শ্রমিক কল্যাণে নিষ্ক্রিয়তা, এক যুগের পুরনো কমিটিতে ধুঁকে ধুঁকে চলছে শ্রমিক দল

প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬, ১১: ৩৪
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের লোগো

জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কমিটি হয়েছিল প্রায় এক যুগ আগে। ২০১৪ সালে গঠিত ওই কমিটির মেয়াদ ২০১৬ সালে শেষ হলেও এখনো পর্যন্ত নতুন নেতৃত্বের দেখা পায়নি শ্রমিক দল। দিবসভিত্তিক অনুষ্ঠান ছাড়া নেই কোনো কার্যক্রম। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন এলাকায় সংগঠনের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে উঠেছে চাঁদাবাজির অভিযোগ। এরকম সংকট নিয়ে চলছে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ এই সহযোগী সংগঠন।

সর্বশেষ ২০১৪ সালের ১৯ ও ২০ এপ্রিল সংগঠনটির কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। ওই কাউন্সিলে শীর্ষ দুই পদ পান আনোয়ার হোসেন ও নূরুল ইসলাম খান নাসিম। ২০১৬ সালে মেয়াদ শেষ হওয়া সেই কমিটি দিয়েই চলছে কার্যক্রম। বিভিন্ন সময়ে কমিটির গুঞ্জন উঠলেও শেষ পর্যন্ত নতুন কমিটি আর আলোর মুখ দেখেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শ্রমিক অধিকার, মজুরি কাঠামো, নিরাপদ কর্মপরিবেশ কিংবা শিল্পখাতের নীতিনির্ধারণী প্রশ্নে সংগঠনটির কার্যকর কোনো ভূমিকা চোখে পড়ে না দীর্ঘদিন ধরে।

দিবসভিত্তিক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা

অভিযোগ রয়েছে, পয়লা মে শ্রমিক দিবসে র‌্যালি ও আলোচনা সভা ছাড়া সংগঠনের তেমন কোনো কার্যক্রম দেখা যায় না। শ্রমিকদের নীতিনির্ধারণী বিষয়েও সংগঠনটির কোনো ভূমিকা দেখা যায় না। এছাড়াও শ্রমিকদের কল্যাণে কার্যকরী ভূমিকা পালন না করার অভিযোগও রয়েছে বিএনপির অন্যতম বৃহৎ এই সহযোগী সংগঠনটির বিরুদ্ধে।

তবে বিষয়টি মানতে নারাজ ঢাকা জেলা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হোসেন আলী। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘সেদিন আগুন লাগল। সভাপতি আনোয়ার ভাইয়ের সাথে গেলাম। রানা প্লাজার ঘটনায় গিয়েছি, শ্রমিকদের জন্য বক্তব্য দিয়েছি। শ্রমিকদের কল্যাণে যে একেবারে কিছুই করছি না তা তো নয়।’

সংগঠনটির কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মঞ্জুরুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘পয়লা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে সমাবেশ করতেছি। এছাড়া রানা প্লাজা দিবস গেছে ২৪ এপ্রিল, আমরা অনেক বড় প্রোগ্রাম করছি সবাইকে নিয়ে। শিল্পকলা একাডেমিতে চিত্র প্রদর্শনী চলছে। চা শ্রমিকদের নিয়ে প্রোগ্রাম করেছি, রিকশা শ্রমিকদের, আউটসোর্সিং কর্মচারীদের নিয়েও আমারা কাজ করছি। এটা তো কন্টিনিউয়াস কাজ। বড় যে জমায়েতগুলা সাধারণত বিভিন্ন ডে উপলক্ষে হয়ে থাকে।’

ভাবমূর্তি সংকটে শ্রমিক দল

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের সুযোগে বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালায় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সহযোগী সংগঠন। এ সময় জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলদারি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে। এছাড়াও সড়কে শ্রমিক দলের ছত্রছায়ায় চাঁদাবাজির অভিযোগ ও পাওয়া যায়।

সংগঠনটির কেন্দ্রীয় পর্যায়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা পুরো সংগঠনের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট তৈরি হতে পারে।’

তবে এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কার বা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানা গেছে। কিন্তু তাতে পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

এপ্রসঙ্গে শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন স্ট্রিমকে বলেন, ‘শ্রমিকদল একটি সুশৃঙ্খল কেন্দ্রীয় সংগঠন। পরিবহন সেক্টরের ইউনিয়নগুলো আলাদা। আমরা শ্রমিক দল একটি আম্ব্রেলা সংগঠন। পরিবহনের ক্ষেত্রে আমাদের অনেক শাখা বা অনুসারী সংগঠন থাকতে পারে। তবে চাঁদাবাজি বা যেকোনো ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায় সংগঠন নেবে না। সড়কের রাজনীতি বা প্রশাসনের কিছু অভ্যন্তরীণ জটিলতার সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ অপকর্ম করতে পারে। তবে আমি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলতে চাই, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা আমাদের কর্মীদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

পরবর্তী কাউন্সিল কবে

দলটির দপ্তর সূত্রে জানা যায়, সারাদেশে বর্তমানে শ্রমিক দলের ২৫৪টি ইউনিট রয়েছে। এসব ইউনিটের অধিকাংশ কমিটির মেয়াদ নেই। তবে মেয়াদ না থাকলেও এসব ইউনিট কার্যকর বলে দাবি করছেন দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা।

দলটির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, সারা দেশের যেসব কমিটির মেয়াদ ৬ মাসের বেশি সময় ধরে মেয়াদ উত্তীর্ণ, সেসব কমিটি বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির অধীনে খুব দ্রুত নতুন কমিটি গঠন করা হবে। আর যেগুলো মেয়াদ উত্তীর্ণের পথে বা অল্প সময় ধরে মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে, সেগুলো পরবর্তী কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের পর নতুন নেতারা কমিটি গঠন করবে।

ঠিক কবে নাগাদ কেন্দ্রীয় কাউন্সিল হবে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকরী সভাপতি সালাহউদ্দিন সরকার স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমাদের চেয়ারম্যান শিমুল বিশ্বাসকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন সমন্বয়ক হিসেবে; শ্রমিক দলের কাউন্সিল যেন দ্রুত করা যায়। তিনি বেশ কিছু কমিটি করেছেন। সংগঠন নতুন গতি পেয়েছে। আরও কিছু করব মে দিবসের পরে। আমরা এই মে দিবসের পরে শ্রমিক দল কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের ডেট করব।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান স্ট্রিমকে বলেন, ‘নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিলেই বিভিন্ন গ্রুপ ও উপগোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়ে সংগঠনটি, ফলে ঐক্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে মূল দলের ওপরও। কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের বিতর্ক ও অস্থিরতা তৈরি হলে সাধারণ মানুষও এর দায় মূল সংগঠনের ওপর চাপায়। এই ঝুঁকি এড়াতেই অনেক সময় কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নতুন কমিটি দিতে অনাগ্রহী থাকে।’

এই রাজনীতি বিশ্লেষকের মতে, এভাবে দীর্ঘদিন অঙ্গসংগঠনগুলোকে ঝুলিয়ে রাখা কোনো সমাধান নয়। এটি যেমন একটি সমস্যা, তেমনি কমিটি দিতে গিয়ে সৃষ্ট সংকটও আরেকটি বড় সমস্যা। তাই কেবল একটি দল নয়, জাতীয় পর্যায়ে সব রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই অঙ্গসংগঠন পরিচালনার বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট নীতি ও চিন্তাভাবনা প্রয়োজন। কারণ অনেক সময় অঙ্গসংগঠনগুলো মূল দলের চেয়েও বেশি সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে। এ বাস্তবতায় বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলেরই ভাবতে হবে—কীভাবে অঙ্গসংগঠনগুলোকে কার্যকর, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং সংঘাতমুক্তভাবে পরিচালনা করা যায়।’

শ্রমিক সংগঠনগুলোকে কার্যকর করার প্রসঙ্গে অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গসংগঠনগুলো নিয়ে একটা জাতীয় পর্যায়ে আলাপ দরকার এবং একটা পলিসি দরকার রাষ্ট্রের যে তারা আসলে কীভাবে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অঙ্গসংগঠনকে ম্যানেজ করবে।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত