অ্যালগরিদমে ‘হুমায়ূন Mode’ অন করার আগে কয়েকটা কথা

স্ট্রিম গ্রাফিক

হুমায়ূন আহমেদ মারা গেছেন সেই ২০১২ সালে। কোনো রাইটার মইরা যাওয়ার পরে ইউজুয়ালি তার লিটারেরি জনরার সার্কুলেশনে একটা ন্যাচারাল ডিজরাপশন আসে। কিন্তু মারা যাওয়ার ১৪ বছর পরেও দেখা যাইতেছে, বাংলাদেশের কালচারাল পেরিফেরিতে 'হুমায়ূনীয়' লিটারেরি জনরার সার্কুলেশন বহাল তবিয়তেই আছে। সাদাত হোসেনের ফ্যানরা রাগ করবেন যদি বলি, আমি নিজেই একগাদা পিপলরে চিনি, যাদের লেখা পড়লে মনে হয় তারা কনস্ট্যান্টলি হুমায়ূন আহমেদকে ইমিটেট করার ট্রাই করতেন বা করতেছেন।

তবে ব্যাপারটা একদম নেক্সট লেভেলে হিট করল গতকাল। ফেসবুকে স্ক্রল করতে করতে একটা উইয়ার্ড জিনিস চোখে পড়ল। বইপড়ুয়াদের একটা বড় গ্রুপ আছে। নাম ‘বইপোকাদের আড্ডাখানা’। তারা এআই প্ল্যাটফর্ম ‘WaheedAI’ এর লগে জয়েন্ট কোলাবোরেশনে একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করছে। ইভেন্টের নাম: ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় হুমায়ূন আহমেদ: গল্প লেখা প্রতিযোগিতা’। নিয়মটা অদ্ভুত! এআই ইউজ কইরা হুমায়ূন আহমেদের স্টাইলে গল্প লেখতে হবে। জিতলে গিফট ছয় হাজার টাকার বই!

কম্পিটিশনের পোস্টার; ছবি: ফেসবুক

প্রতিযোগিতার এই ধরন দেইখা আমার মাথায় ইনস্ট্যান্ট যে জিনিসটা আসছে সেইটা হইলো: ‘এই দন দেকতে এম্বি ডুকাই?’

কিন্তু ইন্টারনেট-কালচারের এই রিফ্লেক্স রিঅ্যাকশনের ঠিক পরপরই আরেকটা জিনিস মনে হইলো। রোল্যাঁ বার্থের বিখ্যাত আইডিয়া ‘ডেথ অব দ্য অথর’ অনুযায়ী আমরা জানি যে, টেক্সট লেখার পর অথরের একধরনের সিম্বোলিক্যাল ডেথ ঘটে। এরপর টেক্সটের মালিকানা সম্পূর্ণভাবে রিডারের স্বাধীন ব্যাখ্যার জগতের। কিন্তু পোস্ট এআই পিরিয়ডে আইসা অথর আর রিডারের মধ্যে সম্পর্কের যে চিরায়ত ডায়াগ্রাম, ঠিক তার মাঝখানে এখন থার্ড পার্টির মতো ঢুইকা গেছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আর অ্যালগরিদম।

আগে যা ছিল রিডারের টেক্সট , এখন এগুলা স্রেফ অ্যালগরিদমের কাঁচামাল। টেক্সট যে এইভাবে ‘ডেটা’ হইয়া উঠল এবং প্ল্যাটফর্মগুলো যে ডেড অথরের লিগ্যাসিকে এইভাবে সার্কুলেট করা শুরু করল–এই পুরো শিফটটারে আমাদের আসলে কীভাবে রিড করা উচিত? এই যে আমাদের লিটারেরি লিগ্যাসির অ্যালগরিদমিক ট্রান্সফর্মেশন, তা নিয়া আমার কিছু আলাপ আছে।

চলেন তাইলে শুরু করি।

হুমায়ূনের সেকেন্ড মরণ

পোস্টারটা দেখেন। হুমায়ূন আহমেদের মুখ আছে, তার নাম আছে। তার লেখার ধরন একটা এআই প্ল্যাটফর্মের প্রোডাক্ট হিসেবে ইউজড হইতেছে। কিন্তু উনি তাতে কনসেন্ট দিতে পারেন নাই, কারণ উনি ডেড।

তো এইখানে কয়েকটা জিনিস আছে, যেগুলারে আলাদা কইরা দেখতে না পারলে আমাদের এই আলোচনাটা কমপ্লিট হয় না। যেমন ধরেন, ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টির আলাপ। হুমায়ূন আহমেদের লেখার কপিরাইট কার কাছে? তার পরিবার আর পাবলিশার এর কাছে যদি ভুল না করি। তো সেই লেখা দিয়া এআই ট্রেইন করা বা সেই লেখার প্যাটার্ন ইউজ কইরা সেইটারে কমার্শিয়াল প্রোডাক্ট বানানো–আইনগত ভাবে কতটা ঠিকঠাক সেইটা এখনো গ্লোবালি একটা অমীমাংসিত প্রশ্ন। আর বাংলাদেশের ল স্ট্রাকচারে এইটা তো আরো ব্লারি একটা ঘটনা। স্যাডলি এই কম্পিটিশনের অর্গানাইজারদের এটা নিয়া কোন আলাপই দেখলাম না।

দ্বিতীয়ত, মোরাল রাইট এর আলাপ। ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টির বাইরেও একজন লেখকের কাছে তার কাজ কীভাবে ইউজ করা হবে, সেটা নিয়ন্ত্রনের অধিকার থাকে। ফ্রেঞ্চ ল ওয়াইজ এইটারে ড্রইট মোরাল (Droit Moral) বলা হয়। এইটা বিক্রি বা হস্তান্তর করা যায় না, মরণের পরেও থাকে। হুমায়ূন আহমেদ কী আসলেই চাইতেন তার লেখার স্টাইল বা তার নাম কোন এআই প্ল্যাটফর্মের মার্কেটিং ক্যাম্পেইনে ব্যবহার করা হবে? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো নাই। কিন্তু আপনি যখন প্রশ্নটা নিয়াই চিন্তা করবেন না, আমি তখন এইটারে প্রব্লেম হিসেবে আইডেন্টিফাই করব।

এবং সবার শেষে আমি ডিগনিটির আলাপ তুলব। একজন মানুষের মুখ, নাম এবং সৃজনশীল পরিচয় তার মরণের পরে কোনো কমার্শিয়াল এন্টিটি ইউজ করতে পারে কি? পারলেও কেমনে এবং কী কী প্রসেসের ভেতর দিয়া পারে?

একটা ঘটনা বলি তাইলে! ২০১২ সালে কোচেলা ফেস্টিভ্যালে টুপ্যাক শাকুরের হলোগ্রাম পারফর্ম করছিলো। টুপাক মারা গেছে তারও ১৬ বছর আগে। তো সেই হলোগ্রাম নিয়ে তখন বড়সর কন্ট্রোভার্সি তৈরি হয়। কিন্তু ঘটনা হইতেছে ওইটার ডিসিশন মেকিংয়ে অন্তত টুপ্যাকের এস্টেট আর ফ্যামিলি কানেক্টেড ছিল। কিন্তু এই কম্পিটিশনে হুমায়ূনের ফ্যামিলি আর পাবলিশাররা কই?

কোচেলা ফেস্টিভ্যালে টুপ্যাকের হলোগ্রাম আর স্নুপ ডগ। ছবি: রোলিং স্টোন
কোচেলা ফেস্টিভ্যালে টুপ্যাকের হলোগ্রাম আর স্নুপ ডগ। ছবি: রোলিং স্টোন

এই কম্পারিজনটার কথা কইতে গিয়া আরেকটা জিনিস মনে হইল। টুপ্যাকের হলোগ্রাম ছিল একটা সিঙ্গুলার ইভেন্টের সিঙ্গুলার স্টেজের কাহিনি। কিন্তু হুমায়ূনের এআই সিমুলেশনের ঘটনাটা হইতে যাচ্ছে একটা রিপ্লিক্যাবল, স্কেলেবল প্রোডাক্ট। যে কেউ, যে কোন সময় ‘হুমায়ূন Mode’ গল্প তৈরি করতে পারবে। আমার কাছে এই জিনিসটা একজন মরা মাইনষের ক্রিয়েটিভ আইডেন্টিটিরে ইনফিনিট লুপে ঢুকায় দেয়ার মতো লাগে আরকি!

পোস্ট এআই রিয়েলিটিতে এইটা নতুন ধরনেরর ডেথ। হুমায়ূন আহমেদের ফিজিক্যাল ডেথ হইছে ২০১২ সালে। আর তার লিটারেরি ডেথ মেবি এইটা যখন তার সাহিত্যিক সত্তারে আপনি অ্যালগরিদমে ফেইলা কমার্শিয়াল প্রোডাক্ট বানাইতেছেন। বার্থ কইছিলেন লেখকের মরণ পাঠকের জন্মের পূর্বশর্ত। কিন্তু তিনি মেবি এই সম্ভাবনার কথা কন নাই, যেইখানে লেখকের ডেথ একটা প্ল্যাটফর্মের মুনাফার শর্ত হইয়া ওঠে।

গ্রোথের ফাঁদ পাতা ভুবনে

হুমায়ূন আহমেদ নিয়া প্রচুর কথাবার্তা হইছে। এইবার নজরটা একটু অন্যদিকে ঘুরাই। একটু WaheedAI নিয়া আলাপ করি।

এই কম্পিটিশনটারে যদি সবচেয়ে অনেস্টলি ডেস্ক্রাইব করতে হয়, তাইলে বলতে হবে যে এইটা একটা এআই প্ল্যাটফর্মের ইউজার একুইজিশন ক্যাম্পেইন। সাহিত্য উদ্যোগ না, সাহিত্যপ্রেমের ফিরিস্তিও না, এইটা একটা গ্রোথ হ্যাকের ঘটনা। হুমায়ূন আহমেদের নাম একটা ইমোশনাল হুক, বইপোকাদের আড্ডাখানার বিশাল কমিউনিটি হইতেছে ফানেল আর WaheedAI হইতেছে ডেস্টিনেশন।

বস কি স্ট্রাকচারটা ধরতে পারছেন?

হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশে একটা অলমোস্ট পারফেক্ট অ্যাসেট। কোটি মানুষের নস্টালজিয়া, প্রথম বইপড়া আর প্রেমের স্মৃতি এই নামের সঙ্গে জড়ায়ে আছে। এই যে ইমোশনাল ক্যাপিটাল এইটারেই একটা প্ল্যাটফর্ম তার ইউজার বেইজ বাড়ানোর কাজে লাগাইতেছে।

এইটারে জাস্ট সিনিক্যাল বইলা ডিসমিস করলে একটা মেইন পয়েন্ট মিস হইয়া যাবে। প্ল্যাটফর্মগুলা সার্ভাইভই করে এঙ্গেজমেন্ট দিয়ে। আর এঙ্গেজমেন্ট আসে ইমোশন থিকা। বাংলাদেশের ডিজিটাল স্পেসে হুমায়ূন আহমেদের নাম যতটা ইমোশন জেনারেট করে, অন্য কোন জিনিস দিয়ে এই মাপের ইমোশন কমই জেনারেট করা যাবে। ফলে কোশ্চেন এইটা না যে ‘WaheedAI এটা কেন করল?’ প্রশ্ন মেবি এইটা যে, ‘এই সিস্টেমে কেউ কেন এটা করবে না?’

কিন্তু স্ট্রাকচারাল প্যারাটা এইখানেই লুকায়ে আছে।

প্ল্যাটফর্ম ইকোনমিতে কালচারাল লিগ্যাসি কখনোই সেফ থাকে না। যে জিনিস যত ইমোশন ক্যারি করে, সেই জিনিস তত মনিটাইজেবল। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল বা জীবনানন্দ বাংলাদেশের ডিজিটাল স্পেসে ইতিমধ্যে অসংখ্যবার কন্টেন্ট এলিমেন্ট হিসেবে চইলা আসছে। হুমায়ূন সেই লিস্টের সর্বশেষ সংযোজন। পার্থক্যটা হইল এইবারের টুলটা । সেইটা এআই।

আগে একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর হুমায়ূনের নাম ইউজ কইরা পোস্ট ক্রিয়েট করত। অইটা একটা লিমিটেড ঘটনা। কিন্তু এখন WaheedAI ‘হুমায়ূন mode’রে একটা রেপ্লিক্যাবল ফিচার হিসেবে দাঁড় করাইতেছে। থিওরিটিক্যালি এই জিনিস আনলিমিটেড স্কেলে প্রডিউস করা যাবে। এতে কইরা প্রত্যেকটা আউটপুটে WaheedAI-এর ব্র্যান্ড ভিজিবিলিটি বাড়বে। এবং এইটার সঙ্গে হুমায়ূনের লিটারেরি এস্টেটের কোন বেনিফিট নাই। হুমায়ূন ফ্যামিলির বা তার পাবলিশারদের কোনো এজেন্সি নাই।

ফলে এইটারে আমি শুধু একটা কম্পিটিশন হিসেবে না দেইখা একটা বিজনেস মডেলের প্রুফ অফ কনসেপ্ট হিসেবে আইডেন্টিফাই করতেছি। ফ্রেঞ্চ ফিলোসফার, ফিল্মমেকার গী ডুব্যোহ (Guy Debord) উনার 'দ্য সোসাইটি অব দ্য স্পেক্ট্যাকল’ এ কইছিলেন, লেট ক্যাপিটালিজমে লাইফ, কালচার, রিলেশনশিপ সবই শেষ পর্যন্ত স্পেক্ট্যাকল হয়ে যায়। এই পোস্ট এআই রিয়েলিটিতে ড্যুবোহর এই অবজারভেশন আরও একটা নতুন মাত্রা পাইছে। এখন শুধু খালি জীবিত মানুষের অভিজ্ঞতাই স্প্যাক্টেকল না, মরা মানুষের ক্রিয়েটিভ আইডেন্টিটিও স্প্যাক্টেকল হয়ে যাইতেছে আর তার মুনাফা যাইতেছে প্ল্যাটফর্মগুলাতে।

গী ডুব্যোহ। ছবি: পিন্টারেস্ট
গী ডুব্যোহ। ছবি: পিন্টারেস্ট

হুমায়ূন আহমেদ যে এখন একটা মার্কেটিং অ্যাসেট এইটা ট্রুথ হিসেবে ভেরি আনকম্ফোর্টেবল। কিন্তু এই জিনিসটারে শুধু WaheedAI এর নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে রিড করলে আমরা আসল সমস্যাটা এড়ায় যাব। আসল সমস্যা হইলো আমরা এমন একটা সিস্টেম বানাইছি, যেখানে এইটাই নর্মালসি। আর এই নর্মালসির ভিতরেই লুকায়ে আছে আরেকটা কাউন্টার আর্গুমেন্ট।

লিটারেচারের ডেমোক্র্যাটাইজেশনের লজিক আর বাউন্ডারি

এতক্ষণ আমি মোটামুটি একটা সাইডেই আলাপ করছি। এইবার একটু অন্যদিক থিকা ভাবি।

এই প্রতিযোগিতার পক্ষে কেউ কেউ আরেকটা লজিক দিতে পারে । এবং সেই লজিকটারে ডিসমিস করলে আমাদের পুরা আলোচনাটা ওয়ান সাইডেড হয়ে যাবে। সো লজিকটা হইতেছে ডেমোক্র্যাটাইজেশনের।

এইটা তো মিছা কথা না যে, বেশিরভাগ টাইমেই বাংলাদেশে রাইটার হওয়া একটা ক্লাস প্রিভিলেজের ঘটনা। ভালো বাংলা শেখার সুযোগ, পড়ার অভ্যাস তৈরির পরিবেশ, সময়, নেটওয়ার্ক এগুলো সবার থাকে না। একটা গার্মেন্টসকর্মী বা দিনমজুরের সন্তান যে হুমায়ূন পড়ছে, যার ভেতরে গল্প বলার একটা তাড়না আছে, কিন্তু যে কখনো প্রোপার বাংলা লেখার সুযোগ পায়নাই , এআই যদি তারে সেই সুযোগটা দেয়, সেটা কি খারাপ?

মিমিক্রি লিটারেচারে সবসময় একটা লেজিটিমেট লার্নিং পাথ। বড় রাইটারদের নকল করতে করতে বহুত রাইটার নিজের ভয়েস খুইজা পাইছেন। হুমায়ূনরে ইমিটেট করতে করতেও বহুজন লেখতে শিখছেন। এআই দিয়া হুমায়ূনের স্টাইল অনুসরণ করাটা হয়তো কারো কারো জন্য সাহিত্যে প্রবেশের ঘটনা হইতে পারে।

কিন্তু এই লজিকেরও তো একটা ফাঁক আছে।

ডেমোক্র‍্যাটাইজেশন মানে সুযোগের সমতা। কিন্তু এই কম্পিটিশন কি আসলেই সেটা করতেছে? আচ্ছা এই কম্পিটিশনে ভালো করতে হইলে কী কী লাগবে? ভালো স্মার্টফোন, স্থিতিশীল ইন্টারনেট কানেকশন আর এআইরে ভালোভাবে ইন্সট্রাক্ট করার এবিলিটি–মোটাদাগে এইগুলা জরুরি। তো এইগুলার জন্য তো আসলে অনেকখানি ইংরেজি জ্ঞানও দরকার। হুমায়ূনের লেখা সম্পর্কে গভীর বোঝাপড়ার দরকার।

এই রিসোর্সেস কি সেই গার্মেন্টসকর্মী বা দিনমজুরের সন্তানের কাছে আছে? ইন জেনারেল প্র্যাকটিসে না থাকার কথা এবং এই ঘটনা নতুন করে ডিজিটাল ডিভাইডেশন তৈরি করবার সম্ভাবনা নিয়ে আসবে। যার কাছে ভালো ডিভাইস, ভালো ইন্টারনেট আর এআই এবিলিটি আছে সেই জিতবে। ফলে এই কম্পিটিশনটা অলরেডি একটা প্রিভিলেজ প্লেগ্রাউন্ড হয়ে উঠতেছে ধারণা করা যায়।

খালি এইটা না, এইখানে আরেকটা ডিপার প্রবলেমও আমি দেখি।

হিউম্যান যখন মিমিক্রি করে, তখন সে নিজের এক্সপেরিয়েন্স দিয়ে অইটারে ফিল্টার করে। বড় রাইটাররে ইমিটেইট করতে করতে এক সময় নিজের জীবনের কথা, নিজের সেন্সিবিলিটি বাইর হইয়া আসে। এই ফ্রিকশনটাই ক্রিয়েটিভ গ্রোথ। এআই এর মিমিক্রিতে তো সেই ফ্রিকশন নাই। আউটপুট এতো স্মুদ আর এফোর্টলেস যে অইখানে গ্রোথের কোন প্লেস নাই।

তাইলে ডেমোক্র‍্যাটাইজেশন দাবিটার কী হয়?

খেয়াল করলে দেখবেন এই কম্পিটিশন নতুন রাইটার ক্রিয়েট করবে না। ক্রিয়েট করবে নতুন কোনো প্রম্পট রাইটার। এই দুইটা কখনোই এক জিনিস না। এই যে ডিসটিঙ্কশন, এইটারে ইগনোর কইরা কেউ যদি ডেমোক্র‍্যাটাইজেশনের আলাপ তোলে সেইটা তো প্রবলেমেটিক। নিজের গল্প, নিজের ভাষায় না বইলা, নিজের গল্প অন্য একজনের ভাষায় একটা মেশিনের থ্রুতে বের করে নিয়ে আসা স্রেফ একটা ইলাবোরেট ইমিটেশন গেইম। এই গেইমে পা দেয়া নিজের সাহিত্যিক ক্যারিয়ারের জন্যই একটা ব্যারিয়ার।

পোস্ট এআই রিয়েলিটিতে হোয়াট ইজ লিটারেচার

না! এইটা মেবি এখন আর কোন ফিলোসফিক্যাল কোশ্চেন না। একদম প্র্যাকটিক্যাল প্রশ্ন যে পোস্ট এআই রিয়েলিটিতে সাহিত্য আসলে কী?

খেয়াল করলে দেখবেন, এখন এআই এমন টেক্সট প্রডিউস করতেছে যেইটা পড়তে ভাল্লাগে। খালি পড়তে ভাল্লাগে যে বিষয়টা এমন না, ইমোশনালিই অ্যাঙ্গেজ করে এবং টেকনিক্যালিও লিটারেচারের সব ক্রাইটেরিয়াও ফিলআপ করে। তাইলে হিউম্যান রিটেন লিটারেচার আর এআই জেনারেটেড কন্টেন্টের মধ্যে প্রিন্সিপাল ডিফারেন্সটা কই?

কয়েকটা জায়গা ধইরা জিনিসটা ভাবা দরকার।

অথরশিপের আলাপটা ধইরাই স্টার্ট করি। আসলে অথরের ধারণাটা খুবই নতুন। প্রিন্টিং প্রেসের আগে লিটারেচার ছিল একটা কমিউনাল ঘটনা। হোমার কি একজন মানুষ বা মহাভারত কি একজনের লেখা, এই নিয়ে একাডেমিয়াতে বহু তর্ক বিদ্যমান। অথরের কনসেপ্টটা বেসিক্যালি ক্যাপিটালিজম আর কপিরাইট ল-এর বাই প্রোডাক্ট।

এই ফ্রেম থিকা দেখলে এআই জেনারেটেড লিটারেচার আসলে প্রি অথর ওরাল ট্রেডিশনের একটা নিউ ভার্শন। কমিউনাল অথরশিপ, শুধু কমিউনিটির জায়গা নিছে অ্যালগরিদম।

কিন্তু এইটাই সমস্যা। ওরাল ট্র্যাডিশনে গল্প তখনই বদলায় যাইত যখন সেইখানে নতুন মানুষের নতুন এক্সপেরিয়েন্স অ্যাড হইত। অ্যালগরিদমে গল্প বদলায় না, সে অপটিমাইজ করে। এবং এই দুইটা ফান্ডামেন্টালি দুইটা আলাদা প্রসেসের ঘটনা।

এইবার আলাপ আসে অরিজিনালিটি নিয়া।

হুমায়ূন আহমেদ কই থিকা লিখছিলেন? তিনি গ্রেট গ্রেট রাইটারদের লেখা পড়ছেন। তার ব্রেইন সেইসব ইনপুট নিয়া একটা আউটপুট ক্রিয়েট করছে। স্কেল আলাদা হইতে পারে, কিন্তু এআইও তো অইটাই করে। তাইলে প্রিন্সিপাল ডিফ্রেন্সটা কই?

এম্বডিমেন্টে আই গেজ!

হুমায়ূনের আস্ত একটা শরীর ছিল। ক্যানসার হইছিল তার, ডিভোর্স হইছিল, ফ্যামিলির প্যারা ছিল, সন্তান হারাইছেন, বাচ্চাদের ওপর কন্ট্রোল হারাইছেন, নতুন কইরা সংসার করছিলেন, লাইফে রিস্ক নিছেন। এই এম্বডিড এক্সপেরিয়েন্স তার লিটারেচাররে শেইপ দিছে। কিন্তু এআই এর তো বডি নাই, তার মর্টালিটিও নাই স্টেকও নাই। এআই জানেনা রিস্ক কী? এআই শুধু জানে রিস্কের ডেস্ক্রিপশন কেমন।

এই পার্থক্যটা ছোট মনে হইতে পারে। কিন্তু এইটাই বেশ ক্রুশাল একটা ঘটনা। এইটা টের পাইলেই আমরা ভ্যালুর প্রশ্নে যাইতে পারবো।

আচ্ছা সাহিত্যের মূল্য কি শুধু আউটপুটে ? মানে একটা ভালো গল্প যদি ভালো গল্পই হয়, সেটা কে বা কীভাবে লিখেছে সেটা কি ম্যাটার করে না?

এই প্রশ্নের সৎ উত্তর হইলো: ম্যাটার করে এবং সব সময় করছে।

আমি এইখানে একটা নতুন কনসেপ্ট আনতে চাই।

রিস্ক।

হুমায়ূন যখন লেখতেন, তার মধ্যে হারানোর ভয় কাজ করত। সময়, শক্তি, রেপুটেশন হারানোর ভয় ছিল তার। বই ফ্লপ করলে সেটা তার লাইফরে এফেক্ট করত। ইউজুয়ালি এই ধরনের রিস্ক থেকে রাইটারদের মধ্যে একটা সততা আসে, লেখক নিজেরে পুরাপুরি দিতে বাধ্য থাকেন।

কিন্তু এআই এর তো হারানোর কিছু নাই। এই কম্পিটিশনের প্রম্পটদাতারও তেমন কিছু হারানোর নাই। একটা ব্যাড প্রম্পট এর কন্সিকোয়েন্স হইল আরেকটা প্রম্পট। পোস্ট এআই রিয়েলিটিতে হয়তো সাহিত্যের নতুন সংজ্ঞা হবে এইটাই যে, যে সাহিত্যে ক্রিয়েটরের হারানোর কিছু থাকে, তার ফেইলিওরের রিয়েল কস্ট থাকে সেইটাই সাহিত্য। বাকি সব হয়তো কন্টেন্ট।

লেখাটার একদম শেষ দিকে আছি।

একটা প্রশ্ন রাইখা লেখাটা শেষ করতে চাই। প্রশ্নটা হইল: এই ধরনের কম্পিটিশন আমাদের কোন দিকে নিয়া যাবে?

যদি এই ধরনের উদ্যোগ নর্মালাইজ হয়, যদি ‘হুমায়ূন mode’ একটা একসেপ্টেড ফিচার হয়ে দাঁড়ায়, যদি মৃত লেখকদের ক্রিয়েটিভ আইডেন্টিটি প্ল্যাটফর্মের প্রোডাক্ট হয়ে উঠতে থাকে তাইলে মেবি আমরা এমন একটা টাইমের দিকে আগাইতেছি যেইখানে লিটারেচার আর কন্টেন্টের পার্থক্যটা আস্তে আস্তে ব্লার হইতে থাকবে।

হুমায়ূন মইরা গেছেন। তার লেখা বাঁইচা আছে। আপনি সেই লেখারে অ্যালগরিদমে ঢুকায় দিলে যেইটা পাবেন সেইটা হুমায়ূন না, হুমায়ূনের শ্যাডো। শ্যাডো দিয়া লাইটের কাজ করা যাবে না। আমাদের লিটারেচারে এখন লাইট দরকার। সাহিত্যের জন্য যদি আসলেই কেউ কিছু করতে চান, শুরুটা এইখান থেকেই করতে পারলেই ভালো।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত