মাদকাসক্তি প্রতিরোধই অধিক জরুরি

প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৬, ২১: ০৪
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশে মাদক আর শুধু সামাজিক সমস্যা নয়; এটিকে বলা যায় জাতীয় নিরাপত্তা সংকট। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ জরিপ বলছে, প্রায় ৮২ লাখ মানুষ মাদক সেবন করছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮ শতাংশ। সিনথেটিক মাদকের ব্যাপ্তিও দ্রুত বাড়ছে। আর মাদকাসক্তদের ৬০ শতাংশেরও বেশি তরুণ।

বাংলাদেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবর্ণ সময়ে— জনসংখ্যার প্রায় ৪৩ শতাংশ ১৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সী। এই জনগোষ্ঠীকে রক্ষা ও উৎপাদনশীল করে তুলতে না পারলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কথাতেই থেকে যাবে। মাদকাসক্তি এ ক্ষেত্রে বড় বাধা।

বাংলাদেশ দুটি মাদক উৎপাদন অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত : পূর্বে ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ (মিয়ানমার-থাইল্যান্ড-লাওস); পশ্চিমে ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট’ (আফগানিস্তান-পাকিস্তান-ইরান)। বিশেষত মিয়ানমারে ইয়াবার উৎপাদন ও সেখান থেকে পাচার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। কমেছে দাম। বিজিবি ও কোস্টগার্ড চেষ্টা চালালেও এসব মাদক আসা বন্ধ হচ্ছে না।

শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাদকের সরবরাহ শৃঙ্খল ভাঙা কঠিন। আর বড় চোরাকারবারিরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকছে। প্রশ্ন উঠছে, মাদকের অর্থের প্রবাহ কোথায় যাচ্ছে? সেই অর্থ আবার রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা কিনছে কিনা। মাদক পাচারে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা প্রচলিত নজরদারির বাইরে। সোশ্যাল মিডিয়া, ডার্ক ওয়েব, এমনকি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে মাদক পৌঁছে যাচ্ছে ভোক্তার হাতে। শুরুতে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে মাদক জুগিয়ে আসক্ত করা হয়; তাতে তৈরি হয় বাজার। এই কৌশল ভাঙতে চাই সাইবার নজরদারি ও ডিজিটাল গোয়েন্দা সক্ষমতা। মাদক পাচারের সঙ্গে অর্থপাচার গভীরভাবে যুক্ত। ব্যাংকব্যবস্থা ও ফিনটেক প্ল্যাটফর্মে ‘অ্যান্টি মানি লন্ডারিং’ নজরদারি জোরদার না হলে এটা থামবে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, মাদক প্রতিরোধে এক টাকা বিনিয়োগ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে পাঁচ থেকে সাত টাকা সাশ্রয় করে। বাংলাদেশে নীতি ও বরাদ্দ এখনও চিকিৎসামুখী; প্রতিরোধমুখী নয়। ৪০৩টি বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রে মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ টাকার অনুদান তো চিকিৎসার জন্য। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে, একবার আসক্ত হলে পুনর্বাসনের হার হতাশাজনক এবং পুনরায় মাদক গ্রহণের প্রবণতাই বেশি।

মাদকের বিস্তার রোধে বিদ্যালয়ে এ সংক্রান্ত শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। আর সেটা হতে হবে তথ্যভিত্তিক ও মনোবিজ্ঞানসম্মত। বিশ্বব্যাপী কার্যকর পদ্ধতি ‘লাইফ স্কিলস ট্রেনিং’ ও ‘পিয়ার এডুকেশন’ মডেল দেশে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে। এটা সম্প্রসারণ করতে হবে। মাদক পাচারের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক কূটনীতিও জরুরি। বাংলাদেশকে আসিয়ান, ইউএনওডিসি ও বিমসটেক প্ল্যাটফর্মে সমস্যাটি সক্রিয়ভাবে তুলতে এবং একইসঙ্গে যৌথ সীমান্ত নজরদারি বাড়াতে হবে।

জাতীয় মাদক প্রতিরোধ কমিশন হওয়া দরকার; যেটি স্বরাষ্ট্র, শিক্ষা, সমাজকল্যাণ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করবে। মাদক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম এখনও বিক্ষিপ্ত। একক কর্তৃপক্ষের অধীনে না আনলে কার্যকর প্রতিরোধ সম্ভব নয়। মাদকাসক্তিকে অপরাধ নয়; সমস্যা হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি আইন ও নীতিতে প্রতিফলিত হতে হবে। মাদকাসক্তকে জেলে পাঠানো সমাধান নয়; তার চাই চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ। পর্তুগাল এই পথে হেঁটে মাদক সমস্যা নাটকীয়ভাবে কমাতে পেরেছে। সেখান থেকে শেখার সুযোগ আছে আমাদের।

দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর তরুণদের সম্পদে রূপান্তরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে বিপুল বিনিয়োগ করেছিল। বাংলাদেশের হাতে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ আছে মাত্র আর এক দশক। এর মধ্যে ৮২ লাখ মাদকসেবী বাড়তে থাকলে এবং ষাট শতাংশ আসক্তই তরুণ হলে সেই ডিভিডেন্ড দায়ে পরিণত হবে। এ অবস্থায় সরকার, নাগরিক সমাজ, পরিবার এবং তরুণরা নিজেরা এই লড়াইয়ের না নামলে শুধু অধিদপ্তর আর বাহিনীর পক্ষে সংকটটির মোকাবিলা সম্ভব নয়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত