রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষকদের প্রতি ‘হুমকি ও অশালীন আচরণের’ অভিযোগ এনে তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাবি শাখা। রোববার (২১ ডিসেম্বর) রাতে শাখা ছাত্রদলের সহ-দপ্তর সম্পাদক সিয়াম বিন আইয়ুবের সই করা এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘এমন আচরণ শিক্ষার পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি এবং একজন ছাত্রনেতার কাছ থেকে এটি অগ্রহণযোগ্য ও অছাত্রসুলভ।’ একজন ছাত্রনেতা হিসেবে বারবার শিক্ষকদের সঙ্গে অশোভন ও মারমুখী আচরণ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের শামিল বলেও উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) আওয়ামীপন্থী হিসেবে অভিযুক্ত ছয় ডিনের পদত্যাগ দাবিতে দপ্তরগুলোতে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাকসু জিএস সালাউদ্দিন আম্মারের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। শিক্ষার্থীদের একাংশ ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা এই কর্মকাণ্ডকে ‘মব কালচার ও ফ্যাসিবাদী আচরণ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
অন্যদিকে আন্দোলনের মুখে ওই ছয়জন ডিন দায়িত্ব পালন করতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। রোববার (২১ ডিসেম্বর) রাতে অনুষ্ঠিত এক সভায় তারা এ সিদ্ধান্তের কথা জানান বলে নিশ্চিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক অধ্যাপক আখতার হোসেন মজুমদার। তিনি বলেছেন, ‘আমরা শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট ডিনদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। আলোচনায় ডিনরা তাদের দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।’
পরে রাতেই এ নিয়ে বিবৃতি প্রকাশ করেছে রাবি ছাত্রদল। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত করার উদ্দেশ্যে একটি কুচক্রী মহল ষড়যন্ত্র করছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উদ্দেশে রাকসু জিএস সালাউদ্দিন আম্মার প্রদত্ত হুমকিমূলক বক্তব্যে অছাত্রসুলভ আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুষ্ঠু পরিবেশের পরিপন্থি।’
একজন ছাত্রনেতা হিসেবে বারবার শিক্ষকদের সঙ্গে ‘অশোভন ও মারমুখী আচরণ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের শামিল’ আখ্যা দিয়ে বিবৃতি আরও বলা হয়, ‘জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে তথাকথিত তালা ঝোলানোর সংস্কৃতি আমাদের ফ্যাসিবাদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ইতিপূর্বে সে (সালাউদ্দিন আম্মার) উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্যসহ এক কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করার মাধ্যমে সারাদেশের শিক্ষক সমাজকে অপমান করেছিল, যা পুরো শিক্ষক সমাজ ও সচেতন শিক্ষার্থী মহলের নিকট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।’
শহীদ শামসুজ্জোহার কথা উল্লেখ করে ছাত্রদলের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘যে ঐতিহাসিক বিদ্যাপীঠে ছাত্রদের জন্য রক্ত দেওয়া শহীদ বুদ্ধিজীবী প্রফেসর ড. সৈয়দ শামসুজ্জোহা স্যার চির নিদ্রায় শায়িত, সেই পবিত্র বিদ্যাপীঠে সালাউদ্দিন আম্মারের মত মব-সন্ত্রাসী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করার অপচেষ্টা চালালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল স্তরের নেতা-কর্মী তা শক্ত হাতে প্রতিহত করবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় একটি গণতান্ত্রিক রাজনীতি চর্চা ও জ্ঞানের স্থান। কথায় কথায় বিভিন্ন মব তৈরি করা; শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কলার ধরে প্রশাসনিক ভবনের সামনে টানিয়ে রাখার হুমকি দেওয়া সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মতো। কারো বিরুদ্ধে যদি ফ্যাসিবাদের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকে, বিশ্ববিদ্যালয় তার বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নিতে পারে, মামলা দিতে পারে। কিন্তু এভাবে মবক্রেসি তৈরি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে একটা ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা কোনভাবেই কাম্য নয়। এভাবে তো বিশ্ববিদ্যালয় চলতে পারে না।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনস কমপ্লেক্সে আন্দোলনকারীরা। স্ট্রিম ছবিবিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর শিক্ষক সমিতি, ডিন, সিন্ডিকেট, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কমিটি এবং শিক্ষা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ১২টি অনুষদের ডিন নির্বাচনে আওয়ামীপন্থী হলুদ প্যানেল থেকে ছয়জন প্রার্থী নির্বাচিত হন। গত বুধবার এসব ডিনের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেও নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী গত ১১ ডিসেম্বর উপাচার্য তাদের স্ব-পদে থাকার নির্দেশ দেন।
গত রোববার (২১ ডিসেম্বর) সকাল ১০টার দিকে ছয় ডিনের পদত্যাগ দাবিতে ডিনস কমপ্লেক্সে যান একদল শিক্ষার্থী। পরে ডিনস কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন ভবনে অবস্থিত সংশ্লিষ্ট ডিনদের চেম্বারে তালা ঝুলিয়ে দেন তারা। এদিন কোনো ডিনই নিজ নিজ বিভাগের ক্লাসে উপস্থিত ছিলেন না বলে জানা গেছে।
পরে দুপুর আড়াইটার দিকে শিক্ষার্থীরা রেজিস্ট্রার দপ্তরে গিয়ে তাদের দাবি উপস্থাপন করেন। এ সময় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ ফয়সাল দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রেজিস্ট্রার ভবন ত্যাগ না করার ঘোষণা দেন। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা রেজিস্ট্রার দপ্তরের পাশাপাশি উপ-উপাচার্য ও প্রক্টর দপ্তরেও তালা ঝুলিয়ে দেন।
প্রায় আধা ঘণ্টা পর তালা খুলে দেওয়া হয়। এরপর উপ-উপাচার্য, প্রক্টর এবং জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। বৈঠকে তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় রাতে আরেকটি সভা আহ্বানের ঘোষণা দিয়ে সভা শেষ করা হয়।
জিএস আম্মারের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা
এই ঘটনায় রাকসু জিএস আম্মারের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা চলছে। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা এই কর্মকাণ্ডকে মব কালচার ও ফ্যাসিবাদী আচরণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। স্টুডেন্ট রাইটস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফাহির আমিন বলেন, ‘যে বা যারা শিক্ষকদের কলার ধরে টেনে বেঁধে রাখতে চায়, তিনি বা তারা মূলত ফ্যাসিবাদী শিক্ষকের না, সকল শিক্ষকেরই কলার ধরতে অভ্যস্ত। কিছুদিন আগে তারা একজন প্রোভিসির সঙ্গে বেয়াদবি করেছে, হেনস্তা করেছে। তিনি (প্রোভিসি) তো ফ্যাসিবাদপন্থী ছিলেন না। পলিটিক্যাল ফিল্ড অনুকূলে নেওয়ার জন্য যখন যার ইচ্ছে কলার ধরবে। আর শিক্ষার্থীদের দেখাবে অধিকার আদায়ে শিক্ষকের কলার ধরতে জানি। আমাকে বাহবা দাও।’
এ বিষয়ে রাবি শাখা ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক ও রাকসুর সাবেক জিএস প্রার্থী নাফিউল ইসলাম জীবন বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আজব এক সিস্টেমে চলছে। আরে ভাই, কোন যৌক্তিক দাবি আদায় করার জন্যে নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি আছে, সেগুলো না করে মব সৃষ্টি করে স্বার্থ হাসিল করাটা এখন কমন হয়ে গেছে। কিছু স্বার্থান্বেষী শিক্ষার্থী এটাকেই বড়ত্ব হিসেবে আখ্যায়িত করছে। শিক্ষকদের সঙ্গে চরম অসদাচরণ, শিক্ষকদের ন্যুনতম সম্মানবোধের জায়গা তারা রাখছে না। প্রো ভিসি, রেজিস্ট্রারসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্ধ্বতন সকল দপ্তর তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, ‘আজকে অধিকাংশ ডিপার্টমেন্টে স্যারেরা ক্লাস নিতে আসেননি। এখন আপনি হয়ত বলবেন, আমি আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের পক্ষ নিচ্ছি। নো, আমি তাদের পক্ষ নিচ্ছি না। যারা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। স্যারেরা ক্লাস নিতে আসলেন না, শিক্ষার সুষ্ঠু স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেল না; এটা নিয়ে রাকসু প্রতিনিধিরা চুপ কেন? ওহ সরি, রাকসু প্রতিনিধিই তো এই মবের অধিনায়ক।’
গণযোগাযোগ ও সংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী সাইফুর রাহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘রাকসু জিএস সালাউদ্দিন আম্মার যেভাবে বলপ্রয়োগ করে, জোর করে কোনো এক শক্তিশালী পক্ষের স্বার্থ উদ্ধারে উন্মাদনায় মেতেছেন। যেভাবে এই রাকসু তার নিজস্ব কর্ম কাঠামো ভুলে স্বৈরাচারী হয়ে উঠছে, এগুলো চরম মাত্রার ফ্যাসিবাদী আচরণ। দিনরাত ফ্যাসিবাদবিরোধী বিলাপ করে নিজেরা একই পথে পা বাঁড়াচ্ছেন, সেটা অ-সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে উপভোগ্য হলেও সত্যিকারের সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে অন্যায্য মনে হওয়ার কথা। এরা যখন কথা বলতে শুরু করবে, তখন এই রাকসু বলতে বাধ্য হবে ‘হামরা যাচ্ছু, যাচ্ছু’!
তিনি বলেন, ‘পদত্যাগ মানে স্বেচ্ছায় দায়িত্ব ছেড়ে আসা। অথচ জিএস আম্মার নিজেই অন্যের পদত্যাগপত্র লিখে আনলেন, চেম্বারে চেম্বারে গিয়ে তালা ঝুলিয়ে দিলেন। এর আগে, কলার ধরে প্রশাসন ভবনের সামনে বেঁধে রাখার হুমকি দিলেন; এ ধরনের আচরণ চরমপন্থী। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগপন্থী ৭০০ শিক্ষক, হাজার দুয়েক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাদ দিয়ে এসব পদে নতুন নিয়োগ দিতে। নিয়োগের প্রতি এতো লোভ কেন? স্বার্থ কার? কোন পক্ষের? কোন দলের? ন্যাচারাল জাস্টিস বলেও একটা ব্যাপার আছে। আপনারা এখন যা করছেন, পূর্বে কেউ না করলেও ভবিষ্যতে যে করবে না, তা ভুলে যাইয়েন না। মনে রাখবেন, আপনারাই এই কায়দা শিখিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে ছাত্রদলের বিবৃতির পরিপ্রেক্ষিতে নিজের আইডিতে একটি ফেসবুক পোস্ট দিয়েছেন সালাউদ্দিন আম্মার। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কিউট ছাত্রদল যেহেতু আমাকে নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে, সেহেতু আমি সঠিক পথেই আছি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সব স্তরের নেতা-কর্মী নাকি আমাকে শক্ত হাতে প্রতিহত করবে। মনোনয়নপত্র নেওয়ার দিন মনে আছে? বিশ্ববিদ্যালয়ের না, রাজশাহীর সর্বস্তরের কর্মী নিয়েও লাভ হয়নি। সালাউদ্দিন আম্মার একা দাঁড়াইয়া ছিল। ওইদিনও সব নেতা-কর্মীর স্লোগান, হুমকি-ধামকি দিয়ে একটা চুলও ছিঁড়তে পারে নাই। ডিনদের পদত্যাগ করাইলাম, বাকি কাজও করে যাবো।’