leadT1ad

কৌশলে নিয়ম লঙ্ঘন প্রার্থীদের, অবশেষে ভাঙল ইসির শীতনিদ্রা

Multiple Authors
সালেহ ফুয়াদ ও তৌফিক হাসান
ঢাকা

স্ট্রিম গ্রাফিক

সাভার থানা স্ট্যান্ড সংলগ্ন সামসুদ্দিন মার্কেট। জুতার দোকানের সামনে লিফলেট দিচ্ছেন হাস্যোজ্জ্বল নারী। নিজের নাম উল্লেখ করে বলছেন, আমি এমপি পদপ্রার্থী। এই প্রথম এমন কেউ লিফলেট নিয়ে এলেন, নাকি?

গণভোটে ‘হ্যাঁ’– এর পক্ষে প্রচারে গিয়ে গত ১৫ জানুয়ারি বিকেলে এভাবেই সংসদ নির্বাচনে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক দিলশানা পারুল। লিফলেটের এক পাশে এনসিপির প্রতীক ‘শাপলা কলি’; অন্যপাশে ঢাকা-১৯ (সাভার-আশুলিয়া) আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে দিলশানা পারুলের ছবি। সঙ্গে নিজের ও পরিবারের ফিরিস্তি, নির্বাচনী এলাকা নিয়ে ‘আমার অগ্রাধিকার প্রতিশ্রুতি’ শীর্ষক পাঁচ অঙ্গীকার এবং ‘কেন আমাকে বেছে নেবেন’ শিরোনামে তিন কারণ তুলে ধরেছেন পারুল।

প্রচারে নিয়ম লঙ্ঘনের ব্যাপারে দিলশানা পারুলকে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ হয়নি। এসএসএম দিলেও সাড়া দেননি তিনি।

ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট ও লিফলেট।
ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট ও লিফলেট।

শুধু এনসিপির নয়, তফসিলের পর থেকে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও জোট সমর্থিত প্রার্থীরা প্রতীক বরাদ্দের আগেই নিয়ম ভেঙে নানা কৌশলে ভোটের প্রচার চালাচ্ছেন। গণভোট, শোকসভা ও দোয়া মাহফিলের নামে নাকের ডগায় এসব করলেও, নির্বাচন কমিশন (ইসি) নির্বিকার। তবে হঠাৎ করেই নড়েচড়ে বসেছে ইসি। আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে একের পর এক প্রার্থীকে শোকজ করছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, এতদিন ধরে প্রকাশ্যে আচরণবিধি লঙ্ঘন হলেও কমিশন আগে কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি? অবশ্য কমিশন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে নির্বাচনী পরিবেশ থাকায় শোকজ দিতে হয়নি। তবে পরিস্থিতি ভিন্ন হওয়ায় ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে।

কী আছে দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালায়

‘নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা-২০২৫’– এর ১৮ নম্বর ধারায় প্রচারের সময়ের উল্লেখ রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কিংবা তাদের মনোনীত প্রার্থী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী কিংবা তাদের পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি ভোটগ্রহণের জন্য নির্ধারিত তিন সপ্তাহের আগে কোনো নির্বাচনী প্রচার শুরু করতে পারবেন না এবং ভোটগ্রহণ শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগে প্রচার শেষ করবেন।

নিয়মটিকে আরও স্পষ্ট করে গত ৫ জানুয়ারি কমিশনের জনসংযোগ অধিশাখার বিবৃতিতে বলা হয়, আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রতীক বরাদ্দের আগে কোনো রাজনৈতিক দল, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা তাঁর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি নির্বাচনী প্রচার করতে পারবেন না। আগামী ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পর নির্বাচনী আচরণ বিধিমালা মেনে প্রচারের জন্য নির্বাচন কমিশন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের ভোট শুরু হওয়ার ৪৮ ঘণ্টা আগে নির্বাচনী প্রচার শেষ করতে হবে।

মাঠ পর্যায়ে আচরণবিধি লঙ্ঘন হচ্ছে কিনা তা তদারকিতে তফসিল ঘোষণার পরদিন প্রতি উপজেলায় দুজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করে ইসি। আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং আসনভিত্তিক নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটিকে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

বিধিমালা ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তির ছবি।
বিধিমালা ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তির ছবি।

তিন কৌশলে প্রচার

দিলশানা পারুলের মতো এনসিপির অনেক প্রার্থী গণভোটে ‘হ্যাঁ’– এর পক্ষে ভোটের প্রচার চালাচ্ছেন। পাশাপাশি নিজের ও শাপলা কলি প্রতীকের কথা জানাচ্ছেন ভোটারদের। বিএনপির প্রার্থীরা খালেদা জিয়ার স্মরণে শোকসভা ও দোয়া মাহফিলের মাধ্যমে ভোটের পক্ষে গণসংযোগ করছেন। আর জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদির স্মরণে শোকসভা ও দোয়া মাহফিলের আড়ালে জনসংযোগ করছেন।

এর বাইরে কেউ কেউ সরাসরি জনসংযোগ করে নিজ দলীয় প্রতীকে ভোট চাইছেন। যেমন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও নরসিংদী জেলা সভাপতি খায়রুল কবির খোকনকে এলাকায় সরাসরি ধানের শীষের জনসংযোগ করতে দেখা গেছে। নরসিংদী-১ (সদর) আসনে বিএনপির প্রার্থী খোকন নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে গত ১০ জানুয়ারি জনসংযোগের একটি ভিডিও দিয়েছেন।

আলোকবালী ইউনিয়নের স্থানীয়দের সঙ্গে খায়রুল কবির খোকনের (নরসিংদী-১) কুশল বিনিময়। স্ক্রিনশট
আলোকবালী ইউনিয়নের স্থানীয়দের সঙ্গে খায়রুল কবির খোকনের (নরসিংদী-১) কুশল বিনিময়। স্ক্রিনশট

এতে দেখা যায়, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অটোরিকশার যাত্রীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে তারা খাবার পেয়েছেন কিনা জানতে চাইছেন খোকন। এক পর্যায়ে তিনি অটোরিকশায় থাকা শিশুদের বলেন, ‘কেমন আছো? ধানের শীষ, নাকি?

এ সময় খোকনের সঙ্গে থাকা একজন স্লোগান দেন, ‘মার্কাটা কী?’ জবাবে সবাই ‘ধানের শীষ’ বলেন। পরে পাশে থাকা আরেকজন শিশুদের বলেন, ‘মায়েরে গিয়া কইও’।

এই ভিডিওর ক্যাপশন, ‘আলোকবালী ইউনিয়নের স্থানীয়দের সঙ্গে কুশল বিনিময়’। এ ব্যাপারে জানতে খায়রুল কবির খোকনের নম্বরে কল দিলেও রিসিভ হয়নি।

(ভিডিওর আর্কাইভ লিঙ্ক: https://archive.ph/JojSS)

রফিকুল ইসলাম খানের প্রচারণার স্ক্রিনশট
রফিকুল ইসলাম খানের প্রচারণার স্ক্রিনশট

প্রায় সব দলের প্রার্থীরা প্রকাশ্যে চালানো প্রচারের চিত্র সামাজিক মাধ্যমে দিচ্ছেন। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সিরাজগঞ্জ-৪ (উল্লাপাড়া-সলঙ্গা) আসনের প্রার্থী মাওলানা রফিকুল ইসলাম খানের কয়েক লাখ ফলোয়ারের ফেসবুক পেজে ১৩ জানুয়ারি এমন প্রচারের ১০টি ছবি দেওয়া হয়। ক্যাপশনে লেখা, মোহনপুর বাজারে সিএনজি/অটোরিকশা স্ট্যান্ডে গণসংযোগ করেন ১১ দলীয় জোট মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান।

[পোস্টের আর্কাইভ লিঙ্ক: https://archive.ph/oSi1Z]

একই রকম প্রচারের বেশ কয়েকটি ছবি জুড়ে গত ৯ জানুয়ারি লেখা, শ্যামলীপাড়া এবং নাগরৌহা বাজারে গণসংযোগ করেন সিরাজগঞ্জ-৪ (উল্লাপাড়া-সলঙ্গা) আসনের ১১ দলীয় জোট মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান।

শেষ সময়ে ভাঙল ইসির শীতনিদ্রা

এতদিন নীরব থাকলেও প্রতীক বরাদ্দের আগ মুহূর্তে কয়েক প্রার্থীকে শোকজ করেছে ইসি। গত ১৮ জানুয়ারি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে শোকজ করে ইসি। এর কয়েকদিন আগে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির ও ঢাকা-১৩ আসনের প্রার্থী মাওলানা মামুনুল হক, সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) আসনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুক, চট্টগ্রাম-১৫ আসনে (লোহাগাড়া-সাতকানিয়া আংশিক) জামায়াতের প্রার্থী শাহাজাহান চৌধুরী, নাটোর-৩ (সিংড়া) আসনে বিএনপির আনোয়ারুল ইসলাম আনু, নওগাঁ-৪ আসনে একই দলের ডা. ইকরামুল বারী টিপুকে নির্বাচনী প্রচারের অভিযোগে শোকজ করে কমিশন।

শেষ সময়ে এসে জামায়াতের নায়েবে আমির মুজিবুর রহমানকেও শোকজ করা হয়েছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনে জামায়াতের এই প্রার্থীকে ১৮ জানুয়ারি নোটিশ পাঠান রাজশাহীর যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক কামরুন নাহার। এতে বলা হয়েছে, অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের উপস্থিতিতে গোদাগাড়ীর রিশিকুল ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে উঠান বৈঠকে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং প্রকাশ্যে দাঁড়িপাল্লার ভোট চাওয়া হয়েছে। পরে এই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে।

আচরণবিধি লঙ্ঘন ঠেকাতে ‘ইসি ব্যর্থ’ উল্লেখ করে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আবদুল আলীম স্ট্রিমকে বলেছেন, ‘শেষ সময়ে এসে ইসি দেখছে আচরণবিধি লঙ্ঘন দিনকে দিন বাড়ছে। এটি যেন এখন আর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়, সেজন্য জোরেশোরে নেমেছে।’ তাঁর মতে, আচরণ বিধিমালাতেই বহু ফাঁকফোকর রয়েছে। এতে অনেক কিছু স্পষ্ট করা নেই। কী করা যাবে, কী যাবে না তা স্পষ্ট করা দরকার ছিল।’

তফসিল ঘোষণার পর থেকেই আচরণবিধি লঙ্ঘন হলেও হঠাৎ কেন তৎপরতা– এমন প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা কেন শোকজ করব? শোকজ তো করছেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং সারাদেশে আমাদের নিয়োগ দেওয়া ইলেকটোরাল ইনকোয়ারি কমিটি। তাদের কাছে হয়তো কেউ অভিযোগ করেছেন; সে পরিপ্রেক্ষিতে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।’

আগে কেন তৎপরতা ছিল না, তার ব্যাখ্যায় এই কমিশনার বলেন, প্রথম দিকে হয়তো নির্বাচনী পরিবেশ ভালো ছিল। তাই শোকজ করা লাগেনি। এখন একটু বেশি ভঙ্গ হচ্ছে, তাই করছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত