যমুনা ও বাঙালি নদী বিধৌত বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা) আসনের সাধারণ মানুষের কাছে নির্বাচনের মূল ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে নদী ভাঙন রোধ ও চরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের অবহেলিত উন্নয়ন। প্রতি বছর ভাঙনে বসতভিটা, ফসলি জমি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া মানুষেরা এবার এমন প্রার্থীকেই বেছে নিতে চান, যিনি তাদের এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান দেবেন।
বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলা নিয়ে গঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৬১৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৮৬ হাজার ৮৮৯ জন, নারী ১ লাখ ৮৯ হাজার ৭২০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৫ জন। বাঙালি আর যমুনার দুই পাড়ের লাখো মানুষ বছরের পর বছর ধরে ভাঙা-গড়ার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতি বছর বন্যার সময় এবং পানি কমলে নদীগর্ভে বিলীন হয় হাজার হাজার বিঘা জমি, ঘরবাড়ি ও হাটবাজার। সামর্থ্যবানরা বাড়ি সরিয়ে নিতে পারলেও নিস্বরা আশ্রয় নেন অন্যের জায়গায়।
বিপরীতে, যমুনার বিস্তীর্ণ বালুচরে বর্তমানে এক কৃষি বিপ্লব শুরু হয়েছে। অর্ধশতাধিক চরে বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বাজারমূল্যের ২ লাখ টনের বেশি ফসল উৎপাদিত হচ্ছে। তবে এই বিশাল অর্থনৈতিক গুরুত্ব সত্ত্বেও চরাঞ্চলে যাতায়াত ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। নেই কোনো হাসপাতাল বা মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এছাড়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেই কোনো পুলিশ ফাঁড়ি। যমুনা নদীর ৪৫ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে মাত্র সাড়ে ১৯ কিলোমিটারে প্রতিরক্ষা কাজ হওয়ায় বাকি অংশগুলোতে প্রতি বছরই ভাঙন দেখা দেয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ও প্রত্যাশার শেষ নেই। সারিয়াকান্দির পারতিত পরল এলাকার প্রভাষক শাহাদত জামান জানান, চরে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং নদী ভাঙন রোধ এখন সময়ের দাবি। কুতুবপুর এলাকার সুমন ও তানভীর হাসান বলেন, ‘বাপ-দাদার ভিটেমাটি হারিয়ে আমরা এখন আতঙ্কিত। ভাঙন রোধে আমরা কার্যকর পদক্ষেপ চাই।’
কাজলা চরের বাসিন্দা হানিফ ও আবু জাফর চরাঞ্চলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ফাঁড়ি এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবার জন্য হাসপাতালের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। আরেক স্থানীয় বাসিন্দা লিটন মিয়া মনে করেন, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি মুক্ত সমাজ গড়ার অঙ্গীকার যে প্রার্থী দেবেন, ভোটাররা তাকেই প্রাধান্য দেবেন।
নির্বাচনী ময়দানে ভোটারদের এসব দাবি পূরণে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন প্রার্থীরাও। জামায়াত মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দীন জানান, তিনি নির্বাচিত হলে নদী ভাঙন রোধের পাশাপাশি চরাঞ্চলে পশুপালন কেন্দ্র, পুলিশ ফাঁড়ি ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবেন। এছাড়াও যমুনায় দ্বিতীয় ব্রিজ নির্মাণ এবং ট্যানারি ও জুট মিল স্থাপনের মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করার কথা জানান তিনি।
অন্যদিকে, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য কাজী রফিকুল ইসলাম বলেন, তার আমলে নেওয়া নদী ভাঙন রোধের কার্যক্রমগুলো তিনি পুনরায় শুরু করবেন। তীর সংরক্ষণের মাধ্যমে নদীকে মানুষের অভিশাপ নয়, বরং আশীর্বাদে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে তার। তিনি আরও প্রতিশ্রুতি দেন, চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পুলিশ ফাঁড়ি নির্মাণ এবং পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলে স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা হবে।