আশুরাকে ঘিরে প্রচলিত মিথ ও বাস্তবতা

প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৬, ০৯: ৫২
ফোরাত নদীর তীর। ছবি: উইকিপিডিয়া

‎‎ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম। আরবিতে এ মাসকে সম্মানিত মাস বলা হয়। আর এই মাসের ১০ তারিখকে বলা হয় আশুরা যা মুসলমানদের কাছে এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ দিন। শতাব্দীর পর শতাব্দী এই আশুরা একদিকে আল্লাহর রহমত, সাহায্য এবং ঐতিহাসিক নানা ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে আসছে। অন্যদিকে কারবালার রক্তস্নাত প্রান্তরে সত্য ও ন্যায়ের জন্য আত্মত্যাগের এক অনন্য ইতিহাসও ধারণ করে আছে।‎

‎প্রতি বছর আশুরা এলে মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে ফিরে আসে আত্মশুদ্ধির আহ্বান। ফিরে আসে আত্মত্যাগ, ধৈর্য, ন্যায় ও মানবিকতার শিক্ষা। ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি এই দিনটি ইতিহাস, আদর্শ এবং মানবতার সংগ্রামের এক অনন্য প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত।

আশুরার ঐতিহাসিক গুরুত্ব

‎‎‘আশুরা’ শব্দটি আরবি ‘আশারা’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ দশ। মহররমের দশম দিন হওয়ায় এ দিনের নামকরণ করা হয়েছে আশুরা। ইসলামি ঐতিহ্য ও বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে, এ দিন বহু ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী।

‎অত্যাচারী ফেরাউনের কবল থেকে বনি ইসরায়েলের মুক্তির ঘটনা ঐতিহাসিক আশুরার দিনে সংঘঠিত হয়েছিল। এ দিনেই ফেরাউন ও তার বাহিনী নবী মুসাকে (আ.) ধাওয়া করতে গিয়ে সাগরের পানিতে তলিয়ে যায়।

‎মুসা (আ.) এবং বনি ইসরায়েলের এই মুক্তির ঘটনাকে স্মরণ করে রাসূল (সা.) আশুরার রোজা পালন করেন। মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় এসে রাসূল (সা.) দেখেন, ইহুদিরা এ দিন রোজা রাখছে। কারণ জানতে চাইলে তারা বলে, এ দিন আল্লাহ মুসা (আ.) ও তাঁর জাতিকে রক্ষা করেছিলেন। তখন রাসূল (সা.)বলেন, ‘মুসা (আ.)- এর ব্যাপারে আমরাই অধিক হকদার।’ এরপর তিনি নিজেও রোজা রাখেন এবং সাহাবিদের রোজা রাখার নির্দেশ দেন।

আশুরার ফজিলত ও আমল

‎আশুরার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো রোজা পালন। সহিহ হাদিসে এসেছে, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘আশুরার দিনের রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হয়ে যায় বলে আমি আল্লাহর কাছে আশা করি।’

‎তবে শুধু মহররমের ১০ তারিখে নয়, বরং রাসূল (সা.) ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম মিলিয়ে দুই দিন রোজা রাখার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। এর মাধ্যমে ইহুদিদের থেকে মুসলমানদের আমলে স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।

আশুরাকেন্দ্রিক প্রচলিত ধারণা ও বাস্তবতা

‎আশুরাকে ঘিরে মুসলিম সমাজে নানা ঘটনা ও কাহিনি প্রচলিত থাকলেও সেগুলোর সবগুলো নির্ভরযোগ্য হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। বিভিন্ন গ্রন্থে আশুরার দিনে আদম (আ.) এর তাওবা কবুল হওয়া, মহাপ্লাবনের পর নূহ (আ.)-এর নৌকা জুদি পাহাড়ে ভেড়া, ঈসা (আ.) এর জন্ম, এমনকি কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার মতো বহু ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু মুহাদ্দিসদের গবেষণায় এসব বর্ণনার অধিকাংশই দুর্বল (যঈফ) বা জাল (মওযু) হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তাই এগুলোকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক বা ধর্মীয় সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয়।

‎সহিহ হাদিসের আলোকে আশুরার সঙ্গে নিশ্চিতভাবে সম্পর্কিত যে ঘটনাটি প্রমাণিত, তা হলো মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের ফেরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীর পানিতে ডুবে ধ্বংস হওয়া। তাই আশুরার তাৎপর্য তুলে ধরতে হলে দুর্বল ও ভিত্তিহীন বর্ণনার পরিবর্তে সহিহ দলিলনির্ভর আলোচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়াই অধিক সমীচীন।

কারবালা: ইতিহাসের এক রক্তঝরা অধ্যায়

‎আশুরার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে কারবালার বেদনাবিধুর ইতিহাস। হিজরি ৬১ সালের ১০ মহররম বর্তমান ইরাকের কারবালা প্রান্তরে মহানবী (সা.) এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করতে গিয়ে শাহাদাত বরণ করেন।

‎ইয়াজিদের প্রতি আনুগত্য স্বীকারে অস্বীকৃতি জানিয়ে কুফাবাসীর আমন্ত্রণে ইমাম হুসাইন (রা.) পরিবার ও অল্পসংখ্যক সঙ্গী নিয়ে কুফার উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু কারবালায় পৌঁছে তাঁরা ইয়াজিদের বাহিনী কর্তৃক অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন এবং ফোরাত নদীর পানি থেকেও তাদের বঞ্চিত করা হয়। চরম তৃষ্ণা ও কষ্টের মধ্যেও তাঁরা অন্যায়ের কাছে মাথানত করেননি। অবশেষে ১০ মহররমে ইমাম হুসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবারের সদস্য ও সঙ্গীরা শাহাদাত বরণ করেন।

আশুরার সর্বজনীন বার্তা

‎‎আশুরা শুধু একটি ধর্মীয় দিবস নয়; এটি সত্য, ন্যায়, ধৈর্য ও আত্মত্যাগের এক চিরন্তন শিক্ষা। এই দিন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকা প্রত্যেক মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। আত্মশুদ্ধি, তওবা ও নেক আমলের পাশাপাশি কারবালার শিক্ষা আমাদের আদর্শের প্রশ্নে আপস না করার প্রেরণা দেয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় থাকার মনোবল জোগায়।

  • মাওলানা ওলিউর রহমান: শিক্ষক, মাদরাসাতুল মুত্তাকীন, উত্তরা, ঢাকা
Ad 300x250

সম্পর্কিত