জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

যেভাবে ১৫ রমজানের রাত উদযাপন করে বাহরাইনের শিশুরা

‎ওলিউর রহমান
‎ওলিউর রহমান

সন্ধ্যা হলেই কচিকাঁচার দল গান গাইতে গাইতে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি যায়। ছবি: সংগৃহীত

‎‎রমজানের ১৫ তারিখ রাত। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। চাঁদের মৃদু আলোতে বর্ণিল পোশাকে সজ্জিত মহল্লার কচিকাঁচার দল হল্লা করতে করতে ছুটছে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে। দরজায় কড়া নেড়ে সবাইকে জানাচ্ছে রমজানের মধ্যভাগের শুভেচ্ছা। প্রত্যেক বাড়ি থেকেই তাদেরকে বিতরণ করা হচ্ছে মিষ্টান্ন, দেওয়া হচ্ছে ছোট ছোট উপহার।‎

‎প্রতি বছর রমজানের ১৫ তারিখ রাত এভাবেই উদযাপন করে বাহরাইনের শিশু-কিশোরেরা। এই উদযাপন স্থানীয়ভাবে ‘কারকাউন’ নামে পরিচিত।‎

‎রমজানে মুসলিম বিশ্বজুড়ে নানা রকম লোকাচার দেখা যায়। যেমন পুরান ঢাকায় একসময় সেহরিতে কাওয়ালের দল কাসিদা গাইতে গাইতে মহল্লাবাসীকে জাগিয়ে তুলত। কোনো কোনো দেশে সূর্যাস্তের সময় কামান দাগিয়ে ইফতারের ঘোষণা দেওয়া হয়। এগুলো ধর্মীয় বিধান নয়, বরং স্থানীয় সংস্কৃতির অংশ।

‎বাহরাইনের কারকাউন অনুষ্ঠানও তেমনই একটি প্রাচীন লোকঐতিহ্য। গবেষণাভিত্তিক নির্দিষ্ট সাল জানা না গেলেও, এটি উপসাগরীয় অঞ্চলে বহু প্রজন্ম ধরে পালিত হয়ে আসছে বলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তীতে কুয়েত, কাতার, ওমানসহ উপসাগরীয় অন্যান্য অঞ্চলেও ভিন্ন ভিন্ন নামে ছড়িয়ে পড়ে এ আনুষ্ঠানিকতা। কোথাও একে বলা হয় কারকীআন, কোথাও কারানকুহ, কোথাও বা অন্য নামে পরিচিত।

‎‘কারকাউন’ শব্দটির উৎপত্তি সম্পর্কে একাধিক মত রয়েছে। কেউ বলেন, এটি আরবি ‘কারউল বাব’ তথা দরজায় কড়া নাড়ার শব্দগত অনুকরণ থেকে এসেছে। আবার কেউ এটিকে শিশুদের হাতে ধরা পাত্রে মিষ্টির ঠোকাঠুকির শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করেন।

‎এ দিনকে কেন্দ্র করে প্রাচীন বাহরাইনের মহল্লাগুলো নতুন সাজে সজ্জিত হয়। বাড়িতে বাড়িতে প্রস্তুত করা হয় নানা পদের মিষ্টান্ন। আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত করা হয়। কয়েকদিন ধরে চলে প্রস্তুতি। অনেক এলাকায় শিশুরা নিজেরাই চাঁদা তুলে সবার জন্য ছোট উপহার কিনে।

‎সন্ধ্যা হলে কচিকাঁচার দল দফ বাজিয়ে প্রাচীন আরবীয় সুরে গান গাইতে গাইতে মিছিলের আকারে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি যায়। কোথাও কোথাও প্রতীকী ঘোড়া বা শোভাযাত্রার সাজও দেখা যায়। শিশুরা ছোট থলে বা বাক্স সঙ্গে রাখে, যেখানে দেওয়া মিষ্টি ও উপহার জমা করে।

‎বাড়ির বড়রা সমবেত হয়ে তাদের স্বাগত জানান এবং মিষ্টিমুখ করান। লাওয ও জাওয নামে বিশেষ পদের মিষ্টান্ন প্রস্তুতের প্রচলন রয়েছে এ দিনে। অনেকে সামর্থ্য অনুযায়ী বখশিশও দেন।

‎এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাহরাইনের শিশু-কিশোরেরা রমজানের মধ্যভাগকে আনন্দ, উৎসবের মধ্য দিয়ে স্বাগত জানায়। ধর্মীয় আবহের ভেতর সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করার এই লোকঐতিহ্য এখনো টিকে আছে সময়ের ভেতর দিয়ে।

  • মাওলানা ওলিউর রহমান: শিক্ষক, মাদরাসাতুল মুত্তাকীন, উত্তরা, ঢাকা

সম্পর্কিত