সম্পাদকীয়

পররাষ্ট্রনীতিতে দেশের স্বার্থ সমুন্নত থাকাটাই মুখ্য

প্রকাশ : ২৭ জুন ২০২৬, ২১: ৩৮
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

নবনির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর কোথায় হবে, তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ছিল। তারেক রহমানের সরকার অবশ্য শুরু থেকে বলছে, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। এটি তাঁর দলের নির্বাচনী প্রচারণায়ও ব্যবহৃত হয়েছে। জনগণেরও প্রত্যাশা, সরকার সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে। প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে বিশেষ সতর্কতার সঙ্গে কাজ করে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করবে, এটাও প্রত্যাশা। নিকট অতীতে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে এটা মার খেয়েছিল বলেও প্রত্যাশাটি বেড়েছে। মালয়েশিয়া ও চীনে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফরের অর্জন নিয়ে আলোচনা এ নিরিখে হওয়াটাই কাম্য।

শুরুতে মালয়েশিয়া গেলেও চীনে প্রধানমন্ত্রীর সফরের দিকেই বেশি করে দৃষ্টি ছিল সবার। বাংলাদেশের বিষয়ে আগ্রহী শক্তিগুলোও এ দিকে ঘনিষ্ঠ নজর রেখেছিল বলে অনুমান। অন্তর্বতী শাসনামলে অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতির কতখানি ধারাবাহিকতা নতুন সরকারের কাজে পরিলক্ষিত হয়, সেটাও সবাই বুঝতে চেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষে জাতীয় সংসদেও উঠেছে বিষয়টি। ধন্যবাদের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি দেশের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করেছেন। বিনয়াবনত বক্তব্যের জন্য তিনি নতুন করে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করবেন। তবে সফর-পরবর্তী কাজের মধ্য দিয়েই তাঁর সরকারের মূল্যায়ন হবে। একটি সফরের ভেতর দিয়েই কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে, এটা কেউই মনে করে না। তবে কিছু ইঙ্গিত বা ধারণা পাওয়া অবশ্যই সম্ভব। একেক দেশের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রে আমাদের ফোকাসও একেক রকম। সহযোগিতার নতুন নতুন ক্ষেত্রও বের করতে হয় এবং তা দিয়ে বিচার করা হয় সরকারের পারফরম্যান্স। আমরা নিশ্চয়ই চাই না মালয়েশিয়ার মতো দ্রুত অগ্রগতি লাভ করা এবং নিকটবর্তী দেশের সঙ্গেও একটি বা দুটি খাতে সম্পর্ক সীমিত করে রাখতে। লক্ষণীয়, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে এবার জনশক্তি রপ্তানির বাইরেও শিক্ষা-গবেষণা, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সহায়তার দিকগুলো সামনে এসেছে। কম সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হলেও এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা বিস্তারে আলোচনার কাঠামোটি স্থির হয়েছে, যেটা তাৎপর্যবহ।

এদিকে চীনের সঙ্গে ১৭টি এমওইউ সইয়ের ঘটনা বিশেষভাবে নজর কাড়বে। আনুষ্ঠানিক সফর শুরুর আগে প্রধানমন্ত্রী সেখানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনেও যোগদান করেন। চীনের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি উভয়ের সঙ্গেই একান্তে বৈঠক হয়েছে তাঁর। ইতিপূর্বে আলোচনায় না আসা প্রস্তাবও চীনের তরফ থেকে উত্থাপিত হওয়ায় বোঝা যায়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফরকে তাঁরা কত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে চীনের একটি স্থলবেষ্টিত প্রদেশের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের প্রস্তাবে নতুনত্ব নেই; আবার রয়েছেও। এতে চীন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার একত্রে উপকৃত হতে পারে বলে মনে করছে দেশটি। তবে মিয়ানমার রয়েছে গভীর রাজনৈতিক সংকটে। সেখান থেকে বিতাড়িত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা নিয়ে আমরাও কম সংকটে নেই। চীন চাইলে এ ক্ষেত্রে কার্যকর সহায়তা জোগাতে পারে বলে ধারণা রয়েছে। সেটি আমাদের আদায়ও করতে হবে।

চীন ক্রমে হয়ে উঠেছে আমাদের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে ঋণ সহায়তা জুগিয়েও চলে এসেছে আলোচনায়। চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহায়তাও আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা। তিস্তা প্রকল্পসহ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রকল্পে সর্বাত্মক সহায়তা জোগাতে দেশটি নিজে থেকে আগ্রহী। এসব ক্ষেত্রে আমাদের সিদ্ধান্তও হতে হবে সতর্কভাবে বিবেচিত। কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের বিকাশ গুরুত্বপূর্ণ অন্য কোনো দেশ বা পক্ষের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির কারণ যাতে না হয়, সেটাও নিশ্চিত করে চলা চাই। বহুকেন্দ্রিক বিশ্বে এর গুরুত্বও বেড়ে চলেছে। তবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির প্রতিফলন ঘটাতে হবে সব ক্ষেত্রে। আমরা অপেক্ষা করে থাকব তারেক রহমান সরকারের বিচক্ষণতাপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির প্রয়োগ দেখতে। বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের সুরক্ষা ও প্রতিফলন দেখতে পেলে সবাই এর প্রশংসাই করবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত