হজের গুরুত্বপূর্ণ মাসায়েল

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৩: ১৩
পবিত্র কাবাঘরে মুসল্লিরা। ছবি: রয়টার্স

মুসলমানদের পাঁচ অতি আবশ্যিক আমলের একটি পবিত্র হজ। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ হজ পালনে পবিত্র নগরী মক্কায় যান। এ বছর হজ ফ্লাইট শুরু হচ্ছে আজ শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) মধ্যরাত থেকে, যাবেন প্রায় ৮০ হাজারের মতো হজযাত্রী।

সামর্থ্যের কারণে সাধারণত মানুষ জীবনে একবারই হজ করে৷ ভিন্ন দেশ ও বৈচিত্র্যপূর্ণ পরিবেশে এই ইবাদতের আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে হয়। তাই প্রথমবার হজযাত্রীদের তাওয়াফ, ইহরামসহ প্রতিটা গুরুত্বপূর্ণ আমল বিষয়ে আগে থেকে কিছু মাসআলা জেনে রাখা ভালো।

হজের পরিচয়

হজ আরবি শব্দ, যার অর্থ সংকল্প করা। হজ হলো নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট কার্যাবলির মাধ্যমে বায়তুল্লাহ শরিফ তাওয়াফ করা অথবা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে বায়তুল্লাহ যাওয়ার সংকল্প করা।

হজ ইসলামি শরিয়তের অন্যতম স্তম্ভ ও রোকন। আর্থিক ও দৈহিকভাবে সামর্থ্যবান নারী-পুরুষের ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ।

যাদের ওপর হজ ফরজ

দৈনন্দিন প্রয়োজনের বাইরে কোনো স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক, বুদ্ধিসম্পন্ন পুরুষ বা নারীর কাছে মক্কায় যাওয়া-আসা এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে পরিবারের ব্যয় নির্বাহের সমপরিমাণ সম্পদ থাকলে তাঁর উপর হজ ফরজ। নারীর ওপর হজ ফরজ হওয়ার জন্য অবশ্য তাঁর একজন মাহরামকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার খরচও যোগ হবে।

হজের ফরজ ও ওয়াজিব

হজের ফরজ তিনটি– ১. ইহরাম করা, ২. আরাফায় অবস্থান করা ও ৩. ফরজ তওয়াফ করা।

হজের ওয়াজিব ছয়টি– ১. সাফা-মারওয়ায় সাঈ করা (দৌড়ানো), ২. মুযদালিফায় অবস্থান করা, ৩. শয়তানকে কঙ্কর নিক্ষেপ করা, ৪. কোরবানি করা, ৫. মাথা মুণ্ডন করা ও ৬. বিদায়ী তাওয়াফ।

ইহরামের পদ্ধতি

হজ অথবা উমরার নিয়তে তালবিয়া পড়লেই ইহরাম সম্পন্ন হয়ে যায়। তবে এর সুন্নত তরিকা হলো– গোঁফ, নখ ও শরীরের পরিষ্কারযোগ্য লোম চেঁছে বা কেটে পরিষ্কার করা; ইহরামের উদ্দেশ্যে উত্তমরূপে গোসল করা; গোসল সম্ভব না হলে ওযু করে নেওয়া। আর ঋতুমতী নারীর জন্য ইহরামের আগে গোসল করা মুস্তাহাব।

হজের জন্য পুরুষরা দুটি নতুন বা ধৌত সাদা চাদর নেবে। একটা লুঙ্গির মতো করে পরবে। অপরটি চাদর হিসেবে ব্যবহার করবে। কালো বা অন্য কোনো শরীয়তসিদ্ধ রঙের কাপড় পরিধান করাও জায়েজ। পায়ের পাতার উপরের উঁচু অংশ খোলা থাকে এমন স্যান্ডেল পরা যাবে। আর নারীরা স্বাভাবিক কাপড় পরবে। তারা ইহরাম অবস্থায় জুতা-মোজা ব্যবহার করতে পারবে।

তালবিয়া হলো—

لبيك اللهم لبيك لبيك لا شريك لك لبيك، إن الحمد والنعمة لك والملك لا شريك لك.

ইহরামের নিষিদ্ধ কাজ

  • পুরুষের জন্য সেলাই করা কাপড় পাঞ্জাবি, জোব্বা, শার্ট, সেলোয়ার, প্যান্ট, গেঞ্জি পরা নিষিদ্ধ।
  • পুরুষের জন্য মাথা ও চেহারা ঢাকাও নিষিদ্ধ। আর নারীদের শুধু চেহারায় কাপড় স্পর্শ করানো নিষেধ। তাই তারা পরপুরুষের সামনে চেহারায় কাপড় না লাগে– এভাবে পর্দা করবে।
  • পুরুষের জন্য পায়ের উপরের অংশের উঁচু হাড় ঢেকে যায় এমন জুতা পরিধান করা নিষেধ। এমন জুতা বা স্যান্ডেল পরতে হবে যাতে ওই উঁচু অংশ খোলা থাকে।
  • ইহরামের কাপড় বা শরীরে আতর বা সুগন্ধি লাগানো নিষেধ। সুগন্ধিযুক্ত তেলও লাগানো যাবে না। সুগন্ধি সাবান, পাউডার, স্নো, ক্রিম ইত্যাদি ব্যবহার করা যাবে না।
  • শরীরের কোনো স্থানের চুল, পশম বা নখ কাটা বা উপড়ানো নিষিদ্ধ।
  • ইহরাম অবস্থায় স্বামী-স্ত্রীর বিশেষ সম্পর্ক স্থাপন করা বা স্ত্রীর সামনে এ সংক্রান্ত কোনো কথা বা কাজ করা নিষিদ্ধ।
  • কোনো বন্য পশু শিকার করা বা কোনো শিকারিকে সহযোগিতা করা নিষিদ্ধ।
  • ঝগড়া-বিবাদ সাধারণ সময়েও নিষিদ্ধ; ইহরাম অবস্থায় এর গুনাহ আরও বেশি।
  • কাপড় বা শরীরের উকুন মারাও নিষিদ্ধ।

ইফরাদ, তামাত্তু, কিরান—এই তিন পদ্ধতিতে হজ আদায় করা যায়। বাংলাদেশের হাজিরা সাধারণত তামাত্তু পদ্ধতিতে হজ আদায় করে থাকেন। এই পদ্ধতিতে প্রথমে ইহরাম বেঁধে মক্কায় গিয়ে ওমরা পালন করতে হয়। এক্ষেত্রে জিলহজ মাসের ৮ তারিখের আগ পর্যন্ত স্বাভাবিক চলাফেরা করা যায়। জিলহজের ৮ তারিখ থেকেই হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।

৮ জিলহজ: মিনায় অবস্থান

জিলহজের ৮ তারিখ সূর্যোদয়ের পর সব হাজিকে ইহরাম অবস্থায় মিনা গমন করতে হবে। যোহর থেকে পরবর্তী দিনের ফজর পর্যন্ত মোট পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মিনায় পড়া এবং ৮ তারিখ দিবাগত রাতে মিনায় অবস্থান করা সুন্নত।

৯ জিলহজ: আরাফায় অবস্থান, মুযদালিফায় গমন

হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুকন আদায়ের দিন ৯ জিলহজ। এদিন দ্বি-প্রহরের পর থেকে পরবর্তী রাতের সুবহে সাদিকের মধ্যে সামান্য সময় আরাফার ময়দানে উপস্থিত থাকলেই এই ফরয আদায় হয়ে যায়। তবে এ দিন সূর্যাস্তের আগে আরাফায় পৌঁছলে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফায় অবস্থান করা ওয়াজিব। ৯ তারিখ সূর্যোদয়ের পর মিনা থেকে আরাফার উদ্দেশে রওনা হওয়া উত্তম।

যোহর ও আসর একত্রে পড়া

আরাফার মাঠে হজের ইমাম সমবেত হাজিদের উদ্দেশে ভাষণ দেন। যোহর ও আসরের নামাজ মসজিদে নামিরাতে একত্রে আদায় করেন। মসজিদে নামিরার জামাতে অংশগ্রহণ করতে পারলে যোহর ও আসর একত্রে ইমামের পিছনে আদায় করবে। কিন্তু মসজিদে নামিরার জামাতে অংশগ্রহণ করা সম্ভব না হলে জোহরের সময় যোহর এবং আসরের সময় আসর পড়বে। একত্রে পড়লে সময়ের আগে পড়া নামাজ আদায় হবে না।

আরাফায় অবস্থানকালে করণীয়

উত্তম হলো, কেবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে একেবারে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দোয়া করা। এত দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে না পারলে অল্প সময় বসবে। এরপর আবার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দোয়া-মোনাজাতে নিমগ্ন থাকবে।

সূর্যাস্তের আগে আরাফা থেকে বের হওয়া যাবে না

অনেকে সূর্যাস্তের আগেই মুযদালিফায় রওনা হয়ে যান। এক্ষেত্রে কর্তব্য হলো পুনরায় আরাফায় ফিরে যাওয়া। যদি ফিরে না যায় তবে ‘দম’ দিতে হবে।

মুযদালিফায় রওনা

আরাফার ময়দান থেকে সূর্যাস্তের পর মাগরিবের নামাজ না পড়েই মুযদালিফার উদ্দেশে রওয়ানা হবে। সূর্যাস্তের পর মুযদালিফার উদ্দেশে রওনা হতে দেরি না করাই উত্তম।

৯ তারিখ দিবাগত রাতের মাগরিব ও এশা

৯ জিলহজের মাগরিব ও এশার নামাজ এশার সময়ে মুযদালিফায় গিয়ে পড়তে হবে। যদি কেউ মুযদালিফায় পৌঁছার আগেই রাস্তায় মাগরিব এশা পড়ে নেয় কিংবা মুযদালিফায় পৌঁছার আগে শুধু মাগরিব পড়ে তবে উভয় ক্ষেত্রে মুযদালিফায় পৌঁছে আবার মাগরিব-এশা একত্রে পড়া জরুরি।

১০ জিলহজ: বিবিধ কাজ

জিলহজের ১০ তারিখে অনেকগুলো ওয়াজিব এবং একটি ফরজ কাজ একদিনে করতে হয়। এ দিনটি তাই হাজি সাহেবদের জন্য কিছুটা কষ্টের।

মুযদালিফায় অবস্থান

মুযদালিফায় অবস্থানের সময় ১০ জিলহজ সুবহে সাদিক থেকে সূর্যোদয়ের পূর্ব পর্যন্ত। সুবহে সাদিকের পর স্বল্প সময় অবস্থানের পর মুযদালিফা ত্যাগ করলেও ওয়াজিব আদায় হবে যাবে। তবে সূর্যোদয় পর্যন্ত অপেক্ষা করা সুন্নত। আর মুযদালিফায় রাত্রি যাপন করা সুন্নতে মুআক্কাদাহ।

জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ

১০ জিলহজ শুধু জামরায়ে আকাবায় কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হয়। কঙ্কর নিক্ষেপের স্থানে যে চওড়া পিলার আছে তাতে কঙ্কর মারা জরুরি নয়; বেষ্টনীর ভেতর পড়লেই যথেষ্ট।

বুট বা ছোলার দানার মতো ছোট কঙ্কর মারা ভালো। বড়োজোর খেজুরের বিচির মতো হতে পারে। ১০ জিলহজ সূর্যোদয়ের পর থেকে সূর্য ঢলে যাওয়া পর্যন্ত সম্ভব হলে কঙ্কর নিক্ষেপ করা মুস্তাহাব। কেউ যদি সাত কঙ্কর একবারে নিক্ষেপ করে তবে এক কঙ্কর মারা হয়েছে বলে গণ্য হবে। এক্ষেত্রে আরও ছয়টি কঙ্কর আলাদাভাবে মারতে হবে।

কোরবানি

তামাত্তু হজ আদায়কারীদের জন্য ১০ জিলহজ সুবহে সাদিকের পর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত হেরেমের সীমানার ভেতর কোরবানি করতে হবে।

মাথা মুণ্ডন করা

১০ যিলহজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব হলো মাথা মুণ্ডন করা। এর মাধ্যমে ইহরাম অবস্থা শেষ হয়। ১০ তারিখ কোরবানির পর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত মাথা মুণ্ডানোর সুযোগ আছে। এর চেয়ে দেরি করলে ‘দম’ ওয়াজিব হবে।

হজের তৃতীয় ফরজ তাওয়াফে জিয়ারত

১০ তারিখের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ফরজ তাওয়াফ করা। জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ, কোরবানি ও মাথা কামানোর পর তাওয়াফ করা সুন্নত। আরাফায় অবস্থানের আগে তাওয়াফে জিয়ারত করলে এটি দিয়ে ফরয তাওয়াফ আদায় হবে না। আরাফায় অবস্থানের পর ১০ জিলহজ সুবহে সাদিক থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগে এই তাওয়াফ করার অবকাশ রয়েছে। যদি ১২ তারিখ সূর্যাস্ত হয়ে যায় এবং তাওয়াফে জিয়ারত করা না হয় তবে দম দেওয়া জরুরি হবে।

১১ ও ১২ জিলহজ: মিনায় অবস্থান, কঙ্কর নিক্ষেপ

১১ ও ১২ জিলহজের রাত্রিতে মিনায় অবস্থান করা সুন্নত। কেউ যদি মিনায় না থাকে তবে সুন্নতের খেলাফ হলেও কোনো জরিমানা দিতে হবে না। ১১ ও ১২ জিলহজ মিনায় অবস্থানের পাশাপাশি হজের একমাত্র আনুষ্ঠানিক কাজ হলো জামরায় গিয়ে কঙ্কর নিক্ষেপ করা। এ দুইদিন তিনটি জামরায় সাতটি করে মোট ২১টি কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হবে।

১২ তারিখ দিবাগত রাতে মিনায় থাকা উত্তম এবং ১৩ তারিখও কঙ্কর নিক্ষেপ করা উত্তম। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজের চতুর্থ দিন অর্থাৎ ১৩ তারিখ কঙ্কর নিক্ষেপ করেই মিনা ত্যাগ করেছিলেন।

বিদায়ী তাওয়াফ

মিকাতের বাইরে অবস্থানকারী হাজিদের জন্য মক্কা মুকাররামা ত্যাগ করার আগে একটি তাওয়াফ করা ওয়াজিব। একে তাওয়াফে বিদা বলা হয়। এই তাওয়াফটি মক্কা থেকে বিদায়ের সময় করা উত্তম। আর মক্কা ও মিকাতের ভেতর অবস্থানকারীদের জন্য তাওয়াফে বিদা ওয়াজিব নয়, মুস্তাহাব।

তথ্যসূত্র: মাসিক আল কাউসার।

বিষয়:

ইসলামহজ

সম্পর্কিত