সংবিধান: ক্ষত সারানোর শিল্প, ক্ষত তৈরির রাজনীতি নয়

এম এম খালেকুজ্জামান
এম এম খালেকুজ্জামান

স্ট্রিম গ্রাফিক

সংবিধান জাতির সম্মিলিত স্বপ্নের প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা। রাজনীতির ঝড়, ক্ষমতার পালাবদল, জনআকাঙ্ক্ষার উত্থান-পতন এসবের মাঝখানে এই নীরব অক্ষের চারদিকে একটি জাতির রাজনৈতিক বিশ্ব আবর্তিত হয়। সংবিধান কেবল আইনের গ্রন্থ নয়। সংবিধান জাতির স্মৃতি, সংগ্রামের দলিল। ভবিষ্যতের সঙ্গে করা এক নৈতিক চুক্তি।

সংবিধান নিয়ে বিতর্ক মানে কেবল ধারার ভাষ্য নিয়ে মতভেদ নয়। এই তর্ক একইসঙ্গে রাষ্ট্র কোন পথে হাঁটবে তা নিয়ে গভীর আত্মজিজ্ঞাসা। যে জাতি তার সংবিধানকে সুবিধামতো কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের উপকরণ বানায় সে শেষ পর্যন্ত নিজের রাজনৈতিক প্রাণকেই অনিশ্চয়তার হাতে সমর্পণ করে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও সংবিধান ফিরে এসেছে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। রাষ্ট্রের দৈনন্দিন সংকট, অর্থনীতির চাপ, প্রশাসনিক দুর্বলতা কিংবা নাগরিক জীবনের অনিশ্চয়তাকে ছাপিয়ে এখন আলোচনার প্রধান বিষয়—সংবিধান সংশোধন হবে, নাকি সংস্কার? প্রশ্নটি নিছক আইনি নয়। এটি রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন, রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন এবং সর্বোপরি সাংবিধানিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।

চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অভিঘাত বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বদলে দিয়েছে। সেই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় পঞ্চদশ সংশোধনী-সংক্রান্ত আপিল বিভাগের রায় নতুন এক সাংবিধানিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তি মনে করছে যে সংবিধানকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সংশোধন অপরিহার্য। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি বিরোধী দল বলছে, বিচ্ছিন্ন সংশোধন নয়; প্রয়োজন মৌলিক সংস্কার। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—আমরা কি সংবিধানকে পরিমার্জন করতে চাই, নাকি পুনর্নির্মাণ করতে চাই? তবে যাই করা হোক, ক্ষত যেন না হয়।

এই বিতর্কের মধ্যেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে শব্দটি প্রায় অনুপস্থিত, তা হলো—সংযম।

সংবিধান কোনো রাজনৈতিক দলের ইশতেহার নয়। এটি কোনো বিজয়ীর ট্রফিও নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ব্রুস একারমেন এক জায়গায় লিখেছিলেন যে সংবিধান কেবল আইনের দলিল নয়; এটি প্রজন্মের পর প্রজন্মের মধ্যে এক অব্যাহত সংলাপের কাঠামো। সেই সংলাপ যদি প্রতিটি রাজনৈতিক পালাবদলে ভেঙে যায়, তবে সংবিধান তার নৈতিক কর্তৃত্ব হারায়।

বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে এই প্রবণতা নতুন নয়। ১৯৭২ সালের পর থেকে সংবিধান বহুবার পরিবর্তিত হয়েছে। কখনো সামরিক শাসনের বৈধতা দিতে, কখনো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে স্থায়ী করতে, কখনো ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাতে। ফলে সংবিধানকে অনেক সময় রাষ্ট্রের মৌলিক চুক্তির চেয়ে রাজনৈতিক শক্তির কৌশলগত দলিল বলেই মনে হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের একটি শিক্ষা দেয়। আর তা হলো, সংবিধান যতটা পরিবর্তনের দলিল, তার চেয়ে বেশি ধারাবাহিকতার দলিল।

ভারতের সংবিধানের প্রধান স্থপতি ভীমরাও রামজি আম্বেদকার সংবিধান প্রণয়নের সময় সতর্ক করে বলেছিলেন, একটি সংবিধান যত ভালোই হোক না কেন, তার সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে যারা তা পরিচালনা করবে তাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক চরিত্রের ওপর।

বাংলাদেশের বর্তমান বিতর্কে এই সতর্কবাণী বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ সমস্যার সবটাই কি সংবিধানের? নাকি সমস্যার একটি বড় অংশ রাজনৈতিক আচরণে, প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতায় এবং সাংবিধানিক নীতির প্রতি অঙ্গীকারহীনতায়?

আমরা প্রায়ই সংবিধানকে এক জাদুকাঠি হিসেবে দেখি। একটি অনুচ্ছেদ বদলে দিলেই যেন গণতন্ত্র সুদৃঢ় হবে, একটি অনুচ্ছেদ পুনর্লিখন করলেই জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হবে। কিংবা কয়েকটি নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করলেই রাষ্ট্রের সংকট দূর হবে। বাস্তবতা অবশ্য এত সরল নয়। গণতন্ত্রের সংকট অনেক সময় সংবিধানের ভাষায় নয়, তার চর্চায় নিহিত। এটি আমরা ভুলে থাকতে পছন্দ করি।

এখানেই সংশোধন ও সংস্কারের বিতর্ককে নতুন করে দেখা প্রয়োজন। সংশোধন মানে বিদ্যমান কাঠামোর ভেতরে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন। সংস্কার মানে সেই কাঠামোর দর্শন, ভিত্তি বা কার্যকারিতার গভীর পুনর্বিবেচনা। উভয় পথই গণতান্ত্রিক হতে পারে। আবার একই সঙ্গে বিপজ্জনক হতে পারে। সংশোধন বিপজ্জনক হয়ে ওঠে যখন তা দলীয় স্বার্থে ব্যবহৃত হয়। সংস্কার বিপজ্জনক হয়ে ওঠে যখন তা স্থিতিশীলতার ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হলো সাংবিধানিক দোলাচল। আজ একটি রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় এসে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বদলাবে। কাল আরেকটি শক্তি এসে আবার তা পাল্টাবে। এভাবে চলতে থাকলে সংবিধান আর স্থায়ী নোঙর থাকে না। তা পরিণত হয় রাজনৈতিক জোয়ার-ভাটার ভেলায়।

বিশ্বের সফল গণতন্ত্রগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে যে সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা কেবল তার শব্দের জন্য নয়, তার স্থায়িত্বের জন্যও। যুক্তরাষ্ট্রে দুই শতাব্দীর বেশি সময় ধরে একই সংবিধান টিকে আছে। ভারতেও শতাধিক সংশোধন সত্ত্বেও মূল সাংবিধানিক দর্শন অটুট রয়েছে। কারণ তারা বুঝেছে যে সংবিধানকে পরিবর্তন করা যায়, কিন্তু তার প্রতি নাগরিক আস্থা প্রতিষ্ঠা করা যায় না কৃত্রিমভাবে। তা প্রতিষ্ঠা করতে হয়ে সাংবিধানিক সংযমের মাধ্যমে।

বাংলাদেশের বর্তমানে তাই সবচেয়ে প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। ক্ষমতাসীনদের মনে রাখতে হবে, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা সাংবিধানিক প্রজ্ঞার বিকল্প নয়। আবার বিরোধীদেরও উপলব্ধি করতে হবে, প্রতিটি সমস্যার সমাধান বিপ্লবাত্মক সংস্কারে নিহিত নয়। রাষ্ট্র পরিচালনা কখনো কখনো সাহসের চেয়ে সংযম বেশি দাবি করে।

সংবিধানকে নিয়ে আমাদের রাজনৈতিক ভাষা অনেক সময় যুদ্ধের ভাষায় পরিণত হয়— জয় বা পরাজয়, রক্ষা বা ধ্বংস, সংশোধন বা সংস্কার। অথচ সংবিধান মূলত সমঝোতার ভাষা। এটি এমন এক সামাজিক চুক্তি, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকলেও রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি নিয়ে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য থাকে।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘সংযমই শক্তির পরিচয়।’ সাংবিধানিক রাজনীতির ক্ষেত্রেও কথাটি সত্য। যে রাষ্ট্র নিজের সংবিধানকে নিয়ে অস্থির, সে রাষ্ট্র কখনো রাজনৈতিকভাবে স্থির হতে পারে না। আর যে রাজনৈতিক শ্রেণি সংবিধানকে কেবল ক্ষমতার যন্ত্র হিসেবে দেখে, তারা শেষ পর্যন্ত সংবিধানের নয়, নিজেদেরই ক্ষতি করে।

বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সংশোধন হোক কিংবা সংস্কার, যে পথই বেছে নেওয়া হোক না কেন, সেটি হতে হবে অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ, যুক্তিনির্ভর এবং সর্বোপরি সংযমপূর্ণ। কারণ সংবিধানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্নে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব নতুন কিছু লেখা নয়। বড় দায়িত্ব হচ্ছে এমন কিছু করা যা রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে অক্ষুণ্ণ রাখে।

সংবিধান রাষ্ট্রের হৃদস্পন্দন। হৃদযন্ত্রে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু চিকিৎসার নামে অঙ্গচ্ছেদ কখনো কাম্য নয়। বিশ্বের সফল সাংবিধানিক অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের শেখায় যে দীর্ঘস্থায়ী সংবিধান সাধারণত বিপ্লব ও ধারাবাহিকতার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করে। সেখানে পরিবর্তন আসে। সেই পরিবর্তন ধ্বংসাত্মকভাবে নয়, হতে হবে সংস্কারের মাধ্যমে। প্রতিহিংসার ভিত্তিতে নয়; সংশোধনের মাধ্যমে, সমঝোতার মাধ্যমে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার ঔদ্ধত্যে নয়।

আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন কোনো সাংবিধানিক স্লোগান নয়। প্রয়োজন সাংবিধানিক সংযমের সংস্কৃতি। সেই সংস্কৃতি স্বীকার করবে প্রতিপক্ষও রাষ্ট্রের অংশ। যে সংস্কৃতি বুঝবে ক্ষমতার সাময়িক সুবিধার জন্য সংবিধানকে ব্যবহার করা মানে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার বীজ বপন করা। যে সংস্কৃতি উপলব্ধি করবে যে সংবিধান কেবল শাসকদের দলিল নয়, এটি আগামী প্রজন্মেরও সামাজিক চুক্তি।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রীম কোর্ট

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত