তামান্না আনজুম

‘মি. ওসমানী, আপনি কি জানেন আপনার উচ্চতা কম?’ কিংস কলেজের ভাইভা বোর্ডে প্রশ্নটা শুনে তরুণ আতাউল গণি ওসমানী মোটেই বিচলিত হলেন না। শান্তভাবে বললেন, ‘জি, জানি।’
পরীক্ষক এবার আরও খোঁচা দিয়ে বললেন, ‘এত ছোট গড়নের মানুষ হয়ে আপনি কীভাবে লম্বা-চওড়া পাঞ্জাবি, সিন্ধি আর পাঠানদের নেতৃত্ব দেবেন?’
ওসমানীর উত্তর ছিল আরও আত্মবিশ্বাসী, ‘স্যার, আমি আমার উচ্চতা সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন। তবে এটাও জানি, আমি নেপোলিয়ন বোনাপার্টের চেয়ে দুই ইঞ্চি লম্বা।’
মেজর কামরুল হাসান ভূঁইয়া সম্পাদিত স্বাধীনতা: সম্মুখ সমরের যোদ্ধাদের অভিজ্ঞতা বইয়ে এই ঘটনাটি উদ্ধৃত হয়েছে। এই ছোট্ট কথোপকথনের মধ্যেই যেন ধরা পড়ে একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস আর ইস্পাতকঠিন ব্যক্তিত্বের ছাপ যিনি নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে যেমন সচেতন, তেমনি দুর্বলতাও জানেন।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে আতাউল গণি ওসমানীকে ডাকা হতো ‘পাপা টাইগার!’ নিজের নেতৃত্বগুণ ও দূরদর্শিতার কারণে শুধু বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যদের কাছেই নয়, অন্যান্য বাহিনীতে থাকা বাঙালি সদস্যদের কাছেও একজন অভিভাবকের মতো হয়ে উঠেছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও অনেক সামরিক কর্মকর্তা ও মুক্তিযোদ্ধা তাঁকে ‘চাচা ওসমানী’ বলেও ডাকতেন।
ব্রিটিশ আমলেই ১৯৪০ সাল থেকে তিনি বাঙালিদের জন্য আলাদা রেজিমেন্ট গঠনের চেষ্টা করছিলেন। শেষ পর্যন্ত যখন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠিত হলো, তখন তাদের টুপি ও ব্যাজে থাকা প্রতীকে বাঘের ছবি ব্যবহার করা হয়। এই বাঘের প্রতীক নিয়েই পাঞ্জাবি জেনারেলরা মাঝে মাঝে ওসমানীকে ঠাট্টা করে বলতেন, ‘ওহে ওসমানী, শেষ পর্যন্ত তুমিও তো বাঘ হয়ে গেলে!’
কথাটার মধ্যে কিছুটা ব্যঙ্গও ছিল। এমনকি শোনা যায়, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানও ওসমানীকে ‘টাইগার ওসমানী’ বলে ডাকতেন।
১৯৪৭-এর দেশভাগের পর জেনারেল ওসমানী পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সেখানে দীর্ঘ সামরিক জীবনে তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে যুক্ত হন। সেসময় বাঙালি সৈন্যদের পেশাগত উন্নতি ও মর্যাদার প্রশ্নে সোচ্চার ছিলেন। যেমন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ওসমানীর বাংলা ভাষায় কথা বলাটা পছন্দ করতেন না। তাঁরা চাইতেন, তিনি উর্দুতে কথা বলুন। কিন্তু ওসমানী সেসব তেমন পাত্তা দিতেন না। পাকিস্তানিদের জবাবে তিনি বলতেন, বাংলা পাকিস্তানের স্বীকৃত রাষ্ট্রভাষাগুলোর একটি। বরং পাঞ্জাবি কর্মকর্তাদেরও তাঁদের পাঞ্জাবি সৈন্যদের সঙ্গে পাঞ্জাবিতে কথা বলা এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ পাঞ্জাবি ছিল কেবল একটি আঞ্চলিক ভাষা।

পাকিস্তানের সেনা কর্তৃপক্ষ ওসমানীর এই অবস্থানকে ঔদ্ধত্য হিসেবে দেখেছিল। এ ছাড়া বাঙালি কর্মকর্তাদের প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থানের কারণে তাঁর পদোন্নতিও বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু সাধারণ বাঙালি সৈন্যদের চোখে ওসমানী হয়ে উঠেছিলেন সাহসী জাতীয়তাবাদী নেতা। অথচ ১৯৪২ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীর সর্বকনিষ্ঠ মেজরদের একজন ছিলেন তিনি। মাত্র ২৩ বছর বয়সে হয়েছিলেনএকটি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক।
১৯৬৭ সালে কর্নেল পদে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন জেনারেল ওসমানী। কিন্তু অবসর তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। বরং ইতিহাস তখন তাঁকে আরও বড় দায়িত্বের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল।
পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্ব তাঁর সামরিক দক্ষতা ও প্রভাব সম্পর্কে ভালোভাবেই জানত। তাই ওই রাতেই ওসমানীকে হত্যার চেষ্টায় পাকিস্তানি বাহিনী তাঁর খোঁজে অভিযান চালায়। তাঁর ভাইয়ের বনানীর বাসায় একটি কমান্ডো দল হামলা চালালেও তাঁকে সেখানে পাওয়া যায়নি। পরে তাঁর ধানমন্ডির বাসাতেও তাঁকে খোঁজা হয়। সেই রাতের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান এবং পরে ঢাকার বাইরে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠনে যুক্ত হন।
এরপর ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে তেলিয়াপাড়া চা-বাগানে বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তিনি নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধের সামরিক নেতৃত্ব সংগঠিত করার কাজে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে হয়ে ওঠেন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ও কমান্ডার-ইন-চিফ।
১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল। হবিগঞ্জের মাধবপুরের তেলিয়াপাড়া চা-বাগান। সকাল থেকেই সেখানে অপেক্ষা করছেন প্রায় ২৬ জন বাঙালি সামরিক কর্মকর্তা। সকাল বাড়ছে। চারপাশে সবুজ পাহাড়। সবাই অপেক্ষা করছেন জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীর জন্য। অন্যরা বলছেন, তিনি আগরতলা থেকে আসছেন, বৈঠক ঠিক সময়েই হবে।
অবশেষে তিনি এলেন। তেলিয়াপাড়া চা-বাগানের ম্যানেজারের বাংলোর সেই বৈঠক মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান, কে. এম. শফিউল্লাহ, খালেদ মোশাররফ, শাফায়াত জামিল, কাজী নুরুজ্জামানসহ বাঙালি সামরিক কর্মকর্তারা। ওসমানী বৈঠকের সভাপতিত্ব করেছিলেন। সেসময় বিদ্রোহী বাঙালি কর্মকর্তাদের মধ্যে ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন তিনি।
তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়নি। কিন্তু যুদ্ধ থেমে থাকার সুযোগ নেই। তাই বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, সেনাবাহিনী, ইপিআর, পুলিশ, আনসার এবং সাধারণ সশস্ত্র মানুষদের নিয়ে একটি মুক্তিবাহিনী গড়ে তোলা হবে। এই বাহিনীর নেতৃত্ব দেবেন জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী। যুদ্ধ পরিচালনা সহজ করতে সামরিক কার্যক্রমের জন্য অঞ্চলভিত্তিক কমান্ড কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
যুদ্ধের জন্য তখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল অস্ত্র, গোলাবারুদ ও প্রশিক্ষণ। বৈঠকে তাই ভারতের কাছ থেকে এসব সহায়তা চাওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়। ভি সি পান্ডে কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমতি নিয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। ভারতীয় ভূখণ্ডে মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও শরণার্থীশিবির স্থাপনে সহযোগিতার কথাও নির্ধারিত হয় সেই বৈঠকে। শুধু তাই নয়, যুদ্ধকে সুসংগঠিত রূপ দিতে রাজনৈতিক সরকার গঠনের ওপর জোর দেওয়া হয়।
বৈঠক শেষে ওসমানী নিজের পিস্তল থেকে ফাঁকা গুলি ছুড়ে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনার ঘোষণা দেন। এরপর এম এ জি ওসমানী ও এম এ রবের নেতৃত্বে স্বাধীনতার যুদ্ধের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার শপথ নেন উপস্থিত সবাই।
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ওসমানীর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর সামরিক কাঠামো ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। পরে বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয় এবং প্রতিটি সেক্টরের দায়িত্ব দেওয়া হয় বিভিন্ন কমান্ডারকে। পাশাপাশি জেড ফোর্স, কে ফোর্স ও এস ফোর্স নামে তিনটি নিয়মিত ব্রিগেড গড়ে ওঠে। ওসমানী বুঝেছিলেন, পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে শুরু থেকেই সরাসরি প্রচলিত যুদ্ধে নামা আত্মঘাতী হতে পারে। তাই মুক্তিযুদ্ধের বড় অংশজুড়ে গেরিলা ও অ্যামবুশ বা আকস্মিক আক্রমণের কৌশলের ওপর জোর দেওয়া হয়।

ছোট ছোট দল আঘাত করবে, পাকিস্তানি বাহিনীর যোগাযোগব্যবস্থা ও চলাচল ব্যাহত করবে, তারপর দ্রুত সরে যাবে। একই সঙ্গে সীমান্তের প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোতে নতুন যোদ্ধা তৈরি হবে এবং নিয়মিত বাহিনীও ধীরে ধীরে শক্তিশালী হবে। এই সমন্বিত কৌশলই পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর ক্রমাগত চাপ তৈরি করে।
মুক্তিযোদ্ধারা যখন দেশের ভেতরে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর একের পর এক আঘাত করতে শুরু করেন, তখন দখলদার বাহিনীকে একসঙ্গে অসংখ্য জায়গায় সতর্ক থাকতে হচ্ছিল। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে নিয়মিত বাহিনী আরও সংগঠিত হয়ে যৌথ অভিযানে চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে এগিয়ে যায়। তবে ওসমানীর নেতৃত্ব শুধু সদর দপ্তরে বসে নির্দেশ দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
৯ এপ্রিলের একটি ঘটনা এর উদাহরণ হিসেবে বলা হয়। সিলেটের কাছে কিন ব্রিজ এলাকায় তরুণ ক্যাপ্টেন আজিজুর রহমানের ইউনিট পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে কঠিন লড়াইয়ে পড়ে। পরিস্থিতি ছিল বিভ্রান্তিকর। এমন সময় পেছন থেকে একটি কণ্ঠ শোনা যায়, ‘ইয়ং ম্যান, হোয়াট ইজ হ্যাপেনিং?’
সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন স্বয়ং কমান্ডার-ইন-চিফ ওসমানী।
এক প্রতিবেদনে মেজর জেনারেল আজিজুর রহমানের বর্ণনাও প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওসমানী দ্রুত পরিস্থিতি বুঝতে পারেন। তিনি তরুণ কমান্ডারকে সংগঠিত হয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরামর্শ দেন। এরপর আরও ভালো প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে সরে যেতে বলেন। পাশাপাশি, পাকিস্তানি বাহিনী যেন তাঁদের পিছু নিয়ে আক্রমণ করতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক করেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালের ২৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল পদে উন্নীত হন জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী। তাঁর এই পদোন্নতি ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে কার্যকর করা হয়। ১৯৭২ সালে তিনি সামরিক বাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
এরপর যুদ্ধের ময়দান থেকে রাজনীতির অঙ্গনে পা রাখেন তিনি। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভায় তিনি জাহাজ চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌ ও বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর নতুন মন্ত্রিসভায় ডাক, তার ও টেলিফোন, যোগাযোগ, জাহাজ চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌ ও বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক চড়াই-উতরাইয়ের পর ১৯৭৪ সালের মে মাসে ওসমানী মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে একদলীয় সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের বিরোধিতা করে সংসদ-সদস্য পদ এবং আওয়ামী লীগের সদস্য পদ ত্যাগ করেন।
১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এই অকুতোভয় প্রধান সেনাপতি।

‘মি. ওসমানী, আপনি কি জানেন আপনার উচ্চতা কম?’ কিংস কলেজের ভাইভা বোর্ডে প্রশ্নটা শুনে তরুণ আতাউল গণি ওসমানী মোটেই বিচলিত হলেন না। শান্তভাবে বললেন, ‘জি, জানি।’
পরীক্ষক এবার আরও খোঁচা দিয়ে বললেন, ‘এত ছোট গড়নের মানুষ হয়ে আপনি কীভাবে লম্বা-চওড়া পাঞ্জাবি, সিন্ধি আর পাঠানদের নেতৃত্ব দেবেন?’
ওসমানীর উত্তর ছিল আরও আত্মবিশ্বাসী, ‘স্যার, আমি আমার উচ্চতা সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন। তবে এটাও জানি, আমি নেপোলিয়ন বোনাপার্টের চেয়ে দুই ইঞ্চি লম্বা।’
মেজর কামরুল হাসান ভূঁইয়া সম্পাদিত স্বাধীনতা: সম্মুখ সমরের যোদ্ধাদের অভিজ্ঞতা বইয়ে এই ঘটনাটি উদ্ধৃত হয়েছে। এই ছোট্ট কথোপকথনের মধ্যেই যেন ধরা পড়ে একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস আর ইস্পাতকঠিন ব্যক্তিত্বের ছাপ যিনি নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে যেমন সচেতন, তেমনি দুর্বলতাও জানেন।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে আতাউল গণি ওসমানীকে ডাকা হতো ‘পাপা টাইগার!’ নিজের নেতৃত্বগুণ ও দূরদর্শিতার কারণে শুধু বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যদের কাছেই নয়, অন্যান্য বাহিনীতে থাকা বাঙালি সদস্যদের কাছেও একজন অভিভাবকের মতো হয়ে উঠেছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও অনেক সামরিক কর্মকর্তা ও মুক্তিযোদ্ধা তাঁকে ‘চাচা ওসমানী’ বলেও ডাকতেন।
ব্রিটিশ আমলেই ১৯৪০ সাল থেকে তিনি বাঙালিদের জন্য আলাদা রেজিমেন্ট গঠনের চেষ্টা করছিলেন। শেষ পর্যন্ত যখন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট গঠিত হলো, তখন তাদের টুপি ও ব্যাজে থাকা প্রতীকে বাঘের ছবি ব্যবহার করা হয়। এই বাঘের প্রতীক নিয়েই পাঞ্জাবি জেনারেলরা মাঝে মাঝে ওসমানীকে ঠাট্টা করে বলতেন, ‘ওহে ওসমানী, শেষ পর্যন্ত তুমিও তো বাঘ হয়ে গেলে!’
কথাটার মধ্যে কিছুটা ব্যঙ্গও ছিল। এমনকি শোনা যায়, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানও ওসমানীকে ‘টাইগার ওসমানী’ বলে ডাকতেন।
১৯৪৭-এর দেশভাগের পর জেনারেল ওসমানী পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সেখানে দীর্ঘ সামরিক জীবনে তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে যুক্ত হন। সেসময় বাঙালি সৈন্যদের পেশাগত উন্নতি ও মর্যাদার প্রশ্নে সোচ্চার ছিলেন। যেমন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ওসমানীর বাংলা ভাষায় কথা বলাটা পছন্দ করতেন না। তাঁরা চাইতেন, তিনি উর্দুতে কথা বলুন। কিন্তু ওসমানী সেসব তেমন পাত্তা দিতেন না। পাকিস্তানিদের জবাবে তিনি বলতেন, বাংলা পাকিস্তানের স্বীকৃত রাষ্ট্রভাষাগুলোর একটি। বরং পাঞ্জাবি কর্মকর্তাদেরও তাঁদের পাঞ্জাবি সৈন্যদের সঙ্গে পাঞ্জাবিতে কথা বলা এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ পাঞ্জাবি ছিল কেবল একটি আঞ্চলিক ভাষা।

পাকিস্তানের সেনা কর্তৃপক্ষ ওসমানীর এই অবস্থানকে ঔদ্ধত্য হিসেবে দেখেছিল। এ ছাড়া বাঙালি কর্মকর্তাদের প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থানের কারণে তাঁর পদোন্নতিও বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু সাধারণ বাঙালি সৈন্যদের চোখে ওসমানী হয়ে উঠেছিলেন সাহসী জাতীয়তাবাদী নেতা। অথচ ১৯৪২ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীর সর্বকনিষ্ঠ মেজরদের একজন ছিলেন তিনি। মাত্র ২৩ বছর বয়সে হয়েছিলেনএকটি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক।
১৯৬৭ সালে কর্নেল পদে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন জেনারেল ওসমানী। কিন্তু অবসর তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। বরং ইতিহাস তখন তাঁকে আরও বড় দায়িত্বের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল।
পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্ব তাঁর সামরিক দক্ষতা ও প্রভাব সম্পর্কে ভালোভাবেই জানত। তাই ওই রাতেই ওসমানীকে হত্যার চেষ্টায় পাকিস্তানি বাহিনী তাঁর খোঁজে অভিযান চালায়। তাঁর ভাইয়ের বনানীর বাসায় একটি কমান্ডো দল হামলা চালালেও তাঁকে সেখানে পাওয়া যায়নি। পরে তাঁর ধানমন্ডির বাসাতেও তাঁকে খোঁজা হয়। সেই রাতের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান এবং পরে ঢাকার বাইরে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠনে যুক্ত হন।
এরপর ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে তেলিয়াপাড়া চা-বাগানে বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তিনি নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধের সামরিক নেতৃত্ব সংগঠিত করার কাজে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে হয়ে ওঠেন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ও কমান্ডার-ইন-চিফ।
১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল। হবিগঞ্জের মাধবপুরের তেলিয়াপাড়া চা-বাগান। সকাল থেকেই সেখানে অপেক্ষা করছেন প্রায় ২৬ জন বাঙালি সামরিক কর্মকর্তা। সকাল বাড়ছে। চারপাশে সবুজ পাহাড়। সবাই অপেক্ষা করছেন জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীর জন্য। অন্যরা বলছেন, তিনি আগরতলা থেকে আসছেন, বৈঠক ঠিক সময়েই হবে।
অবশেষে তিনি এলেন। তেলিয়াপাড়া চা-বাগানের ম্যানেজারের বাংলোর সেই বৈঠক মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান, কে. এম. শফিউল্লাহ, খালেদ মোশাররফ, শাফায়াত জামিল, কাজী নুরুজ্জামানসহ বাঙালি সামরিক কর্মকর্তারা। ওসমানী বৈঠকের সভাপতিত্ব করেছিলেন। সেসময় বিদ্রোহী বাঙালি কর্মকর্তাদের মধ্যে ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন তিনি।
তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়নি। কিন্তু যুদ্ধ থেমে থাকার সুযোগ নেই। তাই বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, সেনাবাহিনী, ইপিআর, পুলিশ, আনসার এবং সাধারণ সশস্ত্র মানুষদের নিয়ে একটি মুক্তিবাহিনী গড়ে তোলা হবে। এই বাহিনীর নেতৃত্ব দেবেন জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী। যুদ্ধ পরিচালনা সহজ করতে সামরিক কার্যক্রমের জন্য অঞ্চলভিত্তিক কমান্ড কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
যুদ্ধের জন্য তখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল অস্ত্র, গোলাবারুদ ও প্রশিক্ষণ। বৈঠকে তাই ভারতের কাছ থেকে এসব সহায়তা চাওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়। ভি সি পান্ডে কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমতি নিয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। ভারতীয় ভূখণ্ডে মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও শরণার্থীশিবির স্থাপনে সহযোগিতার কথাও নির্ধারিত হয় সেই বৈঠকে। শুধু তাই নয়, যুদ্ধকে সুসংগঠিত রূপ দিতে রাজনৈতিক সরকার গঠনের ওপর জোর দেওয়া হয়।
বৈঠক শেষে ওসমানী নিজের পিস্তল থেকে ফাঁকা গুলি ছুড়ে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনার ঘোষণা দেন। এরপর এম এ জি ওসমানী ও এম এ রবের নেতৃত্বে স্বাধীনতার যুদ্ধের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার শপথ নেন উপস্থিত সবাই।
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ওসমানীর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর সামরিক কাঠামো ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। পরে বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয় এবং প্রতিটি সেক্টরের দায়িত্ব দেওয়া হয় বিভিন্ন কমান্ডারকে। পাশাপাশি জেড ফোর্স, কে ফোর্স ও এস ফোর্স নামে তিনটি নিয়মিত ব্রিগেড গড়ে ওঠে। ওসমানী বুঝেছিলেন, পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে শুরু থেকেই সরাসরি প্রচলিত যুদ্ধে নামা আত্মঘাতী হতে পারে। তাই মুক্তিযুদ্ধের বড় অংশজুড়ে গেরিলা ও অ্যামবুশ বা আকস্মিক আক্রমণের কৌশলের ওপর জোর দেওয়া হয়।

ছোট ছোট দল আঘাত করবে, পাকিস্তানি বাহিনীর যোগাযোগব্যবস্থা ও চলাচল ব্যাহত করবে, তারপর দ্রুত সরে যাবে। একই সঙ্গে সীমান্তের প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোতে নতুন যোদ্ধা তৈরি হবে এবং নিয়মিত বাহিনীও ধীরে ধীরে শক্তিশালী হবে। এই সমন্বিত কৌশলই পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর ক্রমাগত চাপ তৈরি করে।
মুক্তিযোদ্ধারা যখন দেশের ভেতরে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর একের পর এক আঘাত করতে শুরু করেন, তখন দখলদার বাহিনীকে একসঙ্গে অসংখ্য জায়গায় সতর্ক থাকতে হচ্ছিল। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে নিয়মিত বাহিনী আরও সংগঠিত হয়ে যৌথ অভিযানে চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে এগিয়ে যায়। তবে ওসমানীর নেতৃত্ব শুধু সদর দপ্তরে বসে নির্দেশ দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
৯ এপ্রিলের একটি ঘটনা এর উদাহরণ হিসেবে বলা হয়। সিলেটের কাছে কিন ব্রিজ এলাকায় তরুণ ক্যাপ্টেন আজিজুর রহমানের ইউনিট পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে কঠিন লড়াইয়ে পড়ে। পরিস্থিতি ছিল বিভ্রান্তিকর। এমন সময় পেছন থেকে একটি কণ্ঠ শোনা যায়, ‘ইয়ং ম্যান, হোয়াট ইজ হ্যাপেনিং?’
সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন স্বয়ং কমান্ডার-ইন-চিফ ওসমানী।
এক প্রতিবেদনে মেজর জেনারেল আজিজুর রহমানের বর্ণনাও প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওসমানী দ্রুত পরিস্থিতি বুঝতে পারেন। তিনি তরুণ কমান্ডারকে সংগঠিত হয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরামর্শ দেন। এরপর আরও ভালো প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে সরে যেতে বলেন। পাশাপাশি, পাকিস্তানি বাহিনী যেন তাঁদের পিছু নিয়ে আক্রমণ করতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক করেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালের ২৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল পদে উন্নীত হন জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী। তাঁর এই পদোন্নতি ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে কার্যকর করা হয়। ১৯৭২ সালে তিনি সামরিক বাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
এরপর যুদ্ধের ময়দান থেকে রাজনীতির অঙ্গনে পা রাখেন তিনি। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভায় তিনি জাহাজ চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌ ও বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর নতুন মন্ত্রিসভায় ডাক, তার ও টেলিফোন, যোগাযোগ, জাহাজ চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌ ও বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক চড়াই-উতরাইয়ের পর ১৯৭৪ সালের মে মাসে ওসমানী মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে একদলীয় সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের বিরোধিতা করে সংসদ-সদস্য পদ এবং আওয়ামী লীগের সদস্য পদ ত্যাগ করেন।
১৯৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এই অকুতোভয় প্রধান সেনাপতি।
.png)

‘পিতার কাছে টাকা চাহিয়া পত্র লেখার সময় হইয়াছে’—মাঝেমধ্যে মাসের শুরুর দিকে পোস্টটা আমাদের নিউজফিডে ঘুরতে থাকে। দেখে হাসি পায়। মনে হয়, পরীক্ষার খাতার সেই বিখ্যাত চিঠি আবার ফিরে এসেছে! শুধু পার্থক্য হলো, তখন বাবার কাছে টাকা চাইতাম পরীক্ষার খাতায় নম্বর পাওয়ার জন্য, আর এখন মাসের শেষে পকেট ফাঁকা হলে সত্
৮ ঘণ্টা আগে
বঙ্গভবন। ঢাকার ব্যস্ততম এলাকা দিলকুশার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভবন অনেক কিছুর সাক্ষী। গল্পটা শুরু হয় ব্রিটিশ আমলে। তখন এই জায়গায় ছিল ঢাকার নবাব পরিবারের একটি বাগানবাড়ি। পরে সরকার সেটি কিনে নেয়। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর এর নাম হয় ‘গভর্নমেন্ট হাউস’। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হলে, ভবনটির নাম পাল্টে রাখা
২৩ আগস্ট ২০২৬
মশা ছোট। এতটাই ছোট যে হাতের এক চাপে তার অস্তিত্ব মুছে যায়। কিন্তু ইতিহাসের ওপর তার ছাপ মুছে ফেলা এত সহজ নয়। এই ক্ষুদ্র প্রাণী কখনো সেনাবাহিনী দুর্বল করেছে, কখনো যুদ্ধের ফলাফল বদলে দিয়েছে, আবার কখনো জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়েছে। উপনিবেশ বিস্তার থেকে শুরু করে মানবসভ্যতার নানা গুরুত্বপূর্ণ বাঁকেও মশাবাহিত
২০ আগস্ট ২০২৬-1363a1-256x144.webp)
বুড়িগঙ্গার পানিতে শুরু হয়েছিল যে যাত্রা, তা একদিন গিয়ে শেষ হলো ইংলিশ চ্যানেলের ওপারে। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সকে আলাদা করেছে এই চ্যানেল। কোনো এক সাঁতারুর ব্যর্থতার খবরই একসময় নাড়া দিয়েছিল বাংলাদেশের আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা ব্রজেন দাসের। তাঁর মনে হলো, ইংলিশ চ্যানেল তাঁকে পাড়ি দিতেই হবে। এরপর সেই স্বপ্ন পূরণ
১৮ আগস্ট ২০২৬