বিশ্বকাপ ২০২৬: মুখ ঢাকলে লাল কার্ড, ৫ সেকেন্ডে গোল কিক

ইলিয়াস কমল
ইলিয়াস কমল

প্রকাশ : ১৬ মে ২০২৬, ০৯: ৪২
স্ট্রিম গ্রাফিক

দুয়ারে কড়া নাড়ছে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এবার বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে একই সঙ্গে তিনটি দেশে। ২০২৬ বিশ্বকাপে যেমন বদলে গেছে ফুটবলের কিছু নিয়মকানুন, তেমনি যোগ হয়েছে হাফ-টাইম শোর মতো বাড়তি বিনোদনও।

যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডা এবারের বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক। এই আয়োজনের মাধ্যমে ফুটবল বিশ্বকাপ এক বিশাল ক্যানভাসের দিকে এগোচ্ছে। যেই ক্যানভাস, বিশ্বকাপের পরিধি আরো বেশি মানুষের কাছে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই এগোচ্ছে তা স্পষ্ট। তিন দেশে টুর্নামেন্ট আয়োজন করায় কলেবর যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে অংশগ্রহণকারী দেশও।

প্রথমবারের মতো এবারের ফুটবল বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দল। ফলে এবার বাদ পড়া দেশ বা তারকার সংখ্যা তুলনামূলক খুব কম। অঞ্চলভিত্তিক বিভাজন বা কনফেডারেশন হিসেবে ইউরোপ থেকে অন্যান্য বার বিশ্বকাপে অংশ নিল ১৩টি দল। এবার সেখানে অংশ নিচ্ছে ১৬টি দল। এরপরও চারবারের বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ান ইটালি টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নিতে পারেনি, এটা ফুটবল ভক্তদের জন্য দুঃখজনক খবরই বলা চলে। আফ্রিকা মহাদেশ থেকেও অন্যবার ৫ দলের অংশগ্রহণের স্থানে এবার ৯ দল অংশ নিচ্ছে। আর তাই সেখান থেকেও আমরা দেখছি কেপ ভার্দের মতো দেশ প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দেখিয়েছে।

এশিয়া থেকেও এবার অংশ নিচ্ছে ৬ দলের স্থানে ৮ দল। আর তাই ইরাক এবং ইরানের মতো প্রতিবেশী দুটি দেশকে একই বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো দেখা যাচ্ছে। যেখানে ইরাক বিশ্বকাপ খেলছে ৪০ বছর পর। একই সঙ্গে এশিয়া থেকেই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে দেখব উজবেকিস্তান এবং ওমানকে। দুই দেশের মধ্যে উজবেকদের সঙ্গে ইউরোপীয়ানদের সম্পর্ক তুলনামূলক কাছাকাছিই বলা যায়। যদিও তারা এতদিন বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করতে পারেনি।

লাতিন আমেরিকা বা দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার বাইরে বাকি দুই থেকে তিন দল সর্বোচ্চ অংশ গ্রহণ করে আসছে অন্যান্য বিশ্বকাপে। এবার সেখানে বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে ছয়টি দল। আর তাই ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ের বাইরে একটি দল যেখানে বিশ্বকাপে অংশ নেয়, এবার সেখানে কপাল খুলেছে ইকুয়েডর, প্যারাগুয়ে ও কলম্বিয়ার। তিন দেশই আগেও বহুবার বিশ্বকাপ খেলেছে, তবে ল্যাটিন দেশ হিসেবে সবচেয়ে কম ফুটবলের সবচেয়ে বড়ো আসরে অংশ নেয়া দেশ হিসেবে এসে জায়গা করে নিয়েছে ইকুয়েডর।

অস্ট্রেলিয়া এশিয়া মহাদেশ থেকে অংশগ্রহণ করায় ওশেনিয়া অঞ্চল থেকে নিউজিল্যান্ডও এসেছে এবারের টুর্নামেন্টে। তবে উত্তর আমেরিকা মহাদেশ থেকে প্রথমবারের মতো জায়গা করে নিয়েছে কুরাসাও এর মতো ছোট্ট দ্বীপ দেশ। যা একই সাথে অবাক করার মতো হলেও আনন্দের ও ফুটবলীয় বৈচিত্রেরই গল্প।

অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বাড়ায় এবার টুর্নামেন্টে বেড়েছে ম্যাচের সংখ্যাও। ৩২ দল অংশগ্রহণ করা টুর্নামেন্টে ম্যাচ আয়োজন হতো ৬৪টি। এবার সেখানে ম্যাচ হবে ১০৪টি। একই সঙ্গে টুর্নামেন্টের স্থায়িত্ব বা সময়ের হিসেবে দৈর্ঘ্য বেড়েছে, হয়েছে ৩৯ দিন। এত দীর্ঘ, এত বেশি ম্যাচের বিশ্বকাপ আগে কখনো হয়নি।

ম্যাচ চলাকালীন খেলার গতি যেন না কমে, সেই লক্ষ্যে থ্রো-ইন বা গোল কিকের জন্য ৫ সেকেন্ড সময় নির্ধারণ করা হয়েছ। এই সময়ের মধ্যে বল খেলায় না ফেরালে থ্রো-ইনের ক্ষেত্রে পজেশন বিপক্ষ দলকে দেওয়া হবে এবং গোল কিকের ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে কর্নার কিক দেওয়া হবে।

বিশ্বকাপ উপলক্ষে নতুন নিয়ম

প্রতিটি বিশ্বকাপেই কিছু না কিছু নতুন নিয়মের সাথে পরিচিত হয় ফুটবল বিশ্ব। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আয়োজনে এই নিয়মগুলোর সাফল্য ব্যর্থতার ওপর নির্ভর করে পরবর্তীতে এগুলো ব্যবহার হয় ইউরোপ, এশিয়াসহ ফুটবলের বিভিন্ন ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক লিগে। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বেশ কিছু নতুন নিয়মের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত যে নিয়মটি হলো, প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের সঙ্গে মুখ ঢেকে কথা বললে লাল কার্ড দেখাতে পারবে রেফারি।

এই নিয়মের পেছনেও কিছু ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। আর সেটা হলো, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইউয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে রিয়াল মাদ্রিদ বনাম বেনফিকার ম্যাচে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে বর্ণবাদী মন্তব্য করেছিলেন আর্জেন্টাইন খেলোয়াড় জিয়ানলুকা প্রেস্টিয়ান্নি। ওই সময় মুখ ঢেকে কথা বলায় লিপ রিডার সেই কথা উদ্ধার করতে পারেনি। কিন্তু ভিনিরসহ খেলোয়াড় কিলিয়ান এমবাপ্পের সাক্ষ্যতে প্রেস্টিয়ান্নির কড়া শাস্তি হয়েছিল। ওই ঘটনার পরই ফিফা সতর্ক হয়। খেলোয়াড়দের মুখ ঢেকে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে কথা বললে লাল কার্ড পর্যন্ত দেওয়ার নিয়ম জারি করে। তবে আসন্ন বিশ্বকাপের আগে এই নিয়ম কোথাও কার্যকর হয়নি। এখান থেকেই এই নিয়ম কার্যকর শুরু হতে যাচ্ছে। তবে আশা করা হচ্ছে ভবিষ্যতেও ইউসিএল বা ইউরোপিয়ান ঘরোয়া টুর্নামেন্টেও এই নিয়ম কার্যকর থাকবে।

ম্যাচ চলাকালীন খেলার গতি যেন না কমে, সেই লক্ষ্যে থ্রো-ইন বা গোল কিকের জন্য ৫ সেকেন্ড সময় নির্ধারণ করা হয়েছ। এই সময়ের মধ্যে বল খেলায় না ফেরালে থ্রো-ইনের ক্ষেত্রে পজেশন বিপক্ষ দলকে দেওয়া হবে এবং গোল কিকের ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে কর্নার কিক দেওয়া হবে।

খেলোয়াড় বদলি হলে মাঠ ছাড়ার জন্য খেলোয়াড়কে ১০ সেকেন্ড সময় নির্ধারণ করারও আইন করেছে ফিফা। ১০ সেকেন্ডের মধ্যে বদলি করা খেলোয়াড় মাঠ না ছাড়লে যে খেলোয়াড় মাঠে নামবেন, তাকে এক মিনিট সাইডলাইনে অপেক্ষা করতে হবে, ফলে ঐ সময় দলটি ১০ জন নিয়ে খেলবে।

কল্পনা করুনতো ব্রাজিল আর্জেন্টিনা হাই ভোল্টেজ ম্যাচ চলছে, বক্সের ঠিক সামনে ট্যাকলের সময় কোনও প্লেয়ার পড়ে গেলেন। আর রেফারি ফ্রি কিক দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে পুরো দলের খেলোয়াড়েরা ঘিরে ধরলেন রেফারিকে। এমন ঘটনা আর ফুটবলে ঘটার সুযোগ নেই। এমন পরিস্থিতি এড়াতে রেফারির কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে দলের অধিনায়ক কথা বলতে পারবেন। অন্য কোনো খেলোয়াড় রেফারির কাছে গিয়ে প্রতিবাদ করলে বা তাকে ঘিরে ধরলে সঙ্গে সঙ্গে হলুদ কার্ড দেওয়া হবে।

সাম্প্রতিক সময়ের ফুটবলে আরেকটি বড়ো ঘটনা ঘটেছে আফ্রিকান কাপ অব নেশন্সের ফাইনালে। মরক্কোয় হওয়া এই টুর্নামেন্টের ফাইনালে রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে মাঠ ছেড়ে ড্রেসিংরুমে চলে গিয়েছিলেন সেনেগালের খেলোয়াড়েরা। এ সময় পনেরো মিনিটের মতো ফাইনাল বন্ধ ছিলো। বেশ কিছুক্ষণ পর, সেনেগাল দল আবারও মাঠে ফিরলে খেলা শুরু হয়। এবং শেষ পর্যন্ত ওই ম্যাচ সেনেগাল ১-০ গোলে জিতে। কিন্তু ঘটনা এখানেই শেষ নয়। সেনেগালের ট্রফি নিয়ে সেলিব্রেশন শেষ হলেও ফাইনালের ঘটনা গড়ায় ক্রীড়া আদালত পর্যন্ত। আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন সেনেগালের শিরোপা কেড়ে নিয়ে মরক্কোকে বিজয়ী ঘোষণা করে। এর বিপক্ষে কোর্ট অব আরবিট্রেশন ফর স্পোর্টসে ইতিমধ্যে আপিল করেছে সেনেগাল ফুটবল ফেডারেশন। এখনও চূড়ান্ত রায় না আসলেও এ বিষয়ে আগেই সতর্কতা অবলম্বন করেছে ফিফা। আর তাই এই বিশ্বকাপে রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কোনো খেলোয়াড় বা দল যদি মাঠ ছেড়ে চলে যায়, তবে সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড় বা কর্মকর্তাদের লাল কার্ড দেখানো হবে।

প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ম্যাচ চলাকালে হাফ-টাইম শোর প্রবর্তন করেছে ফিফা। আমেরিকার হয়ে এনএফএল সুপারবোলের মতো এই বিশ্বকাপের ফাইনালে একটি বড় আকারের হাফ-টাইম মিউজিক্যাল শো অনুষ্ঠিত হবে।

এবারের আয়োজক তিন দেশের জন্য তিনটি মাসকট নির্ধারণ করা হয়েছে। মাসকট তিনটির পৃথক নাম ম্যাপল (কানাডা), জায়ু (মেক্সিকো) এবং ক্লাচ (যুক্তরাষ্ট্র)। এ ছাড়া তিন দেশের কথা বিবেচনা করে অফিশিয়াল বলের নামও রাখা হয়েছে ট্রিওন্ডা।

এছাড়া ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে স্বচ্ছতা বাড়াতে রেফারিরা এবার মাঠে বডি ক্যামেরা বা হেড-মাউন্টেড ক্যামেরা ব্যবহার করতে পারবেন। এর আগে কোনো বিশ্বকাপে রেফারিরা বডি ক্যামেরা ব্যবহার করেননি। সে ক্ষেত্রে এবারই প্রথম এই প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হবে। এছাড়াও কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজের পেনালটি কিক নেয়া খেলোয়াড়কে বিভ্রান্ত করার কৌশল প্রতিহত করতেও কড়াকড়ি করেছে ফিফা। গোলরক্ষকরা চাইলেও আর পেনাল্টি শুট নিতে আসা খেলোয়াড়কে কোনোভাবে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করতে পারবে না। সবকিছু মিলে নানা আয়োজনে আমরা আরেকটা নতুন বিশ্বকাপই দেখতে পারবো আশা করি। যদিও বাংলাদেশের দর্শকদের ফুটবল বিশ্বকাপ দেখার সুযোগ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি ভক্তরা।

সম্পর্কিত