আজ তেরোতম রোজা। রমহমতের দশক শেষ হয়ে মাগফেরাতের দশক চলছে। রমজানের শুরুতে আমলের প্রতি সবার যে আগ্রহ ও উদ্দীপনা ছিল তা কি খানিকটা কমতে শুরু করেছে? মসজিদে মুসুল্লির সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে দিন দিন৷ সেহরি-ইফতারসহ রমজানের অনেক আমল এখন যেন কেবল অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
অথচ গোটা রমজান মাসই আল্লাহর কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। সারা মাসেই আল্লাহর রহমত বান্দার প্রতি অবিরত বর্ষণ হতে থাকে। আল্লাহ তাআলা বান্দাদের প্রতিদিনই ক্ষমা করতে থাকেন।
হাদীসে এসেছে, আল্লাহ তাআলা ক্ষমাশীল, তিনি ক্ষমা করতে ভালবাসেন৷ (তিরমিযী) প্রতিদিন শেষরাতে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের সম্বোধন করে বলতে থাকেন, আছ কোনো ক্ষমাপ্রার্থী, আমার কাছে ক্ষমা চাও৷ আমি ক্ষমা করে দেব। (বুখারী)
রমজান রহমত, বরকত ও মাগফেরাতের মাস। রমজানের নেয়ামত লাভ করার পরও নিজের গুনাহের ক্ষমা করাতে না পারা খুবই পরিতাপের বিষয়। এক হাদীস এসেছে, তিন শ্রেণির মানুষের ওপর ফেরেশতা জীবরাইল (আ.) এবং রাসূল (সা.) লানত করেছেন। তাদের মধ্যে একজন হলো, যে ব্যক্তি রমজান পেয়ে নিজের গুনাহ্ ক্ষমা করাতে পারল না৷ (মুসনাদে আহমদ) রমজান এমন এক মাস, যখন শয়তান বন্দি, রহমতের দরজা খোলা, সমাজে আমলের পরিবেশ বিরাজমান, তবুও যদি কেউ নিজের গুনাহ্ ক্ষমা করাতে না পারে, তার চেয়ে হতভাগা আর কে হতে পারে?
রমজানে ৪টি বিশেষ আমল
অপর এক হাদীসে রাসূল সা. রমজানে চারটি কাজ বেশি বেশি করার নির্দেশ দিয়েছেন। ১. কালেমা পাঠ করা। ২. ইস্তেগফার করা। ৩. জান্নাত লাভের জন্য দোয়া করা। ৪. জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাওয়া। ( ইবনে খুযায়মা)
ইস্তেগফার তথা, নিজেদের কৃত অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থণা করা গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। কোরআনে সূরা নুহের মধ্যে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিচ্ছেন—‘তোমরা তোমাদের রবের কাছে গুনাহ্ মাফ চাও, নিশ্চয় তিনি বড় ক্ষমাশীল৷’ হাদীসে এসেছে, রাসূল (সা.) দৈনিক সত্তরবার ইস্তেগফার করতেন। (বুখারী)
রাসূল (সা.) ছিলেন ছোট, বড় সর্বপ্রকার গুনাহ্ থেকে পবিত্র৷ তবুও তিনি দৈনিক সত্তরবার ইস্তেগফার করতেন। তাঁর এই ইস্তেগফার পাঠের মধ্যে উম্মতের জন্য নির্দেশনা রয়েছে তারাও যেন বেশি বেশি ইস্তেগফার পাঠ করে।
তওবা-ইস্তেগফারের পদ্ধতি
শুধু মুখে মুখে আসতাগফিরুল্লাহ উচ্চারণ করার নামই ইস্তেগফার নয়। উলামায়ে কেরাম বলেছেন, কোনো গুনাহের কাজ করে ফেললে তিনটি কাজের সমন্বয়ে ইস্তেগফার সম্পন্ন করতে হয়।
১. কৃত পাপ কাজের জন্য অনুতপ্ত হওয়া।
২. পাপ কাজটি ছেড়ে দেওয়া।
৩. ভবিষ্যতে এ ধরণের পাপ কাজে না জড়ানোর ব্যাপারে মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা।
পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কারো হক নষ্ট করলে তা ফিরিয়ে দেওয়া কিংবা তার কাছে ক্ষমা চাওয়া। কেননা বান্দার হক নষ্ট করার অপরাধ আল্লাহ তাআলা নিজে ক্ষমা করেন না।
একটি আবেদন
রমজানের দিনগুলো দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। প্রথম দশক চলে গেছে, দ্বিতীয় দশকও বিদায়ের পথে। সামনে অপেক্ষা করছে মুক্তির দশক। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি রহমত, মাগফেরাত লাভ করতে পারছি?
রোজা রাখা সহজ৷ ক্ষুধাও সহ্য করা যায়। কিন্তু কঠিন হলো নিজেকে পরিবর্তন করা, গুনাহ্ ছেড়ে দেওয়া, বিগলিত অন্তরে আল্লাহর কাছে তাওবা করা। রমজান শুধু সময়সূচি বদলানোর মাস নয়—এটি চরিত্র বদলানোর মাস।
আজ রাতেই হয়তো আবার সেই আহ্বান আসবে—‘আছো কোন ক্ষমাপ্রার্থী?’ আমরা কি সেই ডাকে সাড়া দেব? নাকি ব্যস্ততার অজুহাতে আরেকটি সুযোগও হারিয়ে ফেলব?
এই রমজানেই যদি ক্ষমা না পাই তাহলে কবে? হয়তো আজকের দিনটিই আমাদের শেষ দিন। এ রমজানই আমাদের জীবনের শেষ রমজান। তাই আসুন, আজ থেকেই নতুনভাবে শুরু করি।
বেশি বেশি ইস্তেগফার করি, কালেমা পড়ি, জান্নাত চাই, জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাই।
হে আল্লাহ, আপনি আমাদের ক্ষমা করুন। আমাদেরকে সেই হতভাগাদের অন্তর্ভুক্ত করবেন না, যারা রমজান পেয়েও আপনার ক্ষমা পায় না। আমাদের হৃদয় পরিবর্তন করুন। আমাদের তাওবা কবুল করুন। আমাদেরকে আপনার রহমতের ছায়ায় স্থান দিন।
- মাওলানা ওলিউর রহমান: শিক্ষক, মাদরাসাতুল মুত্তাকীন, উত্তরা, ঢাকা