দক্ষিণ আফ্রিকায় নিহত নারায়ণগঞ্জের পাঁচজন

কাল সকালে হেসে হেসে কথা বলছিলাম, আর আজকে আমার ভাইটা নাই: নিহতের স্বজনদের আহাজারি

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
নারায়ণগঞ্জ

দক্ষিণ আফ্রিকায় আগুন নিহত নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ক্রোকেরচর তিনজন। সংগৃহীত ছবি

‘আমার ভাই তো এখনও দুনিয়ার অনেক কিছু বুঝে না। এখনও বিয়ে করে নাই। গতকাল সকালে হেসে হেসে কথা বলছিলাম, আর আজকে আমার ভাইটা নাই। আমরা তো আগে পাঁচ ভাই-বোন ছিলাম, একজন শেষ হইয়া গেছেগা। আমার কলিজার ভাই, আমার মানিক ভাই, তুমি আইয়া পরো, নইলে আমারে লগে লইয়া যাও। আমি আর কুলাইতে পারতাছি না গো ভাই...।’

এক প্রতিবেশীকে জড়িয়ে ধরে কান্নার ভেতর কথাগুলো বলছিলেন মীম আক্তার। বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন আর কিছুক্ষণ পরই ভাইয়ের নাম ধরে ডাকছিলেন। তাঁকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে চোখ ভিজে উঠছিল স্বজনদের। গতকাল মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বিকালে নারায়ণগঞ্জের আলীরটেক ইউনিয়নের ক্রোকেরচর গ্রামে মো. ফাহিমের (২৮) বাড়ি গিয়ে এই দৃশ্য দেখা যায়। ফাহিমসহ এই গ্রামের তিনজন দক্ষিণ আফ্রিকায় নিহত হয়েছে।

গত সোমবার (২৭ জুলাই) বাংলাদেশে সময় রাত ৩টার দিকে দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের কুইন্সটাউনের একটি সুপারশপে দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে অন্তত ৬ বাংলাদেশি নিহত হন। তাঁদের মধ্যে ৫ জনেরই বাড়ি নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায়। অন্যজনের বাড়ি মুন্সিগঞ্জে বলে জানা গেছে।

গতকাল সকালে ফাহিমের মৃত্যু খবর তাঁর বাড়ি পৌঁছালে ভিড় করেন স্বজন ও প্রতিবেশীরা। বিকেলে গিয়েও সে দৃশ্য দেখা যায়। ঘরের ভেতরে বিলাপ করছিলেন ফাহিমের মা লুৎফুন্নেছা। পাশে ছোট বোন মুনমন ও মীম। এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিলেন জমজ ভাই জাহিদ ও নাহিদ। ঘরের ভেতর এক পাশে নির্বাক হয়ে বসেছিলেন বাবা মনির হোসেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বড় ছেলেকে হারিয়ে তিনি বাগরুদ্ধ প্রায়। শুধু বলেন, ‘আমার কিছু বলার নাই। ঘুম ভাঙলো পোলার মৃত্যুর খবর শুইনা। আমি আর কী কমু!’

ফাহিমের স্বজনেরা জানান, পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন তিনি। মাত্র ১৮ বছর বয়সে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমান। কুইন্সটাউনের একটি সুপারশপে ১০ বছর ধরে কর্মরত ছিলেন। চলতি বছর কাগজপত্র সম্পন্ন করে দেশে ফেরার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না।

ফাহিমের ফুফাতো ভাই মো. আল-আমিন বলেন, ‘ফাহিম শুধু কর্মচারী নয়, পুরো দোকানের দায়িত্বও ছিল তাঁর ওপর। পুরা সংসারটা সে-ই চালাইতো। কাগজপত্র ঠিক কইরা কয়েক মাসের মধ্যে দেশে ফিরার কথা ছিল। এত বছর ধরে বিদেশে, এবার বাড়ি আইসা বিয়া করবো— এই স্বপ্ন ছিল। কিন্তু কিছুই আর হইলো না।’

দক্ষিণ আফ্রিকায় নিহত নারায়ণগঞ্জের আপন আহমেদের বাড়িতে শোক। স্ট্রিম ছবি
দক্ষিণ আফ্রিকায় নিহত নারায়ণগঞ্জের আপন আহমেদের বাড়িতে শোক। স্ট্রিম ছবি

আপনের নির্মাণাধীন ঘরেই মায়ের বিলাপ

একই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন ক্রোকেরচর গ্রামের ২০ বছর বয়সী মো. আপন আহমেদ। চার বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন তিনি। ছেলের মৃত্যুর খবরে নির্মাণাধীন একতলা ভবনের মেঝেতে শুয়ে বিলাপ করছিলেন মা আঁখি বেগম। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলছিলেন, ‘আমার পুতেরে আইন্না দেও। তোমরা কেউ আমার পুতেরে আইন্না দেও।’

সদ্য প্রবাস ফেরত বড় ভাই মো. জুয়েল জানান, আগের দিনও ছোট ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়েছিল তার। তিনি বলেন, ‘আমার ভাইর স্বপ্ন ছিল বাড়িঘরটা পাকা করবো, বাবা-মারে নিয়া সেই বাড়িতে থাকবো। বাড়ি ঠিকই হইতেছে, কিন্তু আমার ভাইর স্বপ্ন স্বপ্নই রইয়া গেল।’

ভাইয়ের মরদেহ আনার আকুতি জানিয়ে জুয়েল বলেন, ‘যতটুকু শুনছি, লাশ পুইড়া ছাই হইয়া গেছে। যদি পোড়া লাশের ছাইটুকুও দেশে আনার ব্যবস্থা করা যায়, তাইলেও অন্তত কবর দিতে পারতাম।’

আপন আহমেদের বাবা আলী মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আগুনে আমার ছেলে ও আরও কয়েকজন মারা গেছে। আগুন সবকিছু নিয়ে গেছে। এখন তাদের কী অবস্থা, সেটাও ঠিকভাবে জানি না।’

দক্ষিণ আফ্রিকায় নিহত নারায়ণগঞ্জের এক বাসিন্দার বাড়িতে স্থানীয়দের ভিড়। স্ট্রিম ছবি
দক্ষিণ আফ্রিকায় নিহত নারায়ণগঞ্জের এক বাসিন্দার বাড়িতে স্থানীয়দের ভিড়। স্ট্রিম ছবি

দেশে ফেরার কাগজ তৈরি করছিলেন নূর মোহাম্মদ

শোকের একই আবহ বিরাজ করছিল গ্রামের নিহত নূর মোহাম্মদের বাড়িতেও। খাটের ওপর বসে আহাজারি করছিলেন তাঁর তিন বোন মালা, আরিফা ও কনিকা। অন্য ঘরে কাঁদছিলেন স্ত্রী কামরুন্নাহার। তাঁর বাবা শরব আলী আগেই মারা গেছেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ৫৫ বছর বয়সি নূর মোহাম্মদ দক্ষিণ আফ্রিকা যান ২০১৯ সালে। এর আগে দীর্ঘদিন সিঙ্গাপুর ছিলেন। নিজের উপার্জনেই দুই মেয়ে সায়মা ও সাদিয়ার বিয়ে দিয়েছেন তিনি। ছোট ছেলে সিয়াম এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন।

নূর মোহাম্মদের ভাগনি মোসাম্মৎ ফিমা বলেন, মামা দেশে ফিরবেন বলেই কাগজপত্র করছিলেন। আগের দিনও এই কাজে গিয়েছিলেন। জীবনের বেশির ভাগ সময় বিদেশে কাটিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ফিরছেন লাশ হয়েন।

দক্ষিণ আফ্রিকায় নিহত আরও তিনজন হলেন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার আলীরটেক ইউনিয়নের তৈলখিরার চর গ্রামের ফারুক হোসেনের ছেলে মো. ফয়সাল (২৬) এবং ফতুল্লা থানার বক্তাবলী ইউনিয়নের কানাইনগর গ্রামের মৃত আক্তার হোসেনের ছেলে মো. শাহিন (৩০)। অন্যজন মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার মিরকাদিম পৌরসভার কালিন্দিপাড়া গ্রামের মৃত সালাম বেপারীর ছেলে মো. রাজিক (৫৫)।

ক্ষতিগ্রস্ত সুপারশপের মালিক আলীরটেক ইউপির ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও ক্রোকেরচর গ্রামের বাসিন্দা রওশন আলী। তিনি জানান, দক্ষিণ আফ্রিকায় নিহত ছয়জনের মধ্যে চারজনই তার ইউনিয়নের বাসিন্দা। একজনের বাড়ি পাশের বক্তাবলী ইউনিয়নে। এছাড়া আরেকজন মুন্সিগঞ্জের রিকাবিবাজার এলাকার বাসিন্দা। তারা সবাই পরস্পরের আত্মীয়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত