‘স্পেস’ না পাওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষোভ শরিক নেতাদের

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০২৬, ২১: ৪৮
যমুনায় প্রতিটি টেবিল ঘুরে নেতাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন তারেক রহমান। ছবি: পিএমও

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আমন্ত্রণে তাঁর সঙ্গে বৈঠক করেছেন ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে মিত্র রাজনৈতিক দল ও জোটের শীর্ষ নেতারা। সোমবার (২০ জুলাই) সন্ধ্যার এই বৈঠকের পরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেখানে কী আলাপ-আলোচনা হয়েছে, তা ব্রিফ করেছেন। তবে শরিক দলের শীর্ষ নেতাদের আলাপ সেভাবে আসেনি।

বৈঠক সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে শরিক দলের নেতারা তাদের প্রতি সরকারের অবমূল্যায়ন, যোগাযোগের ঘাটতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে উপেক্ষিত হওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। জবাবে প্রধানমন্ত্রী আগামীতে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলার বিষয়ে আশ্বাস দেন।

রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রায় দেড় ঘণ্টা বৈঠক হয়। পরে তারেক রহমান শরিক দলের নেতাদের সম্মানে নৈশভোজ আয়োজন করেন। বৈঠকে গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২ দলীয় জোট, সমমনা জাতীয়তাবাদী জোট, গণতান্ত্রিক বাম জোট, ইসলামী ঐক্যজোটসহ ৪১টি দলের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন। আমন্ত্রণ পেলেও বৈঠকে অংশ নেয়নি আ স ম আব্দুর রবের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম।

বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক নেতা জানান, স্বাগত বক্তব্য দেন বিএনপি মহাসচিব। এরপর শরিকদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী এবং ইসলামী ঐক্যজোটের এক নেতা। পরে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী।

দুই নেতা প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, রাজপথে ছিলাম, সম্মানের সঙ্গে ছিলাম। আপনারা আমাদের কাছে যতটুকু চেয়েছেন, তার চেয়েও বেশি করেছি। কিন্তু, এখন মনে হচ্ছে, আমাদের কোনো স্পেস দেওয়া হচ্ছে না।

সূত্র জানায়, বৈঠকে সরকার ও বিএনপির সবচেয়ে বেশি সমালোচনামূলক বক্তব্য আসে সাইফুল হক এবং সুব্রত চৌধুরীর কাছ থেকে। তাঁরা বলেন, আন্দোলনের সময় শরিকরা যথেষ্ট গুরুত্ব পেলেও, সরকার গঠনের পরে তা ঘটেনি। পাঁচ মাস পার হলেও শরিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হয়নি। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় যুগপৎ শরিকদের সঙ্গে যোগাযোগে বিএনপির লিয়াজোঁ কমিটিও থাকলেও, এখন নেই। এমনকি সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের আগে বা পরে শরিকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয় না।

দুই নেতা প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, রাজপথে ছিলাম, সম্মানের সঙ্গে ছিলাম। আপনারা আমাদের কাছে যতটুকু চেয়েছেন, তার চেয়েও বেশি করেছি। কিন্তু, এখন মনে হচ্ছে, আমাদের কোনো স্পেস দেওয়া হচ্ছে না।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন একাধিক নেতা জানিয়েছেন, সরকারের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শরিক নেতাদের আমন্ত্রণ না জানানোর বিষয় তুলে ধরেন সুব্রত চৌধুরী। এ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন থেকে চেষ্টা করব সবাইকে নিয়ে চলার।’ বৈঠকে রসিকতা করে কয়েক নেতা বলেন, এটি কী আমাদের ফেয়ারওয়েল ডিনার? উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘না, না। এটা ওয়েলকাম ডিনার।’

ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে মিত্র রাজনৈতিক দল ও জোটের শীর্ষ নেতাদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ছবি: পিএমও
ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে মিত্র রাজনৈতিক দল ও জোটের শীর্ষ নেতাদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ছবি: পিএমও

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈঠকে গণতন্ত্র মঞ্চের নেতা সাইফুল হক বলেন, শরিকদের যেভাবে বৈঠকের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, সেটি মর্যাদাপূর্ণ হয়নি। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সরাসরি যোগাযোগ করে আমন্ত্রণ জানানো উচিত ছিল। কারণ, এরই মধ্যে শরিকদের সঙ্গে একটি মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। সরকারের কর্মকাণ্ডে অনেকের মনে প্রশ্ন, বিএনপি কি ‘একলা চলো’ নীতি নিয়েছে?

এরপর সাইফুল হক বলেন, গত পাঁচ মাসে সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসক, জেলা পরিষদের প্রশাসকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব নিয়োগের আগে যুগপৎ শরিকদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা হয়নি। সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন সাইফুল হক এবং সুব্রত চৌধুরী। তাঁরা বলেন, জাতীয় নির্বাচনে কিছু আসনে শরিকদের ছাড় দেওয়া হলেও, সংরক্ষিত নারী আসনে কাউকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। এমনকি বিষয়টি নিয়ে শরিকদের সঙ্গে পরামর্শ পর্যন্ত করা হয়নি।

উদাহরণ দিয়ে এই দুই নেতা বলেন, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট তাদের শরিকদের সঙ্গে আসন সমন্বয় করেছে। এমনকি এনসিপিকে প্রাপ্যের তুলনায় বেশি সংরক্ষিত আসনে ছাড় দিয়েছে জামায়াত। কিন্তু বিএনপি এক্ষেত্রে শরিকদের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন মনে করেনি। এতে রাজনৈতিক সৌহার্দ্যের প্রতিফলন দেখা যায়নি।

অবশ্য নেতারা বিলম্বে হলেও সরকারের পক্ষ থেকে শরিকদের সঙ্গে বসার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করার জন্য বিএনপিকে ধন্যবাদ জানান। প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং ভবিষ্যতে নিয়মিত রাজনৈতিক সংলাপের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শরিক দলের এক শীর্ষ নেতা বলেন, বিএনপির সরকার গঠনের পরে আমাদের যে কোথাও কোনো স্পেস দিচ্ছে না, সেটি প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হয়েছে। নির্বাচনের আগে জাতীয় সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভুলে গেছে, তা বলা হয়েছে। শরিকদের থেকে দুজনকে প্রতিমন্ত্রী করলে সেটি জাতীয় সরকার হয় না– এভাবেই প্রধানমন্ত্রী জানানো হয়েছে।

উদাহরণ দিয়ে শরিক দলের দুই নেতা বলেন, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট তাদের শরিকদের সঙ্গে আসন সমন্বয় করেছে। এমনকি এনসিপিকে প্রাপ্যের তুলনায় বেশি সংরক্ষিত আসনে ছাড় দিয়েছে জামায়াত। কিন্তু বিএনপি এক্ষেত্রে শরিকদের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন মনে করেনি। এতে রাজনৈতিক সৌহার্দ্যের প্রতিফলন দেখা যায়নি।

বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘নানা বিষয়ে কথা হয়েছে, বলেছি। বিগত পাঁচ মাসে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আমাদের যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গীদের অবস্থান তুলে ধরেছি। প্রধানমন্ত্রীও আগামী দিনে সবাইকে নিয়ে চলার আশ্বাস দিয়েছেন।’

বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন– ‘সরকারের পাঁচ মাসের মধ্যে সম্ভব হয়নি বিভিন্ন কাজের তাড়াহুড়ার জন্য বা কাজের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সব দলগুলোর সঙ্গে কথা বলার। কিন্তু এর মধ্যে সরকার যে কাজগুলো করেছে, সেগুলো ছিল জনগণের একদম কাছাকাছি যাওয়ার’। সবচেয়ে বড় কথা, সরকারকে গুছিয়ে জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়ার কাজটা প্রধানমন্ত্রী শুরু করেছেন।

তিনি আরও বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী যত দ্রুত সম্ভব বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসবেন। রাজনৈতিক দলগুলো আবার কাজ করবে একসঙ্গে। সবচেয়ে বড় জিনিস প্রধানমন্ত্রী বলেছেন– ‘যে ৩১ দফা কর্মসূচি আমরা একসঙ্গে দিয়েছিলাম, সেগুলো বাস্তবায়িত হবে। জুলাই সনদ যেটা আমরা সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলো স্বাক্ষর করেছি, সেই জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে’।

Ad 300x250

সম্পর্কিত