নাজিয়া আফরিন

ফিফার র্যাঙ্কিংয়ে যে দেশের নামই কখনো বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে ঠাঁই পায়নি, সেই দেশের ছাদে, অলিগলিতে, এমনকি ধানখেতের পাশের বাঁশের খুঁটিতেও এখন উড়ছে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার পতাকা। এই দুটি দূরবর্তী লাতিন আমেরিকান দেশই বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় দল। অথচ এই দুই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগলিক দূরত্ব প্রায় সতেরো হাজার কিলোমিটার। তারপরও এই সম্পর্ক এত প্রবল, এত আবেগময়, যে তা কখনো কখনো প্রতিবেশীকে প্রতিদ্বন্দ্বী, এমনকি ভাইকে শত্রু বানিয়ে দিতে পারে। এক রাষ্ট্রীয় সীমাহীন আনুগত্য, এক সীমান্তহীন জাতীয়তাবাদ - যা প্রতি চার বছরে ফিরে আসে আগের চেয়েও তীব্র হয়ে।
এই ভালোবাসার শেকড় সন্ধান করতে গেলে পেছনে ফিরতে হয় ষাট-সত্তরের দশকে। তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিরতা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে তরুণ প্রজন্ম খুঁজছিল আশার প্রতীক, খুঁজছিল এমন কোনো নায়ক যাকে ঘিরে স্বপ্ন বোনা যায়। সেই সময় ব্রাজিল ছিল বিশ্ব ফুটবলের অপ্রতিরোধ্য শক্তি, আর পেলে হয়ে উঠেছিলেন সেই কাঙ্ক্ষিত নায়ক।
১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ যখন প্রথমবার রঙিন টেলিভিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পৌঁছাল, তখন দিয়েগো মারাদোনার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই কালজয়ী গোল দিলেন! সেটা কেবল একটি ফুটবল মুহূর্ত হয়ে থাকেনি, বরং হয়ে উঠেছিল উপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে এক প্রতীকী জয়। মারাদোনার উত্তরসূরি হিসেবে লিওনেল মেসি এখন তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে সেই জায়গা ধারণ করছেন, আর ব্রাজিলের নেইমার হয়ে উঠেছেন আরেক নায়ক।
এই বিশ্বকাপ ঘিরে দৃশ্যপট আবারও বদলে গেছে। ঢাকার গুলশানের মতো অভিজাত এলাকার দোকানে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের জার্সি বিকোচ্ছে হাতের নাগালের দামে, পাড়ায় পাড়ায় উঠছে মেসির বিশালাকার কাটআউট, আর সমর্থকেরা একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় বিশাল আকৃতির পতাকা বানাচ্ছেন, গ্রাফিতি আঁকছেন, বাড়ির দেয়াল রাঙাচ্ছেন। এই প্রতিযোগিতার এক চমকপ্রদ উদাহরণ হলো ৭২ বছর বয়সী সেই পৌঢ়, যিনি জমির একাংশ বিক্রি করে সাড়ে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ একটি জার্মান পতাকা তৈরি করিয়েছেন। তাঁর স্বপ্ন, এই পতাকা একদিন জার্মানির কোনো জাদুঘরে জায়গা পাবে। এমন আবেগ যতই অতিরঞ্জিত মনে হোক, তা একটি জাতির ফুটবলপ্রেমের গভীরতাকেই তুলে ধরে।
কিন্তু এই উন্মাদনার একটি অন্ধকার দিকও আছে। প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ নতুন কিছু নয়। সম্প্রতি হবিগঞ্জে একটি স্থানীয় ফুটবল ম্যাচের পর ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে অনেকে আহত হয়েছেন। অতীতের পরিসংখ্যানও উদ্বেগজন - ২০২২ সালের বিশ্বকাপের সময় প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের সংঘর্ষে অন্তত তেইশ জনের প্রাণহানির তথ্য পাওয়া গেছে, আর এর আগে পতাকা ওড়াতে গিয়ে বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে একাধিক মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। ভালোবাসা যখন এতটা তীব্র হয়ে ওঠে, তখন তা আমাদের ভাবায় - এই আবেগের উৎস কী, এবং তা কেন এত সীমাহীন।
তবে এই বিশ্বকাপে একটি নতুন বাঁকও দেখা যাচ্ছে। যে দেশগুলো এতদিন বাংলাদেশের এই ফুটবল-উন্মাদনাকে দূর থেকে দেখত, তারাও এখন এই আবেগকে আপন করে নেওয়ার চেষ্টা করছে। আটাশ বছর পর প্রথমবার বিশ্বকাপে ফেরা নরওয়ে তাদের দূতাবাসের মাধ্যমে বাংলাদেশের সমর্থকদের কাছে আবেদন জানিয়েছে, মনে করিয়ে দিয়েছে, স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম কয়েকটি দেশের একটি তারা। "তাহলে কী বলো, বাংলাদেশ? এবার আন্ডারডগদের পক্ষে দাঁড়ানোর সময়," এমন আহ্বানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেম এখন আর কেবল একটি অভ্যন্তরীণ সাংস্কৃতিক ঘটনা নয়, সাংস্কৃতিক কূটনীতিরও এক হাতিয়ার।
এই পরিস্থিতি একটি গভীর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায় - একটি জাতি যখন নিজের কোনো প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসবে এতটা সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে, তখন তারা আসলে কী খোঁজে? সম্ভবত এটি কেবল খেলা দেখার আনন্দ নয়; এটি এক সম্মিলিত স্বপ্নের অংশ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, যেখানে নিজের অনুপস্থিতিকে অন্যের বিজয়ের মধ্য দিয়ে পূরণ করার প্রবণতা কাজ করে। ফিফার মঞ্চে বাংলাদেশের নাম থাকুক বা না থাকুক, বাংলাদেশের হৃদয় যে এই উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা এখন বিশ্বও স্বীকার করছে।
লেখক: শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস

ফিফার র্যাঙ্কিংয়ে যে দেশের নামই কখনো বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে ঠাঁই পায়নি, সেই দেশের ছাদে, অলিগলিতে, এমনকি ধানখেতের পাশের বাঁশের খুঁটিতেও এখন উড়ছে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার পতাকা। এই দুটি দূরবর্তী লাতিন আমেরিকান দেশই বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় দল। অথচ এই দুই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগলিক দূরত্ব প্রায় সতেরো হাজার কিলোমিটার। তারপরও এই সম্পর্ক এত প্রবল, এত আবেগময়, যে তা কখনো কখনো প্রতিবেশীকে প্রতিদ্বন্দ্বী, এমনকি ভাইকে শত্রু বানিয়ে দিতে পারে। এক রাষ্ট্রীয় সীমাহীন আনুগত্য, এক সীমান্তহীন জাতীয়তাবাদ - যা প্রতি চার বছরে ফিরে আসে আগের চেয়েও তীব্র হয়ে।
এই ভালোবাসার শেকড় সন্ধান করতে গেলে পেছনে ফিরতে হয় ষাট-সত্তরের দশকে। তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিরতা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে তরুণ প্রজন্ম খুঁজছিল আশার প্রতীক, খুঁজছিল এমন কোনো নায়ক যাকে ঘিরে স্বপ্ন বোনা যায়। সেই সময় ব্রাজিল ছিল বিশ্ব ফুটবলের অপ্রতিরোধ্য শক্তি, আর পেলে হয়ে উঠেছিলেন সেই কাঙ্ক্ষিত নায়ক।
১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ যখন প্রথমবার রঙিন টেলিভিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পৌঁছাল, তখন দিয়েগো মারাদোনার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেই কালজয়ী গোল দিলেন! সেটা কেবল একটি ফুটবল মুহূর্ত হয়ে থাকেনি, বরং হয়ে উঠেছিল উপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে এক প্রতীকী জয়। মারাদোনার উত্তরসূরি হিসেবে লিওনেল মেসি এখন তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে সেই জায়গা ধারণ করছেন, আর ব্রাজিলের নেইমার হয়ে উঠেছেন আরেক নায়ক।
এই বিশ্বকাপ ঘিরে দৃশ্যপট আবারও বদলে গেছে। ঢাকার গুলশানের মতো অভিজাত এলাকার দোকানে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের জার্সি বিকোচ্ছে হাতের নাগালের দামে, পাড়ায় পাড়ায় উঠছে মেসির বিশালাকার কাটআউট, আর সমর্থকেরা একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় বিশাল আকৃতির পতাকা বানাচ্ছেন, গ্রাফিতি আঁকছেন, বাড়ির দেয়াল রাঙাচ্ছেন। এই প্রতিযোগিতার এক চমকপ্রদ উদাহরণ হলো ৭২ বছর বয়সী সেই পৌঢ়, যিনি জমির একাংশ বিক্রি করে সাড়ে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ একটি জার্মান পতাকা তৈরি করিয়েছেন। তাঁর স্বপ্ন, এই পতাকা একদিন জার্মানির কোনো জাদুঘরে জায়গা পাবে। এমন আবেগ যতই অতিরঞ্জিত মনে হোক, তা একটি জাতির ফুটবলপ্রেমের গভীরতাকেই তুলে ধরে।
কিন্তু এই উন্মাদনার একটি অন্ধকার দিকও আছে। প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ নতুন কিছু নয়। সম্প্রতি হবিগঞ্জে একটি স্থানীয় ফুটবল ম্যাচের পর ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে অনেকে আহত হয়েছেন। অতীতের পরিসংখ্যানও উদ্বেগজন - ২০২২ সালের বিশ্বকাপের সময় প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের সংঘর্ষে অন্তত তেইশ জনের প্রাণহানির তথ্য পাওয়া গেছে, আর এর আগে পতাকা ওড়াতে গিয়ে বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে একাধিক মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। ভালোবাসা যখন এতটা তীব্র হয়ে ওঠে, তখন তা আমাদের ভাবায় - এই আবেগের উৎস কী, এবং তা কেন এত সীমাহীন।
তবে এই বিশ্বকাপে একটি নতুন বাঁকও দেখা যাচ্ছে। যে দেশগুলো এতদিন বাংলাদেশের এই ফুটবল-উন্মাদনাকে দূর থেকে দেখত, তারাও এখন এই আবেগকে আপন করে নেওয়ার চেষ্টা করছে। আটাশ বছর পর প্রথমবার বিশ্বকাপে ফেরা নরওয়ে তাদের দূতাবাসের মাধ্যমে বাংলাদেশের সমর্থকদের কাছে আবেদন জানিয়েছে, মনে করিয়ে দিয়েছে, স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম কয়েকটি দেশের একটি তারা। "তাহলে কী বলো, বাংলাদেশ? এবার আন্ডারডগদের পক্ষে দাঁড়ানোর সময়," এমন আহ্বানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেম এখন আর কেবল একটি অভ্যন্তরীণ সাংস্কৃতিক ঘটনা নয়, সাংস্কৃতিক কূটনীতিরও এক হাতিয়ার।
এই পরিস্থিতি একটি গভীর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায় - একটি জাতি যখন নিজের কোনো প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসবে এতটা সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে, তখন তারা আসলে কী খোঁজে? সম্ভবত এটি কেবল খেলা দেখার আনন্দ নয়; এটি এক সম্মিলিত স্বপ্নের অংশ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, যেখানে নিজের অনুপস্থিতিকে অন্যের বিজয়ের মধ্য দিয়ে পূরণ করার প্রবণতা কাজ করে। ফিফার মঞ্চে বাংলাদেশের নাম থাকুক বা না থাকুক, বাংলাদেশের হৃদয় যে এই উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা এখন বিশ্বও স্বীকার করছে।
লেখক: শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস

বাংলাদেশের সামনে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সম্ভবত ভারত কতটা শক্তিশালী—তা নয়। বরং প্রশ্নটি হলো, আমরা ভারতকে কতটা শক্তিশালী বলে কল্পনা করি। কারণ ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, বাস্তব শক্তির চেয়েও শক্তি সম্পর্কে মানুষের বিশ্বাস কাল্পনিক ধারণা অধিক কার্যকর রাজনৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টি করতে পারে।
১ ঘণ্টা আগে
শিক্ষাবাজেটের অন্তত ০.৫ শতাংশ জিডিপিকে 'গবেষণা ও উন্নয়ন'-এর জন্য আলাদা উপ-খাত হিসেবে ঘোষণা করুন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়াতে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেটে সরাসরি ও স্বাধীন 'থোক বরাদ্দ' নিশ্চিত করুন। একইসঙ্গে, ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং মেধার ভিত্তিতে ফান্ডের বণ্টন তদারকি করতে...
১ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ ব্যয়, নীতিগত দুর্বলতা, অস্বচ্ছতা এবং ভোক্তাবিরোধী সিদ্ধান্তের বোঝা বহন করছে। সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক অঙ্গীকার বদলেছে, আইনের ভাষা বদলেছে—কিন্তু সাধারণ ভোক্তার বাস্তবতা খুব একটা বদলায়নি।
৬ ঘণ্টা আগে
১৬ জুন। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ইতিহাসে একটি কালো দিন। ১৯৭৫ সালের এ দিনটিতে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে তৎকালীন বাকশাল সরকার চারটি পত্রিকা সরকারি ব্যবস্থাপনায় রেখে বাকি সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়। এতে হাজারো সাংবাদিকসহ গণমাধ্যমকর্মী রাতারাতি বেকার হয়ে দুঃসহ জীবনে পতিত হন।
৯ ঘণ্টা আগে