জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ভোটের পর কাটছে ভয়, মাঠে সক্রিয় হচ্ছে আ.লীগ

প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০: ৪০
সীমিত পরিসরের কর্মসূচি দিয়ে সরকারের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ। স্ট্রিম গ্রাফিক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সক্রিয় হচ্ছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। বেশ কয়েকটি জেলায় কার্যালয় খোলা থেকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের কর্মসূচিও করেছেন তারা। যদিও এসব চেষ্টার সময় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার হতে হয়েছে।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ধাক্কা ও ভয়ভীতি কিছুটা কমে আসায় তারা মাঠ যাচাই করছেন। সীমিত পরিসরের কর্মসূচি দিয়ে সরকারের মনোভাব বোঝার চেষ্টা করছেন। কর্মীদের মনোবল ধরে রাখা এবং রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদে প্রকাশ্যে আসার বিকল্প নেই বলে মনে করেন নেতারা। এক্ষেত্রে সরকারে বিএনপির আসাকে আশীর্বাদ মানছেন তারা।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান হয়। এরপর শীর্ষ নেতারা আত্মগোপনে অথবা বিদেশে পালিয়ে যান। অনেকে গ্রেপ্তার হন। দলটির প্রায় সব পর্যায়ের নেতাকর্মী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। বন্ধ হয়ে যায় দলীয় কার্যালয়। এরই মধ্যে ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর প্রথমে ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার। পরে গত বছরের ১০ মে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা দেয়।

সম্প্রতি সংসদ নির্বাচনে জিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সক্রিয় হতে থাকেন। নেতাকর্মীরা জানান, নির্বাচনের আগে সমর্থন পেতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতারা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং নির্বাচনের পর চলাফেরা ও রাজনৈতিক কার্যক্রমের ব্যাপারে অভয় দেন।

শরীয়তপুর জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা ভোটে বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছি। নির্বাচনে জিতলে আমাদের কোনো ক্ষতি করবে না– এমন আশ্বাস তারা দেন। তাদের ভরসাতেই নেতাকর্মীরা মাঠে নামছেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই পলাতক। হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমাদের কর্মীরা রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং দল পুনর্গঠনে কার্যালয় পুনরায় খোলার চেষ্টা করবে– এটাই স্বাভাবিক। আমরা আশা করি, বিএনপি সরকার এটিকে নিজেদের জন্য কোনো হুমকি হিসেবে দেখবে না। তারা আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে সম্মান করবে।’

এ ব্যাপারে রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন স্ট্রিমকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বড় রাজনৈতিক দল, তাদের বিশাল সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে। আওয়ামী লীগের ভোট টানতে অনেক রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনের আগে নানা প্রতিশ্রুতি দিতে দেখা গেছে। সেই আশ্বাসেই ভোটের পর আওয়ামী লীগের সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা খুবই স্বাভাবিক। তবে এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক পক্ষের অভয় আছে কিনা, তা হলফ করে বলা কঠিন।’

বিভিন্ন জেলায় তৎপর নেতাকর্মী, গ্রেপ্তার

গত ১০ দিনে অন্তত ১৫ জেলায় আওয়ামী লীগ, এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীকে ঝটিকা মিছিল কিংবা কার্যালয় খোলার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে এসব কার্যক্রম প্রকাশ্যে আসে। ওইদিন পঞ্চগড়ের চাকলাহাট ইউনিয়নে দলীয় কার্যালয়ের তালা খুলে দেওয়ার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ১৫ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে তালা ভেঙে কার্যালয়ে প্রবেশ করে স্লোগান দেন কর্মীরা।

১৬ ফেব্রুয়ারি বরগুনার বেতাগী, পটুয়াখালীর দশমিনা ও খুলনা মহানগরের দলীয় কার্যালয়ে অবস্থান; ১৮ ফেব্রুয়ারি শরীয়তপুর ও নোয়াখালী কার্যালয়ে; পরদিন রাজশাহীতে দলীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন করেন কর্মীরা।

২০ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে স্লোগান দিয়ে ব্যানার টাঙান নেতাকর্মীরা। ওইদিন যশোরের বাঘারপাড়ায় তালা ভেঙে কার্যালয়ে ঢোকেন কর্মীরা। ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারের উখিয়া, হবিগঞ্জ, রাজবাড়ী ও পাবনায় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন করে। যদিও পাবনা কার্যালয়ে সন্ধ্যায় আগুন দেওয়া যায়।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও শহীদ দিবস ঘিরে চট্টগ্রাম নগরী, গাইবান্ধা, সাতক্ষীরার কলারোয়া, নড়াইলের লোহাগড়া, জামালপুরের বকশীগঞ্জ ও রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে সীমিত পরিসরে কর্মসূচি পালন করেন নেতাকর্মীরা। এসব কর্মসূচি ঘিরে গতকাল রোববার টাঙ্গাইলে এক, আগের দিন শনিবার গাইবান্ধায় দুই এবং একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে ফুল দিতে গেলে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া শুক্রবার বিকেলে কুমিল্লার বুড়িচং কার্যালয়ে ইফতার কর্মসূচির সময় এক, চট্টগ্রামে ঝটিকা মিছিল থেকে আট ও গত শনিবার পাবনায় জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে নিরাপত্তা বাহিনী।

বিএনপি সব সময় আওয়ামী লীগের বিষয়টি বিচারিক প্রক্রিয়ায় দেখার কথা বলে আসছে। বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার বিষয়ে সোমবার বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘এটি আমরা চাইনি। যেহেতু আইনগতভাবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, তাই সব জায়গায় সেভাবেই তাদের দেখা হবে।’

তবে আওয়ামী লীগের এভাবে প্রকাশ্যে আসার পেছনে বিএনপির ইন্ধন রয়েছে বলে সরাসরি অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্যসচিব জয়নাল আবেদীন শিশির। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে আপস করে আওয়ামী লীগ কার্যক্রম চালাচ্ছে। কিন্তু আমাদের অবস্থান সব সময় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনার যেকোনো প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হবে।’

পুলিশ সদরদপ্তর থেকেও সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের কোনো তৎপরতা চলতে দেওয়া যাবে না। কেউ বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করলে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে– মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এই নির্দেশনা দিয়েছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক।

Ad 300x250

সম্পর্কিত