মো. রাশিদুল ইসলাম রাসেল; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর, বাংলাদেশের ‘লুক ইস্ট’ বা পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতি, চীনের সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব এবং ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
স্ট্রিম ডেস্ক

স্ট্রিম: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে চীন সফর করছেন। ক্ষমতা গ্রহণের পর নিজের প্রথম সরকারি সফরে তিনি মালয়েশিয়ায় এবং সেখান থেকেই তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে পৌঁছেছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই চীন সফরটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
রাশিদুল ইসলাম: বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান তার সরকারের দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে প্রথমেই বেছে নিয়েছেন মালয়েশিয়া। বলা যায় খুব সফলভাবেই তার মালয়েশিয়ায় সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সেখান থেকেই তিনি চীনে পৌঁছেছেন। চীনে তার এই সফরটি বেশ কয়েকটি কারণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমত, বাংলাদেশের দুটি মেজর পাওয়ার প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে একটি চীন। ঐতিহাসিকভাবেই চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি সুসম্পর্ক রয়েছে এবং ক্ষমতাসীন সব সরকারই তা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।
দ্বিতীয়ত, ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে এই সফরটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সঙ্গে প্রতিবেশী ভারতের যে ধরনের সম্পর্ক ছিল, তা দেশের রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। এ কারণে প্রথম সফর হিসেবে ভারতকে বেছে নেওয়াটা বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারের জন্য উপযোগী ছিল না। তাই প্রধানমন্ত্রীর এই চীন সফরটি অপ্রত্যাশিত নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় খুবই প্রত্যাশিত বলেই মনে করছি।
স্ট্রিম: অতীতে দেখা গেছে, বাংলাদেশের সরকারপ্রধানরা দায়িত্ব গ্রহণ করে সাধারণত প্রথমেই ভারত সফরে গেছেন। এক্ষেত্রে তারেক রহমান ব্যতিক্রম ঘটালেন। এটি কি বিশেষ কোনো বার্তা বহন করে? বাংলাদেশ কি চীনের দিকে আরও বেশি ঝুঁকেছে?
রাশিদুল ইসলাম: বাংলাদেশ এর আগেও যখনই চীনের দিকে ঝুঁকেছে, যেটাকে আমরা আমাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় 'টিল্ট' বলি, সেই ঝোঁকাটা কখনোই এটা বোঝায়নি যে আমরা আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতকে সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করেছি। এর মানে হলো, আমরা কিছু ক্ষেত্রে চীনকে অগ্রাধিকার দিলেও ভারতের সঙ্গে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছি। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরটা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও, একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট আগ্রহী।
বাংলাদেশের এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর প্রেক্ষাপট ভারত বোঝে। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পরের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত অত্যন্ত স্বাভাবিক। ভারতীয় গণমাধ্যম এবং বিশ্লেষকরাও বলছেন, এই সফরের কারণে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, 'প্র্যাগমাটিজম' বা বাস্তবতার নিরিখেই দুই দেশ সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করবে। জুলাই ২০২৪-এর সংকট কাটিয়ে ওঠা যে জরুরি, তা উভয় দেশই উপলব্ধি করে। তাই প্রধানমন্ত্রীর এই চীন সফর বাংলাদেশ-ভারতের চলমান সম্পর্ক উন্নয়নের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে না বলেই আমার বিশ্বাস।
স্ট্রিম: প্রধানমন্ত্রীর এই চীন সফর সামরিক, অর্থনৈতিক বা অন্যান্য প্রেক্ষাপটে কতটা কার্যকর হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
রাশিদুল ইসলাম: এটি আসলে সামনের দিনগুলোতেই দেখার বিষয়। তবে অতীতের পরিসংখ্যান বলে, চীন সব সময়ই বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করেছে—তা অর্থনীতি হোক বা সামরিক খাত। বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে এক ধরনের টানাপোড়েন চলছে, এশীয় ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে চীন সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চাইবে। তারা চাইবে বাংলাদেশকে ভারতের প্রভাব বলয় থেকে বের করে নিজেদের কাছাকাছি রাখতে।
তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সরকার 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতির ভিত্তিতে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছেন। তাই বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আরও একধাপ এগোলেও তা পুরোপুরি একপক্ষীয় হবে না।
এখানে আরেকটি বিষয় স্মরণযোগ্য। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মা, প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদে (২০০১-এর পর) বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে 'লুক ইস্ট' (পূর্বমুখী) পলিসির উদ্ভব ঘটেছিল। তখন পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে জোর দেওয়া হয়েছিল। তারেক রহমানের বর্তমান নীতিতেও সেই ধারাবাহিকতা স্পষ্ট। তিনি শুধু চীনের সঙ্গেই নয়, বৃহত্তর পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করতে চাইছেন।
মালয়েশিয়া সফরের মাধ্যমে আসিয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা তারই অংশ। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আসিয়ানের 'সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার' হওয়ার চেষ্টা করছে এবং আঞ্চলিক মুক্তবাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) সুবিধাদি কাজে লাগানোর সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। সুতরাং, প্রধানমন্ত্রীর এই চীন সফরকে কেবল ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা ঠিক হবে না। এটিকে বৃহত্তর 'লুক ইস্ট' বা পূর্বমুখী নীতির আলোকে বিশ্লেষণ করলে এর কৌশলগত গুরুত্ব আরও ভালোভাবে অনুধাবন করা যাবে।
স্ট্রিম: তার মানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কি এখন পুরোপুরি পূর্বমুখী?
রাশিদুল ইসলাম: বাংলাদেশ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে সেরকম ঘোষণা দেয়নি। তবে 'লুক ইস্ট' বা পূর্বমুখী নীতির যে একটি ধারাবাহিকতা থাকবে এটা খুবই প্রত্যাশিত। অতীতে যখন এই নীতিটি গ্রহণ করা হয়েছিল, তখন তা পররাষ্ট্র বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষের কাছে বেশ সমাদৃত হয়েছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ যদি এটিকে পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করে, তবে তা দেশের জন্য সুফলই বয়ে আনবে। কারণ, বাংলাদেশ সবসময়ই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়াতে চেয়েছে। ভূ-রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ তিন দিক থেকে ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং অন্যান্য রাষ্ট্র থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। এই বাস্তবতায় পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও কানেক্টিভিটি বৃদ্ধি করা ছাড়া বাংলাদেশের সামনে খুব বেশি বিকল্প নেই। জনাব তারেক রহমান অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবেই এই 'লুক ইস্ট' নীতিটি পুনরুজ্জীবিত করতে যাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে।
স্ট্রিম: বাংলাদেশ এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় যে সংকটে ভুগছে, সেটি হলো অর্থনৈতিক সংকট। এক্ষেত্রে সরকারের সামনে কি এই মুহূর্তে চীন ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প রয়েছে, যারা বাংলাদেশকে এত বড় পরিসরে সাহায্য করতে পারবে? আর এক্ষেত্রে চীন আসলে আমাদের জন্য কতটা বিশ্বস্ত বন্ধু?
রাশিদুল ইসলাম: অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করলে বর্তমানে চীনের কোনো বিকল্প আসলে বাংলাদেশের হাতে নেই। আমাদের পশ্চিমা উন্নয়ন অংশীদাররাও সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিকভাবে খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। পশ্চিমা বিশ্ব এবং যুক্তরাষ্ট্র এই বাস্তব পরিস্থিতি বোঝে। তাই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের জায়গা থেকে তারা ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক জোরদারের এই প্রক্রিয়াকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে না।
বিগত সরকার, যাদের ভারতমুখী বলে মনে করা হতো, তারাও চীনের সঙ্গে বড় বড় মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছিল এবং চীন তাতে ইতিবাচক সাড়াও দিয়েছিল। সেই প্রকল্পগুলোর কাজ এখনো চলমান। যতটুকু জানা যাচ্ছে, বর্তমান সরকার অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য চীনের কাছ থেকে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পাওয়ার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে তিস্তা পানি ব্যবস্থাপনা, মাতারবাড়িতে বিনিয়োগ এবং মোংলা বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প উল্লেখযোগ্য। এত বিপুল পরিমাণ অর্থায়ন করার সক্ষমতা কেবল চীনেরই রয়েছে। তাই এই মুহূর্তে চীনের কোনো বিকল্প আসলেই বাংলাদেশের সামনে নেই।
স্ট্রিম: চীনের সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ পরিষ্কার। কিন্তু বাংলাদেশের দিকে এত মনোযোগ দেওয়া বা এত বিশাল বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে চীনের স্বার্থটি কী?
রাশিদুল ইসলাম: এখানে চীনের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক—উভয় ধরনের স্বার্থই জড়িত। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ চীনের জন্য একটি বিশাল বাজার। আমাদের দেশে তাদের ব্যাপক রপ্তানি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ রয়েছে, পাশাপাশি হাজার হাজার চীনা কর্মী এখানে কাজ করছেন—সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক লাভ তাদের আছেই।
ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকেও বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মনোযোগের কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বৈশ্বিক দ্বন্দ্ব সুবিদিত; যুক্তরাষ্ট্রের 'ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি' মূলত চীনকেন্দ্রিক। যুক্তরাষ্ট্র যেমন বাংলাদেশের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ভূ-কৌশলগত সুবিধা নিতে চায়, চীনও ঠিক একইভাবে এই অঞ্চল থেকে সুবিধা নিতে আগ্রহী।
এছাড়া, আঞ্চলিক আধিপত্য নিয়ে ভারতের সঙ্গে চীনের দীর্ঘস্থায়ী প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সীমান্ত বিরোধ রয়েছে, যা ভবিষ্যতে বড় সংঘাতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা করেন অনেকেই। এই দীর্ঘমেয়াদি প্রেক্ষাপটে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে চীনের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশকে সামরিকভাবে শক্তিশালী করার পেছনেও তাদের এই চিন্তাধারা কাজ করতে পারে। বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের প্রায় ৭০ শতাংশই আসে চীন থেকে। এটি বাংলাদেশের যেমন প্রয়োজন, তেমনি চীনের জন্যও আর্থিকভাবে লাভজনক। সার্বিকভাবে, চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কটি কোনো একতরফা বিষয় নয়, এটি একটি 'উইন-উইন' বা উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক সম্পর্ক।
স্ট্রিম: ভারতের 'শিলিগুড়ি করিডর'-এর খুব কাছে আমাদের তিস্তা প্রকল্পে চীনা অর্থায়ন এবং লালমনিরহাটে বিমানঘাঁটির আধুনিকায়ন নিয়ে নয়াদিল্লির গভীর উদ্বেগ রয়েছে। ভারতের এই ভূকৌশলগত অস্বস্তি এবং বাংলাদেশের নিজস্ব নদী ব্যবস্থাপনা ও সামরিক চাহিদার মধ্যে ঢাকা কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে?
রাশিদুল ইসলাম: এখন পর্যন্ত সেখানে যতটুকু অগ্রগতি হয়েছে এবং আমরা যেসব তথ্য পাচ্ছি, তার ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এতে অবশ্যই একটি কৌশলগত সুবিধা রয়েছে। আর ভারতের দিক থেকে চিন্তা করলে, স্বাভাবিকভাবেই তাদের এই কৌশলগত সুবিধাটি ইতিবাচকভাবে দেখার কথা নয়। এক্ষেত্রে ভারতীয় গণমাধ্যমে নানা ধরনের উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে বলে জানা যায়, যদিও আমি নিশ্চিত নই যে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কি না।
তবে ভারতীয় গণমাধ্যমে এমন একটি ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি হয়েছে যে, বাংলাদেশ ভারতের জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে উঠছে। লালমনিরহাট বা নীলফামারী অঞ্চলটি ভারতের অত্যন্ত স্পর্শকাতর 'শিলিগুড়ি করিডোর' বা 'চিকেন নেক'-এর খুব কাছাকাছি অবস্থিত। ভবিষ্যতে সেখানে চীনা অর্থায়নে সামরিক তৎপরতা বাড়লে, ভারত সেটিকে নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। তবে বাংলাদেশ বিষয়টি সেভাবে দেখছে বলে আমি মনে করি না। ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর বা তাদের পরাজিত করার মতো কোনো প্রস্তুতি বাংলাদেশ নিচ্ছে—এমনটি ভাবার কোনো অবকাশ নেই। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এমন কিছু করার সক্ষমতাও নেই। তাছাড়া, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান টানাপোড়েনের সময়ে বাংলাদেশের দিক থেকে এমন কোনো উসকানিমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও নয়।
তবে এর পাশাপাশি আমাদের মনে রাখতে হবে, নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির অধিকার ও প্রয়োজনীয়তা প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্রেরই রয়েছে। সীমান্ত হত্যা ও অন্যান্য অমীমাংসিত বিরোধের কারণে ভারতের বিপরীতে বাংলাদেশের নিজস্ব একটি 'ডেটারেন্স' বা নিবৃত্তকরণ সক্ষমতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের এই সামরিক ও অবকাঠামোগত উদ্যোগগুলো শতভাগ যৌক্তিক। এটি সরাসরি ভারতের ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে হুমকির মুখে ফেলবে বলে আমি মনে করি না। এখন দেখার বিষয় হলো, ভবিষ্যতে দুই দেশ কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে বিষয়গুলোকে কীভাবে উপস্থাপন করে এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে কোনো যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পারে কি না।
স্ট্রিম: প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে যুদ্ধবিমানসহ অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম কেনার চুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, জানা গেছে যুক্তরাষ্ট্র কিছু পাল্টা প্রস্তাব দিলেও ঢাকা তা গ্রহণ করেনি। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক উন্নয়নকে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে দেখবে এবং বাংলাদেশ এই সম্পর্কগুলোর মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখবে?
রাশিদুল ইসলাম: এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষুণ্ন না করেই যে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চায়—এই বাস্তবতাটি যুক্তরাষ্ট্র অনুধাবন করে।
এক্ষেত্রে আমরা 'পাকিস্তান মডেল'-এর কথা ভাবতে পারি। পাকিস্তান চীনের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক বজায় রেখেও এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা প্রশমনেও যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের ওপর নির্ভর করেছে। সুতরাং, বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক বাড়ালেও যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টিকে বাস্তবতার আলোকেই দেখবে বলে আমার বিশ্বাস।
তাছাড়া, বাংলাদেশ যে সামরিক সরঞ্জামই কিনুক না কেন, তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো হুমকি নয়। একটি উদীয়মান মধ্যম সারির শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা এখনও বেশ সীমিত। মূলত নিজস্ব প্রতিরক্ষার জন্যই আমাদের এসব সরঞ্জাম প্রয়োজন। সামরিক বাহিনীকে আধুনিকায়নের যে 'ভিশন ২০৩০' রয়েছে, তার সঙ্গেও এই ক্রয়প্রক্রিয়া সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাংলাদেশ তার ৭০ শতাংশের বেশি সামরিক সরঞ্জাম চীন থেকে ক্রয় করে আসছে। তাই এটি হঠাৎ করে ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কে কোনো উত্তেজনা তৈরি করবে বলে মনে হয় না।
আরেকটি বিষয় হলো, বাংলাদেশের 'ইন্দো-প্যাসিফিক রূপরেখায়' নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে, যা কোনো ধরনের সামরিক সংঘাতে জড়ানোকে নিরুৎসাহিত করে। বাস্তবতার নিরিখে বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো সংঘাতের আশঙ্কা থাকলে তা মূলত মিয়ানমারের সঙ্গেই হতে পারে, যারা প্রায়শই আমাদের জন্য সামরিক হুমকি তৈরি করে। অন্যদিকে, ভারত একটি বৃহৎ ও শক্তিশালী প্রতিবেশী। তাদের সঙ্গে সরাসরি কোনো বৈরিতা না থাকলেও নিজেদের সুরক্ষায় ন্যূনতম 'ডিটারেন্স' বা নিবৃত্তকরণ সক্ষমতা অর্জন করা বাংলাদেশের জন্য জরুরি। এসব কারণেই বাংলাদেশের সামরিক আধুনিকায়ন প্রয়োজন, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থি নয়।
স্ট্রিম: সর্বশেষ, চব্বিশ-পরবর্তী বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা বা সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভারতের মনোভাব এখন পর্যন্ত কেমন দেখছেন? বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের চিন্তাভাবনা বা আচরণে কী প্রকাশ পাচ্ছে?
রাশিদুল ইসলাম: চব্বিশ-পরবর্তী সময়ে প্রথম দিকে ভারতের মনোভাব বেশ রক্ষণশীল ও ক্ষেত্রবিশেষে নেতিবাচক মনে হয়েছে। ভারতীয় মিডিয়া এবং উচ্চপর্যায় থেকে আসা কিছু বয়ান বা ন্যারেটিভ সেসময় দুই দেশের সম্পর্ককে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। তবে আশার কথা হলো, খুব দ্রুতই ওই ন্যারেটিভগুলোর গ্রহণযোগ্যতা কমে আসে।
বর্তমানে উভয় দেশের সরকারই সম্পর্ক উন্নয়নের ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশের একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সরকারকে সম্মান করা এবং তাদের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রাখা যে জরুরি, ভারত তা অনুধাবন করতে পেরেছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশও কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা বিভিন্ন সময়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। আশা করা যায়, অদূর ভবিষ্যতেই দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে আসবে। বর্তমানে ভিসা সংক্রান্ত যে জটিলতা রয়েছে, তা সাময়িক এবং শিগগিরই কেটে যাবে। এছাড়া দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক লেনদেনও আগের চেয়ে স্বাভাবিক হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিবেশী পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ নেই। তাই বাংলাদেশ ও ভারত—উভয় পক্ষকেই অত্যন্ত বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দিকে এগোতে হবে। তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝা প্রয়োজন যে, প্রতিবেশীর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখার অর্থ কোনোভাবেই 'নতজানু পররাষ্ট্রনীতি' নয়। এই মৌলিক পার্থক্যটি বুঝতে পারলে উভয় দেশই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আরও বেশি আগ্রহী হবে।
স্ট্রিম: ঢাকা স্ট্রিমকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
রাশিদুল ইসলাম: আপনাকেও ধন্যবাদ।

মো. রাশিদুল ইসলাম রাসেল; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর, বাংলাদেশের ‘লুক ইস্ট’ বা পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতি, চীনের সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব এবং ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
.png)
স্ট্রিম: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমানে চীন সফর করছেন। ক্ষমতা গ্রহণের পর নিজের প্রথম সরকারি সফরে তিনি মালয়েশিয়ায় এবং সেখান থেকেই তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে পৌঁছেছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই চীন সফরটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
রাশিদুল ইসলাম: বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান তার সরকারের দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে প্রথমেই বেছে নিয়েছেন মালয়েশিয়া। বলা যায় খুব সফলভাবেই তার মালয়েশিয়ায় সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সেখান থেকেই তিনি চীনে পৌঁছেছেন। চীনে তার এই সফরটি বেশ কয়েকটি কারণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমত, বাংলাদেশের দুটি মেজর পাওয়ার প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে একটি চীন। ঐতিহাসিকভাবেই চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি সুসম্পর্ক রয়েছে এবং ক্ষমতাসীন সব সরকারই তা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।
দ্বিতীয়ত, ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে এই সফরটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সঙ্গে প্রতিবেশী ভারতের যে ধরনের সম্পর্ক ছিল, তা দেশের রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। এ কারণে প্রথম সফর হিসেবে ভারতকে বেছে নেওয়াটা বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারের জন্য উপযোগী ছিল না। তাই প্রধানমন্ত্রীর এই চীন সফরটি অপ্রত্যাশিত নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় খুবই প্রত্যাশিত বলেই মনে করছি।
স্ট্রিম: অতীতে দেখা গেছে, বাংলাদেশের সরকারপ্রধানরা দায়িত্ব গ্রহণ করে সাধারণত প্রথমেই ভারত সফরে গেছেন। এক্ষেত্রে তারেক রহমান ব্যতিক্রম ঘটালেন। এটি কি বিশেষ কোনো বার্তা বহন করে? বাংলাদেশ কি চীনের দিকে আরও বেশি ঝুঁকেছে?
রাশিদুল ইসলাম: বাংলাদেশ এর আগেও যখনই চীনের দিকে ঝুঁকেছে, যেটাকে আমরা আমাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় 'টিল্ট' বলি, সেই ঝোঁকাটা কখনোই এটা বোঝায়নি যে আমরা আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতকে সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করেছি। এর মানে হলো, আমরা কিছু ক্ষেত্রে চীনকে অগ্রাধিকার দিলেও ভারতের সঙ্গে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছি। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরটা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও, একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট আগ্রহী।
বাংলাদেশের এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর প্রেক্ষাপট ভারত বোঝে। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পরের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত অত্যন্ত স্বাভাবিক। ভারতীয় গণমাধ্যম এবং বিশ্লেষকরাও বলছেন, এই সফরের কারণে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, 'প্র্যাগমাটিজম' বা বাস্তবতার নিরিখেই দুই দেশ সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করবে। জুলাই ২০২৪-এর সংকট কাটিয়ে ওঠা যে জরুরি, তা উভয় দেশই উপলব্ধি করে। তাই প্রধানমন্ত্রীর এই চীন সফর বাংলাদেশ-ভারতের চলমান সম্পর্ক উন্নয়নের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে না বলেই আমার বিশ্বাস।
স্ট্রিম: প্রধানমন্ত্রীর এই চীন সফর সামরিক, অর্থনৈতিক বা অন্যান্য প্রেক্ষাপটে কতটা কার্যকর হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
রাশিদুল ইসলাম: এটি আসলে সামনের দিনগুলোতেই দেখার বিষয়। তবে অতীতের পরিসংখ্যান বলে, চীন সব সময়ই বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করেছে—তা অর্থনীতি হোক বা সামরিক খাত। বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে এক ধরনের টানাপোড়েন চলছে, এশীয় ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে চীন সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চাইবে। তারা চাইবে বাংলাদেশকে ভারতের প্রভাব বলয় থেকে বের করে নিজেদের কাছাকাছি রাখতে।
তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সরকার 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতির ভিত্তিতে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছেন। তাই বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আরও একধাপ এগোলেও তা পুরোপুরি একপক্ষীয় হবে না।
এখানে আরেকটি বিষয় স্মরণযোগ্য। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মা, প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদে (২০০১-এর পর) বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে 'লুক ইস্ট' (পূর্বমুখী) পলিসির উদ্ভব ঘটেছিল। তখন পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে জোর দেওয়া হয়েছিল। তারেক রহমানের বর্তমান নীতিতেও সেই ধারাবাহিকতা স্পষ্ট। তিনি শুধু চীনের সঙ্গেই নয়, বৃহত্তর পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করতে চাইছেন।
মালয়েশিয়া সফরের মাধ্যমে আসিয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা তারই অংশ। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আসিয়ানের 'সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার' হওয়ার চেষ্টা করছে এবং আঞ্চলিক মুক্তবাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) সুবিধাদি কাজে লাগানোর সম্ভাব্যতা যাচাই করছে। সুতরাং, প্রধানমন্ত্রীর এই চীন সফরকে কেবল ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা ঠিক হবে না। এটিকে বৃহত্তর 'লুক ইস্ট' বা পূর্বমুখী নীতির আলোকে বিশ্লেষণ করলে এর কৌশলগত গুরুত্ব আরও ভালোভাবে অনুধাবন করা যাবে।
স্ট্রিম: তার মানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কি এখন পুরোপুরি পূর্বমুখী?
রাশিদুল ইসলাম: বাংলাদেশ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে সেরকম ঘোষণা দেয়নি। তবে 'লুক ইস্ট' বা পূর্বমুখী নীতির যে একটি ধারাবাহিকতা থাকবে এটা খুবই প্রত্যাশিত। অতীতে যখন এই নীতিটি গ্রহণ করা হয়েছিল, তখন তা পররাষ্ট্র বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষের কাছে বেশ সমাদৃত হয়েছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ যদি এটিকে পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করে, তবে তা দেশের জন্য সুফলই বয়ে আনবে। কারণ, বাংলাদেশ সবসময়ই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়াতে চেয়েছে। ভূ-রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ তিন দিক থেকে ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং অন্যান্য রাষ্ট্র থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। এই বাস্তবতায় পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও কানেক্টিভিটি বৃদ্ধি করা ছাড়া বাংলাদেশের সামনে খুব বেশি বিকল্প নেই। জনাব তারেক রহমান অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবেই এই 'লুক ইস্ট' নীতিটি পুনরুজ্জীবিত করতে যাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে।
স্ট্রিম: বাংলাদেশ এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় যে সংকটে ভুগছে, সেটি হলো অর্থনৈতিক সংকট। এক্ষেত্রে সরকারের সামনে কি এই মুহূর্তে চীন ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প রয়েছে, যারা বাংলাদেশকে এত বড় পরিসরে সাহায্য করতে পারবে? আর এক্ষেত্রে চীন আসলে আমাদের জন্য কতটা বিশ্বস্ত বন্ধু?
রাশিদুল ইসলাম: অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করলে বর্তমানে চীনের কোনো বিকল্প আসলে বাংলাদেশের হাতে নেই। আমাদের পশ্চিমা উন্নয়ন অংশীদাররাও সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিকভাবে খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। পশ্চিমা বিশ্ব এবং যুক্তরাষ্ট্র এই বাস্তব পরিস্থিতি বোঝে। তাই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের জায়গা থেকে তারা ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক জোরদারের এই প্রক্রিয়াকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে না।
বিগত সরকার, যাদের ভারতমুখী বলে মনে করা হতো, তারাও চীনের সঙ্গে বড় বড় মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছিল এবং চীন তাতে ইতিবাচক সাড়াও দিয়েছিল। সেই প্রকল্পগুলোর কাজ এখনো চলমান। যতটুকু জানা যাচ্ছে, বর্তমান সরকার অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য চীনের কাছ থেকে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পাওয়ার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে তিস্তা পানি ব্যবস্থাপনা, মাতারবাড়িতে বিনিয়োগ এবং মোংলা বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প উল্লেখযোগ্য। এত বিপুল পরিমাণ অর্থায়ন করার সক্ষমতা কেবল চীনেরই রয়েছে। তাই এই মুহূর্তে চীনের কোনো বিকল্প আসলেই বাংলাদেশের সামনে নেই।
স্ট্রিম: চীনের সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ পরিষ্কার। কিন্তু বাংলাদেশের দিকে এত মনোযোগ দেওয়া বা এত বিশাল বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে চীনের স্বার্থটি কী?
রাশিদুল ইসলাম: এখানে চীনের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক—উভয় ধরনের স্বার্থই জড়িত। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ চীনের জন্য একটি বিশাল বাজার। আমাদের দেশে তাদের ব্যাপক রপ্তানি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ রয়েছে, পাশাপাশি হাজার হাজার চীনা কর্মী এখানে কাজ করছেন—সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক লাভ তাদের আছেই।
ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকেও বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মনোযোগের কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বৈশ্বিক দ্বন্দ্ব সুবিদিত; যুক্তরাষ্ট্রের 'ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি' মূলত চীনকেন্দ্রিক। যুক্তরাষ্ট্র যেমন বাংলাদেশের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ভূ-কৌশলগত সুবিধা নিতে চায়, চীনও ঠিক একইভাবে এই অঞ্চল থেকে সুবিধা নিতে আগ্রহী।
এছাড়া, আঞ্চলিক আধিপত্য নিয়ে ভারতের সঙ্গে চীনের দীর্ঘস্থায়ী প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সীমান্ত বিরোধ রয়েছে, যা ভবিষ্যতে বড় সংঘাতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা করেন অনেকেই। এই দীর্ঘমেয়াদি প্রেক্ষাপটে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে চীনের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশকে সামরিকভাবে শক্তিশালী করার পেছনেও তাদের এই চিন্তাধারা কাজ করতে পারে। বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের প্রায় ৭০ শতাংশই আসে চীন থেকে। এটি বাংলাদেশের যেমন প্রয়োজন, তেমনি চীনের জন্যও আর্থিকভাবে লাভজনক। সার্বিকভাবে, চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কটি কোনো একতরফা বিষয় নয়, এটি একটি 'উইন-উইন' বা উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক সম্পর্ক।
স্ট্রিম: ভারতের 'শিলিগুড়ি করিডর'-এর খুব কাছে আমাদের তিস্তা প্রকল্পে চীনা অর্থায়ন এবং লালমনিরহাটে বিমানঘাঁটির আধুনিকায়ন নিয়ে নয়াদিল্লির গভীর উদ্বেগ রয়েছে। ভারতের এই ভূকৌশলগত অস্বস্তি এবং বাংলাদেশের নিজস্ব নদী ব্যবস্থাপনা ও সামরিক চাহিদার মধ্যে ঢাকা কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে?
রাশিদুল ইসলাম: এখন পর্যন্ত সেখানে যতটুকু অগ্রগতি হয়েছে এবং আমরা যেসব তথ্য পাচ্ছি, তার ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এতে অবশ্যই একটি কৌশলগত সুবিধা রয়েছে। আর ভারতের দিক থেকে চিন্তা করলে, স্বাভাবিকভাবেই তাদের এই কৌশলগত সুবিধাটি ইতিবাচকভাবে দেখার কথা নয়। এক্ষেত্রে ভারতীয় গণমাধ্যমে নানা ধরনের উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে বলে জানা যায়, যদিও আমি নিশ্চিত নই যে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কি না।
তবে ভারতীয় গণমাধ্যমে এমন একটি ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি হয়েছে যে, বাংলাদেশ ভারতের জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে উঠছে। লালমনিরহাট বা নীলফামারী অঞ্চলটি ভারতের অত্যন্ত স্পর্শকাতর 'শিলিগুড়ি করিডোর' বা 'চিকেন নেক'-এর খুব কাছাকাছি অবস্থিত। ভবিষ্যতে সেখানে চীনা অর্থায়নে সামরিক তৎপরতা বাড়লে, ভারত সেটিকে নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। তবে বাংলাদেশ বিষয়টি সেভাবে দেখছে বলে আমি মনে করি না। ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর বা তাদের পরাজিত করার মতো কোনো প্রস্তুতি বাংলাদেশ নিচ্ছে—এমনটি ভাবার কোনো অবকাশ নেই। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এমন কিছু করার সক্ষমতাও নেই। তাছাড়া, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বর্তমান টানাপোড়েনের সময়ে বাংলাদেশের দিক থেকে এমন কোনো উসকানিমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও নয়।
তবে এর পাশাপাশি আমাদের মনে রাখতে হবে, নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির অধিকার ও প্রয়োজনীয়তা প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্রেরই রয়েছে। সীমান্ত হত্যা ও অন্যান্য অমীমাংসিত বিরোধের কারণে ভারতের বিপরীতে বাংলাদেশের নিজস্ব একটি 'ডেটারেন্স' বা নিবৃত্তকরণ সক্ষমতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের এই সামরিক ও অবকাঠামোগত উদ্যোগগুলো শতভাগ যৌক্তিক। এটি সরাসরি ভারতের ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে হুমকির মুখে ফেলবে বলে আমি মনে করি না। এখন দেখার বিষয় হলো, ভবিষ্যতে দুই দেশ কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে বিষয়গুলোকে কীভাবে উপস্থাপন করে এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে কোনো যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পারে কি না।
স্ট্রিম: প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে যুদ্ধবিমানসহ অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম কেনার চুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, জানা গেছে যুক্তরাষ্ট্র কিছু পাল্টা প্রস্তাব দিলেও ঢাকা তা গ্রহণ করেনি। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক উন্নয়নকে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে দেখবে এবং বাংলাদেশ এই সম্পর্কগুলোর মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখবে?
রাশিদুল ইসলাম: এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষুণ্ন না করেই যে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চায়—এই বাস্তবতাটি যুক্তরাষ্ট্র অনুধাবন করে।
এক্ষেত্রে আমরা 'পাকিস্তান মডেল'-এর কথা ভাবতে পারি। পাকিস্তান চীনের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক বজায় রেখেও এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা প্রশমনেও যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের ওপর নির্ভর করেছে। সুতরাং, বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক বাড়ালেও যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টিকে বাস্তবতার আলোকেই দেখবে বলে আমার বিশ্বাস।
তাছাড়া, বাংলাদেশ যে সামরিক সরঞ্জামই কিনুক না কেন, তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো হুমকি নয়। একটি উদীয়মান মধ্যম সারির শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা এখনও বেশ সীমিত। মূলত নিজস্ব প্রতিরক্ষার জন্যই আমাদের এসব সরঞ্জাম প্রয়োজন। সামরিক বাহিনীকে আধুনিকায়নের যে 'ভিশন ২০৩০' রয়েছে, তার সঙ্গেও এই ক্রয়প্রক্রিয়া সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাংলাদেশ তার ৭০ শতাংশের বেশি সামরিক সরঞ্জাম চীন থেকে ক্রয় করে আসছে। তাই এটি হঠাৎ করে ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কে কোনো উত্তেজনা তৈরি করবে বলে মনে হয় না।
আরেকটি বিষয় হলো, বাংলাদেশের 'ইন্দো-প্যাসিফিক রূপরেখায়' নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে, যা কোনো ধরনের সামরিক সংঘাতে জড়ানোকে নিরুৎসাহিত করে। বাস্তবতার নিরিখে বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো সংঘাতের আশঙ্কা থাকলে তা মূলত মিয়ানমারের সঙ্গেই হতে পারে, যারা প্রায়শই আমাদের জন্য সামরিক হুমকি তৈরি করে। অন্যদিকে, ভারত একটি বৃহৎ ও শক্তিশালী প্রতিবেশী। তাদের সঙ্গে সরাসরি কোনো বৈরিতা না থাকলেও নিজেদের সুরক্ষায় ন্যূনতম 'ডিটারেন্স' বা নিবৃত্তকরণ সক্ষমতা অর্জন করা বাংলাদেশের জন্য জরুরি। এসব কারণেই বাংলাদেশের সামরিক আধুনিকায়ন প্রয়োজন, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থি নয়।
স্ট্রিম: সর্বশেষ, চব্বিশ-পরবর্তী বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা বা সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভারতের মনোভাব এখন পর্যন্ত কেমন দেখছেন? বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের চিন্তাভাবনা বা আচরণে কী প্রকাশ পাচ্ছে?
রাশিদুল ইসলাম: চব্বিশ-পরবর্তী সময়ে প্রথম দিকে ভারতের মনোভাব বেশ রক্ষণশীল ও ক্ষেত্রবিশেষে নেতিবাচক মনে হয়েছে। ভারতীয় মিডিয়া এবং উচ্চপর্যায় থেকে আসা কিছু বয়ান বা ন্যারেটিভ সেসময় দুই দেশের সম্পর্ককে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। তবে আশার কথা হলো, খুব দ্রুতই ওই ন্যারেটিভগুলোর গ্রহণযোগ্যতা কমে আসে।
বর্তমানে উভয় দেশের সরকারই সম্পর্ক উন্নয়নের ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশের একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সরকারকে সম্মান করা এবং তাদের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রাখা যে জরুরি, ভারত তা অনুধাবন করতে পেরেছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশও কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা বিভিন্ন সময়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। আশা করা যায়, অদূর ভবিষ্যতেই দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে আসবে। বর্তমানে ভিসা সংক্রান্ত যে জটিলতা রয়েছে, তা সাময়িক এবং শিগগিরই কেটে যাবে। এছাড়া দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক লেনদেনও আগের চেয়ে স্বাভাবিক হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিবেশী পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ নেই। তাই বাংলাদেশ ও ভারত—উভয় পক্ষকেই অত্যন্ত বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দিকে এগোতে হবে। তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝা প্রয়োজন যে, প্রতিবেশীর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখার অর্থ কোনোভাবেই 'নতজানু পররাষ্ট্রনীতি' নয়। এই মৌলিক পার্থক্যটি বুঝতে পারলে উভয় দেশই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আরও বেশি আগ্রহী হবে।
স্ট্রিম: ঢাকা স্ট্রিমকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
রাশিদুল ইসলাম: আপনাকেও ধন্যবাদ।
.png)
.png)

এই মুহূর্তে আমাদের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আস্থার সংকট। এই সংকটকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়—দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক। দেশীয় আস্থার সংকট মূলত বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কাজ করছে। অন্যদিকে সরকারের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা এখনো সন্দিহান।
১২ আগস্ট ২০২৬
ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত মুহূর্ত ছিল ৫ আগস্টের ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি। এর পেছনের পটভূমি এবং পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের নানা বিষয় নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমের মুখোমুখি হয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। সাক্ষাৎকার নিয়
০৪ আগস্ট ২০২৬
আমাদের মোট আর্থিক ব্যবস্থার ৯০ শতাংশের বেশিই ব্যাংকনির্ভর। বাকি ১০ শতাংশের কম জুড়ে রয়েছে শেয়ারবাজার, বিমা ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান। সুতরাং, এমন একটি ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলোকে ভালো অবস্থানে না নিতে পারলে নিশ্চিতভাবেই দেশের পুরো আর্থিক কার্যক্রমই স্থবির হয়ে পড়বে।
৩১ জুলাই ২০২৬
নেতৃত্বকে জানতে হবে কীভাবে কাজ আদায় করে নিতে হয়। গৃহকর্ত্রীকে যেমন জানতে হয় গৃহকর্মীর কাছ থেকে কীভাবে কাজ আদায় করতে হবে, ঠিক তেমনি সরকারের নীতিনির্ধারকদেরও জানতে হবে আমলাদের দিয়ে কীভাবে নীতি বাস্তবায়ন করতে হয়। সরকারে যদি দলীয়, অযোগ্য বা অপদার্থ লোক বসানো হয়, তারা কোনো ইতিবাচক অবদান রাখতে পারবে না।
২৪ জুলাই ২০২৬