোন আধুনিকতা, প্রগতি কিংবা জ্ঞানতত্ত্ব এসব সমর্থন করে? পূর্ববাংলা বা ঢাকার পূর্বসূরি সামাজিক সত্তা হিসেবে মুসলিম সাহিত্য সমাজ কি এই ধরনের সমাজের কথা দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পেরেছিল?

সম্ভবত না। তার প্রমাণ রেখে গেছেন ‘শিখা’ সঙ্গীরা। তারা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন কী করে মুসলমান ও ইসলাম বাংলা অঞ্চলের সমাজ ও সংস্কৃতিকে বদলে দিয়েছে, বাংলা ভাষার পরিগঠনের সঙ্গে কী করে মিশে আছে ইসলাম ও মুসলমানের উপাদান, বাউল বা অন্যান্য লোকায়ত ধর্মমতের ওপর ইসলাম কতখানি প্রভাবক উপাদান হিসেবে কাজ করেছে। মুসলিম সাহিত্য সমাজ দেখিয়েছে সম্প্রদায়গত পরিচয় নিয়েই রচিত হতে পারে সম্পর্কের সেতুবন্ধন।

ইতিহাসের এইসব অক্ষয় তথ্য জানিয়ে তারা গড়তে চেয়েছিলেন গ্রহণমনস্ক এক সমাজ। ধর্ম আর সম্প্রদায়ের দোহাই দিয়ে হত্যা বা ধ্বংস নয়, চেয়েছিলেন অগ্রসর মানসিকতার সমাজ। আর তাই, এ কথা বলতেই হয় পূর্ববাংলা বা বাংলাদেশের সম্প্রদায়নিরপেক্ষ আধুনিক সমাজদৃষ্টি আজ, কাল অথবা পরশুর গল্প নয়। বায়ান্ন কিংবা একাত্তরের জাগরণের ভেতর দিয়েই এর জন্ম ঘটে নি। পূর্ববাংলার চিন্তার আধুনিকায়নের এই ইতিহাসে মুসলিম সাহিত্য সমাজ বড় একটি স্তম্ভ।

আজকের, এই মুহূর্তের বাংলাদেশ কি মুসলিম সাহিত্য সমাজের চিন্তার ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে? নাকি, শতবর্ষের উজ্জ্বল আলোর নিচে জমে আছে অন্ধকারের কুহক? জবাব খুঁজতে, পূর্ববাংলা কিংবা বাংলাদেশের আত্মপরিচয় অনুসন্ধানীরা নিশ্চয়ই ‘শিখা’র পাতাগুলো উল্টে দেখবেন।

Ad 300x250

সম্পর্কিত