একটি মুক্ত বিশ্ব থেকে আরেকটি মুক্ত বিশ্বের প্রতি জন্মদিনের শুভেচ্ছা

ড. আবদুল্লাহ আল ইউসুফ
ড. আবদুল্লাহ আল ইউসুফ

ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

আমাদের বেছে নেওয়া ছোট পাহাড়ের ঢালটি কানসাসের চিরচেনা ভূপ্রকৃতির মতো নিচের হ্রদে গিয়ে মিশেছিল। শত শত পরিবার—কালো, সাদা, বাদামি ও হলুদ সব রঙের নারী-পুরুষ ও শিশুরা—ওই ‘লিটল রাউন্ড টপ’ (একটি পাহাড়ের নাম) পাহাড়ের ঢালে জড়ো হয়েছিল। সেটি দেখতে মনে হচ্ছিল ছোট্ট এক পৃথিবী।

মুহূর্তের জন্য ১৮৬৩ সালের ২ জুলাই গেটিসবার্গের ‘লিটল রাউন্ড টপ’-এ কী ঘটেছিল সেই চিন্তা আমার মনে পড়ে গেল। কর্নেল জোশুয়া চেম্বারলেনের নেতৃত্বে ‘টুয়েন্টিয়েথ মেইন’ বাহিনীর সফল আক্রমণ গেটিসবার্গের যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। একটি মুক্ত বিশ্ব গঠনের পথে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

তবে কানসাসের সেই জুলাইয়ের সন্ধ্যায় ওই পরিবারগুলো বা শিশুদের গাড়িতে থাকা ছোট বাচ্চারা শত্রুর ওপর আক্রমণ করার জন্য জড়ো হয়নি। সেখানে কোনো শত্রু ছিল না। এটা ঠিক যে হ্রদের ওপারে সারিবদ্ধ ছোট ধাতব টিউবগুলো আসলে ছিল ছোট কামান। সেই কামানগুলো থেকে বারুদের গোলা ছোড়া হচ্ছিল। তবে তা আমাদের দিকে নয়, আকাশের দিকে। এই ঘটনা যেখানে ঘটছিল, তার এপাশে আমরা পপকর্ন ও সোডা নিয়ে আয়েশ করে বসেছিলাম এবং ওপরের আকাশে চমৎকার আতশবাজি দেখছিলাম। স্বাধীনতা দিবস এর আগে কখনো আমাদের কাছে এত আকর্ষণীয় মনে হয়নি। সেটি ছিল ৪ জুলাই, আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস।

নিচের সেই বহুবর্ণ ও বহুজাতিক সমাবেশের মতোই আকাশটিও নানা রঙে জ্বলে উঠেছিল। একটি রং অন্যটিকে আড়াআড়িভাবে কেটে শেষ পর্যন্ত গভীর নীলে মিশে যাচ্ছিল। এখানে নীল মানে হলো সমগ্র মানবজাতির প্রতি ভালোবাসার রং। টুইন টাওয়ারে সেই জঘন্য হামলার ঠিক ৯ মাস পর নিচের ওই বহুজাতিক সমাবেশ এবং আকাশের রঙিন প্রদর্শনীটি এতটাই প্রতীকী ও অনুপ্রেরণাদায়ক মনে হচ্ছিল যে, একই পৃথিবী ভাগ করে নেওয়া এবং একই বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়ার স্পষ্ট বার্তাটি কারও চোখ এড়িয়ে যাওয়ার কথা নয়; যে বাতাসকে আমরা কেউ আর কখনো (বিদ্বেষ দিয়ে) দূষিত করতে চাইব না।

একটি মুক্ত বিশ্বের ধারণা—যেখানে সব জাতি, গোষ্ঠী, ধর্ম ও বিশ্বাসের মিলনমেলা বা ‘মেল্টিং পট’ তৈরি হবে—তা সম্ভবত মাইকেল সারা তার কালজয়ী উপন্যাস ‘কিলার এঞ্জেলস’-এ সবচেয়ে ভালো ফুটিয়ে তুলেছেন। বিদ্রোহীদের উদ্দেশে কর্নেল চেম্বারলেনের সেই ভাষণের কথা মনে আছে? ‘আমরা এমন এক সেনাবাহিনী যারা অন্য মানুষকে মুক্ত করতে বের হয়েছি... এখানে কাউকে মাথা নত করতে হয় না। কেউ রাজপরিবারে জন্ম নেয়নি। এখানে আমরা আপনাকে বিচার করি আপনার কাজ দিয়ে, আপনার বাবা কে ছিলেন তা দিয়ে নয়। এখানে আপনি বিশেষ কিছু হতে পারেন। এখানে ঘর বাঁধার জায়গা আছে। তবে এটি কেবল জমির বিষয় নয়। জমি সবসময়ই পাওয়া যায়। এটি আসলে একটি ধারণা যে আমাদের সবারই মূল্য আছে—আপনার এবং আমার। শেষ পর্যন্ত আমরা যার জন্য লড়ছি, তা হলো আমরা একে অপরের জন্য লড়ছি।’

সমুদ্র এবং শতাব্দীর ব্যবধানে এই মুক্ত বিশ্বের বার্তাটি অন্য এক আশ্রয়ে জায়গা করে নিয়েছিল—এই ছোট বদ্বীপ বাংলাদেশে। শতাব্দীকাল ধরে অনেক পরিব্রাজক এবং ভাগ্যসন্ধানী এই ভূমিতে ভ্রমণ করেছেন এবং চিরস্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য একটি স্বপ্নের গন্তব্য খুঁজে পেয়েছেন। বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের মানুষ কোনো না কোনো সময়ে এই দেশে এসেছে। আরব, মঙ্গোলীয়, রোমান, পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, আর্মেনীয়, আন্দালুসিয়ান, ব্রিটিশ, ইরানি—এমন কোনো জাতি নেই যারা এই চমৎকার দেশে শান্তি খুঁজে পায়নি। আজ তাদের বংশধররা এখানেই আছে, স্থানীয়দের থেকে তাদের আলাদা করা কঠিন। একে অপরের সাথে চিরন্তন বন্ধন তৈরি করে তারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করছে। এটি সত্যিই এক নিখুঁত মিলনমেলা (মেল্টিং পট)।

শতাব্দী আগে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিয়ন নেতারা মুক্ত বিশ্বের যে ধারণা পোষণ করেছিলেন, বাংলাদেশ যেন তার একটি নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। আমরা আমাদের অভিন্ন মূল্যবোধের মাধ্যমে নিজেদের যুক্ত অনুভব করি। আমরা আমেরিকার স্বাধীনতাকে আমাদের নিজেদের স্বাধীনতার মতোই শ্রদ্ধা করি। আমেরিকার এই ২৫০তম জন্মদিনে আমরা আমেরিকানদের প্রতি, মুক্ত বিশ্বের প্রতি এবং আমাদের চিরন্তন বন্ধনের প্রতি শুভকামনা জানাই।

  • ড. আবদুল্লাহ আল ইউসুফ: গবেষণা পরিচালক, ওসমানি সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ
Ad 300x250

সম্পর্কিত