পয়লা বৈশাখ এলেই নানা বিতর্ক চোখে পড়ে। কেউ এটাকে সংস্কৃতি বলে আঁকড়ে ধরতে চায়, কেউ ধর্মের নামে পুরোটা প্রত্যাখ্যান করতে চায়। কিন্তু এই তর্কের ভিড়ে আমার মনে পড়ে যায় একেবারে অন্যরকম এক বৈশাখ।
আমাদের ছোটবেলায় পয়লা বৈশাখের দিনে নেত্রকোনা শহরের বাসা ছেড়ে নানাবাড়িতে চলে যেতাম। সেখানে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে মেলা বসত। মেলায় যেতে আমাদের রক্ষণশীল পরিবারে মৃদু নিষেধ ছিল। তবুও এলাকার ছেলেদের সঙ্গে চলে গেলে বিশেষ কোনো বিপত্তি হতো না।
নানাবাড়ির মেলা প্রাঙ্গণে কী কী হতো সবকিছু এখন আর স্পষ্ট মনে নেই। তবে আমাদের কাছে প্রধান আকর্ষণ ছিল মিশ্রি দিয়ে বানানো হাতি, ঘোড়া কিনে খাওয়া (কদমা, কোথাও কোথাও বলে ছাঁচ মিষ্টি)। আর মাটির খেলনা কিনে খেলতে খেলতে বাড়ি ফেরা। সবচেয়ে আকর্ষণীয় খেলনা ছিল সুতায় টানা এক ধরনের গাড়ি। যেখানে মাটির ছোট দু’টি ঢোল থাকতো। সুতা টানলে ঢং ঢং শব্দ করতো। (কোথাও কোথাও এই গাড়ির নাম টমটম)
বড় হতে হতে আমরা নানারকম ধর্মীয় ব্যাখ্যা শুনতে শুনতে নববর্ষ, গ্রামীণ মেলা এবং এসব সাংস্কৃতিক আয়োজনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলাম।
কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায়—নববর্ষ পালন এবং গ্রামীণ মেলায় যাওয়া কি আদতেই ধর্ম পরিপন্থী কিছু?
পয়লা বৈশাখ: সংস্কৃতি না ধর্ম?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে নববর্ষ উদযাপিত হয়। কোথাও এটি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের অংশ। আবার কোথাও নিছক সাংস্কৃতিক উৎসব। তাহলে বাংলা নববর্ষ কী? ধর্ম, না কি সংস্কৃতি?
চৈত্রসংক্রান্তির দিনে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কিছু ধর্মীয় রিচুয়াল থাকলেও পয়লা বৈশাখের দেশব্যাপী উদযাপনের রীতি-রেওয়াজে সেসবের প্রত্যক্ষ কোনো প্রভাব বা বাধ্যতামূলক অনুষঙ্গ নেই। বরং এটি একটি কৃষিভিত্তিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এটি পালনে ইসলামের সরাসরি কোনো ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা থাকার কথা নয়।
সংযোজন ও বিকৃতি: নতুন বিতর্ক
তবে সাম্প্রতিককালে পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে কিছু আয়োজন যুক্ত হয়েছে। যেমন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ বা গান-বাজনার কিছু ধারা—যেগুলো ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সমর্থনযোগ্য নয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এগুলো পয়লা বৈশাখের মৌলিক অংশ নয়। আমাদের শৈশবের মেলায় এসবের কোনো উপস্থিতি ছিল না। পরবর্তী সময়ে এগুলোকে প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার যে চেষ্টা হয়েছে, তা সমাজে অপ্রয়োজনীয় বিভাজনও তৈরি করেছে।
নতুন বয়ানের প্রচেষ্টা
সাম্প্রতিককালে আরেকটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পয়লা বৈশাখে হামদ, না’ত কাওয়ালি জলসার আয়োজন করে এটাকে ‘ইসলামীকরণের’ প্রচেষ্টা। এটা অনেক ক্ষেত্রে একধরনের হীনমন্যতা বলেই মনে হয়। এ অঞ্চলের মানুষ আমরা যতটুকু মুসলমান ততটুকুই বাঙালি। বাংলার মাটি-বাতাসে উদযাপনের যে প্রথা পদ্ধতি রয়েছে, তা যদি ধর্ম পরিপন্থী না হয়, তাহলে সেটা পালনে বাধা কোথায়? নতুন কিছু সংযোজনের প্রয়োজনীয়তাই বা কতটুকু?
আপনি যা করতে পারেন, উদযাপনে আপনার ধর্ম পরিপন্থী কোনো উপাদান থাকলে তা এড়িয়ে যেতে পারেন কিংবা বাদ দিতে পারেন। স্বাভাবিক হামদ, নাতও করতে পারেন। তবে এর মাধ্যমে নতুন সংস্কৃতি বিনির্মাণের প্রচেষ্টা ভুল। এটা ‘মঙ্গল’ শোভাযাত্রারই কাউন্টার মাত্র। এটা সমাজের বিভাজনকেই কেবল জিইয়ে রাখা।
সীমারেখা: আনন্দ নাকি অপসংস্কৃতি?
বাংলা নববর্ষের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ মেলা, লোকজ সংস্কৃতি, পান্তা-ইলিশ, হালখাতা—যার অনেক কিছুই নিরীহ ও ঐতিহ্যবাহী এবং ধর্মসমর্থিত। কিন্তু একইসঙ্গে কিছু বিষয় যুক্ত হয়েছে ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো—সে ভালোকে গ্রহণ করবে, মন্দ থেকে নিজেকে দূরে রাখবে। আনন্দের নামে যদি সীমালঙ্ঘন ঘটে, তবে সেই আনন্দ আর কল্যাণ বয়ে আনে না।
পয়লা বৈশাখ তাই আমাদের সামনে একটি দ্বিমুখী বাস্তবতা তুলে ধরে। একদিকে শৈশবের নির্মল আনন্দ, গ্রামীণ সংস্কৃতির সরলতা; অন্যদিকে আধুনিক সময়ের কিছু সংযোজন, যা বিতর্ক আর বিভাজনকে উসকে দিচ্ছে।
একজন মুমিনের জন্য এখানে করণীয় খুব জটিল কিছু নয়। তাকে সবকিছু গ্রহণ করতে হবে না, আবার সবকিছু বর্জনও করতে হবে না। বরং তাকে বেছে নিতে হবে—কোনটি তার বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, আর কোনটি নয়। কারণ, সংস্কৃতিকে অস্বীকার বা অন্ধভাবে গ্রহণ করা কোনোটিই শোভনীয় নয়; বরং সচেতন বাছাইয়ের মাধ্যমেই একজন মুমিন তার পরিচয় অটুট রাখে।
নববর্ষের আসল তাৎপর্য তাই এই উপলব্ধির মধ্যে—যেখানে মানুষ নিজের শিকড়ও ধরে রাখে। আবার নিজের ঈমানকেও অক্ষুণ্ণ রাখে।
- মাওলানা ওলিউর রহমান: শিক্ষক, মাদরাসাতুল মুত্তাকীন, উত্তরা, ঢাকা