ওলিউর রহমান

উপমহাদেশে মুসলিম পুনর্জাগরণের অন্যতম রূপকার ছিলেন শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী। খ্রিস্টীয় আঠারো শতকের চরম রাজনৈতিক ও সামাজিক দুর্যোগের সময়ে ভারতীয় মুসলমানদের চিন্তা, শিক্ষা ও নৈতিক সংস্কারে তিনি এক যুগান্তকারী বিপ্লব সাধন করেন।
ভারতের মুসলমানদের আজকের যে রাজনৈতিক ও সামাজিক দুরবস্থা, তার শিকড় প্রোথিত ছিল সেই আঠারো শতকের অস্থিরতায়। ১১৯৩ সালে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে পৃথ্বীরাজকে পরাজিত করার মাধ্যমে সুলতান মুহাম্মদ ঘুরী দিল্লিতে যে মুসলিম শাসনের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, আঠারো শতকে এসে তা ক্রমেই দুর্বল ও নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
এ সময় ভারতের দক্ষিণাঞ্চলে শক্তিশালী হয়ে ওঠে মারাঠা শক্তি। পাঞ্জাব ও লাহোর দখল করে তারা দিল্লির অদূরবর্তী আমরোহা পর্যন্ত নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে। দিল্লির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জাঠ শক্তিও মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বল উত্তরাধিকারীদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে শিখরাও ক্রমেই রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে শুরু করে। ভারতবর্ষের বিভিন্ন আঞ্চলিক শাসক দিল্লির কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব অস্বীকার করে স্বাধীন অবস্থান গ্রহণ করতে থাকে।
বাংলা অঞ্চলেও ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ধীরে ধীরে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে মুঘল সম্রাটদের প্রভাবকে সংকুচিত করে ফেলছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ইউরোপীয় বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব, যা ভারতীয় মুসলিম সমাজের জন্য নতুন এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়।
মুসলিম সমাজের ওপর নেমে আসা এই বহুমুখী সংকট শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)-এর হৃদয়কে গভীরভাবে ব্যথিত করে। শাহ ওয়ালিউল্লাহ জন্ম আঠারো শতকের সূচনালগ্নে। বংশপরম্পরায় তিনি দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি.)-এর বংশধর ছিলেন। অল্প বয়সেই পিতার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায়ে রহিমিয়্যাতে তিনি তাফসির, হাদিস, ফিকহ, দর্শন ও অন্যান্য ইসলামি জ্ঞানে গভীর দক্ষতা অর্জন করেন। আইনশাস্ত্রেও ছিল তার অসামান্য পারদর্শিতা।
তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট মুহাদ্দিস, সমাজ সংস্কারক এবং উপমহাদেশের আধুনিক ইসলামি চিন্তার অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ।
সাধারণ মুসলমানদের জীবনে দ্বীনি চেতনার পুনর্জাগরণ এবং দিল্লির মুসলিম শাসনের দুর্বল ভিত্তিকে শক্তিশালী করার বিষয়টি তাকে সর্বদা চিন্তিত রাখত। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে কোনো জাতির পুনর্জাগরণ সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন মানুষের চিন্তা, শিক্ষা, নৈতিকতা ও সামাজিক কাঠামোর ব্যাপক সংস্কার।
তাই তৃণমূল সমাজ থেকে রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত ইসলাহ বা সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন।
শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার পরিধিকে আরও বিস্তৃত করে নিজেকে সংস্কারমূলক কাজের জন্য প্রস্তুত করতে শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) হিজাজ সফর করেন। সেখানে অবস্থানকালে তিনি মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত আলেম ও জ্ঞানীদের সংস্পর্শে আসেন। আরব বিশ্বের জ্ঞানচর্চা, তুর্কি সালতানাতের রাজনৈতিক বাস্তবতা, মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা এবং তৎকালীন বৈশ্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভ করেন।
হিজাজে অবস্থানকালে তিনি উপলব্ধি করেন, ভারতবর্ষের মুসলমানদের ওপর আসন্ন সংকট মোকাবিলা করতে হলে কেবল আবেগনির্ভর প্রতিরোধ নয়, বরং প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, জ্ঞানভিত্তিক সংস্কার এবং সুসংগঠিত নেতৃত্ব।
তিনি বুঝতে পারেন, মুসলিম সমাজকে পুনর্জাগরিত করতে হলে প্রথমে প্রয়োজন কুরআন ও হাদিসের জ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য করে পৌঁছে দেওয়া। পাশাপাশি শিক্ষা, অর্থনীতি, সমাজসংস্কার এবং রাজনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন রয়েছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ ও উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করেন। ধর্মীয় ক্ষেত্রে তিনি কুসংস্কার, অজ্ঞতা ও দ্বীনের নামে বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে সংস্কারের আহ্বান জানান। আর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি উপলব্ধি করেন, মুসলিম সমাজের অস্তিত্ব ও মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রয়োজন যোগ্য, নৈতিক ও দূরদর্শী নেতৃত্ব।
মোটকথা, রাষ্ট্র কাঠামোর মৌলিক চারটি বিষয়—রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সমাজসংস্কার—ছিল শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.)-এর চিন্তার কেন্দ্রে।
রাজনৈতিক প্রতিরোধ
মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর তার দুর্বল উত্তরসূরিদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও অযোগ্যতার সুযোগে মারাঠা শক্তি দ্রুত বিস্তার লাভ করে। একপর্যায়ে তারা দিল্লির আশপাশের অঞ্চল পর্যন্ত নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে।
এদিকে ইরানের শাসক নাদের শাহ দিল্লি আক্রমণ করে বিপুল সম্পদ লুট করে নিয়ে যায়। এই আক্রমণে অসংখ্য মানুষ নিহত হয়। কিন্তু অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে দুর্বল হয়ে পড়া মুঘল শাসকরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হন।
শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) এই সংকট সম্পর্কে শাসকদের বারবার সতর্ক করেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে তিনি আফগান শাসক আহমদ শাহ আবদালী ও অন্যান্য প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যাতে দিল্লির ওপর আসন্ন বিপদ প্রতিহত করা যায়।
তবে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, বাইরের শক্তির সহায়তায় সাময়িকভাবে সংকট মোকাবিলা করা গেলেও স্থায়ী সমাধানের জন্য নিজেদের মধ্য থেকেই একটি আদর্শবাদী, দক্ষ ও আত্মত্যাগী নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে।
এই উপলব্ধি থেকেই তিনি তার সন্তান, শিষ্য ও একনিষ্ঠ অনুসারীদের নিয়ে একটি শক্তিশালী সংস্কারধারার ভিত্তি স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে তার চিন্তা ও আদর্শের ধারাবাহিকতায় ইংরেজবিরোধী আন্দোলন, বালাকোটের সংগ্রাম, শামেলি আন্দোলন, রেশমি রুমাল আন্দোলন, ফরায়েজী আন্দোলন এবং বাঁশের কেল্লার প্রতিরোধসহ উপমহাদেশের বহু ইসলামি পুনর্জাগরণ আন্দোলনের বীজ অঙ্কুরিত হয়।
ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক দর্শন
ইউরোপীয় বাণিজ্যিক শক্তির উত্থান এবং উপনিবেশবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিস্তার আঠারো শতকের বিশ্বব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো তাদের অধিকৃত অঞ্চলে পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিস্তার ঘটায়। সম্পদ আহরণ, ভোগবাদ এবং মুনাফাকেন্দ্রিক অর্থনীতি সমাজে বৈষম্য ও শোষণের নতুন বাস্তবতা সৃষ্টি করে।
শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শনের ব্যাখ্যা করে দেখান যে ইসলাম ব্যক্তি উদ্যোগ ও সম্পদের বৈধ ব্যবহারের স্বাধীনতা স্বীকার করে, তবে এর সঙ্গে নৈতিকতা, ন্যায়বিচার ও সামাজিক দায়বদ্ধতার শর্ত যুক্ত করে।
তিনি মনে করতেন, এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রয়োজন যেখানে ব্যক্তির স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু সমাজের দুর্বল শ্রেণির অধিকারও সুরক্ষিত থাকবে।
ধর্মীয় সংস্কার
দ্বিতীয় মুঘল সম্রাট হুমায়ূনের পুনরায় দিল্লির ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই ভারতে ইরানি শিয়াদের প্রভাব ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। পরবর্তীকালে সম্রাট আকবরের শাসনামলে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নানা কারণে সেই প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি এমন রূপ নেয় যে বিভিন্ন অঞ্চলে শিয়া-সুন্নি মতবিরোধ তীব্র আকার ধারণ করে। একই সঙ্গে তাসাউফের নামে প্রচলিত কিছু অনুশীলনের মধ্যেও নানা বিচ্যুতি ও বহিরাগত প্রভাব প্রবেশ করতে থাকে।
শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) এসব প্রবণতার বিরুদ্ধে সংস্কারকাজে আত্মনিয়োগ করেন। তার রচিত বিভিন্ন গ্রন্থে তিনি এ বিষয়গুলোর বিশদ পর্যালোচনা করেছেন। তারই দিকনির্দেশনায় পুত্র শাহ আবদুল আযীয দেহলভী (রহ.) রচনা করেন সুবিখ্যাত গ্রন্থ তোহফায়ে ইসনা আশারিয়া।
শিক্ষা সংস্কার
উপমহাদেশের ধর্মীয় শিক্ষার ইতিহাসে শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)-এর অবদান অনন্য। ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও কার্যকর করে তোলার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ কারণে তাকে উপমহাদেশের ধর্মীয় শিক্ষাধারার আধ্যাত্মিক গুরু বলা হয়।
শাহ সাহেবের জীবনের অন্যতম যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ছিল কুরআন চর্চাকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করে তোলা। তার মতে, আল-কুরআন কোনো বিশেষ শ্রেণির জন্য সংরক্ষিত গ্রন্থ নয়। এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহর হিদায়াত। তাই মানুষের উচিত কুরআনের অর্থ ও মর্ম উপলব্ধির চেষ্টা করা। এ উদ্দেশ্যে তিনি ফারসি ভাষায় কুরআনের অনুবাদ করেন, যা উপমহাদেশে কুরআন চর্চার ইতিহাসে নতুন দিগন্ত ওপেন বা উন্মোচন করে।
হাদিস শিক্ষার ক্ষেত্রেও শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) যুগান্তকারী পরিবর্তন আনেন। ভারতবর্ষে হাদিস চর্চার যে সনদ-পরম্পরা আজও বিদ্যমান, তার অধিকাংশই কোনো না কোনোভাবে তার মাধ্যমে সংযুক্ত হয়েছে।
দরসে নিজামির পাঠ্যক্রমে মানতিক, দর্শন ও কালামের যে ব্যাপক প্রাধান্য ছিল, শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) অত্যন্ত কৌশলে তার পাশাপাশি তাফসির, উসুলুত তাফসির, হাদিস, উসুলুল হাদিস, ফিকহ ও উসুলুল ফিকহের গুরুত্ব বৃদ্ধি করেন। এর ফলে ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থা আরও কার্যকর, ভারসাম্যপূর্ণ ও কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক রূপ লাভ করে।
গ্রন্থাবলি
শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) ছিলেন বহু কালজয়ী ও প্রভাবশালী গ্রন্থের রচয়িতা। তার হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা ইসলামি চিন্তা ও দর্শনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে আজও সমাদৃত।
খিলাফতে রাশেদার প্রামাণিকতা ও তাৎপর্য নিয়ে রচিত তার ইযালাতুল খাফা আন খিলাফাতিল খুলাফা গ্রন্থটি ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তার ইতিহাসে একটি অনন্য সংযোজন। গ্রন্থটির গভীরতা ও গবেষণামূল্য সমকালীন ও পরবর্তী বহু আলেমকে বিস্মিত করেছে।
জ্ঞান, সংস্কার, রাষ্ট্রচিন্তা ও আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব—এই চারটি অঙ্গনেই শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) রেখে গেছেন অনন্য অবদান। তার চিন্তা ও কর্মধারা শুধু তার সমকালেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং উপমহাদেশের বহু সংস্কার, শিক্ষা ও পুনর্জাগরণ আন্দোলনের ভিত্তি নির্মাণ করেছে।
১৭৬২ খ্রিস্টাব্দে ৬২ বছর বয়সে এই মহান মনীষী ইন্তেকাল করেন। কিন্তু তার রেখে যাওয়া জ্ঞান, চিন্তা ও সংস্কারের উত্তরাধিকার আজও মুসলিম বিশ্বের জন্য প্রেরণার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা।

উপমহাদেশে মুসলিম পুনর্জাগরণের অন্যতম রূপকার ছিলেন শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী। খ্রিস্টীয় আঠারো শতকের চরম রাজনৈতিক ও সামাজিক দুর্যোগের সময়ে ভারতীয় মুসলমানদের চিন্তা, শিক্ষা ও নৈতিক সংস্কারে তিনি এক যুগান্তকারী বিপ্লব সাধন করেন।
ভারতের মুসলমানদের আজকের যে রাজনৈতিক ও সামাজিক দুরবস্থা, তার শিকড় প্রোথিত ছিল সেই আঠারো শতকের অস্থিরতায়। ১১৯৩ সালে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে পৃথ্বীরাজকে পরাজিত করার মাধ্যমে সুলতান মুহাম্মদ ঘুরী দিল্লিতে যে মুসলিম শাসনের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, আঠারো শতকে এসে তা ক্রমেই দুর্বল ও নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
এ সময় ভারতের দক্ষিণাঞ্চলে শক্তিশালী হয়ে ওঠে মারাঠা শক্তি। পাঞ্জাব ও লাহোর দখল করে তারা দিল্লির অদূরবর্তী আমরোহা পর্যন্ত নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে। দিল্লির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জাঠ শক্তিও মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বল উত্তরাধিকারীদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে শিখরাও ক্রমেই রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে শুরু করে। ভারতবর্ষের বিভিন্ন আঞ্চলিক শাসক দিল্লির কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব অস্বীকার করে স্বাধীন অবস্থান গ্রহণ করতে থাকে।
বাংলা অঞ্চলেও ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ধীরে ধীরে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে মুঘল সম্রাটদের প্রভাবকে সংকুচিত করে ফেলছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ইউরোপীয় বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব, যা ভারতীয় মুসলিম সমাজের জন্য নতুন এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়।
মুসলিম সমাজের ওপর নেমে আসা এই বহুমুখী সংকট শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)-এর হৃদয়কে গভীরভাবে ব্যথিত করে। শাহ ওয়ালিউল্লাহ জন্ম আঠারো শতকের সূচনালগ্নে। বংশপরম্পরায় তিনি দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি.)-এর বংশধর ছিলেন। অল্প বয়সেই পিতার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায়ে রহিমিয়্যাতে তিনি তাফসির, হাদিস, ফিকহ, দর্শন ও অন্যান্য ইসলামি জ্ঞানে গভীর দক্ষতা অর্জন করেন। আইনশাস্ত্রেও ছিল তার অসামান্য পারদর্শিতা।
তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট মুহাদ্দিস, সমাজ সংস্কারক এবং উপমহাদেশের আধুনিক ইসলামি চিন্তার অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ।
সাধারণ মুসলমানদের জীবনে দ্বীনি চেতনার পুনর্জাগরণ এবং দিল্লির মুসলিম শাসনের দুর্বল ভিত্তিকে শক্তিশালী করার বিষয়টি তাকে সর্বদা চিন্তিত রাখত। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে কোনো জাতির পুনর্জাগরণ সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন মানুষের চিন্তা, শিক্ষা, নৈতিকতা ও সামাজিক কাঠামোর ব্যাপক সংস্কার।
তাই তৃণমূল সমাজ থেকে রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত ইসলাহ বা সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন।
শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার পরিধিকে আরও বিস্তৃত করে নিজেকে সংস্কারমূলক কাজের জন্য প্রস্তুত করতে শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) হিজাজ সফর করেন। সেখানে অবস্থানকালে তিনি মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত আলেম ও জ্ঞানীদের সংস্পর্শে আসেন। আরব বিশ্বের জ্ঞানচর্চা, তুর্কি সালতানাতের রাজনৈতিক বাস্তবতা, মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা এবং তৎকালীন বৈশ্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভ করেন।
হিজাজে অবস্থানকালে তিনি উপলব্ধি করেন, ভারতবর্ষের মুসলমানদের ওপর আসন্ন সংকট মোকাবিলা করতে হলে কেবল আবেগনির্ভর প্রতিরোধ নয়, বরং প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, জ্ঞানভিত্তিক সংস্কার এবং সুসংগঠিত নেতৃত্ব।
তিনি বুঝতে পারেন, মুসলিম সমাজকে পুনর্জাগরিত করতে হলে প্রথমে প্রয়োজন কুরআন ও হাদিসের জ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য করে পৌঁছে দেওয়া। পাশাপাশি শিক্ষা, অর্থনীতি, সমাজসংস্কার এবং রাজনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন রয়েছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ ও উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করেন। ধর্মীয় ক্ষেত্রে তিনি কুসংস্কার, অজ্ঞতা ও দ্বীনের নামে বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে সংস্কারের আহ্বান জানান। আর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি উপলব্ধি করেন, মুসলিম সমাজের অস্তিত্ব ও মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রয়োজন যোগ্য, নৈতিক ও দূরদর্শী নেতৃত্ব।
মোটকথা, রাষ্ট্র কাঠামোর মৌলিক চারটি বিষয়—রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা ও সমাজসংস্কার—ছিল শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.)-এর চিন্তার কেন্দ্রে।
রাজনৈতিক প্রতিরোধ
মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর তার দুর্বল উত্তরসূরিদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও অযোগ্যতার সুযোগে মারাঠা শক্তি দ্রুত বিস্তার লাভ করে। একপর্যায়ে তারা দিল্লির আশপাশের অঞ্চল পর্যন্ত নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে।
এদিকে ইরানের শাসক নাদের শাহ দিল্লি আক্রমণ করে বিপুল সম্পদ লুট করে নিয়ে যায়। এই আক্রমণে অসংখ্য মানুষ নিহত হয়। কিন্তু অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে দুর্বল হয়ে পড়া মুঘল শাসকরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হন।
শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) এই সংকট সম্পর্কে শাসকদের বারবার সতর্ক করেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে তিনি আফগান শাসক আহমদ শাহ আবদালী ও অন্যান্য প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যাতে দিল্লির ওপর আসন্ন বিপদ প্রতিহত করা যায়।
তবে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, বাইরের শক্তির সহায়তায় সাময়িকভাবে সংকট মোকাবিলা করা গেলেও স্থায়ী সমাধানের জন্য নিজেদের মধ্য থেকেই একটি আদর্শবাদী, দক্ষ ও আত্মত্যাগী নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে।
এই উপলব্ধি থেকেই তিনি তার সন্তান, শিষ্য ও একনিষ্ঠ অনুসারীদের নিয়ে একটি শক্তিশালী সংস্কারধারার ভিত্তি স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে তার চিন্তা ও আদর্শের ধারাবাহিকতায় ইংরেজবিরোধী আন্দোলন, বালাকোটের সংগ্রাম, শামেলি আন্দোলন, রেশমি রুমাল আন্দোলন, ফরায়েজী আন্দোলন এবং বাঁশের কেল্লার প্রতিরোধসহ উপমহাদেশের বহু ইসলামি পুনর্জাগরণ আন্দোলনের বীজ অঙ্কুরিত হয়।
ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক দর্শন
ইউরোপীয় বাণিজ্যিক শক্তির উত্থান এবং উপনিবেশবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিস্তার আঠারো শতকের বিশ্বব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো তাদের অধিকৃত অঞ্চলে পুঁজিবাদী অর্থনীতির বিস্তার ঘটায়। সম্পদ আহরণ, ভোগবাদ এবং মুনাফাকেন্দ্রিক অর্থনীতি সমাজে বৈষম্য ও শোষণের নতুন বাস্তবতা সৃষ্টি করে।
শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শনের ব্যাখ্যা করে দেখান যে ইসলাম ব্যক্তি উদ্যোগ ও সম্পদের বৈধ ব্যবহারের স্বাধীনতা স্বীকার করে, তবে এর সঙ্গে নৈতিকতা, ন্যায়বিচার ও সামাজিক দায়বদ্ধতার শর্ত যুক্ত করে।
তিনি মনে করতেন, এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রয়োজন যেখানে ব্যক্তির স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু সমাজের দুর্বল শ্রেণির অধিকারও সুরক্ষিত থাকবে।
ধর্মীয় সংস্কার
দ্বিতীয় মুঘল সম্রাট হুমায়ূনের পুনরায় দিল্লির ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই ভারতে ইরানি শিয়াদের প্রভাব ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। পরবর্তীকালে সম্রাট আকবরের শাসনামলে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নানা কারণে সেই প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি এমন রূপ নেয় যে বিভিন্ন অঞ্চলে শিয়া-সুন্নি মতবিরোধ তীব্র আকার ধারণ করে। একই সঙ্গে তাসাউফের নামে প্রচলিত কিছু অনুশীলনের মধ্যেও নানা বিচ্যুতি ও বহিরাগত প্রভাব প্রবেশ করতে থাকে।
শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) এসব প্রবণতার বিরুদ্ধে সংস্কারকাজে আত্মনিয়োগ করেন। তার রচিত বিভিন্ন গ্রন্থে তিনি এ বিষয়গুলোর বিশদ পর্যালোচনা করেছেন। তারই দিকনির্দেশনায় পুত্র শাহ আবদুল আযীয দেহলভী (রহ.) রচনা করেন সুবিখ্যাত গ্রন্থ তোহফায়ে ইসনা আশারিয়া।
শিক্ষা সংস্কার
উপমহাদেশের ধর্মীয় শিক্ষার ইতিহাসে শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)-এর অবদান অনন্য। ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও কার্যকর করে তোলার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ কারণে তাকে উপমহাদেশের ধর্মীয় শিক্ষাধারার আধ্যাত্মিক গুরু বলা হয়।
শাহ সাহেবের জীবনের অন্যতম যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ছিল কুরআন চর্চাকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করে তোলা। তার মতে, আল-কুরআন কোনো বিশেষ শ্রেণির জন্য সংরক্ষিত গ্রন্থ নয়। এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহর হিদায়াত। তাই মানুষের উচিত কুরআনের অর্থ ও মর্ম উপলব্ধির চেষ্টা করা। এ উদ্দেশ্যে তিনি ফারসি ভাষায় কুরআনের অনুবাদ করেন, যা উপমহাদেশে কুরআন চর্চার ইতিহাসে নতুন দিগন্ত ওপেন বা উন্মোচন করে।
হাদিস শিক্ষার ক্ষেত্রেও শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) যুগান্তকারী পরিবর্তন আনেন। ভারতবর্ষে হাদিস চর্চার যে সনদ-পরম্পরা আজও বিদ্যমান, তার অধিকাংশই কোনো না কোনোভাবে তার মাধ্যমে সংযুক্ত হয়েছে।
দরসে নিজামির পাঠ্যক্রমে মানতিক, দর্শন ও কালামের যে ব্যাপক প্রাধান্য ছিল, শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) অত্যন্ত কৌশলে তার পাশাপাশি তাফসির, উসুলুত তাফসির, হাদিস, উসুলুল হাদিস, ফিকহ ও উসুলুল ফিকহের গুরুত্ব বৃদ্ধি করেন। এর ফলে ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থা আরও কার্যকর, ভারসাম্যপূর্ণ ও কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক রূপ লাভ করে।
গ্রন্থাবলি
শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) ছিলেন বহু কালজয়ী ও প্রভাবশালী গ্রন্থের রচয়িতা। তার হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা ইসলামি চিন্তা ও দর্শনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে আজও সমাদৃত।
খিলাফতে রাশেদার প্রামাণিকতা ও তাৎপর্য নিয়ে রচিত তার ইযালাতুল খাফা আন খিলাফাতিল খুলাফা গ্রন্থটি ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তার ইতিহাসে একটি অনন্য সংযোজন। গ্রন্থটির গভীরতা ও গবেষণামূল্য সমকালীন ও পরবর্তী বহু আলেমকে বিস্মিত করেছে।
জ্ঞান, সংস্কার, রাষ্ট্রচিন্তা ও আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব—এই চারটি অঙ্গনেই শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) রেখে গেছেন অনন্য অবদান। তার চিন্তা ও কর্মধারা শুধু তার সমকালেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং উপমহাদেশের বহু সংস্কার, শিক্ষা ও পুনর্জাগরণ আন্দোলনের ভিত্তি নির্মাণ করেছে।
১৭৬২ খ্রিস্টাব্দে ৬২ বছর বয়সে এই মহান মনীষী ইন্তেকাল করেন। কিন্তু তার রেখে যাওয়া জ্ঞান, চিন্তা ও সংস্কারের উত্তরাধিকার আজও মুসলিম বিশ্বের জন্য প্রেরণার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা।
.png)

সমরকন্দ মুসলিম জ্ঞানসভ্যতার ইতিহাসে এক কিংবদন্তি নাম। শতাব্দীর পর শতাব্দী এই নগরী ছিল জ্ঞান, সভ্যতা ও সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল কেন্দ্র। বিশাল মাদরাসার প্রাঙ্গণে প্রতিধ্বনিত হতো কুরআন ও হাদিসের দরস, খানকাগুলো মুখর থাকত আধ্যাত্মিক সাধনায়,
১৭ জুলাই ২০২৬
১৯৯৫ সালের ১১ জুলাই ছিল বসনিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দিন। তিন বছর ধরে চলা গণহত্যা এ দিনে সকল সীমা অতিক্রম করেছিল। দেশটির সেব্রেনিৎসা শহরে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ৮ হাজারের বেশি মানুষ হত্যা করা হয়েছিল ১১ জুলাই। গতকাল ছিল সেব্রেনিৎসা গণহত্যার ৩১তম বার্ষিকী।
১২ জুলাই ২০২৬
গোটা আব্বাসী খেলাফতজুড়েই ছোট-বড় অনেক মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আব্বাসী খলীফাগণ শিক্ষা প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তবে ছত্রিশতম আব্বাসী খলিফা মুস্তানসির বিল্লাহ ছিলেন এ ক্ষেত্রে প্রবাদতুল্য ব্যক্তিত্ব।
০৩ জুলাই ২০২৬
ইসলামি বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররম। আরবিতে এ মাসকে সম্মানিত মাস বলা হয়। আর এই মাসের ১০ তারিখকে বলা হয় আশুরা যা মুসলমানদের কাছে এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ দিন। শতাব্দীর পর শতাব্দী এই আশুরা একদিকে আল্লাহর রহমত, সাহায্য এবং ঐতিহাসিক নানা ঘটনার সাক্ষ্য বহন করে আসছে।
২৬ জুন ২০২৬