টিসিবির লাইনে দেয়ালচাপা: এক দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল

প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১৮: ২৫
টিসিবির পণ্য নিতে আসা মানুষদের জুতা-স্যান্ডেল। দেয়ালধসের পরের দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

দারিদ্র্যের চাপে দীর্ঘ হচ্ছে টিসিবির লাইন। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকের এই সংবাদ শিরোনামের ঠিক ৫ মাস পরে গত ২৮ জুলাই আরেকটি শিরোনাম: রাজধানীতে টিসিবির লাইনে পণ্য কিনতে গিয়ে দেয়াল ধসে দুজনের মৃত্যু। আরেকটি পত্রিকা বলছে: সংসারে সাশ্রয়ের চেষ্টা, শেষ হলো দেয়ালধসে মৃত্যুতে।

ঘটনার দিন বেলা দেড়টার দিকে টিসিবির পণ্য নিতে অপেক্ষমাণ মানুষের ওপর মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের পেছনের দেয়ালটি ভেঙে পড়ে। এতে দুজন নিহত আর অন্তত আটজন আহত হন। স্থানীয়দের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, দেয়ালের ভেতরে কোনো বিম বা কলাম ছিল না। পুরোনো দেয়ালটি ছিল শুধু ইট দিয়ে তৈরি।

ঘটনায় নিহতদের একজন নাসিমা বেগম (৪৪) । রাজধানীর ইউসেপ মিরপুর টেকনিক্যাল স্কুলে কাজ করতেন। যা বেতন পেতেন, তা দিয়ে তার ছোট মেয়ের লেখাপড়ার খরচ জোগানোসহ সংসার চালাতে কষ্ট হতো। কিছুটা সাশ্রয়ের আশায় টিসিবির পণ্য কিনতে গিয়েছিলেন। কিন্তু পণ্য নিয়ে বাসায় ফেরা হয়নি। মৃত্যু হয় দেয়াল ধসে।

রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন সরকারি সংস্থা টিসিবির পণ্যবাহী ট্রাকের পেছনে মানুষের লম্বা লাইন দেখা যায়। সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে মানুষের কথাবার্তা শুনলে দেশের অর্থনীতির একটা মোটামুটি চিত্র পাওয়া যায়। বলা হয় যে দেশের অর্থনীতির অবস্থা যত খারাপ হবে, টিসিবির লাইন তত দীর্ঘ হবে। মানুষের আয় কমে গেলে তারা তুলনামূলক কম দামে কিছু পণ্য কেনার জন্য এই লাইনে দাঁড়িয়ে যায়।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় ডাব-বিক্রেতা মো. শাকিলের সঙ্গে কথা বলছিলেন একটি ইংরেজি দৈনিকের রিপোর্টার। শাকিল তাকে জানান, টিসিবির এই প্যাকেজের জন্য তাকে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। এই সময়ে তার ডাবের দোকান বন্ধ ছিল। ফলে তার লোকসান হয়েছে। তবুও তিনি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন। কারণ শেষ পর্যন্ত প্যাকেজটি পেয়েছেন।

ট্রাক সেল কর্মসূচির আওতায় সাধারণত সয়াবিন তেল, মসুর ডাল ও চিনি বিক্রি করা হয় বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে। তবে রোজার মাসে পণ্যের তালিকায় খেজুর ও ছোলা যুক্ত হয়। কখনো পেঁয়াজও বিক্রি হয়। যেকোনো নাগরিক টিসিবির এই ট্রাক থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য কিনতে পারেন। তবে টাকা থাকলেই যে কেউ নিজের ইচ্ছেমতো পণ্য কেনার সুযোগ পাবেন না। সরকার মূলত এখানে ভর্তুকি দেয় সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষের কষ্ট কিছুটা লাঘব করার জন্য। তিন-চারটি পণ্য কিনে তিন শ টাকা সাশ্রয় কম কথা নয়। তাই টিসিবির ট্রাক সেল কার্যক্রমের আওতা, পণ্যের পরিমাণ এবং পণ্যের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু চাহিদার তুলনায় টিসিবির ট্রাকগুলোয় পণ্য কম থাকে। নির্ধারিত স্থানে ট্রাক আসার নির্দিষ্ট সময়ের আগেই মানুষের লম্বা লাইন তৈরি হয়ে যায়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশে সাধারণ মানুষকে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে ফেলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি। তার ওপর গত কয়েক মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। এর মধ্যে টানা বৃষ্টি ও বন্যার কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে সবজি ও কাঁচা মরিচের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বাজারে এসব পণ্যের দাম অনেক বেড়েছে। টিসিবির ট্রাকে এগুলো বিক্রি হয় না। তবে কোনো একটি পণ্যের দাম বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষ অন্য জায়গায় খরচ কমায়। সেই খরচ কমানোর জন্য টিসিবির লাইন দীর্ঘ হয়। সেই তুলনায় টিসিবির ট্রাক এবং তাতে পণ্যের বৈচিত্র্য কম।

মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির অঙ্কটাও বেশ গোলমেলে। দেশের রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যান প্রয়োজনমতো টেম্পারিং করার নজির তো মোটেও দুর্লভ নয়। আর পরিসংখ্যানে মাথাপিছু আয় বাড়লেও তার বিপরীতে কত লোক কর্মহীন হয়েছে এবং কত লোকের আয় কমেছে; তার সাথে সাথে নিত্যপণ্যের দাম কী পরিমাণ বেড়েছে—সেটিও হিসাব করা দরকার।

বিভিন্ন গবেষণা বলছে, দেশে দারিদ্র্য বেড়েছে। কত শতাংশ দারিদ্র্য বেড়েছে এবং কত শতাংশ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে—সেই পরিসংখ্যান নিয়ে অনেক সময়ই সরকারের তরফে প্রশ্ন তোলা হয়। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের পরে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে যে প্রচুর মানুষ কর্মহীন হয়েছে—সেটি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম যদি স্থিতিশীল থাকে, তবুও কর্মহীন বা আয় কমে যাওয়া মানুষের কাছে দামের এই স্থিতিশীলতাও কঠিন বাস্তবতা। সাধারণ মানুষের কাজের সুযোগ বাড়লে এবং তাদের আয় বাড়লে, অর্থনীতি সচল থাকলে পণ্যের দাম বাড়লেও বাজারে তেমন প্রভাব পড়ে না। কারণ মানুষ তখন কিনতে পারে। কিন্তু গত দুই বছরে পণ্যের দামের সঙ্গে বেড়েছে কর্মহীনতা। কমেছে মানুষের আয়।

স্মরণ করা যেতে পারে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিও স্বীকার করেছিলেন যে ভালো ভালো পোশাক পরা মানুষদেরও এখন টিসিবির লাইনে দেখা যাচ্ছে। মন্ত্রীর এই স্বীকারোক্তি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনাও হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি কার্টুনে দেখা যায় স্যুট-টাই পরা এক ভদ্রলোক ভিক্ষুককে প্রশ্ন করছেন, ‘তোমার ২৫০০ ডলার কোথায় গেল?’ সাধারণ মানুষ ও শিল্পীদের এই যে রসিকতা, তার পেছনে রয়েছে মূলত অসন্তোষ, ক্ষোভ।

স্বল্প ও সীমিত আয়ের মানুষের প্রতি সংবেদনশীল নীতির আলোকেই সরকারি ব্যবস্থাপনায় অর্থাৎ টিসিবির মাধ্যমে তুলনামূলক কম দামে নিত্যপণ্য বিক্রি করা হয়। ঘনবসতিপূর্ণ, গুরুত্বপূর্ণ এবং দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকায় টিসিবির ট্রাক থাকার কথা। কিন্তু সেখানেও নানা সমস্যার কথা গণমাধ্যমে আসে। যেমন, একই লোক বারবার পণ্য কিনছেন। তা ঠেকানোর ব্যবস্থা টিসিবির নেই। অনেক খুচরা দোকানদার এখান থেকে কম দামে পণ্য কিনে বেশি দামে বিক্রি করছেন। প্রতিদিনের চাহিদার অনুপাতে সরবরাহ নেই। অনেককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রাকের পেছনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এক দিকে মাথাপিছু আয় বেড়েছে বলে রাষ্ট্র তৃপ্তির ঢেকুর তোলে। অন্যদিকে টিসিবির ট্রাক চলে গেলে মানুষ তার পেছনে দৌড় দেয় কিংবা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষমাণ মানুষের ওপর জীর্ণ দেয়াল ধসে পড়ে।

মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির অঙ্কটাও বেশ গোলমেলে। দেশের রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যান প্রয়োজনমতো টেম্পারিং করার নজির তো মোটেও দুর্লভ নয়। আর পরিসংখ্যানে মাথাপিছু আয় বাড়লেও তার বিপরীতে কত লোক কর্মহীন হয়েছে এবং কত লোকের আয় কমেছে; তার সাথে সাথে নিত্যপণ্যের দাম কী পরিমাণ বেড়েছে—সেটিও হিসাব করা দরকার।

অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল সমস্যা হচ্ছে আয় বৈষম্য। অবৈধ পথে কোটি কোটি টাকা কামাচ্ছে একটি গোষ্ঠী। সেই টাকার বিরাট অংশই জনগণের ট্যাক্সের। এই লুটপাটের টাকা চলে যায় বিদেশে। জুলাই অভ্যুত্থানে বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষের রাস্তায় নেমে আসার পেছনে তাদের এসব ক্ষোভের ভূমিকাও কম নয়। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে জনগণের পয়সা লুটপাট করা এবং বিদেশে টাকা পাচার বন্ধ হয়েছে—সে কথা হলফ করে বলার সুযোগ নেই। সুতরাং যে বিশাল জনগোষ্ঠী দুর্নীতি ও লুটপাটের সঙ্গে যুক্ত নয় বা সেই সুযোগও যাদের নেই, তারা করোনার অতিমারিতে কাজ হারায়, বেকার হয়, বেতন কমে যায়। সেই জনগোষ্ঠীই অভ্যুত্থানের পরে শিল্প-কারখানা বন্ধ হলে কর্মহীন হয়।

সম্প্রতি দেশের একটি বড় শিল্প গ্রুপের চট্টগ্রামে থাকা সব কারখানা বন্ধ হয়েছে। ফলে ১০ হাজারের বেশি শ্রমিকের কর্মহীন হওয়ার খবর গণমাধ্যমে এসেছে। ওই শিল্প গ্রুপের মালিক কে, তার কোন সব অপকর্ম আছে তার সমান গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে বেকার হয়ে যাওয়ার মানুষগুলোর কী হবে?

অভ্যুত্থানের পরে অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ছিল সমস্ত কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান চালু রাখা। উচিত ছিল সুনির্দিষ্ট অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের মালিকের শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি তার মালিকানাধীন কোনো প্রতিষ্ঠান যাতে বন্ধ না হয়; কর্মীদের বেতন অনিয়মিত বা অনিশ্চিত হয়ে না পড়ে; যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো বেদখল না হয়; সেখানে লুটপাট ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া না হয়—সেটি নিশ্চিত করা। কেননা মালিকের পাপের বোঝা শ্রমিকের ঘাড়ে চাপানো অন্যায়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার এই কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচিত বিএনপি সরকারও দেশের অর্থনীতির বৃহত্তর স্বার্থে সমস্ত কল-কারখানা সচল রাখা এবং ব্যবসার পরিবেশ নিশ্চিত করার কাজটি কতটা করতে পারছে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

দেশের অর্থনীতি যদি ঠিক করা না যায়, মানুষের যদি কাজ না থাকে, আয় কমে যায়—তাহলে টিসিবির লাইন আরও দীর্ঘ হবে। সেখানে গিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য না পেলে মানুষের ক্ষোভ ও অসন্তোষ আরও বাড়বে। আর এসব হলে দীর্ঘ মেয়াদে সরকারের দেশ পরিচালনাকে কঠিন করে তুলবে।

  • আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত