leadT1ad

বগুড়া-৬ (সদর) আসন

বগুড়ায় একমাত্র নারী প্রার্থী দিলরুবা, প্রতিদ্বন্দ্বী তারেক রহমান

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
রাজশাহী

বগুড়া জেলার একমাত্র নারী প্রার্থী দিলরুবা। সংগৃহীত ছবি

দিলরুবা নূরীর হাতে নগদ আছে মাত্র ১০ হাজার টাকা। সম্পদ বলতে ৫৪ শতাংশ জমি ছাড়া আর কিছুই নেই। এ নিয়েই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ (সদর) আসনে ভোটের মাঠে নেমেছেন তিনি। এর বাইরে গণ-অর্থ সংগ্রহ এবং আত্মীয়-স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে পাওয়া ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা ভোটের মাঠে খরচ করবেন তিনি। নির্বাচিত হলে সাম্যের সমাজ বিনির্মাণের ইচ্ছা তাঁর। তাই কিছু কর্মী-সমর্থক নিয়ে সারা দিন শহরের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত ছুটে বেড়াচ্ছেন। সাবলীল মিশে যাচ্ছেন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে। দেশে শত কোটি টাকার প্রার্থীদের মধ্যে তাঁর এই স্বল্প খরচের ধারণা আর সাবলীল মিশতে পারার বিষয়টি আলাদাভাবে দৃষ্টি কাড়ছে ভোটারদের।

বগুড়া-৬ (সদর) আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দলের দুর্গো হিসেবে বিবেচিত এই আসনে তাঁর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন আরও চার প্রার্থী। জেলায় ৩৪ জন সংসদ সদস্য (এমপি) প্রার্থীর মধ্যে একমাত্র নারী প্রার্থী দিলরুবা লড়ছেন এই আসনেই। গতকাল শনিবার (২৪ জানুয়ারি) দুপুরে স্ট্রিমকে দিলরুবা বলেন, ‘নারী প্রার্থীদের অনেক রকম কথা শুনতে হয়, যেটা পুরুষ প্রার্থীদের শুনতে হয় না।’

দিলরুবা পেশায় আইনজীবী। ২০২২ সাল থেকে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) বগুড়া জেলার সদস্যসচিব এবং সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। সেই সঙ্গে নারী সংগঠনের জেলা শাখার সভাপতিও তিনি। নির্বাচন কেন্দ্র করে বামপন্থী ৯টি দলের জোট গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ‘মই’ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন এই নেত্রী।

নারীদের থেকেই নারী প্রতিনিধিত্ব

এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণ কম। সেখানে বগুড়ায় একজন নারী প্রার্থী হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন অনেক ভোটার। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নতুন তালিকা অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩। এর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ নারী ভোটার। কিন্তু নারী প্রার্থী মাত্র ৪ দশমিক ০৪ শতাংশ।

বগুড়ায় গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট প্রার্থী দিলরুবা। সংগৃহীত ছবি
বগুড়ায় গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট প্রার্থী দিলরুবা। সংগৃহীত ছবি

দল হিসেবে শক্তিশালী না হলেও ব্যক্তি দিলরুবার সাবলীল মিশতে পারা জন্য মুগ্ধ ভোটারেরা। তাঁর প্রার্থিতাকে স্বাগত জানিয়ে বগুড়া সদরের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বৃন্দাবনপাড়ার বাসিন্দা মাহফুজ মন্ডল বলেন, ‘বগুড়ায় একজন নারী নির্বাচনে এসেছেন, সেটা তো পজিটিভ। বগুড়া বিএনপির এলাকা, জামায়াতও ভালো করছে। সেই জায়গায় দিলরুবা ভোটে দাঁড়িয়েছেন। তিনি যেহেতু বাম সংগঠন থেকে এসেছেন, নির্বাচন করছেন এ জন্যই সাধুবাদ জানাই।’

নারী মুক্তির জন্য তাঁদের প্রতিনিধিত্ব জরুরি জানিয়ে বাসদের জেলা শাখার আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম পল্টু বলেন, ‘প্রার্থী বড়, ভোট অনেক পেতে পারে, এসব দেখলে হবে না। যে সংবিধান আমাকে সম-অধিকার দেয়, সেই সংবিধানের অধীনেই আমরা বৈষম্য করছি। নারীরা তার অধিকারের কথা বলবে, মুক্তির জন্য কথা বলবে। সেখানে নারী প্রতিনিধিত্ব না থাকলে তো হয় না।’

আন্দোলনের সাফল্য থেকে অনুপ্রেরণা

রাজনীতিতে দিলরুবার হাতেখড়ি ২০০৩ সালে, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের মাধ্যমে। তবে শিক্ষাজীবনের ক্যাম্পাসে নেতৃত্ব দেওয়া একটি আন্দোলনই দিলরুবাকে রাজনীতিতে আসা অনুপ্রেরণা দিয়েছে। তিনি জানান, স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে পড়াকালে ২০০৫ সালে আজিজুল হক কলেজে ইন্টারমিডিয়েট (উচ্চ মাধ্যমিক) শাখা বন্ধের প্রতিবাদে মাসব্যাপী আন্দোলনে সামনের সারিতে ছিলেন তিনি। এতে বন্ধের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সরকার। এই সাফল্য তাঁকে রাজনীতিতে আসতে অনুপ্রাণিত করে।

রাজনৈতিক সক্রিয়তা থেকেই এখনো সংসার করেননি দিলরুবা। তিনি বললেন, ‘রাজনৈতিক কমরেডদের নিয়েই আমরা একটা পারিবারিক জীবন। নারী কমরেড যারা আছেন বগুড়ায়, সংসার বলতে তাঁদের নিয়েই। পরিবারে ভাই-বোন, মা আছেন। তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক আছে। তাঁরা বিভিন্ন জায়গায় আছেন। যোগাযোগ আছে। কিন্তু আমি আমি আমার রাজনৈতিক কলিগদের নিয়েই একসঙ্গে অবস্থান করি।’

বগুড়ায় ভোটের প্রচারে বাসদ নেত্রী দিলরুবা। সংগৃহীত ছবি
বগুড়ায় ভোটের প্রচারে বাসদ নেত্রী দিলরুবা। সংগৃহীত ছবি

প্রথম নির্বাচনেই প্রতিপক্ষ হেভিওয়েট

রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকলেও এবার প্রথম কোনো নির্বাচন করছেন দিলরুবা। প্রথমবারই তাঁর সামনে আছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মতো হেভিওয়েট প্রার্থী। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন— জানতে চাইলে দিলরুবা বললেন, ‘আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। হেভিওয়েট প্রার্থীরও নিজস্ব আদর্শ আছে, দলীয় এজেন্ডা আছে। আমারও নিজস্ব মতামত, আদর্শ এবং দলীয় এজেন্ডা আছে। তিনি আমার প্রতিদ্বন্দ্বী— এভাবেই দেখছি। জনগণের কাছে আমি আমার বার্তা নিয়ে যাচ্ছি। প্রতিদ্বন্দ্বী কে, তা দেখে তো রাজনীতি হয় না। তাহলে তো আমি ভোটে আসতাম না।’

দিলরুবার বাড়ি শহরের বাদুড়তলা এলাকায়। হলফনামায় তথ্য অনুযায়ী, বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন মনোবিজ্ঞানে। পরবর্তীতে আইনে পড়াশোনা করে বগুড়া বারের সদস্য হয়েছেন।

নির্বাচিত হলে সাম্যের সমাজ বিনির্মাণের ইচ্ছার কথা জানিয়ে দিলরুবা বলেন, ‘আমি সাম্যের একটা সমাজ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষায় রাজনীতিটা করছি। এই যে মানুষে মানুষে বিশাল বৈষম্য, অর্থনৈতিক যে বৈষম্য— এটা কমাতে হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করা। কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা, ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, দেশের ৫০ পার্সেন্ট নারী, তারা নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে আসতে পারছে না। এসব বিষয় নিয়ে আমি কাজ করতে চাই।’

বগুড়া শহরে ভোটের প্রচারে বামজোট প্রার্থী দিলরুবা। সংগৃহীত ছবি
বগুড়া শহরে ভোটের প্রচারে বামজোট প্রার্থী দিলরুবা। সংগৃহীত ছবি

ভোটের মাঠে প্রতিবন্ধকতা

বড় দলের প্রার্থীদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের নমনীয়তাকে প্রতিবন্ধক হিসেবে মনে করেছেন দিলরুবা। নির্বাচনী এলাকায় দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত তিনটা মাইক ব্যবহারের নিয়ম থাকলেও বগুড়ায় সম্প্রতি একটি বড় রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী জনসভা কেন্দ্র করে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে শব্দের মাইক ব্যবহার করা হয়েছে। দিলরুবা বলেন, ‘এই অ্যাডভান্টেজগুলো তারা যখন পাবে, তখন আমার বার্তাটা ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে গিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছি।’

রাজধানীতে (ঢাকা-৮ আসন) প্রার্থী ওসমান হাদিকে হত্যা ও জড়িত ব্যক্তিরা এখনো ধরা না পড়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্ত অবস্থান দেখতে পাচ্ছেন না দিলরুবা। এই পরিস্থিতিতে দেশে গণতন্ত্র ফেরানো জরুরি মনে করেন তিনি। ‘আমরা কোনো অগণতান্ত্রিক সরকারকে দেখতে চাই না জন্য নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। গণতন্ত্রের পথে দেশটাকে ফিরিয়ে আনা খুব জরুরি। ষড়যন্ত্র চলছে, আমরা বার বার নোটিশ করছি যে, এগুলো রুখে দেওয়া দরকার।’

দেশে নারী ভোটার অনুপাতে ‍প্রার্থী না থাকায় প্রসঙ্গ তুলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বগুড়া জেলার সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন ইসলাম তুহিন বলেন, ‘দেশে রাজনীতিতে যে অবস্থা আমরা দেখছি; তাতে ভোটে নারী প্রার্থী দেখছিই না। সেই হিসেবে বগুড়ার দিলরুবা একজন হলেও পেয়েছি। এটাই বড় বিষয়। এটাই আমাদের প্রাপ্তি। তাঁকে স্বাগত জানাচ্ছি। এখন ভোটে কী ফলাফল হবে, কতদূর এগোতে পারবেন, সেটা তো পরের বিষয়।’

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত