ক্লাসরুম থেকে বঙ্গভবনে মির্জা ফখরুল

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া/স্ট্রিম গ্রাফিক
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া/স্ট্রিম গ্রাফিক

রাজনীতিতে আসার আগে তিনি ছিলেন শিক্ষক। সরকারি কলেজে ঢুকে অর্থনীতি পড়িয়েছেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কাজ করেছেন প্রশাসনেও। একসময় ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। এরপর ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতিতে এসে বিএনপির স্থানীয় নেতা থেকে জাতীয় পর্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উঠেছেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনের মধ্যে আছে ছাত্রজীবনের বামপন্থী রাজনীতি, সরকারি চাকরি, স্থানীয় সরকার, মন্ত্রিত্ব, বিরোধী দলের আন্দোলন এবং শেষ পর্যন্ত বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্বে উঠে আসার দীর্ঘ পথ।

আজ বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিজয়ী ঘোষণা করেছেন। রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে তিনি পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। আর ১১–দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। ফলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হলেন বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপ্রতি।

ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম, রাজনীতির আবহে বেড়ে ওঠা

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিনও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি পাকিস্তান আমলে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে ছিলেন এবং পরে বাংলাদেশের রাজনীতিতেও সক্রিয় হন। মির্জা ফখরুলের পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয়ও বেশ পুরোনো। তাঁর চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ বাংলাদেশের রাজনীতির পরিচিত নেতা ছিলেন এবং একসময় জাতীয় সংসদের স্পিকারও ছিলেন।

ফখরুলের বেড়ে ওঠা উত্তরবঙ্গের ঠাকুরগাঁওয়ে হলেও উচ্চশিক্ষার জন্য তাঁকে ঢাকায় আসতে হয়। তিনি ঠাকুরগাঁও থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে ঢাকা কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পড়েন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন।

দুই কন্যার সঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: মির্জা ফখরুলের ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া
দুই কন্যার সঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: মির্জা ফখরুলের ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই তাঁর রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার শুরু। ষাটের দশকে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক হন। পরে ১৯৬৯ সালের আইয়ুববিরোধী গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতির দায়িত্বও পান। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সে সময় তাঁকে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারেও যেতে হয়েছিল।

শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবনের শুরু

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে মির্জা ফখরুল সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে ঢোকেননি। তাঁর কর্মজীবনের শুরু শিক্ষকতা দিয়ে। ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে আরও কয়েকটি সরকারি কলেজে অর্থনীতি পড়ান।

শিক্ষকতার পাশাপাশি সরকারি প্রশাসনের সঙ্গেও তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তিনি তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারির সচিব হিসেবে কাজ করেন। পরে আবার শিক্ষকতায় ফিরে যান। তিনি ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজেও অর্থনীতি পড়িয়েছেন। সরকারি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরেও কাজ করেছেন এবং ইউনেসকোর সঙ্গেও কাজের অভিজ্ঞতা ছিল বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চাকরি ছেড়ে পৌর রাজনীতিতে

১৯৮৬ সালে মির্জা ফখরুল সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর ১৯৮৮ সালের পৌর নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন এবং জয়ী হন।

এটি ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায়। জাতীয় রাজনীতির বড় মঞ্চে যাওয়ার আগে তিনি স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব পালন করেন। ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনীতিতে তাঁর অবস্থানও ধীরে ধীরে শক্ত হতে থাকে।

এরপর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তাঁকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়। এখান থেকেই বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতিতে তাঁর উত্থান শুরু।

সংসদে যেতে করতে হয়েছে অপেক্ষা

বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর জাতীয় সংসদে যেতে তাঁকে কয়েকটি নির্বাচনের ফলের অপেক্ষা করতে হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও একই আসনে তিনি আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কাছে হারেন, যদিও এবার ব্যবধান ছিল তুলনামূলক কম।

শেষ পর্যন্ত ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন মির্জা ফখরুল। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পর সেটিই ছিল তাঁর জাতীয় সংসদে প্রবেশ।

দুই কন্যার সঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: মির্জা ফখরুলের ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া
দুই কন্যার সঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: মির্জা ফখরুলের ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া

মন্ত্রী হিসেবে দুই মন্ত্রণালয়ে

২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠনের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হন। ২০০৫ সালের নভেম্বর থেকে তিনি বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন।

২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনেও তিনি অংশ নেন। তবে এরপর বিএনপির রাজনীতিতে তাঁর মূল ভূমিকা ক্রমেই সাংগঠনিক ও দলীয় নেতৃত্বের দিকে চলে যায়।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উত্থান

২০০৯ সালে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব করা হয়। এরপর ২০১১ সালে দলের তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেন মারা গেলে ফখরুল ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। তিনি প্রায় পাঁচ বছর এই দায়িত্বে ছিলেন।

এরপর ২০১৬ সালের মার্চে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের পর তিনি দলের মহাসচিব নির্বাচিত হন। এই সময়ের মধ্যে বিএনপি দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে ছিল। ফলে ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের বড় অংশ কেটেছে বিরোধী দলের কর্মসূচি, নির্বাচন, আন্দোলন, গ্রেপ্তার এবং দলীয় সংকট মোকাবিলার মধ্য দিয়ে।

আন্দোলন, মামলা ও কারাবাস

বিএনপির মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুল দীর্ঘ সময় ধরে দলটির অন্যতম প্রধান মুখ। নির্বাচনী ব্যবস্থা, সরকারের পদত্যাগ, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ বিভিন্ন দাবিতে বিএনপির আন্দোলনে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি বর্জন করেছিল। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ আসনের পাশাপাশি বগুড়া-৬ আসন থেকেও নির্বাচন করেন। বগুড়া-৬ আসনে তিনি জয়ী হন। তবে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। বিএনপির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।

২০২৩ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সহিংসতার পর মির্জা ফখরুল গ্রেপ্তার হন। ২০২৪ সালের জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের সময়ও তিনি কারাগারে ছিলেন। তাঁর ৭৬তম জন্মদিনও কারাগারে কেটেছিল।

এ সময় বিএনপি ও দলটির নেতারা তাঁর গ্রেপ্তারকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সমালোচনা করেন। অন্যদিকে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এই সময়ের ঘটনাগুলো তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম কঠিন অধ্যায় হয়ে ওঠে।

২০২৬: আবার সংসদে, এবার সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে

২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে মির্জা ফখরুল আবার ঠাকুরগাঁও-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং বড় ব্যবধানে জয়ী হন। জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের হিসাবে তিনি ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৬ ভোট পান। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী পেয়েছিলেন ১ লাখ ৪১ হাজার ১৭ ভোট।

নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তিনি বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্বও ধরে রাখেন।

সরকারে ফিরে তাঁর কাজের পরিধিও বদলে যায়। এবার তিনি শুধু বিরোধী দলের কর্মসূচির মুখপাত্র নন; স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ উন্নয়ন ও সমবায় খাতের মতো বড় প্রশাসনিক ক্ষেত্রের দায়িত্বে থাকা একজন মন্ত্রী।

জুনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়েও তিনি বক্তব্য দেন। তিনি বাজেটকে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব বলে মন্তব্য করেন এবং বলেন, উৎপাদন বাড়লে মূল্যস্ফীতিও কমবে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: সংগৃহীত
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: সংগৃহীত

অবশেষে রাষ্ট্রপতি

মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে নতুন অধ্যায়টি শুরু হয় ২০২৬ সালের আগস্টে। গত ১৩ আগস্ট বিএনপি তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়। পরে তিনি বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন।

এরপর আজ বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হলেন মির্জা ফখরুল। জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনের ভোটাভুটিতে তিনি ২৫৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী অলি আহমদ, যিনি পেয়েছেন ৮৮ ভোট।

আজ দুপুর ২টায় শুরু হয়ে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সংসদ সদস্যদের ভোটগ্রহণ চলে। ভোট গণনা শেষে নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন আনুষ্ঠানিকভাবে এই ফলাফল ঘোষণা করেন।

এই বিপুল বিজয়ের মাধ্যমে ৭৮ বছর বয়সী প্রবীণ রাজনীতিক মির্জা ফখরুলের বঙ্গভবনে যাওয়ার পথ সুগম হলো। আগামীকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় শপথ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তিনি দেশের নতুন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

ক্লাসরুম থেকে বঙ্গভবনে মির্জা ফখরুল