যে কারণে রিঙ্গো স্টার মিউজিক হিস্ট্রির এক ‘ইউনিক’ ড্রামার

স্ট্রিম গ্রাফিক

মিম কালচারে বিটলসের ড্রামার রিঙ্গো স্টাররে নিয়া মজার একটা লাইন আছে। লাইনটা হইল—‘রিঙ্গো ওয়াজ নট ইভেন দ্য বেস্ট ড্রামার ইন দ্য বিটলস।’ আমার কাছে মনে হয়, পপ কালচারের সবচেয়ে ক্লিশে জিনিসটা হইলো, পপ কালচার সবসময় ‘ফ্রন্টম্যান’ আর ‘মাস্টারমাইন্ড’ ন্যারেটিভ সেল করতে পছন্দ করে।

কোনো ড্রামারকে জাজ করতে হইলে তার জিনিয়াস হইবার প্যারামিটার হইয়া দাঁড়ায় লাউডনেস আর স্পিড। যে যত ফাস্ট ড্রাম পিডাইতে পারে, সে যেন বা তত বড় স্টার। জন বনহ্যামের ফ্যানদের আঘাত করা কোনভাবেই আমার উদ্দেশ্য না।

কিন্তু মজার ব্যাপার হইলো, এই লাইনটাই আসলে পপ কালচারের হিস্টোরিক্যাল রিভিশনিজমের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। অনেকেই ভাবেন এই কথা জন লেনন নিজে বলছিলেন, কিন্তু বিটলস হিস্টোরিয়ান মার্ক লেউইসন খুঁইজা বাইর করছেন, লাইনটার আসল সোর্স বিবিসি রেডিও একটা কমেডি শো, ‘রেডিও অ্যাকটিভ’, যেইটা এয়ার হইছিল ১৯৮১ সালের অক্টোবরে। মানে লেনন মারা যাওয়ার প্রায় এক বছর পরে। অথচ জোকটা এতবার রিপিট হইছে যে এখন এইটাই ‘ফ্যাক্ট’ হিসেবে ভাইরাল হইয়া গেছে। বাস্তবে লেনন রিঙ্গোরে নিয়া উল্টা কথা বলছিলেন। তিনি বলছিলেন, রিঙ্গো টেকনিক্যালি হয়তো টপ ড্রামার না, কিন্তু তার ড্রামিং আন্ডাররেটেড, ঠিক যেমন পল ম্যাককার্টনির বেজ প্লেয়িং আন্ডাররেটেড।

৭ জুলাই, রিঙ্গো স্টারের জন্মদিন। পপ কালচারের এই হিস্টোরিক্যাল রিভিশনিজম আর হিরো ওরশিপের বাইরে গিয়া যদি অ্যাকাডেমিক লেন্স আর মিউজিকোলজির জায়গা থিকা আমরা হিস্ট্রিরে হালকা ডিকনস্ট্রাক্ট করি, তাইলে রিঙ্গো স্টারের লিগ্যাসিটা ঠিক কেমন? রিঙ্গো কে, তার আসল নাম কী, এই জাতীয় উইকিপিডিয়াগিরি বাদ দিয়া চলেন বুইঝা আসি, রিঙ্গো কেন মিউজিক হিস্ট্রির ওয়ান অফ দ্য সিগনিফিক্যান্ট ড্রামারদের একজন!

রিঙ্গো স্টার। ছবি: পিন্টারেস্ট
রিঙ্গো স্টার। ছবি: পিন্টারেস্ট

রিঙ্গো ছিলেন বাওয়া বা বামহাতি। কিন্তু মজার বিষয় হইলো, বস বাজাইতেন ডানহাতি কিটে। যেকোনো কনভেনশনাল মিউজিক ইনস্টিটিউশন বা অ্যাকাডেমিক পার্সপেক্টিভ থিকা দেখলে এইটা একটা ভুল টেকনিক। কিন্তু এর ফলে তার ড্রাম ফিলগুলা ইউজুয়ালি বাম হাত দিয়া লিড কইরা শুরু হইতো, যা রিদমের মধ্যে একটা আনইউজুয়াল মাইক্রো-সেকেন্ডের ড্র্যাগ বা ডিলে তৈরি করত।

এথনোমিউজিকোলজি এবং পারকাশন স্টাডিজে রিঙ্গোর বাজানোর টাইমিং নিয়ে প্রচুর আলাপ-আলোচনা হইছে। অ্যাকাডেমিকরা যারে ‘পার্টিসিপেটরি ডিসক্রেপেন্সিস’ বা মাইক্রো-টাইমিং বলেন, রিঙ্গো ছিলেন তার মাস্টার। তিনি মেট্রোনোমের মতো নিখুঁত বা মেকানিকাল ছিলেন না; বরং তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিটের ঠিক এক মাইক্রোসেকেন্ড পরে হিট করতেন। এই গাণিতিক অসামঞ্জস্যতাই গানে একটা ইমোশনাল গ্রুভ বা সুইং ক্রিয়েট কইরা দিত। কেউ কেউ আদর কইরা এই সুইংরে ‘রিঙ্গো সুইং’ ডাকেন।

কয়েকটা কারণে অডিও ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সাউন্ড প্রোডাকশনের অ্যাকাডেমিক কোর্সে রিঙ্গো স্টারের রেকর্ডিং সেশনগুলারে এখনো কেস স্টাডি হিসেবে পড়ানো হয়। রিঙ্গোর আগে ড্রামস বাজানো হইতো মূলত বিগ-ব্যান্ড জ্যাজ স্টাইলে। হাই-পিচড এবং প্রচুর রিংগিং সাউন্ড। সেই যুগে জ্যাজ ড্রামাররা ‘ট্র্যাডিশনাল গ্রিপ’ ইউজ করতেন, মানে দুই হাতে দুই রকম কইরা স্টিক ধরতেন। রিঙ্গোই রক মিউজিকে ‘ম্যাচড গ্রিপ’ পপুলারাইজ করছিলেন, মানে দুই হাতে সেইম ওয়েতে স্টিক ধরা, যা এখন প্রায় সব রক ড্রামার ফলো করে। রিঙ্গো আর প্রডিউসার জর্জ মার্টিন স্টুডিওতে ড্রামসের ওপর টি-টাওয়েলস বিছায়া, টমগুলোকে ডি-টিউন কইরা একেবারে লো-পিচড, থাডি একটা সাউন্ড তৈরি করেন। আধুনিক রেকর্ডিংয়ে আমরা যে ফ্যাট, পাঞ্চি কিক বা স্নেয়ারের সাউন্ড শুনি, টেকনিক্যালি তার ব্লু-প্রিন্ট এই অ্যান্টি এস্টাবলিশমেন্ট সাউন্ড ডিজাইনের মধ্যেই ছিল। ড্রামের ভেতরে কাপড় বা কম্বল দিয়ে সাউন্ড ড্যাম্প করার এই টেকনিক সাউন্ড ফিজিক্স এবং অ্যাকুস্টিক স্টাডিজে একটা সিগনিফিক্যান্ট একজাম্পল হিসেবে দেখা হয়। রিঙ্গো আর বিটলসের সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার জিওফ এমেরিক মিলে ড্রামসের খুব কাছে মাইক্রোফোন বসায়ে যে পাঞ্চি সাউন্ড ক্রিয়েট করছিলেন, বর্তমানে এই ক্লোজ মাইকিং মডার্ন ড্রাম রেকর্ডিংয়ের স্ট্যান্ডার্ড।

জিওফ এমেরিক আর রিঙ্গো। ছবি: গেটি ইমেজ
জিওফ এমেরিক আর রিঙ্গো। ছবি: গেটি ইমেজ

এইখানে একটা এক্সাম্পল দিই। ১৯৬৬ সালে ‘রেইন’ গানটা রেকর্ডিংয়ের সময় জিওফ এমেরিক ড্রামের ভেতরে একটা উলের সোয়েটার গুঁইজা দিছিলেন সাউন্ড ডেড করার লাইগা, আর বেজ ড্রাম আগের চেয়ে অনেক কাছ থিকা মাইক করছিলেন। রেজাল্ট হইলো এমন একটা বুমি, থাডি সাউন্ড, যেইটা আগে কোনো রক রেকর্ডে শোনা যায় নাই। রিঙ্গো নিজেই বহুবার বলছেন, ‘রেইন’ তার ক্যারিয়ারের সেরা ড্রামিং পারফরম্যান্স, বিটলসের বাকি সব গানের চেয়েও। গানের ২ মিনিট ২৪ সেকেন্ডের একটা ব্রেকে রিঙ্গো প্রথমবারের মতো সরাসরি ড্রামে না গিয়া হাই-হ্যাট দিয়া ফিল শুরু করেন, তখনকার সময়ে যেইটা পুরাই নতুন একটা আইডিয়া আছিল।

‘দ্য বিটলস এজ মিউজিশিয়ানস’ এর কাভার। ছবি: পিন্টারেস্ট
‘দ্য বিটলস এজ মিউজিশিয়ানস’ এর কাভার। ছবি: পিন্টারেস্ট

মিউজিকোলজিস্ট ওয়াল্টার এভারেট তার দুই খণ্ডের বই ‘দ্য বিটলস এজ মিউজিশিয়ানস’-এ রিঙ্গো স্টাররে নিয়া আলাপ করতে গিয়া দেখাইছেন রিঙ্গো কীভাবে প্রথাগত রিদম সেকশনের ধারণারে ব্রেক কইরা ড্রামসরে মেলোডির পরিপূরক হিসেবে দাঁড় করাইছিলেন। তার ড্রাম পার্টগুলা এতই নিখুঁতভাবে গানের সাথে বোনা থাকত যে, সেগুলোরে বাদ দিলে বা চেঞ্জ করলে গানের মূল স্ট্রাকচারই ভেঙে পড়ে। অনেকে এই এপ্রোচরে ‘কম্পোজিশনাল ড্রামিং’ নামে ডাকেন।

অ্যাজ আ মিউজিশিয়ান রিঙ্গোর ছিল ‘সং ফার্স্ট ফিলোসফি’। ইউজুয়ালি একজন ড্রামার একটা নির্দিষ্ট গ্রুভ বা রিদম প্লে করেন, যার ওপর ব্যান্ডের বাকিরা গান বাজায়। কিন্তু রিঙ্গো প্রত্যেকটা গানের জন্য আলাদা এবং ইউনিক ড্রাম পার্ট বানাইতেন, যা লিরিক এবং মেলোডির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকত। ‘টিকেট টু রাইড’, ‘ইন মাই লাইফ’ বা ‘কাম টুগেদার’ এর মতো গানগুলা শুনলে বোঝা যাবে কেন মিউজিকোলজিস্টরা এইসব গানের ড্রাম প্যাটার্নকে মেলোডিক পার্কাশন হিসেবে আখ্যা দিতে চান। জাস্ট গানগুলা থিকা ড্রাম অংশ এলিমিনেট করেন, দেখবেন পুরা গানের আইডেন্টিটি চেঞ্জ হইয়া গেছে।

আর মিউজিকোলজিস্টরা শুধু নোটস নিয়া ভাবেন না, তারা টিম্বার বা শব্দের কালার নিয়াও কাজ করেন। রিঙ্গো ছিলেন পারকাশন সাউন্ড ডিজাইনের পাইওনিয়ার। কোন গানে হাই হ্যাট কতটা ওপেন থাকবে, বা স্নেয়ারের সাউন্ড কতটা ডেড করা হবে, তার ওপর রিঙ্গোর সূক্ষ্ম কন্ট্রোল ছিল। যারা ‘স্ট্রবেরি ফিল্ডস ফরেভার’ শুনছেন তারা হয়তো খেয়াল করছেন রিঙ্গো কীভাবে পারকাশন দিয়া পুরাদস্তুর একটা সাইকাডেলিক সাউন্ডস্কেপ বানাইছেন। ওই গানে রিঙ্গোর টম টম ফিলগুলা এখনো অ্যাকাডেমিক্যালি মাস্টারপিস হিসেবে কাউন্ট করা হয়।

১৯৬৪ সালে বিখ্যাত ‘দ্য এড সুলিভান শো’-তে রিঙ্গোরে লুডউইগ কোম্পানির ড্রাম কিট বাজাইতে দেখার পর অল্প সময়ের মধ্যেই আমেরিকায় ড্রাম সেটের বিক্রি আকাশচুম্বী হইয়া যায়। লুডউইগ কোম্পানির ড্রাম কিটরে রিঙ্গো কেমনে একা হাতে গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডে পরিণত কইরা ফেলছিলেন, সেইটা মিউজিক বিজনেস আর ইনস্ট্রুমেন্ট হিস্ট্রির একটা গুরুত্বপূর্ণ চ্যাপ্টার। আর মডার্ন ড্রাম সেটের যে স্ট্যান্ডার্ড গঠন আমরা এখন দেখি, তা জনপ্রিয় করার পেছনেও তার অবদান আছে।

রিঙ্গোর আগে ড্রামাররা সাধারণত ব্যান্ডের পেছনে অন্ধকারে সাইডম্যান হিসেবেই থাকতেন। রিঙ্গো ড্রাম সেটরে একটা রাইজারের ওপর বসায়া আর নিজের বাজানোর স্টাইল দিয়া ড্রামাররে স্টেজে একটা ভিজ্যুয়াল ফোকাস পয়েন্টে পরিণত কইরা ফেলছিলেন। রিঙ্গো স্টার নিজের সেন্স অফ হিউমার, চার্ম আর সিগনেচার স্টাইল দিয়া এস্টাবলিশ কইরা দিছিলেন যে, একজন ড্রামারও ব্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ আর জনপ্রিয় তারকা হইতে পারে।

রিঙ্গো ছিলেন লিভারপুলের ডিংগল এরিয়ার একজন খাঁটি ওয়ার্কিং ক্লাসের রিপ্রেজেন্টিটিভ। তার কোনো প্রথাগত মিউজিক্যাল ট্রেনিং ছিল না। সেই যুগে, যখন মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতেও একটা এলিট বা অ্যাকাডেমিক ক্লাসের ডমিনেশন ছিল, তখন রিঙ্গোর এই উত্থান ছিল অ্যান্টি-এলিটিজমের একটা বড় স্টেটমেন্ট।

সিক্সটিজে গ্লোবাল জিওপলিটিক্সে যখন আমেরিকার কনজিউমারিজম আর হলিউডের কালচারাল ডমিনেশন চলতেছিল, তখন ব্রিটিশ ইনভেশন ছিল ইউকের সবচেয়ে বড় সফট পাওয়ার উইপন। আর সেই সফট পাওয়ারের সবচেয়ে অ্যাক্সেসিবল মুখটা ছিলেন রিঙ্গো স্টার। আমেরিকান ওয়ার্কিং ক্লাস অডিয়েন্স জন লেননের ইন্টেলেকচুয়ালিজম বা পল ম্যাককার্টনির পারফেকশনের চেয়ে রিঙ্গোর ‘কমন ম্যান’ চার্মের সাথে সবার আগে এলাইনড ফিল করতে পারছিল।

আর যারা রিঙ্গোরে ‘জাস্ট এ বিটল’ ভাবেন, তাদের জন্য কিছু রিসিট থাকা দরকার। রিঙ্গো রক অ্যান্ড রোল হল অফ ফেমে দুইবার ঢুকছেন, একবার বিটলসের মেম্বার হিসেবে ১৯৮৮ সালে, আরেকবার সোলো আর্টিস্ট হিসেবে ২০১৫ সালে। ১৯৯৯ সালে তিনি মডার্ন ড্রামার হল অব ফেমে ইনডাক্টেড হন, আর ২০০২ সালে পারকাশিভ আর্টস সোসাইটি হল অব ফেমে, যেইখানে তার সাথে আছেন বাডি রিচ আর উইলিয়াম এফ লুডউইগের মতো নামও। ২০১১ সালে রোলিং স্টোন ম্যাগাজিনের পাঠকদের ভোটে রিঙ্গো সর্বকালের সেরা ড্রামারদের লিস্টে পঞ্চম স্থানে ছিলেন।

রিঙ্গো নিজেও কখনো টেকনিক্যাল ভার্চুওসিটির পিছে দৌড়ান নাই। বাডি রিচের মতো টেকনিক্যালি এক্সট্রাঅর্ডিনারি ড্রামারদের নিয়া জিজ্ঞেস করলে রিঙ্গো বলতেন, বাডি রিচ এক হাতে যা করতে পারেন, তিনি নয় হাত দিয়াও পারবেন না, কিন্তু ওইটা নিছক টেকনিক, ওইটা তারে টানে না। এই একটা লাইনেই রিঙ্গোর পুরা ফিলোসফিটা ধরা পড়ে।

ড্রামিংয়ে কারেক্ট বা ফাস্ট হওয়ার চেয়ে যে ফিল আর অরিজিনালিটি অনেক বেশি ইম্প্যাক্টফুল, তা রিঙ্গোর হাত ধইরাই সারা দুনিয়ায় সবার আগে এস্টাবলিশ হয়। ড্রামিংরে টেকনিক্যাল স্পেস থিকা আর্টিস্টিক স্পেসে নিয়া যাওয়ায় ডেভ গ্রোল থিকা শুরু কইরা ম্যাক্স ওয়েইনবার্গের মতো বিখ্যাত ড্রামাররা রিঙ্গোরে সারাজীবন আইডিওলাইজ কইরা গেছেন।

আজকের দিনে রিঙ্গোরে জানাই তার ৮৬তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত