
দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩৩ শতাংশ। এটি কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং সামষ্টিক অর্থনীতির এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের প্রতিচ্ছবি। একটি দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হচ্ছে তার ব্যাংক খাত। সেই খাতেই যখন এমন পচন ধরে, তখন বুঝতে হবে, এজন্য দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত অবক্ষয় দায়ী।
২০০৯ সালের দিকেও দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার কোটি টাকার মতো। গত ১৫ বছরে তা ফুলেফেঁপে ৬ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এমন নজিরবিহীন লুটপাট বিশ্বের অন্য কোনো দেশে দেখা যায় না। আফগানিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা বা আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার চরম সংকটাপন্ন দেশগুলোতেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
এর পেছনে মূল কারণ হলো চরম অব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর চূড়ান্ত ব্যর্থতা। যাদের প্রধান দায়িত্ব ছিল ব্যাংক খাত তদারকি করা, সেই বাংলাদেশ ব্যাংক সম্পূর্ণরূপে রাজনীতিকীকরণের শিকার হয়েছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ফলে ব্যক্তিস্বার্থ সবসময় প্রাধান্য পেয়েছে এবং রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবানরা এর চরম অপব্যবহার করেছে। ব্যাংক খাতে কোনো ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স’ বা জবাবদিহিতার জায়গা ছিল না। যাদের এই লুটপাট ঠেকানোর কথা ছিল, তারা ভয়ে চুপ থেকেছেন অথবা নিজেরাই লুটপাটের অংশীদার হয়েছেন।
ব্যাংক খাত থেকে টাকা নিয়ে আর ফেরত না দেওয়ার যে অপসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তার মূলে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। আমাদের এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যেখানে তদবির করে বা টাকা-পয়সা ছড়িয়ে যেকোনো দুর্নীতি থেকে ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ বা বেরিয়ে আসার পথ তৈরি করে নেওয়া যায়।
সম্প্রতি খেলাপি ঋণ কমানোর লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট এবং ২ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছর মেয়াদে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দিয়েছে। পাশাপাশি সুদ মওকুফের মতো নজিরবিহীন নীতি সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে। এরপরও খেলাপি ঋণ না কমে উল্টো বাড়ছে। এর একটি বড় কারণ হতে পারে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। ঋণখেলাপিদের বড় অংশই বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তারা এখনো এক ধরনের ভীতি বা আস্থার সংকটে ভুগছেন। তারা হয়তো বুঝতে পারছেন না, বর্তমান সরকারের ওপর কতটা ভরসা করা যায়।
এক্ষেত্রে ঢালাও সুবিধার বদলে প্রকৃত খেলাপিদের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। যারা বৈশ্বিক সংকট, বিদ্যুৎ বা জ্বালানি সমস্যা কিংবা রাজনৈতিক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে খেলাপি হতে বাধ্য হয়েছেন, তাদের জন্য এ সুযোগটি কার্যকর হতে পারে। অন্যদিকে গত ১৫ বছরে যারা রাজনীতির ছত্রছায়ায় থেকে সুবিধা নিয়েছেন কিন্তু কোনো বড় ফৌজদারি অপরাধ বা অর্থ পাচারের সঙ্গে সরাসরি জড়িত নন, তাদের স্বাভাবিক আর্থ-সামাজিক কর্মকাণ্ডে ফিরিয়ে আনতে সরকার একটি সুচিন্তিত ‘অ্যামনেস্টি’ বা সাধারণ ক্ষমার কথা ভাবতে পারে। কারণ এই বিশাল ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে অর্থনীতির মূল স্রোতে না ফেরালে সমাজ ও অর্থনীতিতে অস্থিরতা থেকেই যাবে। যেমনটি স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও অনেককে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ দিয়েছিলেন।
অন্তর্বর্তী সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি থেকে কিছুটা সরে এসে নীতি সুদহার কমানো এবং ‘স্টিমুলাস প্যাকেজ’ ঘোষণার মতো উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ এখনো তলানিতে (৭-৮ শতাংশ)। এর কারণ শুধু টাকার অভাব নয়, বরং কাঠামোগত সমস্যা। কারখানা চালানোর জন্য যদি পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকে, তবে স্টিমুলাস প্যাকেজ দিয়ে বন্ধ কারখানা কীভাবে চালু হবে? বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে বড় বাধা জ্বালানি খাতের সংকট। এই মাল্টি-লেয়ারড বা বহুমাত্রিক সংকট সমাধান না হলে শুধু ব্যাংকিং নীতি দিয়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা যাবে না।
আমাদের ব্যাংক খাতের একটি বড় অংশ সরকারি ব্যাংকের দখলে এবং সবচেয়ে বড় খেলাপি আর দুর্নীতির আখড়াও এই ব্যাংকগুলো। এর মানে হলো, সরকারের বিশেষ মহল এবং সুবিধাবাদী বেসরকারি খাত মিলেই লুটপাট চালিয়েছে। অন্যদিকে, বেসরকারি খাতের তৃতীয় প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর অবস্থা সবচেয়ে করুণ। কারণ এগুলোর জন্মই হয়েছিল অসৎ উদ্দেশ্যে। এই দুর্বল ব্যাংকগুলোকে জনগণের করের টাকায় বারবার মূলধন জোগান দিয়ে টিকিয়ে রাখা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। তবে সাধারণ আমানতকারীদের সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে, কারণ সরকারই এই ব্যাংকগুলোকে বাজারে আসার এবং দুর্নীতি করার সুযোগ করে দিয়েছিল।
সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাত পুনর্গঠন করতে হলে আমাদের এখনই কিছু কঠোর ও যুগান্তকারী সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, বাংলাদেশ ব্যাংককে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে এবং ব্যাংক খাতের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ কমাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ব্যাংক পরিচালনায় মালিক-পরিচালকদের আধিপত্য বন্ধ করতে হবে। মালিকরা ডিভিডেন্ড বা মুনাফা নেবেন, কিন্তু ব্যাংক পরিচালনা করবেন সম্পূর্ণ স্বাধীন ও পেশাদার ব্যাংকাররা। এ ক্ষেত্রে আমরা এনজিও পরিচালিত ব্যাংকগুলোর (যেমন ব্র্যাক ব্যাংক) সফল মডেল অনুসরণ করতে পারি, যেখানে কোনো পারিবারিক বা মালিকানাভিত্তিক ডিরেক্টরশিপ থাকে না।
তৃতীয়ত, ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা বা এমডিদের যোগসাজশ ছাড়া বড় বড় দুর্নীতি বা বেনামি ঋণ দেওয়া কখনোই সম্ভব নয়। যারা উচ্চ বেতনে চাকরি করে কেবল মালিকদের খুশি রাখার জন্য কাজ করেছেন, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
চতুর্থত, ব্যর্থ বা ফেইলড ব্যাংকগুলোকে নিবিড় তদারকি ও নতুন ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে উদ্ধারের চেষ্টা করতে হবে।
দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত এই সংকটের রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা যদি পুরনো পদ্ধতিতেই ব্যাংক খাত চালানোর চেষ্টা করি, তবে কোনো পরিবর্তনই আসবে না। আর্থিক খাতের সংস্কার এখন আর বিকল্প নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার অপরিহার্য শর্ত। সুশাসন, জবাবদিহি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই কেবল আমরা এই খেলাপি ঋণের দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে এসে একটি সুস্থ ও গতিশীল অর্থনীতি গড়ে তুলতে সক্ষম হব।
.png)

পুরাকালে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথির এক মহাদুর্যোগপূর্ণ রাতে যমুনার দুই পাড়ে জন্ম নেয় দুই ভিন্ন মায়ের দুই সন্তান—কৃষ্ণ ও যোগমায়া। মথুরার কারাগারে দেবকীর কোলে শ্রীকৃষ্ণ, আর ওপারে গোকুলে যশোদার ঘরে যোগমায়া। আজ তাঁদের জন্মদিন।
৬ ঘণ্টা আগে
কিছুদিন পরপর খেলাপি ঋণের যে পরিস্থিতি সামনে আসছে, তাতে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে আরও। পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্রিয়তা নেই, তা নয়। তবে ‘উদার’ নীতি সহায়তায়ও খেলাপি ঋণ পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। নতুন ধারায় পরিস্থিতি মোকাবিলা প্রয়োজন বলেও মনে হচ্ছে।
১৬ ঘণ্টা আগে
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো রাষ্ট্রই স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রুর ধারণায় আবদ্ধ থাকে না। রাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ কৌশলগত অবস্থান। তাই সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, যা ‘মক্কা চুক্তি’ নামে আলোচিত– বাংলাদেশে
২১ ঘণ্টা আগে
এই বিপদ এখনো শেষ হয়নি। প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক তথ্য বলছে, হিমালয়ের উঁচু এলাকায় বরফ ও পাথরের বিশাল ধস থেকেই লেন্দে খোলায় একের পর এক বিপর্যয়ের সূত্রপাত হতে পারে।
২১ ঘণ্টা আগে