আনুশেহ আনাদিল

কিশোরগঞ্জের একটি খবর পড়ে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলাম। একটি কনসার্ট বন্ধের দাবি জানিয়ে প্রশাসনের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সেই চিঠিতে বলা হয়েছে, গান-বাজনা ইসলামী শরিয়াহবিরোধী। পরে প্রশাসনিক অনুমতি বা লাইসেন্স না থাকার কথাও বলা হয়েছে। সেটি যদি সত্য হয়, তার জন্য আইন আছে, নিয়ম আছে, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া আছে।
কিন্তু আমাকে ভাবিয়েছে অন্য একটি বিষয়। লাইসেন্সের কাগজটির আড়ালে যেন সেই অন্য কাগজটি হারিয়ে না যায়—যেখানে গানকেই প্রশ্ন করা হয়েছে। যেখানে একটি ধর্মীয় ব্যাখ্যার ভিত্তিতে বলা হয়েছে, গান-বাজনা করা যাবে না।
আমি সেই বাক্যটির সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের দিকে তাকাতে চাই। রাগ নিয়ে নয়। কাউকে আক্রমণ করার জন্যও নয়। একটু গভীরভাবে। একটু মমতা নিয়ে।
আমার মনে হয়, প্রশ্নটি একটি কনসার্টের চেয়ে অনেক বড়। আমরা আমাদের দেশটিকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছি? ধীরে ধীরে আমরা কী আমাদের আকাশটাকেই ছোট করে ফেলছি না?
আমি একজন সংগীতশিল্পী। একজন নারী। একজন শিল্পী। একজন উদ্যোক্তা। বহু বছর ধরে নিজের প্রতিষ্ঠান চালাই। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিই। আমি আমার পছন্দের পোশাক পরি। হিজাব পরি না—কারণ আমি তা পরতে চাই না। আর যে নারী হিজাব পরতে চান, তাঁর সেই স্বাধীনতাও আমার স্বাধীনতার মতোই মূল্যবান।
আমি এমন একটি পরিবারে বড় হয়েছি, যেখানে ইসলামের যে ধারাটি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি, সেটি সুফি ঐতিহ্যের। সেখানে ধর্মকে আমি প্রথম চিনেছি ভয়ের ভাষায় নয়, অনুসন্ধানের ভাষায়; নিষেধের তালিকা হিসেবে নয়, মানুষের অন্তরের দিকে ফিরে তাকানোর একটি পথ হিসেবে। গানও সেই জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু ছিল না।
এটি আমার উত্তরাধিকার। কিন্তু তারও আগে আমি মানুষ। কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন আমি কোন ধর্মের, আমার ভেতর থেকে প্রথম যে উত্তরটি আসে তা কোনো ধর্মের নাম নয়—আমি মানুষ। এর অর্থ এই নয় যে আমি ধর্মকে অস্বীকার করি। বরং পৃথিবীর নানা ধর্মের মধ্যে আমি মানুষের গভীর অনুসন্ধানের নানা ভাষা দেখতে পাই।
কোথাও প্রার্থনার নীরবতা, কোথাও আত্মসমর্পণ, কোথাও করুণা, কোথাও প্রেম, কোথাও বিরহ, কোথাও নিজের অহংকে অতিক্রম করার আকুলতা। হয়তো এ কারণেই একজন বাঙালি সংগীতশিল্পী হিসেবে আমার গানের ভেতরে এক জগৎ থেকে আরেক জগতে যেতে কোনো অসুবিধা হয় না।
একটি গানে আমি নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর কথা বলতে পারি, ফাতিমার কথা বলতে পারি; সেই একই সৃষ্টির স্রোতে কখন যে কৃষ্ণের কাছে চলে যাই, কখন রাধার বিরহ এসে মিশে যায়, আবার কখন ফিরে আসি বাংলার কোনো ফকিরের কাছে; নিজেও হয়তো এসব খেয়াল করি না। আমার কাছে এগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো আলাদা আলাদা বাক্স নয়। এই ভূখণ্ডের দীর্ঘ স্মৃতিরই অংশ।
কৃষ্ণ-রাধা এই বাংলার স্মৃতিতে আছেন। নবী-ফাতিমাও আছেন। বুদ্ধের করুণা আছে। বৈষ্ণবের বিরহ আছে। সুফির প্রেম আছে। ফকিরের প্রশ্ন আছে। বাউলের মানুষ-অন্বেষণ আছে।
আমি কেন তাদের একজনকে গ্রহণ করতে গিয়ে আরেকজনকে আমার ভেতর থেকে নির্বাসিত করব? অন্যের জানালা দিয়ে আসা আলো দেখলে আমার নিজের জানালার আলো নিভে যায় না।
আমার ঘরটা শুধু একটু বড় হয়। আমার মেয়েও একজন তরুণ শিল্পী। তার নিজের চোখ আছে, নিজের কল্পনার জগৎ আছে, নিজের ভাষা আছে। আমি কেন তাকে পৃথিবীতে এনেছি, যদি তার চারপাশে ভয়ের দেয়াল তুলে দিই? আমি কেন তাকে ভাবতে শিখিয়েছি, যদি পরে বলি—এতটুকুর বাইরে ভেবো না? আমি কেন তার হাতে রং তুলে দেব, যদি বলে দিই—এই পর্যন্ত আঁকবে, এর বাইরে নয়?
সন্তানকে পৃথিবীতে আনার অর্থ কি তাকে নিজের ছাঁচে গড়ে তোলা? নাকি নিজের সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার সাহস দেওয়া? আমি দ্বিতীয়টিই বিশ্বাস করতে চাই। আর ঠিক এই জায়গায় এসে আমার মন খারাপ হয়। কারণ এই তরুণদের জন্যও তো আমরা দায়ী।
কোনো শিশু পৃথিবীতে জন্ম নিয়ে নিজে থেকে শেখে না যে একটি গান পৃথিবীতে থাকা উচিত নয়, একটি ছবি আঁকা উচিত নয়, একজন নারীকে এভাবে পোশাক পরা উচিত নয়, কিংবা প্রেমে পড়া দুজন তরুণ-তরুণী পাশাপাশি হাঁটলে তাদের থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার।
এসব ধারণা কোথাও না কোথাও থেকে শেখানো হয়। তাই আমার প্রশ্ন শুধু ধর্মীয় নেতাদের কাছে নয়। প্রশ্ন আমাদের রাষ্ট্রের কাছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার কাছে। আমাদের পরিবারগুলোর কাছে। এবং গত কয়েক দশকে ক্ষমতায় থাকা প্রতিটি সরকারের কাছে। আমরা কেন আমাদের সন্তানদের এত বিচ্ছিন্ন পৃথিবীতে বড় হতে দিয়েছি?
একই দেশের শিশুরা কেন এমন ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষার দ্বীপে বড় হবে, যেখানে একদল আরেক দলের জীবন, সংস্কৃতি, বিশ্বাস, শিল্প কিংবা দৈনন্দিন বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগই পাবে না?
কেন আমরা জানতে চাইব না আমাদের সন্তানরা কী শিখছে? শুধু অংক, বাংলা, ইংরেজি কিংবা ধর্মীয় পাঠ নয়। তারা মানুষ সম্পর্কে কী শিখছে? তাদের কি শেখানো হচ্ছে যে একজন মানুষ তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়েও সম্মানের যোগ্য? তারা কি শিল্পের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে? দর্শনের সঙ্গে? বিজ্ঞানের সঙ্গে? ইতিহাসের সঙ্গে? বাংলাদেশের বহু ধর্ম ও বহু সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে?
তারা কি প্রশ্ন করতে শিখছে? নাকি শুধু উত্তর মুখস্থ করছে? এই বিচ্ছিন্নতার দায় কোনো একটি সরকারের নয়। কোনো একটি রাজনৈতিক দলেরও নয়। আমাদের সরকারগুলো—যে নামেই বা যে পতাকা তলেই ক্ষমতায় আসুক—দীর্ঘদিন ধরে সমাজের বিভিন্ন অংশকে পাশাপাশি বেড়ে উঠতে দিয়েছে, কিন্তু পরস্পরকে জানার ব্যবস্থা যথেষ্ট করেনি।
আর বিচ্ছিন্নতা খুব সহজেই ভয়ের জন্ম দেয়। যাকে আমি চিনি না, তাকে ভয় পাওয়া সহজ। যাকে বুঝি না, তাকে বিচার করা আরও সহজ। আর যাকে বিচার করতে শিখে যাই, একদিন তাকে নিয়ন্ত্রণ করাও স্বাভাবিক মনে হতে শুরু করে। সেখান থেকেই আসে ‘মোরাল পুলিশিং’—নৈতিকতার নামে অন্য মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের পাহারাদারি।
কিন্তু কেন? একটি ছেলে আর একটি মেয়ে একে অপরকে ভালোবাসল। বিয়ের আগে পাশাপাশি হাঁটল। গল্প করল। হাত ধরল। সেখানে তৃতীয় একজন মানুষের কী কাজ?
তারা যদি প্রাপ্তবয়স্ক হয়, পরস্পরের সম্মতিতে থাকে, কারও ক্ষতি না করে; তাহলে তাদের ভালোবাসার ওপর সমাজের পাহারাদার বসানোর প্রয়োজন কেন? কেন একজন অপরিচিত মানুষের পোশাক আমার নৈতিকতার পরীক্ষা হবে?
কেন একজন নারীর চুল, একজন পুরুষের জীবনযাপন, দুজন মানুষের সম্পর্ক, একজন শিল্পীর ছবি কিংবা একজন সংগীতশিল্পীর গান দেখে আমার মনে হবে—এটিকে থামানোর অধিকার আমার আছে।
আমরা কি নৈতিকতা আর নিয়ন্ত্রণকে এক করে ফেলছি? নৈতিকতা তো প্রথমে নিজের দিকে তাকানোর কথা। অন্যের জীবনের ওপর পাহারা বসানোর কথা নয়। আমরা এমন শিক্ষিত হতে হই, এমন প্রজ্ঞাবান; যাতে ভিন্ন কিছু দেখলেই তাকে নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন অনুভব করব না। নিজের বিশ্বাসকে ভালোবাসতে হলে অন্যের জানালা বন্ধ করে দিতে হবে কেন? নিজের আলো জ্বালাতে হলে অন্যের প্রদীপ নেভাতে হবে কেন? এই বদ্বীপের ইতিহাস তো সংকীর্ণতার ইতিহাস নয়।
হাজার বছর ধরে কত মানুষ এই মাটির ওপর দিয়ে হেঁটেছে। কত বিশ্বাস, কত দর্শন, কত ভাষা, কত সুর এসে মিশেছে এখানে। বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলমান, সুফি, বৈষ্ণব—কত ধারার মানুষের পদচিহ্ন এই মাটির স্মৃতিতে রয়ে গেছে।
নদী যেমন এক জায়গার জল নিয়ে সাগরে যায় না, বাংলাও তেমনি একটি মাত্র স্রোত দিয়ে তৈরি হয়নি। আমাদের ভাষা মিশেছে। রান্না মিশেছে। পোশাক মিশেছে। স্থাপত্য মিশেছে। দর্শন মিশেছে। সুর মিশেছে। আর সেই মিশে যাওয়া থেকেই জন্ম নিয়েছে আমাদের নিজস্বতা।
এই মাটিতে কখনো গানই হয়ে উঠেছে প্রার্থনা, কখনো দর্শন, কখনো প্রতিবাদ, কখনো মানুষের সঙ্গে মানুষের সেতু। তাহলে আজ, এত দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসে, গানকেই যদি তার অস্তিত্বের বৈধতা প্রমাণ করতে হয়—আমাদের কি একবার থেমে ভাবা উচিত নয়?
বিশেষ করে জুলাইয়ের পর। আমি আওয়ামী লীগের সমালোচনা করেছি। ক্ষমতার অপব্যবহার, দমন, দুর্নীতি বা অন্যায়ের সমালোচনা করব, যে দলই ক্ষমতায় থাকুক। কিন্তু আজ যে অসহিষ্ণুতা আমরা আরও প্রকাশ্যে দেখতে পাচ্ছি, সেটি জুলাইয়ের কোনো এক সকালে হঠাৎ জন্ম নেয়নি।
এর বীজ আমাদের সমাজে আগে থেকেই ছিল। আমাদের শিক্ষার ফাঁকে ছিল। পরিবারে ছিল। রাজনীতির সুবিধাবাদে ছিল। আমাদের ভয় এবং নীরবতার মধ্যেও ছিল। আগের শাসনামলও সেই বাস্তবতার দায় এড়াতে পারে না।
জুলাই অনেক মানুষের মুখে কথা বলার সাহস ফিরিয়ে দিয়েছে। সেটি মূল্যবান। কিন্তু বাকস্বাধীনতার দরজা খুললে শুধু আমার পছন্দের কণ্ঠই বেরিয়ে আসবে না—এমন কণ্ঠও বেরিয়ে আসবে, যার কথা শুনে আমাকে গভীরভাবে ভাবতে হবে।
তাকে চুপ করিয়ে দেওয়া আমার উত্তর নয়। আমার উত্তর—তার সামনে আরেকটি প্রশ্ন রাখা। আমরা স্বাধীনতা চেয়েছিলাম কেন? শুধু শাসকের মুখ বদলানোর জন্য? একটি ভয়ের জায়গায় আরেকটি ভয় বসানোর জন্য?
একটি কর্তৃত্ব সরিয়ে আরেকটি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য? একটি নিষেধাজ্ঞার জায়গায় আরেকটি নিষেধাজ্ঞা লেখার জন্য? নাকি এমন একটি বাংলাদেশ তৈরি করার জন্য, যেখানে মানুষ আরও স্বাধীনভাবে চিন্তা করবে, আরও গভীরভাবে প্রশ্ন করবে, আরও উদারভাবে একে অন্যকে ধারণ করতে শিখবে?
বাংলাদেশের সংবিধান আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং সাহিত্য ও শিল্পকলার বিকাশের কথা বলে। চিন্তা, বিবেক, মতপ্রকাশ ও ধর্মীয় স্বাধীনতার কথাও বলে। তাই রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়—গান শরিয়াহসম্মত কিনা। রাষ্ট্রের প্রশ্ন হওয়া উচিত—এই কনসার্ট বাংলাদেশের কোন আইন ভঙ্গ করেছে?
অনুমতি না থাকলে অনুমতির আইন প্রয়োগ করুন। নিরাপত্তার সমস্যা থাকলে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করুন। শব্দদূষণ হলে তার আইন প্রয়োগ করুন। কিন্তু কোনো একটি ধর্মীয় ব্যাখ্যা রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জীবনের মাপকাঠি হয়ে উঠতে পারে না।
আর যারা সেই চিঠি লিখেছেন, তাঁদেরও আমি চুপ করিয়ে দিতে চাই না। আমি তাঁদের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন রাখতে চাই। আপনার বিশ্বাসকে সম্মান করতে হলে কি আমাকে আপনার মতো হতে হবে?
আমার গান কি আপনার বিশ্বাসকে এতটাই বিপন্ন করে যে গানটিকেই থামিয়ে দিতে হবে? আমার মেয়ের ছবি, অন্য কোনো নারীর পোশাক, একজন কবির শব্দ, একজন নৃত্যশিল্পীর শরীর—এসবের সীমা কি অন্য কেউ নির্ধারণ করবে? নাকি আমরা এমন একটি সমাজ তৈরি করতে পারি, যেখানে গভীরভাবে ধর্মপ্রাণ একজন মানুষ এবং সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে জীবনযাপন করা আরেকজন মানুষ পাশাপাশি বসে একই আকাশের নিচে নিরাপদ বোধ করে?
আমাদের কাজ আরও নিষেধ তৈরি করা নয়, মানুষ তৈরি করা। এমন মানুষ, যার বিশ্বাস এত গভীর যে অন্যের গান তাকে ভয় দেখায় না। এমন মানুষ, যে নিজের ধর্মকে ভালোবেসেও অন্য ধর্মের সৌন্দর্যের সামনে বিস্মিত হতে পারে। এমন মানুষ, যে উত্তর জানার পাশাপাশি প্রশ্ন করতেও জানে। যে নিজের সন্তানকে শুধু কী ভাবতে হবে তা শেখায় না—কীভাবে ভাবতে হয়, সেটিও শেখায়। যে ভিন্নতাকে হুমকি নয়, মানুষের অসীম বৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে দেখতে শেখে।
কারণ শিক্ষা যদি আমাদের শুধু আরও নিশ্চিত করে, কিন্তু আরও প্রজ্ঞাবান না করে; যদি আমাদের আরও ধার্মিক করে, কিন্তু আরও সহৃদয় না করে; যদি আমাদের অনেক উত্তর দেয়, কিন্তু অন্য মানুষের জন্য হৃদয়ের জায়গাটুকু ছোট করে দেয়—তাহলে সেই শিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়েও আমাদের প্রশ্ন করা দরকার।
এই বদ্বীপ আমাদের তার চেয়েও বড় একটি উত্তরাধিকার দিয়ে গেছে। নদীর দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। একটি নদী আরেকটি নদীর জলকে জিজ্ঞেস করে না—তুমি কোথা থেকে এলে? সে তাকে গ্রহণ করে। দুই স্রোত মিশে আরও প্রশস্ত হয়। মানুষেরও কি তেমন হওয়ার কথা ছিল না?
আমি আমার মেয়েকে ছোট পৃথিবী দিয়ে যেতে চাই না। আমি এমন একটি বাংলাদেশ রেখে যেতে চাই না, যেখানে তাকে তার শিল্পের বৈধতা প্রমাণ করতে হবে; কোনো নারীকে তার পোশাকের ব্যাখ্যা দিতে হবে; কোনো কবিকে তার কবিতার পক্ষে সাক্ষ্য দিতে হবে; কোনো সংগীতশিল্পীকে বোঝাতে হবে কেন তার গান গাওয়ার অধিকার আছে; কিংবা ভালোবাসার জন্য দুজন তরুণ মানুষকে অপরিচিত মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
আমি এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে মসজিদের আজান থাকবে, মন্দিরের ঘণ্টা থাকবে, গির্জার প্রার্থনা থাকবে, বাউলের একতারা থাকবে, শিল্পীর ক্যানভাস থাকবে, কবির প্রশ্ন থাকবে, প্রেমিক-প্রেমিকা পাশাপাশি হাঁটবে—আর কারও যদি নীরব থাকতে ইচ্ছে করে, তার নীরবতাটুকুও থাকবে।
কারও অস্তিত্ব যেন আরেকজনের অস্তিত্বকে ছোট না করে। কারণ বহুত্ব আমাদের দুর্বলতা নয়। এটাই এই বদ্বীপের দীর্ঘ স্মৃতি। এত নদী এসে মিশেছে বলেই এই মাটি উর্বর। এত মানুষ, এত পথ, এত বিশ্বাস, এত সুর এসে মিশেছে বলেই আমরা আমরা হয়েছি। তাই আজ একটি কনসার্টের পাশে দাঁড়িয়ে আমি শুধু গানের পাশে দাঁড়াচ্ছি না।
আমি মানুষের ভেতরের সেই বিশাল জায়গাটুকুর পাশে দাঁড়াচ্ছি—যেখানে আমার সঙ্গে আপনার মিল না থাকলেও আপনাকে সম্মান করার, আপনাকে ভালোবাসার এবং আপনার স্বাধীনতাকে নিজের স্বাধীনতার মতোই মূল্যবান মনে করার জায়গা থাকে। আমার উত্তরাধিকার সুফি হতে পারে। আপনার উত্তরাধিকার অন্য কিছু হতে পারে। কিন্তু তারও আগে আমরা দুজনেই মানুষ।
আপনার বিশ্বাস থাকুক, গান থাকুক। আমার মেয়ের রং-তুলি থাকুক। দুই তরুণের ভালোবাসা থাকুক। কারও প্রার্থনা থাকুক। কারও প্রশ্ন থাকুক। আমাদের সবার জন্য আকাশটুকু থাকুক। হাজার বছরের এত নদী, এত পথ, এত বিশ্বাস, এত মানুষ পেরিয়ে এসে আমাদের আরও বিস্তৃত মানুষ হওয়ার কথা ছিল। নিজেদের আরও ছোট করে ফেলা নয়।

কিশোরগঞ্জের একটি খবর পড়ে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলাম। একটি কনসার্ট বন্ধের দাবি জানিয়ে প্রশাসনের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সেই চিঠিতে বলা হয়েছে, গান-বাজনা ইসলামী শরিয়াহবিরোধী। পরে প্রশাসনিক অনুমতি বা লাইসেন্স না থাকার কথাও বলা হয়েছে। সেটি যদি সত্য হয়, তার জন্য আইন আছে, নিয়ম আছে, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া আছে।
কিন্তু আমাকে ভাবিয়েছে অন্য একটি বিষয়। লাইসেন্সের কাগজটির আড়ালে যেন সেই অন্য কাগজটি হারিয়ে না যায়—যেখানে গানকেই প্রশ্ন করা হয়েছে। যেখানে একটি ধর্মীয় ব্যাখ্যার ভিত্তিতে বলা হয়েছে, গান-বাজনা করা যাবে না।
আমি সেই বাক্যটির সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের দিকে তাকাতে চাই। রাগ নিয়ে নয়। কাউকে আক্রমণ করার জন্যও নয়। একটু গভীরভাবে। একটু মমতা নিয়ে।
আমার মনে হয়, প্রশ্নটি একটি কনসার্টের চেয়ে অনেক বড়। আমরা আমাদের দেশটিকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছি? ধীরে ধীরে আমরা কী আমাদের আকাশটাকেই ছোট করে ফেলছি না?
আমি একজন সংগীতশিল্পী। একজন নারী। একজন শিল্পী। একজন উদ্যোক্তা। বহু বছর ধরে নিজের প্রতিষ্ঠান চালাই। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিই। আমি আমার পছন্দের পোশাক পরি। হিজাব পরি না—কারণ আমি তা পরতে চাই না। আর যে নারী হিজাব পরতে চান, তাঁর সেই স্বাধীনতাও আমার স্বাধীনতার মতোই মূল্যবান।
আমি এমন একটি পরিবারে বড় হয়েছি, যেখানে ইসলামের যে ধারাটি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি, সেটি সুফি ঐতিহ্যের। সেখানে ধর্মকে আমি প্রথম চিনেছি ভয়ের ভাষায় নয়, অনুসন্ধানের ভাষায়; নিষেধের তালিকা হিসেবে নয়, মানুষের অন্তরের দিকে ফিরে তাকানোর একটি পথ হিসেবে। গানও সেই জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু ছিল না।
এটি আমার উত্তরাধিকার। কিন্তু তারও আগে আমি মানুষ। কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন আমি কোন ধর্মের, আমার ভেতর থেকে প্রথম যে উত্তরটি আসে তা কোনো ধর্মের নাম নয়—আমি মানুষ। এর অর্থ এই নয় যে আমি ধর্মকে অস্বীকার করি। বরং পৃথিবীর নানা ধর্মের মধ্যে আমি মানুষের গভীর অনুসন্ধানের নানা ভাষা দেখতে পাই।
কোথাও প্রার্থনার নীরবতা, কোথাও আত্মসমর্পণ, কোথাও করুণা, কোথাও প্রেম, কোথাও বিরহ, কোথাও নিজের অহংকে অতিক্রম করার আকুলতা। হয়তো এ কারণেই একজন বাঙালি সংগীতশিল্পী হিসেবে আমার গানের ভেতরে এক জগৎ থেকে আরেক জগতে যেতে কোনো অসুবিধা হয় না।
একটি গানে আমি নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর কথা বলতে পারি, ফাতিমার কথা বলতে পারি; সেই একই সৃষ্টির স্রোতে কখন যে কৃষ্ণের কাছে চলে যাই, কখন রাধার বিরহ এসে মিশে যায়, আবার কখন ফিরে আসি বাংলার কোনো ফকিরের কাছে; নিজেও হয়তো এসব খেয়াল করি না। আমার কাছে এগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো আলাদা আলাদা বাক্স নয়। এই ভূখণ্ডের দীর্ঘ স্মৃতিরই অংশ।
কৃষ্ণ-রাধা এই বাংলার স্মৃতিতে আছেন। নবী-ফাতিমাও আছেন। বুদ্ধের করুণা আছে। বৈষ্ণবের বিরহ আছে। সুফির প্রেম আছে। ফকিরের প্রশ্ন আছে। বাউলের মানুষ-অন্বেষণ আছে।
আমি কেন তাদের একজনকে গ্রহণ করতে গিয়ে আরেকজনকে আমার ভেতর থেকে নির্বাসিত করব? অন্যের জানালা দিয়ে আসা আলো দেখলে আমার নিজের জানালার আলো নিভে যায় না।
আমার ঘরটা শুধু একটু বড় হয়। আমার মেয়েও একজন তরুণ শিল্পী। তার নিজের চোখ আছে, নিজের কল্পনার জগৎ আছে, নিজের ভাষা আছে। আমি কেন তাকে পৃথিবীতে এনেছি, যদি তার চারপাশে ভয়ের দেয়াল তুলে দিই? আমি কেন তাকে ভাবতে শিখিয়েছি, যদি পরে বলি—এতটুকুর বাইরে ভেবো না? আমি কেন তার হাতে রং তুলে দেব, যদি বলে দিই—এই পর্যন্ত আঁকবে, এর বাইরে নয়?
সন্তানকে পৃথিবীতে আনার অর্থ কি তাকে নিজের ছাঁচে গড়ে তোলা? নাকি নিজের সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার সাহস দেওয়া? আমি দ্বিতীয়টিই বিশ্বাস করতে চাই। আর ঠিক এই জায়গায় এসে আমার মন খারাপ হয়। কারণ এই তরুণদের জন্যও তো আমরা দায়ী।
কোনো শিশু পৃথিবীতে জন্ম নিয়ে নিজে থেকে শেখে না যে একটি গান পৃথিবীতে থাকা উচিত নয়, একটি ছবি আঁকা উচিত নয়, একজন নারীকে এভাবে পোশাক পরা উচিত নয়, কিংবা প্রেমে পড়া দুজন তরুণ-তরুণী পাশাপাশি হাঁটলে তাদের থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার।
এসব ধারণা কোথাও না কোথাও থেকে শেখানো হয়। তাই আমার প্রশ্ন শুধু ধর্মীয় নেতাদের কাছে নয়। প্রশ্ন আমাদের রাষ্ট্রের কাছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার কাছে। আমাদের পরিবারগুলোর কাছে। এবং গত কয়েক দশকে ক্ষমতায় থাকা প্রতিটি সরকারের কাছে। আমরা কেন আমাদের সন্তানদের এত বিচ্ছিন্ন পৃথিবীতে বড় হতে দিয়েছি?
একই দেশের শিশুরা কেন এমন ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষার দ্বীপে বড় হবে, যেখানে একদল আরেক দলের জীবন, সংস্কৃতি, বিশ্বাস, শিল্প কিংবা দৈনন্দিন বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগই পাবে না?
কেন আমরা জানতে চাইব না আমাদের সন্তানরা কী শিখছে? শুধু অংক, বাংলা, ইংরেজি কিংবা ধর্মীয় পাঠ নয়। তারা মানুষ সম্পর্কে কী শিখছে? তাদের কি শেখানো হচ্ছে যে একজন মানুষ তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়েও সম্মানের যোগ্য? তারা কি শিল্পের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে? দর্শনের সঙ্গে? বিজ্ঞানের সঙ্গে? ইতিহাসের সঙ্গে? বাংলাদেশের বহু ধর্ম ও বহু সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে?
তারা কি প্রশ্ন করতে শিখছে? নাকি শুধু উত্তর মুখস্থ করছে? এই বিচ্ছিন্নতার দায় কোনো একটি সরকারের নয়। কোনো একটি রাজনৈতিক দলেরও নয়। আমাদের সরকারগুলো—যে নামেই বা যে পতাকা তলেই ক্ষমতায় আসুক—দীর্ঘদিন ধরে সমাজের বিভিন্ন অংশকে পাশাপাশি বেড়ে উঠতে দিয়েছে, কিন্তু পরস্পরকে জানার ব্যবস্থা যথেষ্ট করেনি।
আর বিচ্ছিন্নতা খুব সহজেই ভয়ের জন্ম দেয়। যাকে আমি চিনি না, তাকে ভয় পাওয়া সহজ। যাকে বুঝি না, তাকে বিচার করা আরও সহজ। আর যাকে বিচার করতে শিখে যাই, একদিন তাকে নিয়ন্ত্রণ করাও স্বাভাবিক মনে হতে শুরু করে। সেখান থেকেই আসে ‘মোরাল পুলিশিং’—নৈতিকতার নামে অন্য মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের পাহারাদারি।
কিন্তু কেন? একটি ছেলে আর একটি মেয়ে একে অপরকে ভালোবাসল। বিয়ের আগে পাশাপাশি হাঁটল। গল্প করল। হাত ধরল। সেখানে তৃতীয় একজন মানুষের কী কাজ?
তারা যদি প্রাপ্তবয়স্ক হয়, পরস্পরের সম্মতিতে থাকে, কারও ক্ষতি না করে; তাহলে তাদের ভালোবাসার ওপর সমাজের পাহারাদার বসানোর প্রয়োজন কেন? কেন একজন অপরিচিত মানুষের পোশাক আমার নৈতিকতার পরীক্ষা হবে?
কেন একজন নারীর চুল, একজন পুরুষের জীবনযাপন, দুজন মানুষের সম্পর্ক, একজন শিল্পীর ছবি কিংবা একজন সংগীতশিল্পীর গান দেখে আমার মনে হবে—এটিকে থামানোর অধিকার আমার আছে।
আমরা কি নৈতিকতা আর নিয়ন্ত্রণকে এক করে ফেলছি? নৈতিকতা তো প্রথমে নিজের দিকে তাকানোর কথা। অন্যের জীবনের ওপর পাহারা বসানোর কথা নয়। আমরা এমন শিক্ষিত হতে হই, এমন প্রজ্ঞাবান; যাতে ভিন্ন কিছু দেখলেই তাকে নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন অনুভব করব না। নিজের বিশ্বাসকে ভালোবাসতে হলে অন্যের জানালা বন্ধ করে দিতে হবে কেন? নিজের আলো জ্বালাতে হলে অন্যের প্রদীপ নেভাতে হবে কেন? এই বদ্বীপের ইতিহাস তো সংকীর্ণতার ইতিহাস নয়।
হাজার বছর ধরে কত মানুষ এই মাটির ওপর দিয়ে হেঁটেছে। কত বিশ্বাস, কত দর্শন, কত ভাষা, কত সুর এসে মিশেছে এখানে। বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলমান, সুফি, বৈষ্ণব—কত ধারার মানুষের পদচিহ্ন এই মাটির স্মৃতিতে রয়ে গেছে।
নদী যেমন এক জায়গার জল নিয়ে সাগরে যায় না, বাংলাও তেমনি একটি মাত্র স্রোত দিয়ে তৈরি হয়নি। আমাদের ভাষা মিশেছে। রান্না মিশেছে। পোশাক মিশেছে। স্থাপত্য মিশেছে। দর্শন মিশেছে। সুর মিশেছে। আর সেই মিশে যাওয়া থেকেই জন্ম নিয়েছে আমাদের নিজস্বতা।
এই মাটিতে কখনো গানই হয়ে উঠেছে প্রার্থনা, কখনো দর্শন, কখনো প্রতিবাদ, কখনো মানুষের সঙ্গে মানুষের সেতু। তাহলে আজ, এত দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসে, গানকেই যদি তার অস্তিত্বের বৈধতা প্রমাণ করতে হয়—আমাদের কি একবার থেমে ভাবা উচিত নয়?
বিশেষ করে জুলাইয়ের পর। আমি আওয়ামী লীগের সমালোচনা করেছি। ক্ষমতার অপব্যবহার, দমন, দুর্নীতি বা অন্যায়ের সমালোচনা করব, যে দলই ক্ষমতায় থাকুক। কিন্তু আজ যে অসহিষ্ণুতা আমরা আরও প্রকাশ্যে দেখতে পাচ্ছি, সেটি জুলাইয়ের কোনো এক সকালে হঠাৎ জন্ম নেয়নি।
এর বীজ আমাদের সমাজে আগে থেকেই ছিল। আমাদের শিক্ষার ফাঁকে ছিল। পরিবারে ছিল। রাজনীতির সুবিধাবাদে ছিল। আমাদের ভয় এবং নীরবতার মধ্যেও ছিল। আগের শাসনামলও সেই বাস্তবতার দায় এড়াতে পারে না।
জুলাই অনেক মানুষের মুখে কথা বলার সাহস ফিরিয়ে দিয়েছে। সেটি মূল্যবান। কিন্তু বাকস্বাধীনতার দরজা খুললে শুধু আমার পছন্দের কণ্ঠই বেরিয়ে আসবে না—এমন কণ্ঠও বেরিয়ে আসবে, যার কথা শুনে আমাকে গভীরভাবে ভাবতে হবে।
তাকে চুপ করিয়ে দেওয়া আমার উত্তর নয়। আমার উত্তর—তার সামনে আরেকটি প্রশ্ন রাখা। আমরা স্বাধীনতা চেয়েছিলাম কেন? শুধু শাসকের মুখ বদলানোর জন্য? একটি ভয়ের জায়গায় আরেকটি ভয় বসানোর জন্য?
একটি কর্তৃত্ব সরিয়ে আরেকটি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য? একটি নিষেধাজ্ঞার জায়গায় আরেকটি নিষেধাজ্ঞা লেখার জন্য? নাকি এমন একটি বাংলাদেশ তৈরি করার জন্য, যেখানে মানুষ আরও স্বাধীনভাবে চিন্তা করবে, আরও গভীরভাবে প্রশ্ন করবে, আরও উদারভাবে একে অন্যকে ধারণ করতে শিখবে?
বাংলাদেশের সংবিধান আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং সাহিত্য ও শিল্পকলার বিকাশের কথা বলে। চিন্তা, বিবেক, মতপ্রকাশ ও ধর্মীয় স্বাধীনতার কথাও বলে। তাই রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়—গান শরিয়াহসম্মত কিনা। রাষ্ট্রের প্রশ্ন হওয়া উচিত—এই কনসার্ট বাংলাদেশের কোন আইন ভঙ্গ করেছে?
অনুমতি না থাকলে অনুমতির আইন প্রয়োগ করুন। নিরাপত্তার সমস্যা থাকলে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করুন। শব্দদূষণ হলে তার আইন প্রয়োগ করুন। কিন্তু কোনো একটি ধর্মীয় ব্যাখ্যা রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জীবনের মাপকাঠি হয়ে উঠতে পারে না।
আর যারা সেই চিঠি লিখেছেন, তাঁদেরও আমি চুপ করিয়ে দিতে চাই না। আমি তাঁদের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন রাখতে চাই। আপনার বিশ্বাসকে সম্মান করতে হলে কি আমাকে আপনার মতো হতে হবে?
আমার গান কি আপনার বিশ্বাসকে এতটাই বিপন্ন করে যে গানটিকেই থামিয়ে দিতে হবে? আমার মেয়ের ছবি, অন্য কোনো নারীর পোশাক, একজন কবির শব্দ, একজন নৃত্যশিল্পীর শরীর—এসবের সীমা কি অন্য কেউ নির্ধারণ করবে? নাকি আমরা এমন একটি সমাজ তৈরি করতে পারি, যেখানে গভীরভাবে ধর্মপ্রাণ একজন মানুষ এবং সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে জীবনযাপন করা আরেকজন মানুষ পাশাপাশি বসে একই আকাশের নিচে নিরাপদ বোধ করে?
আমাদের কাজ আরও নিষেধ তৈরি করা নয়, মানুষ তৈরি করা। এমন মানুষ, যার বিশ্বাস এত গভীর যে অন্যের গান তাকে ভয় দেখায় না। এমন মানুষ, যে নিজের ধর্মকে ভালোবেসেও অন্য ধর্মের সৌন্দর্যের সামনে বিস্মিত হতে পারে। এমন মানুষ, যে উত্তর জানার পাশাপাশি প্রশ্ন করতেও জানে। যে নিজের সন্তানকে শুধু কী ভাবতে হবে তা শেখায় না—কীভাবে ভাবতে হয়, সেটিও শেখায়। যে ভিন্নতাকে হুমকি নয়, মানুষের অসীম বৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে দেখতে শেখে।
কারণ শিক্ষা যদি আমাদের শুধু আরও নিশ্চিত করে, কিন্তু আরও প্রজ্ঞাবান না করে; যদি আমাদের আরও ধার্মিক করে, কিন্তু আরও সহৃদয় না করে; যদি আমাদের অনেক উত্তর দেয়, কিন্তু অন্য মানুষের জন্য হৃদয়ের জায়গাটুকু ছোট করে দেয়—তাহলে সেই শিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়েও আমাদের প্রশ্ন করা দরকার।
এই বদ্বীপ আমাদের তার চেয়েও বড় একটি উত্তরাধিকার দিয়ে গেছে। নদীর দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। একটি নদী আরেকটি নদীর জলকে জিজ্ঞেস করে না—তুমি কোথা থেকে এলে? সে তাকে গ্রহণ করে। দুই স্রোত মিশে আরও প্রশস্ত হয়। মানুষেরও কি তেমন হওয়ার কথা ছিল না?
আমি আমার মেয়েকে ছোট পৃথিবী দিয়ে যেতে চাই না। আমি এমন একটি বাংলাদেশ রেখে যেতে চাই না, যেখানে তাকে তার শিল্পের বৈধতা প্রমাণ করতে হবে; কোনো নারীকে তার পোশাকের ব্যাখ্যা দিতে হবে; কোনো কবিকে তার কবিতার পক্ষে সাক্ষ্য দিতে হবে; কোনো সংগীতশিল্পীকে বোঝাতে হবে কেন তার গান গাওয়ার অধিকার আছে; কিংবা ভালোবাসার জন্য দুজন তরুণ মানুষকে অপরিচিত মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
আমি এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে মসজিদের আজান থাকবে, মন্দিরের ঘণ্টা থাকবে, গির্জার প্রার্থনা থাকবে, বাউলের একতারা থাকবে, শিল্পীর ক্যানভাস থাকবে, কবির প্রশ্ন থাকবে, প্রেমিক-প্রেমিকা পাশাপাশি হাঁটবে—আর কারও যদি নীরব থাকতে ইচ্ছে করে, তার নীরবতাটুকুও থাকবে।
কারও অস্তিত্ব যেন আরেকজনের অস্তিত্বকে ছোট না করে। কারণ বহুত্ব আমাদের দুর্বলতা নয়। এটাই এই বদ্বীপের দীর্ঘ স্মৃতি। এত নদী এসে মিশেছে বলেই এই মাটি উর্বর। এত মানুষ, এত পথ, এত বিশ্বাস, এত সুর এসে মিশেছে বলেই আমরা আমরা হয়েছি। তাই আজ একটি কনসার্টের পাশে দাঁড়িয়ে আমি শুধু গানের পাশে দাঁড়াচ্ছি না।
আমি মানুষের ভেতরের সেই বিশাল জায়গাটুকুর পাশে দাঁড়াচ্ছি—যেখানে আমার সঙ্গে আপনার মিল না থাকলেও আপনাকে সম্মান করার, আপনাকে ভালোবাসার এবং আপনার স্বাধীনতাকে নিজের স্বাধীনতার মতোই মূল্যবান মনে করার জায়গা থাকে। আমার উত্তরাধিকার সুফি হতে পারে। আপনার উত্তরাধিকার অন্য কিছু হতে পারে। কিন্তু তারও আগে আমরা দুজনেই মানুষ।
আপনার বিশ্বাস থাকুক, গান থাকুক। আমার মেয়ের রং-তুলি থাকুক। দুই তরুণের ভালোবাসা থাকুক। কারও প্রার্থনা থাকুক। কারও প্রশ্ন থাকুক। আমাদের সবার জন্য আকাশটুকু থাকুক। হাজার বছরের এত নদী, এত পথ, এত বিশ্বাস, এত মানুষ পেরিয়ে এসে আমাদের আরও বিস্তৃত মানুষ হওয়ার কথা ছিল। নিজেদের আরও ছোট করে ফেলা নয়।
.png)

শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হয়েছিলেন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল সপরিবারে। সেই রাতে আরও একাধিক বাসভবনে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। এর মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব নেতৃত্বাধীন স্বৈরশাসনের অবসান হয়েছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে সেই লক্ষ্য অর্জনে ওই ধরনের হত্যাকাণ্ডই একমাত্র উপায় ছিল কিনা, তা
১৬ আগস্ট ২০২৬
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে ৯ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু এবং বেশ কয়েকজনের আহত হওয়ার ঘটনাটি দেশের শ্রম খাতের এক ভয়াবহ ও রূঢ় বাস্তবতাকে আবারও আমাদের সামনে উন্মোচিত করেছে।
১৬ আগস্ট ২০২৬
ময়মনসিংহের ত্রিশালের একটি বালুমহাল। সেখানকার অস্থায়ী টিনের কার্যালয়ে বসে কাজ করছিলেন ইজারাদারের এক কর্মচারী। হঠাৎ সেখানে দলবল নিয়ে প্রবেশ করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য। সরকারি কর্মকর্তাদের এমন আকস্মিক প্রবেশে কিছুটা ভড়কে যান ওই কর্মচারী।
