মো. ফজলুল হকের সাক্ষাৎকার

খারাপ সময়ে দায়িত্ব নিয়েছে সরকার, তবুও আশাবাদী ব্যবসায়ীরা

মো. ফজলুল হক বিকেএমইএ (বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন)-এর সাবেক সভাপতি। তিনি দেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের একজন পরিচিত ব্যবসায়ী ও অর্থনীতি বিশ্লেষক। কাজ করেছেন ইন্টারন্যাশনাল অ্যাপারেল ফেডারেশনের (আইএএফ) পর্ষদ সদস্য হিসেবে। দেশের বর্তমান ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ, আসন্ন বাজেটের চ্যালেঞ্জ, কর ব্যবস্থাপনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ও সামষ্টিক অর্থনীতির নানা দিক নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

প্রকাশ : ০২ জুন ২০২৬, ১০: ৪৮
মো. ফজলুল হক। ছবি : স্ট্রিম

স্ট্রিম: দীর্ঘ সময় পর দেশে একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। সেই সরকারের ১০০ দিন পার হলো। এই ১০০ দিনে সরকারকে কেমন দেখলেন?

মো. ফজলুল হক: সরকারের বয়স ১০০ দিন পার হয়েছে। আমার মনে হয়, সরকারের কাজ নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করার মতো যথেষ্ট সময় এখনো হয়নি। বিশেষ করে আমরা যারা ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত এবং অর্থনীতির একটি অংশ, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে সুনির্দিষ্ট মন্তব্য করার সময় এখনো আসেনি।

তারপরও বলব, তাদের সূচনাটা মন্দ নয়। সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের কাজ তারা শুরু করেছে। সেসব প্রতিশ্রুতি কতটা যৌক্তিক বা অযৌক্তিক, সেটি ভিন্ন বিতর্কের বিষয়। যেমন—ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ডের কথা বলা যায়। এগুলো আগে অন্য নামে ছিল কি না, সেটিও আরেক বিতর্ক। তবে মূল বিষয় হলো, তারা নিজেদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।

এই সরকারের একটি দুর্ভাগ্য হলো, তাদের বেশ খারাপ একটি সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়েছে। সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতির অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। অর্থনীতি যেহেতু একটি দেশের মূল চালিকাশক্তি, তাই দায়িত্ব গ্রহণের সময়টা মোটেও অনুকূল ছিল না। এর পরপরই ছিল রমজান মাস। যেকোনো সরকারের জন্যই রমজান মাসটি একটু চ্যালেঞ্জিং বা জটিল হয়। এবারের রমজানও ব্যতিক্রম ছিল না, তবে বড় ধরনের কোনো সংকট তৈরি হয়নি। তাই সরকারকে আমি ইতিবাচক দিক থেকে ৫ নম্বর দিতে চাই; তারা ভালোই করছে। তবে এটি কেবলই শুরু।

স্ট্রিম: একজন ব্যবসায়ী বা বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি হিসেবে বর্তমান বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশকে কীভাবে দেখছেন? ব্যবসায়ীদের আস্থার জায়গাটা কি ফিরেছে?

মো. ফজলুল হক: শক্ত বা চূড়ান্ত কোনো মন্তব্য করার সময় এখনো আসেনি বলে মনে করি। সেদিন একটি সেমিনারে বলছিলাম যে, বেসরকারি খাতের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে—বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় দেড় বছরে বিনিয়োগ শূন্যের কোঠায় বা নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে নেমে এসেছিল, সেখানে মানুষের আস্থার জায়গাটা হয়তো কিছুটা পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। তবে সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ এখনো পুরোপুরি ফিরে আসেনি। এর কারণ হলো, ব্যাংকিং খাত এখনো টালমাটাল, অর্থের জোগান অনিশ্চিত এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ এখনো নির্বিঘ্ন করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ সরাসরি এ যুদ্ধের অংশ না হলেও অর্থনৈতিকভাবে এর নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি আমাদের ওপর পড়েছে। সব মিলিয়ে আমি বলব, সরকারের চেষ্টাটা দৃশ্যমান, তবে ফলাফল দেখতে হয়তো আরও কিছুটা সময় লাগবে। চূড়ান্ত কোনো মন্তব্য না করেই বলতে চাই, আমরা আশাবাদী যে এই সরকার আগামী দিনে আরও ভালো করবে।

পত্রপত্রিকা মারফত আমরা যতটুকু জানতে পারছি, সম্ভাব্য বাজেটের আকার এবারও অনেক বড় হতে যাচ্ছে। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বাজেটের আকার বড় না করে একটি কার্যকর ও কিছুটা ছোট বাজেট প্রণয়ন করার মতো সাহসী পদক্ষেপ সরকার নিতে পারত। এর জন্য রাজনৈতিক সাহসের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু মনে হচ্ছে, সরকার হয়তো সেই গতানুগতিক পথেই হাঁটছে।

স্ট্রিম: বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী নিজেই ব্যবসায়ীদের ডেকে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেছেন। দুই-তিনটি গ্রুপের সঙ্গে বৈঠক করে অনেক সময় দিয়েছেন। এই উদ্যোগগুলোকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

মো. ফজলুল হক: এটিকে চমৎকার একটি উদ্যোগ বলব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার মাস দেড়েক আগে, জানুয়ারির প্রথম দিকেই ব্যবসায়ী গ্রুপের একটি বড় প্রতিনিধিদলের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। আমি নিজেও সেখানে ছিলাম। আমরা মূলত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে আনুষ্ঠানিকভাবে শোক জানাতে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলাম। শোকজ্ঞাপন পর্ব শেষ হওয়ার পর তিনি নিজে থেকেই আমাদের বসিয়ে রেখে প্রায় তিন ঘণ্টা আলোচনা করেন। তখন নির্বাচন নিয়ে একধরনের অনিশ্চয়তা থাকলেও, বড় দল হিসেবে প্রত্যাশা অনুযায়ী তিনিই যে প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন, সেই আত্মবিশ্বাস তাঁর মধ্যে ছিল। তিনি ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁর মধ্যে কোনো দম্ভ বা নেতিবাচক মনোভাব ছিল না। অত্যন্ত ইতিবাচক ও বিনয়ীভাবে তিনি কথা বলেছেন। নিজে কম বলেছেন। খুব ধৈর্য ধরে আমাদের কথা শুনেছেন। এটি একটি বড় ইতিবাচক দিক।

আমরা পত্রিকায় দেখেছি তিনি ইতিমধ্যে বিভিন্ন ব্যবসায়ী গ্রুপের সঙ্গে বসেছেন। এর বাইরেও অর্থনীতিবিদ এবং সমাজের সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে তিনি একক ও দলবদ্ধভাবে বৈঠক করেছেন। অর্থাৎ, প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান থেকে তাঁর চেষ্টাটা দৃশ্যমান। তবে এই একই ধরনের চেষ্টা তাঁর মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্যের দিক থেকেও সমানভাবে দৃশ্যমান হওয়া উচিত। এরপরের বিষয়টি হলো, মাঠপর্যায়ে যারা সরকার চালান, সেই আমলাতন্ত্রের ভেতরেও এই ইতিবাচক মনোভাবের বিস্তার ঘটা প্রয়োজন। যদিও এ বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করার সময় এখনো আসেনি। আমার মনে হয়, আমলাতন্ত্রকে আরও সক্রিয় করার ক্ষেত্রেও তাঁর একটি চেষ্টা রয়েছে। এ কারণেই আমরা দেখছি, তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চেয়ে সচিবালয়ে বেশি অফিস করছেন। গুলশানের বাসা থেকে সচিবালয় বেশ দূরে। যাতায়াতের রাস্তাও খুব একটা সুবিধাজনক নয়। এরপরও বিষয়গুলোকে আমি ইতিবাচকভাবেই দেখতে চাই। হয়তো আরও কিছুটা সময় গেলে এর একটি ইতিবাচক প্রভাব আমরা দেখতে পাব।

তবে আবারও বলতে হয়, শুধু তিনি একা উদ্যোগী হলে চলবে না। তাঁর দলের আরও দু-একজন হয়তো প্রোঅ্যাকটিভ হয়ে ভালো কাজ করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু সফলতা তখনই আসবে, যখন পুরো দল বা অন্তত দলের বড় একটি অংশ ইতিবাচকভাবে পারফর্ম করবে। কারণ এটি একটি দলীয় কাজ, বর্তমান যুগে একা কোনো ক্ষেত্রেই পূর্ণ সফলতা অর্জন করা সম্ভব নয়।

স্ট্রিম: সরকারকে দায়িত্ব গ্রহণের ১০০ দিনের মাথায় এসেই একটি বাজেট দিতে হচ্ছে। বাজেটের মাধ্যমেই মূলত বোঝা যাবে যে সরকার অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে কী ভাবছে। এ বিষয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?

মো. ফজলুল হক: ১০০ দিনের মাথায় বাজেট দেওয়াটা যেকোনো সরকারের জন্যই বেশ চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে এমন এক সময়ে বাজেট দিতে হচ্ছে, যখন অর্থনৈতিক অবস্থা বিপর্যস্ত। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি চলছে। বিগত দিনগুলোতে আমরা দেখেছি, আগের বারের চেয়ে বড় বাজেট দেওয়াটা একধরনের রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে নতুন সরকার যদি আগের সরকারের চেয়ে বড় বাজেট দিতে না পারে। তবে অনেকেই হয়তো ভাবেন যে তারা বোধ হয় ভালো করতে পারছে না। এই মনস্তত্ত্ব হয়তো রাজনীতিবিদদের ভেতরেও কাজ করে। পত্রপত্রিকা মারফত আমরা যতটুকু জানতে পারছি, সম্ভাব্য বাজেটের আকার এবারও অনেক বড় হতে যাচ্ছে। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বাজেটের আকার বড় না করে একটি কার্যকর ও কিছুটা ছোট বাজেট প্রণয়ন করার মতো সাহসী পদক্ষেপ সরকার নিতে পারত। এর জন্য রাজনৈতিক সাহসের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু মনে হচ্ছে, সরকার হয়তো সেই গতানুগতিক পথেই হাঁটছে।

ব্যাংকিং খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো এখনো চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে রয়েছে। এমন একটি সময়ে এত বড় বাজেটের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সত্যিই কঠিন। সরকার তখনই সফল হতে পারবে, যখন বাজেটের আয় ও ব্যয়ের পুরো ব্যবস্থাপনাটি অত্যন্ত দক্ষ, সুশৃঙ্খল এবং স্বচ্ছ হবে। স্বচ্ছতা বলতে আমি দুর্নীতি কমানোর কথা বোঝাচ্ছি। এগুলো নিশ্চিত করতে পারলে শতভাগ না হলেও সফলতার কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব।

এখানে আমার কাছে একটি বড় ঝুঁকির জায়গা মনে হচ্ছে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা। আমরা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় দেখেছি, প্রায় ৬ লাখ ৯০ হাজার কোটি বা প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে। আমার হিসাবমতে, এটি চলতি বছরের আয়ের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এটি প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার। বিশেষ করে যখন ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা বিরাজ করছে। রাজস্ব আহরণের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতিশীলতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমদানি-রপ্তানি কমে গেলে, মানুষের জীবনযাত্রা সংকুচিত হলে এবং মূল্যস্ফীতির কারণে ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে, এর নেতিবাচক প্রভাব স্বয়ংক্রিয়ভাবেই রাজস্ব আদায়ের ওপর পড়বে। কারণ, আমদানি কম হলে শুল্ক কম আদায় হবে, বেচাকেনা কম হলে ভ্যাট কম আসবে এবং মুনাফা কম হলে আয়করও কমে যাবে। এসব দিক বিবেচনা করলে রাজস্ব আয় অনেকটাই কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বাংলাদেশের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আগের বিএনপি সরকার বা অন্যান্য সরকারের আমলেও বছর শেষে প্রাক্কলিত আয়ের সঙ্গে বাস্তব আয়ের কখনোই মিল পাওয়া যায়নি; সব সময়ই একটি ঘাটতি থেকে যায়।

স্ট্রিম: একদিকে যেমন রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির একটা বড় আশঙ্কা আপনি দেখছেন, অন্যদিকে নতুন সরকার হিসেবে তাদের নানা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেরও চাপ রয়েছে। আয় ও ব্যয়ের এই অসামঞ্জস্যতা এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সরকারের সামনে আর কী কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

মো. ফজলুল হক: সরকার প্রচুর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, যার সঙ্গে সরকারি ব্যয় সরাসরি যুক্ত। ফলে একদিকে আয় প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়বে না, অন্যদিকে ব্যয় হয়তো প্রত্যাশার চেয়ে বেশি হয়ে যাবে। এর পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো এখনো চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে রয়েছে। এমন একটি সময়ে এত বড় বাজেটের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সত্যিই কঠিন। সরকার তখনই সফল হতে পারবে, যখন বাজেটের আয় ও ব্যয়ের পুরো ব্যবস্থাপনাটি অত্যন্ত দক্ষ, সুশৃঙ্খল এবং স্বচ্ছ হবে। স্বচ্ছতা বলতে আমি দুর্নীতি কমানোর কথা বোঝাচ্ছি। এগুলো নিশ্চিত করতে পারলে শতভাগ না হলেও সফলতার কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব।

প্রতিকূল এই পরিস্থিতিতে অনেক বড় একটি বাজেট দেওয়ার সাহস দেখানোর জন্য আমি সরকারকে সাধুবাদ জানাই। তবে এর সফলতা নির্ভর করছে সরকারের পুরো দল এবং আমলাতন্ত্রের দক্ষ ব্যবস্থাপনার ওপর। কারণ, রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি আমলাতন্ত্রই মূল কাজটি করে থাকে। আর এই বাজেটের সফলতার ওপরই সরকারের রাজনৈতিক অর্জন বা সাফল্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

স্ট্রিম: আপনি প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকার যে বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার কথা বললেন, এর একটি বড় অংশ আসবে ভ্যাট থেকে। অভিযোগ রয়েছে, যারা ইতিমধ্যে কর দিচ্ছেন, তাদের ওপরই নতুন করে চাপ তৈরি করা হচ্ছে। নতুন কোনো প্রণোদনা বা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। এ অবস্থায় আপনাদের কী মনে হয়, ব্যবসায়ীদের বা বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ আরও বাড়বে?

মো. ফজলুল হক: এটি আসলে এখনই পুরোপুরি অনুমান করা কঠিন। গত কয়েকদিন আগে এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে সাধারণ মানুষের কষ্ট হবে না এবং করের বোঝা বাড়বে না। তবে নতুন কিছু কর হয়তো ধার্য হতে পারে, যেমন—সম্পদ কর বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের ওপর কর। এই সম্পদ করের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার খুব একটা সরাসরি সম্পর্ক নেই। সম্পদের অধিকারী যিনিই হোন না কেন—তিনি ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী বা গৃহবধূ যা-ই হোন না কেন—সবাইকেই হয়তো এই কর দিতে হবে। তবে সেটি ভিন্ন আলোচনা।

আমরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছি, যারা নিয়মিত কর দিচ্ছেন, তাদের ওপরই নতুন করে বোঝা না চাপিয়ে করের আওতা বা ভিত্তি সম্প্রসারিত করা উচিত। আমার মনে হয়, এখন সময় এসেছে ছোট ব্যবসায়ীদেরও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার।

আমি আশা করি, ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন করে করের বোঝা বাড়বে না। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, এত বড় একটি রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা যখন নির্ধারণ করা হয়, তখন বিদ্যমান করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে না—এটি বিশ্বাস করা কঠিন। আবার, এনবিআর-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কথা যদি সত্যি হয়, তবে সেটি স্বস্তিদায়ক হবে। তারা যদি সাধারণ মানুষ বা ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন করের বোঝা না চাপিয়েই এত বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেন, তবে আমি অবশ্যই তাদের দ্বিগুণ সাধুবাদ জানাব। এটি সত্যিই একটি ভালো উদ্যোগ হবে।

স্ট্রিম: এক্ষেত্রে এনবিআর-এর বিকল্প কৌশল কী হওয়া উচিত? আপনারা কি মনে করেন যে নতুন করদাতা খুঁজে বের করে করের আওতা বাড়ানোর বিষয়ে এবার বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন?

মো. ফজলুল হক: আমরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছি, যারা নিয়মিত কর দিচ্ছেন, তাদের ওপরই নতুন করে বোঝা না চাপিয়ে করের আওতা বা ভিত্তি সম্প্রসারিত করা উচিত। আমার মনে হয়, এখন সময় এসেছে ছোট ব্যবসায়ীদেরও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার। তা না হলে বাংলাদেশের অল্প কিছু ব্যবসায়ী—সেটা কয়েক শ বা কয়েক হাজার হতে পারে—তাদের ওপরই পুরো করের বোঝার একটি বড় অংশ গিয়ে পড়ে। এই জায়গায় তাদের কষ্টটা লাঘব করা প্রয়োজন। কর প্রদানের সঙ্গে যেহেতু দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়া সরাসরি জড়িত, তাই দেশের উন্নয়নে সবারই কমবেশি ভূমিকা থাকা দরকার।

আমি এমনটি বলছি না যে, একজন বড় ব্যবসায়ী যে পরিমাণ কর দেবেন, ছোট ব্যবসায়ীকেও সমপরিমাণ কর দিতে হবে। এমন কথা কোনো আইনেই বলা নেই। কিন্তু আনুপাতিক হারে না হোক, অন্তত ন্যূনতম একটি কর যেন তারা দেন। যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করেন এবং যাদের আয় করমুক্ত সীমার ওপরে, তাদের কর প্রদানে উৎসাহিত করা উচিত। গত কয়েক দিন আগের একটি সেমিনারে আমরা বলছিলাম যে 'করের আওতা' বা 'ট্যাক্স নেট'-এর কথা শুনলে অনেকে আতঙ্কিত হন। তাই আমরা নেটের কথা নাই-বা বললাম; বরং তাদের কর দিতে অভ্যস্ত ও সচেতন করে তোলা প্রয়োজন। ইতিবাচকভাবে তাদের কাছে পৌঁছাতে হবে। এক বছরেই হয়তো সব অর্জন করা সম্ভব নয়, তবে শুরুটা তো করা দরকার। আমরা প্রত্যাশা করছি, এই বছর থেকেই সেই শুরুটা হবে।

স্ট্রিম: এক আলোচনায় আপনি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে কয়েকটি পরামর্শের কথা বলেছিলেন। আপনাদের দিক থেকে সুনির্দিষ্ট কী কী সুপারিশ থাকতে পারে?

মো. ফজলুল হক: আমাদের দিক থেকে প্রথম সুপারিশ হলো, যারা নিয়মিত ও সঠিকভাবে কর দিচ্ছেন, তাদের ওপর নতুন করে করের বোঝা না চাপানো। এটি করলে তারা উল্টো নিরুৎসাহিত হবেন। নতুন করদাতা খুঁজে না পেয়ে চেনা মানুষদের ওপর বোঝা চাপিয়ে দেওয়াটা মূলত কর প্রশাসনের অদক্ষতাকেই প্রমাণ করে। এটি অদক্ষ ব্যবস্থাপনারই একটি প্রতিফলন। তাই আমরা চাই, কর প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে নতুনদের করের আওতায় নিয়ে আসুন। তারা কতটা দক্ষতার সঙ্গে সবার জন্য একটি লাভজনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেন, সেটি আমরা দেখতে চাই। এটি গেল একটি দিক।

দ্বিতীয় দিকটি হলো, কর দেওয়ার ভীতি দূর করা। কর বলতে আমি সব ধরনের করকেই বোঝাচ্ছি—সেটা কাস্টমস, ভ্যাট বা আয়কর যা-ই হোক না কেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে কর নিয়ে যে ভীতি কাজ করে, তা দূর করতে কর প্রশাসনের বড় ভূমিকা রয়েছে। কাউকে দেখলে যদি মানুষ ভয় পায়, তবে তার নিজেরই বিশ্লেষণ করে দেখা উচিত যে কেন মানুষ তাকে ভয় পাচ্ছে। তার চেহারা, পোশাক, নাকি আচার-আচরণের কারণে মানুষ ভয় পাচ্ছে—তা খতিয়ে দেখা দরকার। পরিবারেও অনেক সময় এমন হয় যে, কোনো একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দেখলে বাচ্চারা ভয় পায় এবং কাছে যেতে চায় না। তখন ওই ব্যক্তিকেই ভাবতে হয় কীভাবে আরও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করা যায়। কর প্রশাসনের ক্ষেত্রেও বিষয়টি তেমনই হওয়া উচিত। আপনি নিশ্চয়ই একটি সেমিনারে খেয়াল করেছেন, মাননীয় মন্ত্রী থেকে শুরু করে সবাই করদাতাদের হয়রানির বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। এই হয়রানি বন্ধ হওয়া খুব জরুরি। হয়রানি বন্ধ হলে মানুষ কর দিতে আরও বেশি উৎসাহিত হবে এবং সামগ্রিকভাবে রাজস্ব আহরণও বাড়বে।

যারা নিয়মিত ও সঠিকভাবে কর দিচ্ছেন, তাদের ওপর নতুন করে করের বোঝা না চাপানো। এটি করলে তারা উল্টো নিরুৎসাহিত হবেন। নতুন করদাতা খুঁজে না পেয়ে চেনা মানুষদের ওপর বোঝা চাপিয়ে দেওয়াটা মূলত কর প্রশাসনের অদক্ষতাকেই প্রমাণ করে। এটি অদক্ষ ব্যবস্থাপনারই একটি প্রতিফলন।

এ ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। আমরা প্রায়ই বলি যে আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত অনেক কম। কয়েক দিন আগের সেই সেমিনারে—যেখানে আপনিও উপস্থিত ছিলেন—আলোচনা হয়েছিল যে, মানুষ যে পরিমাণ কর দেয়, তার পুরোটাই রাষ্ট্রীয় কোষাগারে পৌঁছায় না। করদাতার পকেট থেকে রাষ্ট্রীয় কোষাগার—এই দুই গন্তব্যের মাঝখানে যে প্রতিবন্ধকতা বা অস্বচ্ছতা রয়েছে, তা দূর করা অত্যন্ত জরুরি। এটি দূর করতে কর প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং সরকারের অন্যান্য সংস্থার ইতিবাচক ও সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা প্রয়োজন। এখানে যে 'সিস্টেম লস' হচ্ছে বা মাঝপথে যে টাকাটা নষ্ট হচ্ছে, তা যদি উদ্ধার করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করা যায়, তবে বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায় সম্ভব। এর ফলে হয়তো কিছু অসাধু ব্যক্তি ব্যক্তিগতভাবে কম লাভবান হবেন, কিন্তু চূড়ান্তভাবে সরকার এবং দেশই এর দ্বারা লাভবান হবে।

স্ট্রিম: সরকারি দলের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম একটি লক্ষ্য হলো আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরি করা। এটি নিয়ে অনেকেই আলোচনা করছেন, নানা মডেল তৈরির কথা ভাবছেন। কিন্তু বিনিয়োগ না বাড়িয়ে এবং বেসরকারি খাতকে বর্তমান অবস্থায় রেখে কি পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব? নাকি এ ক্ষেত্রে অন্য কিছু করা উচিত?

মো. ফজলুল হক: আমি মনে করি, বিষয়টি আমার আগের উত্তরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কারণ, বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে না—সেটা সরকারি বিনিয়োগ হোক বা বেসরকারি বিনিয়োগ। সরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে সৃষ্ট কর্মসংস্থান সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি হয় না। মূল সরকারি চাকরি বাদে বিভিন্ন প্রকল্পের চাকরিগুলো সাধারণত এক বা দুই বছর মেয়াদি অস্থায়ী চাকরি হয়ে থাকে। অন্যদিকে, বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে যেসব কর্মসংস্থান তৈরি হয়, সেগুলো মূলত দীর্ঘমেয়াদি। আমি হয়তো পার্থক্যটা বোঝাতে পেরেছি।

ধরুন, সরকার একটি প্রকল্প হাতে নিল, যেমন—পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ। প্রকল্পটি হয়তো পাঁচ বছর মেয়াদি। সেখানে বেশির ভাগ মানুষের চাকরিই হবে ওই পাঁচ বছরের জন্য। প্রকল্প শেষে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য হয়তো অল্প কিছু লোক রাখা হবে। কিন্তু বেসরকারি খাতে যদি একটি কারখানা গড়ে ওঠে, তবে সেটি দীর্ঘ মেয়াদেই চলবে বলে আমরা আশা করতে পারি। তাই সরকারের বিনিয়োগেরও প্রয়োজন রয়েছে, আমি এর বিরোধিতা করছি না। তবে সরকারি বিনিয়োগের সুবিধা সবসময় দীর্ঘমেয়াদি হয় না, অনেক সময় এটি স্বল্প বা মধ্যমেয়াদি হয়।

তাই আমি আবারও সেই কথাতেই ফিরে যাচ্ছি—যদি সম্মিলিত প্রচেষ্টা না থাকে এবং আপনি যদি পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে মেরামত বা ঠিক করতে না পারেন, তবে কর্মসংস্থান তৈরি হবে না। অর্থাৎ, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে এর ভিত্তিকে শক্তিশালী করা এবং কর্মসংস্থান বাড়ানো—দুটো বিষয় আসলে একই সুতোয় গাঁথা। এ কারণেই এই প্রশ্নের উত্তরটি আমার আগের উত্তরের মতোই হবে। আমি সরকারকে তিন বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনা নিতে বলেছি। সরকারের ইতিমধ্যে তিন মাস পার হয়ে গেছে। কোনো কাজ শুরু করতে আরও পাঁচ-ছয় মাস সময় লাগবে। ফলে তিন বছর মেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শেষে সরকার অন্তত এক বছর সময় পাবে এর সুফল বা অর্জনগুলো ঘরে তোলার জন্য। এই হিসাবটি মাথায় রেখেই আমি তিন বছরের কথা বলেছি।

স্ট্রিম: সাধারণত একাডেমিশিয়ান বা তাত্ত্বিকরাই পরিকল্পনা প্রণয়নের সঙ্গে বেশি যুক্ত থাকেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কাজ করা ব্যক্তিদের যুক্ত করা হয় না। অনেকে বলেণ, এ কারণেই পরিকল্পনাগুলো মাঝপথে গিয়ে হোঁচট খায়। পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় প্র্যাকটিশনার, আপনাদের মতো ব্যবসায়ী বা অন্যান্য পেশার মানুষদের যুক্ত করা উচিত কি না?

মো. ফজলুল হক: খুবই চমৎকার একটি কথা বলেছেন। কয়েক দিন আগে একজন অর্থনীতিবিদের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল। তাত্ত্বিক মানুষদের সঙ্গে আমাদের মূল পার্থক্য হলো—তাঁরা সবসময় বলেন, ‘এটি হওয়া উচিত’, যেটাকে আমরা হয়তো পুঁথিগত বলি। আর আমরা বলি, ‘এটি করা সম্ভব।’ পার্থক্যটা ঠিক এখানেই। ‘কী হওয়া উচিত’-এর চেয়ে ‘কী করা সম্ভব’—তার নিরিখেই আসলে পরিকল্পনা করা ও বাস্তবায়ন করা দরকার।

মানুষ যে পরিমাণ কর দেয়, তার পুরোটাই রাষ্ট্রীয় কোষাগারে পৌঁছায় না। করদাতার পকেট থেকে রাষ্ট্রীয় কোষাগার—এই দুই গন্তব্যের মাঝখানে যে প্রতিবন্ধকতা বা অস্বচ্ছতা রয়েছে, তা দূর করা অত্যন্ত জরুরি। এটি দূর করতে কর প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং সরকারের অন্যান্য সংস্থার ইতিবাচক ও সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা প্রয়োজন।

তবে তত্ত্বেরও প্রয়োজন আছে। আদর্শগতভাবে কী হওয়া উচিত, সেটাও আমাদের জানা থাকা দরকার। এটি আমার চেয়ে যিনি তত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা বা গবেষণা করেন, তিনি অনেক ভালো জানেন। তাই তাঁকেও দরকার, কারণ স্ট্যান্ডার্ড বা মানদণ্ডটা আমাদের জানতে হবে। অন্যদিকে, আমাদের মতো প্র্যাকটিশনার—শুধু ব্যবসায়ী নন, বিভিন্ন খাতের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা সমাজবিজ্ঞানী, যাঁরা মাঠপর্যায়ে বা প্র্যাকটিক্যাল ফিল্ডে কাজ করছেন—তাদের প্র্যাকটিক্যাল নলেজের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ তাঁরা মাঠের বাস্তবতা জানেন। এই তত্ত্ব আর বাস্তবতার যখন একটি সঠিক মিশেল বা সমন্বয় হবে, তখনই একটি সফল কাজ করা সম্ভব। আপনি একদম ঠিক বলেছেন, শুধু তত্ত্ব দিয়ে পরিকল্পনা করলে যখন বাস্তবের সঙ্গে মিলবে না, তখন হতাশা তৈরি হবে এবং একপর্যায়ে প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যাবে।

স্ট্রিম: আমাদের দেশের পরিকল্পনা কমিশনে তো শুধু অর্থনীতিবিদ বা এমন তাত্ত্বিকরাই বসেন, কোনো প্র্যাকটিশনারকে সেখানে রাখা বা ডাকা হয় না। সেখানে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ, শক্তি বা জ্বালানি বিভাগ, অবকাঠামো বিভাগ—সবই আছে। এ বিষয়ে কি বলবেন?

মো. ফজলুল হক: এটি অবশ্যই করা উচিত। তবে এখানে আমলাতন্ত্রের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তারা নিজেদের গণ্ডির ভেতরে থাকতেই পছন্দ করেন। এটি হয়তো শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বের আমলাতন্ত্রের চিত্রই কমবেশি এক। এখন কাকে ডাকবেন বা কাকে রাখবেন না—সেই ক্ষমতা তো আমলাদের হাতেই, প্র্যাকটিশনার বা আমাদের হাতে নেই।

ঠিক এই জায়গাতেই রাজনৈতিক সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এই মেলবন্ধন তৈরির দায়িত্বটা সরকারকেই নিতে হবে। তাদের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে যেন পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে সব জায়গাতেই তাত্ত্বিক ও আমলাদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট খাতের প্র্যাকটিশনাররাও থাকেন। প্র্যাকটিশনার বলতে শুধু ব্যবসায়ী নন; স্বাস্থ্য খাতে ডাক্তার, প্রকৌশল খাতে ইঞ্জিনিয়ার বা হিসাবরক্ষণ খাতে অ্যাকাউন্টিংয়ের লোকজন থাকতে পারেন। বিভিন্ন খাতের এসব প্র্যাকটিশনারকে পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় অবশ্যই রাখা উচিত। এতে করে পরিকল্পনাটি আরও রিচ এবং বাস্তবমুখী হবে। একজন প্র্যাকটিশনারের কাছ থেকেই আপনি জানতে পারবেন যে বাস্তবে কতটা এগোনো সম্ভব বা পরিকল্পনাটি কতটা বাস্তবায়নযোগ্য। কাগজের কলমে যিনি পরিকল্পনা তৈরি করেন, তাঁর চেয়ে যিনি প্রতিদিন মাঠে কাজ বাস্তবায়ন করেন এবং প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করেন, তাঁর অভিজ্ঞতার আসলে কোনো বিকল্প নেই।

স্ট্রিম: যেমন ধরুন, কাগজে কলমে বসে ঠিক করে ফেলা হলো যে এক কোটি কর্মসংস্থান হয়ে যাবে, কিন্তু বাস্তবে আদৌ তা হবে কি না বা এর জন্য কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে—সেসব কিন্তু বলা থাকে না।

মো. ফজলুল হক: হ্যাঁ, বিষয়টা তেমনই। যেমন অনেক সময় কারখানায় কেউ হয়তো মুখের কথায় বলে ফেলে, "স্যার, চিন্তা করবেন না, এটা কোনো কাজই না, সাত দিনেই হয়ে যাবে!" কিন্তু যখনই তাকে বিষয়টি লিখিত আকারে দিতে বলা হয়, তখন দেখা যায় কাজটা সাত দিনে হচ্ছে না, বরং নয় দিন লাগছে। মুখে বলাটা খুব সহজ, কিন্তু যখনই আপনি লিখতে যাবেন, তখন আপনার ভেতর একটি দায়িত্ববোধ কাজ করবে। তখন হিসাবটা মেলাতে হয় যে, আমি সাত দিনে কাজটা কীভাবে করব।

আপনি ঠিকই বলেছেন, সরকার হয়তো এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির কথা বলছে। কিন্তু এটি যখন লিখিত আকারে বা ডিটেইল পরিকল্পনায় আসবে, তখন বোঝা যাবে বাস্তবতার সঙ্গে এর কতটা ফারাক। প্রাথমিকভাবে হয়তো বলা হবে যে—এখানে এতগুলো প্রজেক্ট করব, ওখানে এতগুলো করব, এভাবেই এক কোটি হয়ে যাবে। এভাবে বললে হয়তো ফারাকটা ধরা পড়বে না। কিন্তু আপনি যখন আরও বিস্তারিত পরিকল্পনায় যাবেন, গভীরে যাবেন, তখন দেখবেন আপনি ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছেন এবং বুঝতে পারবেন যে বাস্তবে এটি এতটা সহজ নয়।

সর্বাধিক পঠিত
লেটেস্ট
Ad 300x250

সম্পর্কিত