আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা নওগাঁয় বইছে উৎসবের আমেজ। শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্রই নির্বাচনী প্রচারণায় মুখর প্রার্থীরা। তবে এবারের নির্বাচনে বিশেষ নজর কেড়েছে নারী ভোটারদের সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ। জেলার ৬টি সংসদীয় আসনেই পুরুষ ভোটারের চেয়ে নারী ভোটারের সংখ্যা বেশি হওয়ায় বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জয়-পরাজয় নির্ধারণে নারীরাই হতে পারেন প্রধান নিয়ামক। তবে প্রথাগত প্রতিশ্রুতির বদলে এবার নারীরা চাচ্ছেন সরাসরি প্রতিনিধিত্ব ও বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা।
জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, নওগাঁর ১১টি উপজেলা নিয়ে গঠিত ৬টি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার ২৩ লাখ ২৯ হাজার ৫৯২ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১১ লাখ ৬৯ হাজার ৮০৭ জন, যা পুরুষ ভোটারের (১১ লাখ ৫৯ হাজার ৭৬৪ জন) তুলনায় প্রায় ১০ হাজার বেশি। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ২১ জন। এই বিপুল সংখ্যক নারী ভোটারের মন জয়ে ব্যস্ত বিএনপি, জামায়াত, সিপিবিসহ ৩২ জন প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বীরা।
নারীরা এখন কেবল ভোটাধিকার প্রয়োগেই তুষ্ট নন, তারা অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি তুলছেন। শহরের উকিল পাড়া এলাকার নারী উদ্যোক্তা লিপি খাতুন বলেন, ‘কর্মসংস্থানের অভাবে উদ্যোক্তা হয়েছি। তবে সহজ শর্তে ঋণ ও সরকারি সহায়তা না পেলে ব্যবসা বিস্তার করা কঠিন। আমরা এমন সরকার চাই যারা নারী উদ্যোক্তাদের প্রকৃত মূল্যায়ন করবে।’
নওগাঁর বাঙ্গাবাড়িয়া মহল্লার নারী উদ্যোক্তা শামিমা খানম। স্ট্রিম ছবিঅন্যদিকে, শহরের ফুটপাতে রুটি বিক্রেতা মোমেনা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ভোটের সময় আমাদের কদর বাড়ে, কিন্তু পরে আর কেউ খোঁজ রাখে না। আমরা শ্রমজীবী নারীদের মর্যাদা দেয়—এমন সরকার চাই।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী প্রথম সাধারণ নির্বাচন হওয়ায় নতুন নারী ভোটারদের মধ্যে বাড়তি উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। মান্দা উপজেলার নতুন ভোটার আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, ‘আমি আমার পছন্দের প্রার্থীকে নির্ভয়ে ভোট দিতে চাই। কেন্দ্রগুলোতে বিশৃঙ্খলামুক্ত পরিবেশ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পর্যাপ্ত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।’
একুশে পরিষদ নওগাঁর সহ-সভাপতি ও সমাজকর্মী নাইচ পারভীন এক গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গের অবতারণা করেন। তিনি বলেন, ‘নারীরা প্রতিটি আন্দোলনে সামনের সারিতে থাকলেও পরে তাদের ঘরে সীমাবদ্ধ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এবার আমাদের দাবি, নারীরা যেন কেবল সংরক্ষিত আসনে নয়, সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদে নেতৃত্বের সুযোগ পান।’
নওগাঁ জজকোর্টের আইনজীবী সুমাইয়া আক্তার শিথী বলেন, ‘পরিবার থেকে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দেওয়ার যে চাপ থাকে, তা থেকে নারীদের মুক্তি চাই। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও নারীর সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে এমন সরকারই আগামী দিনে কাম্য।
এই আইনজীবী ও রাজনীতি বিশ্লেষক আরও বলেন, এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের নির্ধারক হয়ে উঠবে নাী ভোটাররা।
নওগাঁর ৬টি আসনেই এখন আলোচনার কেন্দ্রে নারী ভোটাররা। শেষ পর্যন্ত ব্যালট যুদ্ধে নারীরা কাকে বেছে নেন, তা দেখতে মুখিয়ে আছে পুরো জেলা।