leadT1ad

স্ত্রীদের চোখে জল বনাম ৫০১ উদযাপন

স্ট্রিম গ্রাফিক

একজন নারী কখন সবচেয়ে নিঃশব্দে কাঁদেন? যখন প্রতারণাটা বোঝার ভাষা থাকে না, অভিযোগ করার জায়গা থাকে না, আর সংসারটা টিকিয়ে রাখার দায় থেকেও মুক্তি নেই। যখন তিনি জানতে পারেন যাঁকে একমাত্র ভেবে এসেছেন এত বছর, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো উৎসর্গ করেছেন, তিনি আসলে গোপনে আরেকটি সংসার পেতে রেখেছেন। কাগজ নেই, সামাজিক স্বীকৃতি নেই, প্রতিবেশী জানে না, আত্মীয়স্বজন জানে না। শুধু আছে একটি দাবি, ‘এটা শরিয়তসম্মত।’ সেই নারী তখন কোথায় যাবেন? আদালতে গেলে প্রমাণ নেই। পরিবারকে বললে লজ্জা। প্রতিবাদ করলে সংসার ভাঙার ভয়। আর চুপ থাকলে প্রতিদিন একটু একটু করে নিজের ভেতরটা ভেঙে পড়ে।

আলোচিত রিসোর্টকাণ্ড নিয়ে হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হক ফেসবুকে একটি দীর্ঘ পোস্ট করেছেন। শিরোনাম ‘৫০১ ফ্যাসিবাদী হাসিনার ব্যর্থ প্রজেক্ট।’ পোস্টে তিনি ২০২১ সালের ৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের রয়েল রিসোর্টের ৫০১ নম্বর কক্ষে তাঁর বিরুদ্ধে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় অভিযানকে হাসিনা সরকারের ‘ব্যর্থ ষড়যন্ত্র’ হিসেবে উপস্থাপন করে ‘৫০১’ সংখ্যাটিকে নিজের ‘বিজয়ের প্রতীক’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। রাষ্ট্রযন্ত্র সেদিন কী করেছিল, তা নিয়ে আলাদা প্রশ্ন তোলা যায়। কিন্তু উদযাপনের এই ঘোষণা আরও অনেক প্রশ্নের দরজা খুলে দিয়েছে।

২০২১ সালের ৩ এপ্রিলের মাত্র একদিন আগেও সারা দেশে মোদীবিরোধী আন্দোলন চলছিল। সেই আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯ মার্চ। চলেছিল ২ এপ্রিল পর্যন্ত। মাঝে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশে এসে নির্দিষ্ট কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ফেরতও যান। এই সময়গুলোতে হাটহাজারীতে পুলিশের গুলিতে মানুষ মরেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জ্বলেছে। এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন মামুনুল হক নিজেই। তাঁর বক্তৃতায়, ডাকে মানুষ পথে নেমেছিল। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্বের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে’ (বুখারি ও মুসলিম)। আন্দোলনের শেষ দিনের পরদিনই যখন সেই নেতা রিসোর্টে, তখন নেতৃত্বের আমানতের প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে।

কিন্তু পোস্টে কেবল সেই পুরোনো ঘটনার স্মৃতি জাগিয়ে দেয়নি, নতুন একটি বিপদও সামনে এনেছে। মামুনুল হক প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন যে ওই নারীর সঙ্গে তার শরিয়তসম্মত বিয়ে হয়েছিল। বিয়েটি গোপন, কারণ পরিবারকে জানানো ‘কঠিন ছিল।’ এই স্বীকারোক্তির ভেতরে যে কথাটি আছে তা হলো— প্রথম স্ত্রী জানতেন না। বছরের পর বছর জানতেন না। এটিকে শুধু ব্যক্তিগত বিষয় বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ এই ঘটনাকে তিনি এখন বিজয় হিসেবে উদযাপনের ঘোষণা করেছেন। তাঁর লক্ষাধিক অনুসারী সেই উদযাপনে অংশগ্রহণের জন্য মুখিয়ে আছে।

ইসলামে একাধিক বিয়ে বৈধ। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সা. স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘তোমরা বিয়ের কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করো… দফ বাজাও।’ (আহমাদ, তিরমিজি) ইমাম মালিক রহ. থেকে শুরু করে শাফেয়ি ও হাম্বলি মাযহাব পর্যন্ত সবাই বিয়ে প্রকাশ্য করাকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে গণ্য করেছেন। বিয়ে গোপন রাখা কেন অনুচিত? কারণ, বিয়ে কেবল দুজন মানুষের চুক্তি নয়। এটি একটি সামাজিক স্বীকৃতি। সন্তানের পরিচয়, ভরণপোষণের অধিকার, উত্তরাধিকার, এই সবকিছুর ভিত্তি হলো বিয়ের প্রকাশ্যতা। যেখানে সেটি নেই, সেখানে সুরক্ষাও নেই।

মামুনুল হক নিজেই স্বীকার করেছেন, প্রথম স্ত্রীকে তিনি সত্য বলেননি, দ্বিতীয় স্ত্রীর পরিচয় দিতে গিয়ে পুরোনো পরিচয় ব্যবহার করেছেন। আল্লাহ তাআলা সূরা নিসায় বলেছেন, একাধিক বিয়েতে ন্যায়বিচার করতে না পারার আশঙ্কা থাকলে একজনেই সীমাবদ্ধ থাকো। (সূরা নিসা: ৩) ন্যায়বিচারের সংজ্ঞা কেবল সমান খোরপোশ নয়। সততা এবং স্বচ্ছতাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। একজন শায়খুল হাদিস যখন নিজের জীবনে এই মানদণ্ড রাখতে পারেন না, তখন প্রশ্নটা কেবল তাঁকে নিয়ে থাকে না। যে মানুষগুলো তাঁর কাছ থেকে তাকওয়া ও সততার শিক্ষা গ্রহণ করেন, তাদের নিয়েও হয়।

৫০১ যদি সত্যিই বিজয়ের প্রতীক হয়, তাহলে সেই বিজয়ের উদযাপনে যেন প্রথম স্ত্রীর নিঃশব্দ কান্নার কথাটুকুও থাকে।

ফেসবুকের সেই পোস্টে আরও একটি উদ্বেগজনক বিষয় উঠে এসেছে। মামুনুল হক আম্মাজান হজরত আয়েশা রা.-এর বিরুদ্ধে মুনাফিকদের অপবাদের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনেছেন। তিনি বলেছেন সরাসরি তুলনা করছেন না, তবে অনুপ্রেরণা নিচ্ছেন। কিন্তু একটু ভাবা দরকার। সেই ঘটনায় আল্লাহ তাআলা নিজে ওহীর মাধ্যমে সূরা নূরে হজরত আয়েশা রা.-এর পবিত্রতার ঘোষণা দিয়েছেন। সেটি চূড়ান্ত, কিয়ামত পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত এবং সন্দেহের ঊর্ধ্বে। এটি ওহীনির্ভর ফয়সালা। সমকালীন কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিচার হয় সাক্ষ্য, বিবেক ও আইনি প্রক্রিয়ায় এবং কখনো সময়ের হাতে ছেড়ে দিয়ে। এই দুটি ঘটনার মর্যাদা ও বিচারপদ্ধতির মধ্যে যে অসীম ব্যবধান, তা অস্বীকার করলে ইসলামের জ্ঞানতাত্ত্বিক শ্রেণিবিন্যাস সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

যে প্রশ্নটি বেশি জরুরি তা হলো সমাজের ওপর এই ঘটনার প্রভাব। মামুনুল হকের মতো একজন শীর্ষ ধর্মীয় নেতা যখন গোপন ও কাগজপত্রহীন বিয়েকে প্রকাশ্যে ‘শরিয়তসম্মত’ বলেন এবং সেটিকে উদযাপনের ঘোষণা দেন, তখন এই প্রবণতাকে বৃহৎভাবে সামাজিক বৈধতা দেওয়া হয়। বিশেষত তার লক্ষাধিক ভক্ত ও অনুসারীর মধ্যে এই বার্তা যাবে যে, বড় আলেম এটা করেছেন, তাহলে আমিও করতে পারি। এই প্রবণতা তখন মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়তে পারে। কাগজ নেই, সাক্ষী নেই, প্রথম স্ত্রী জানেন না অথচ দাবি আছে ‘ইসলামি বিয়ে।’ তখন এই চক্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন হুজুর পরিবারের নারীরা।

তাই যাঁরা আগামীতে কন্যা বা বোনের বিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন, তাঁদের প্রতি একটি কথা বলা দরকার। গোপন ও কাগজপত্রহীন বিয়েকে যে মতাদর্শ বৈধতা দেয়, সেই মতাদর্শের অনুসারীদের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপনে সতর্কতা জরুরি। কারণ মামুনুল হক যে ধারাকে প্রকাশ্য স্বীকৃতি দিলেন, সেই ধারায় আপনার বোন বা কন্যা একদিন হয়তো জানতে পারবেন যে তিনি ‘দ্বিতীয়’ ছিলেন বা দ্বিতীয় একজনও আছেন। আর তা আইনি কোনো সুরক্ষা ছাড়া, সামাজিক কোনো স্বীকৃতি ছাড়া।

মামুনুল হকের সঙ্গে রাষ্ট্র সেদিন যা করেছিল, তা নিয়ে আলাদা প্রশ্ন থাকতে পারে। ব্যক্তির প্রাইভেসিতে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ, মিডিয়া ট্রায়াল, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কারো ব্যক্তিজীবন ব্যবহার নিন্দনীয়। সে বিষয়ে সোচ্চার থাকা দরকার। কোনো নাগরিকের ব্যক্তিগত জীবনে রাষ্ট্রের অবৈধ অনুপ্রবেশকে সমর্থন করা যায় না। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে রাষ্ট্রের অন্যায় একজন ধর্মীয় নেতার নৈতিক দায়িত্বকে ঢেকে দিতে পারে না। দুটো প্রশ্ন পাশাপাশি থাকতে পারে। একটি আরেকটিকে বাতিল করে না। রাষ্ট্র যদি সীমা লঙ্ঘন করে থাকে তাহলে তার সমালোচনা হবে। আবার একজন আলেম, একজন শায়খুল হাদিস ও লাখো মানুষের অনুসরণীয় নেতা যদি নিজের ব্যক্তিগত জীবনে এমন কিছু করে থাকেন যা সমাজে বিভ্রান্তিকর বার্তা দেয়, সেটিও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না।

৫০১ যদি সত্যিই বিজয়ের প্রতীক হয়, তাহলে সেই বিজয়ের উদযাপনে যেন প্রথম স্ত্রীর নিঃশব্দ কান্নার কথাটুকুও থাকে।

লেখক: সাংবাদিক

Ad 300x250

সম্পর্কিত