অপমান থেকে উত্থান: দিল্লির মসনদে কাঁপন ধরাচ্ছে ‘তেলাপোকা রাজনীতি’

লেখা:
লেখা:
উদয় চন্দ্র

প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০২৬, ১৭: ৩২
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

ভারতে ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ বা সিজেপি ভাইরাল হয়েছে দুই মাস হলো। তবে এর অনুসারীরা এখন বেশ কঠিন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন।

শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক টানা ২১ দিন ধরে অনশন করছিলেন। দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপির অবস্থান কর্মসূচি থেকে পুলিশ তাকে জোর করে তুলে হাসপাতালে পাঠিয়েছে। তবে বিক্ষোভকারীরা এখনো মাঠ ছাড়েননি। এদিকে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকেও নিজের অনশন শুরু করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস নিয়ে সারা ভারতেই এখন তীব্র ক্ষোভ। জবাবদিহির চরম অভাবে ভারতের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এর প্রতিবাদে সোমবার ভারতের পার্লামেন্টের দিকে পদযাত্রা করার কথা বিক্ষোভকারীদের। তাদের দাবি, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হবে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগের দাবিও উঠেছে।

গত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে সিজেপি-র আত্মপ্রকাশ ঘটে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বেকার যুবকদের ‘তেলাপোকা’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। এতে সারা দেশে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এরপর থেকেই তরুণদের মধ্যে এই দল (ককরোচ জনতা পার্টি) অনলাইনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। রাস্তায় নেমে বিশাল সব আন্দোলনও করে তারা।

এই রাজনীতি কোনো বিপ্লব নয়, বরং এক করুণ ট্র্যাজেডি। কারণ এই ‘তেলাপোকা’ এমন এক ভারতের প্রতীক, যেখানে তরুণদের বড় হওয়ার স্বপ্নগুলো প্রতিদিন মাটিতে মিশে যাচ্ছে।

আগে সরকার এদের খুব একটা পাত্তা দেয়নি। তারা ভেবেছিল, নির্দিষ্ট জায়গায় আন্দোলন করতে দিলে একসময় এরা নিজেরাই ভেঙে পড়বে। কিন্তু শনিবারের পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। মনে হচ্ছে, সিজেপি এখন ক্ষমতাসীনদের ভয় ধরিয়ে দিয়েছে।

একে আর শুধু সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরাল ট্রেন্ড বা সাময়িক কোনো ব্যঙ্গাত্মক বিষয় ভাবার সুযোগ নেই। সমাজের বিশাল এক অংশের মনের চাপা কষ্টগুলোই যেন এই ‘তেলাপোকা’র মাধ্যমে বেরিয়ে এসেছে।

কাউকে ‘তেলাপোকা’ বলার মানে হলো— সে নোংরা, অপ্রয়োজনীয় এবং তাকে চোখের আড়ালে রাখাই ভালো। তেলাপোকাকে সবাই ঘৃণা করে। তবে একে সহজে মারা যায় না। ভদ্র সমাজের আড়ালেই এরা বাঁচে। বেকারত্ব, প্রশ্নফাঁস এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির যাঁতাকলে পিষ্ট তরুণরা এই অপমানের মধ্যেই নিজেদের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেয়েছে। তারা এই অপমানকেই নিজেদের ব্যাজ হিসেবে লুফে নিয়েছে।

এই রাজনীতি কোনো বিপ্লব নয়, বরং এক করুণ ট্র্যাজেডি। কারণ এই ‘তেলাপোকা’ এমন এক ভারতের প্রতীক, যেখানে তরুণদের বড় হওয়ার স্বপ্নগুলো প্রতিদিন মাটিতে মিশে যাচ্ছে।

‘তেলাপোকা রাজনীতি’ এমন এক সময়ে সামনে এলো যখন মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বেশ শক্তিশালী। তাদের হাতে অঢেল সম্পদ, আদর্শিক শৃঙ্খলা আর ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সালের নির্বাচনে তারা মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ভোটারের সমর্থন পেয়েছে। অর্থাৎ, তিন ভাগের দুই ভাগ মানুষই মোদির সরকারকে চায়নি। তারপরেও আঞ্চলিক জোট আর বিরোধীদের ভাঙনের সুযোগে তারা ক্ষমতায় টিকে আছে। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের গণতান্ত্রিক পথগুলো— যেমন দল, নির্বাচন, মিডিয়া বা স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো— এখন আর বিশ্বাসযোগ্য নেই। তরুণদের চোখে তাই পুরো ব্যবস্থাটাই দুর্নীতিগ্রস্ত।

মানুষের কণ্ঠ যখন রোধ করা হয়, তখন এভাবেই ব্যঙ্গের মাধ্যমে গণতন্ত্র বেঁচে থাকে। সংগঠিত রাজনীতি যখন ঝুঁকিপূর্ণ, তখন ‘মিম’ হয়ে ওঠে প্রতিবাদের হাতিয়ার। এই অন্ধকার সময়ে হাসতে পারাই যেন সাহসের শেষ রূপ।

এবার অর্থনীতির কথায় আসা যাক। করোনা মহামারির পর ভারতের প্রায় ৮০ কোটি মানুষ সরকারি ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল। এতে বোঝা যায়, মানুষের অর্থনৈতিক ভিত্তি কতটা নড়বড়ে। অন্যদিকে, দেশের সম্পদের পাহাড় জমছে মাত্র ১ শতাংশ ধনীর হাতে। মাঝখান থেকে পিষ্ট হচ্ছে মধ্যবিত্তরা। প্রবৃদ্ধি হলেও কর্মসংস্থান বাড়ছে না।

দেশটিতে শিক্ষিতের হার বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই তুলনায় সম্মানজনক চাকরি তৈরি হয়নি। তরুণদের স্বপ্ন দেখতে শেখানো হয়েছে, কিন্তু অর্থনীতি তাদের শুধু হতাশাই উপহার দিচ্ছে।

এ কারণেই প্রশ্নফাঁস বা নিয়োগে দেরি হলে তরুণরা এত ক্ষুব্ধ হয়। মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে একটি পরীক্ষা শুধু পরীক্ষা নয়, এটি তাদের ভাগ্য বদলের বাজি। একটু ভালো চাকরির আশায় বাবা-মা ধারদেনা করে, জমি বিক্রি করে সন্তানদের কোচিংয়ে পড়ান। তাই প্রশ্ন যখন ফাঁস হয়, তখন সেটি লাখো পরিবারের আত্মত্যাগের সাথে বেইমানি করার শামিল।

তেলাপোকা প্রতীকটি তাই ভীষণ অর্থবহ। এটি সেই বেকার গ্র্যাজুয়েট, হতাশ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা নিরাপত্তাহীন চুক্তিভিত্তিক কর্মীর কথা বলে। এই তেলাপোকা হলো সেই নাগরিক, যে কোনো সম্মান ছাড়াই শুধু টিকে থাকার লড়াই করে যাচ্ছে।

মোদি সরকার হয়তো নির্বাচনে জেতার কৌশল রপ্ত করেছে, কিন্তু সামাজিক বৈষম্য দূর করতে পারেনি। যারা উত্তরাধিকার সূত্রে ধনী নয়, যাদের পুঁজি নেই, তাদের ভবিষ্যৎ কী? এই প্রশ্নের উত্তর মোদি সরকারের কাছে নেই।

তেলাপোকা প্রতীকটি ভীষণ অর্থবহ। এটি সেই বেকার গ্র্যাজুয়েট, হতাশ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা নিরাপত্তাহীন চুক্তিভিত্তিক কর্মীর কথা বলে। এই তেলাপোকা হলো সেই নাগরিক, যে কোনো সম্মান ছাড়াই শুধু টিকে থাকার লড়াই করে যাচ্ছে।

সত্যি বলতে, সিজেপি-ও এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না। কারণ তারাও বেশ ভঙ্গুর। তবে এই দলটির আত্মপ্রকাশ প্রমাণ করে যে, পুরোনো রাজনীতির ভাষা এখন অচল। একটি নিছক রসিকতা বা জোকস যখন এত দূর গড়ায়, তখন বুঝতে হবে সমাজের ভেতরে গভীর কোনো অসুখ লুকিয়ে আছে।

এটাই তেলাপোকা রাজনীতির মূল কথা। মানুষের কণ্ঠ যখন রোধ করা হয়, তখন এভাবেই ব্যঙ্গের মাধ্যমে গণতন্ত্র বেঁচে থাকে। সংগঠিত রাজনীতি যখন ঝুঁকিপূর্ণ, তখন ‘মিম’ হয়ে ওঠে প্রতিবাদের হাতিয়ার। এই অন্ধকার সময়ে হাসতে পারাই যেন সাহসের শেষ রূপ।

দিন শেষে, তেলাপোকা কোনো বিপ্লবী বীর নয়। এটি একটি তুচ্ছ প্রাণী মাত্র। তবে বাড়ির মালিক ঘর যতই পরিষ্কার বলে দাবি করুক না কেন, ঘরে ময়লা থাকলেই কেবল তেলাপোকা বাইরে বেরিয়ে আসে।

  • উদয় চন্দ্র: অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক

(লেখাটি আল জাজিরা থেকে ভাষান্তর করেছেন মুজাহিদুল ইসলাম)

Ad 300x250

সম্পর্কিত