বছরে ২৫ হাজার অগ্নিকাণ্ড: উদাসীনতাই কি বড় ঝুঁকি

লেখা:
লেখা:
আলী আহমেদ খান

প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১২: ০৬
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

প্রতি বছর বাংলাদেশে গড়ে প্রায় ২৫ হাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় জীবন ও সম্পদের প্রাণহানিও ব্যাপক। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে অগ্নিকাণ্ডে মোট ৬৫০ জনের মৃত্যু ও ২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। সবশেষ গত শুক্রবারও (২৪ এপ্রিল) নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় একটি গোডাউনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, এতে ২০টি দোকান পুড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

বিজ্ঞানের ভাষায় আগুন লাগার জন্য প্রধানত তিনটি উপাদানের প্রয়োজন হয়—তাপমাত্রা, অক্সিজেন এবং দাহ্য পদার্থ। এই তিনটির সমন্বয়ে তৈরি হয় ‘ফায়ার ট্রায়াঙ্গেল’। গ্রীষ্মকালে বাতাসে আর্দ্রতা বা জলীয় বাষ্পের পরিমাণ মারাত্মকভাবে কমে যায়। চারপাশ অত্যন্ত শুষ্ক থাকার কারণে এই সময়ে ছোট একটি স্ফুলিঙ্গও খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বড় আগুনের আকার ধারণ করে। কাঠ, পাতা, কাগজ বা অন্যান্য দাহ্য পদার্থগুলো শুষ্ক থাকায় এগুলোর আগুন ধরে যাওয়ার প্রবণতা বা ফ্লেমিবিলিটি বহুগুণ বেড়ে যায়।

কিন্তু শুধু আবহাওয়াকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আগুন লাগার পেছনে আমাদের চরম উদাসীনতাও দায়ী। আমাদের একটি সাধারণ মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা হলো— ‘আমার ঘরে বা কারখানায় হয়তো আগুন লাগবে না’। এই ভ্রান্ত আত্মবিশ্বাসের কারণেই আমরা অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়ে সবচেয়ে বেশি শৈথিল্য প্রদর্শন করি। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে ঘটা অগ্নিকাণ্ডগুলোর প্রায় ৩৫ শতাংশেরই প্রধান কারণ বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট। ভবন বা কারখানাগুলোতে নিম্নমানের তার ও সস্তা বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার, যত্রতত্র উন্মুক্ত তার ফেলে রাখা এবং বছরের পর বছর সেগুলোর কোনো রক্ষণাবেক্ষণ না করাই এর মূল কারণ। এছাড়া বৈদ্যুতিক লাইনগুলো অনেক সময় ওভারলোড হয়ে যায়, যা থেকে শর্টসার্কিট হয়ে আগুনের সূত্রপাত ঘটে।

আগুন লাগার দ্বিতীয় প্রধান কারণ হলো যত্রতত্র বিড়ি-সিগারেটের জ্বলন্ত অবশিষ্টাংশ ছুড়ে ফেলা। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৪ হাজার ৪২৪টি অগ্নিকাণ্ড ঘটছে কেবল এই কারণে, যা মোট অগ্নিকাণ্ডের প্রায় ১৭ শতাংশ। এছাড়া বাসাবাড়ি ও কারখানায় ইদানীং এলপিজি গ্যাসের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। কিন্তু গ্যাসের লাইনের লুজ কানেকশন বা লিকেজ থেকে প্রায় ১৩ শতাংশ অগ্নিকাণ্ড ঘটছে। পাশাপাশি ছোটদের আগুন নিয়ে খেলার কারণেও প্রায় ৩ শতাংশ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়।

আগুন লাগার দ্বিতীয় প্রধান কারণ হলো যত্রতত্র বিড়ি-সিগারেটের জ্বলন্ত অবশিষ্টাংশ ছুড়ে ফেলা। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৪ হাজার ৪২৪টি অগ্নিকাণ্ড ঘটছে কেবল এই কারণে, যা মোট অগ্নিকাণ্ডের প্রায় ১৭ শতাংশ।

শহর এলাকায় জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে আমাদের সচেতনতা ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। আগুন লাগতেই পারে। কিন্তু সেই আগুন যেন বিশাল আকার ধারণ করতে না পারে, তার জন্য প্রাথমিক প্রস্তুতির বড়ই অভাব। যেকোনো অগ্নিকাণ্ডের প্রথম ১০ থেকে ১৫ মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে প্রাথমিক রেসপন্স করা না গেলে আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। কিন্তু আমাদের অধিকাংশ বাসাবাড়ি, কারখানা বা গোডাউনে আগুন নেভানোর পর্যাপ্ত সরঞ্জাম, যেমন- ফায়ার এক্সটিংগুইশার হাতের কাছে থাকে না।

অগ্নিনিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি সর্বজনীন প্রবাদ হলো— ‘সেফটি ইজ এভরিওয়ান’স বিজনেস’। আগুন লাগলে কেবল ফায়ার ব্রিগেডের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। আগুন লাগার পরিবেশটাই যেন তৈরি না হয়, সেদিকে সবার আগে নজর দিতে হবে। বাসাবাড়ি বা কারখানার বৈদ্যুতিক ও গ্যাসের লাইন নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।

পাশাপাশি আগুন লাগলে কোথায় পানি পাওয়া যাবে, ফায়ার এক্সটিংগুইশার কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, কে বৈদ্যুতিক মেইন সুইচ বন্ধ করবে এবং কে গ্যাসের লাইন বন্ধ করবে—এ বিষয়ে পূর্বপরিকল্পনা থাকতে হবে। প্রতিষ্ঠানে বা ভবনে নিয়মিত অগ্নিনির্বাপণ মহড়া বা ফায়ার ড্রিলের আয়োজন করা অত্যাবশ্যক। প্রথম ১০ মিনিট নিজেদেরই আগুনের সঙ্গে লড়াই করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

সবশেষে আসে ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতার প্রসঙ্গ। একথা অনস্বীকার্য যে, ফায়ার সার্ভিসের সরঞ্জাম ও সক্ষমতা আগের চেয়ে বেড়েছে। কিন্তু শহরের পরিধি ও জনসংখ্যা যে হারে বেড়েছে, সে অনুপাতে ফায়ার স্টেশনের সংখ্যা বাড়েনি। এর চেয়েও বড় সমস্যা হলো ‘রেসপন্স টাইম’। সরু রাস্তাঘাট, তীব্র যানজট ও জরুরি সেবার গাড়ি চলাচলের জন্য আলাদা কোনো লেন না থাকায় ফায়ার ব্রিগেডের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়ে যায়। আর এই বিলম্বের কারণে আগুন ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শহর ও শিল্পাঞ্চলগুলোর বিভিন্ন পয়েন্টে ছোট ছোট ‘স্যাটেলাইট ফায়ার স্টেশন’ বা ‘ফায়ার পোস্ট’ স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। এর ফলে ফায়ার সার্ভিসের রেসপন্স টাইম বা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সময় উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। সরকারিভাবে এমন একটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেকটাই কমে আসবে।

আগুন লাগার পর হা-হুতাশ করার চেয়ে আগুন লাগার আগেই সচেতন হওয়া জরুরি। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার মাধ্যমেই কেবল আমরা একটি নিরাপদ সমাজ ও বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারি।

লেখক: বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি)

সম্পর্কিত