আতাউর রহমান রাইহান

রাজধানীর বনশ্রীর একটি দোকানে গত ১৯ মার্চ মেয়ের জন্য খেলনা গাড়ি কিনতে দোকানিকে ৫০০ টাকার নোট দেন সালেহা বেগম। খেলনার দাম ৩৫৫ টাকা। তবে দোকানি ক্যাশ ড্রয়ার তন্ন তন্ন করে খুঁজেও পেলেন ফেরত দেওয়ার খুচরা টাকা। শেষপর্যন্ত পাশের দোকানে গিয়ে টাকা ভাঙিয়ে আনতে হয় সালেহাকে।
খুচরা টাকা নেই কেন—জানতে চাইলে দোকানি দুঃখ করে বলেন, এক দিন আগেই কয়েক হাজার টাকার ১০ ও ২০ টাকার খুচরা নোট কিনেছেন। এজন্য হাজারে বাড়তি গুণতে হয়েছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। পণ্য বিক্রি করতে করতে সেগুলোও শেষ হয়ে গেছে।
দেশে কম মূল্যমানের, বিশেষ করে ১০, ২০ ও ৫০ টাকার নোটের এই ঘাটতি চলছে কয়েক মাস ধরেই। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, ১০, ২০ টাকার নোটের বেশিরভাগই ছেঁড়া, সেটিও মিলছে না। এতে দৈনন্দিন জীবনে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বিশেষ করে ব্যবসায়ীরা পড়েছেন মহাবিপদে। পণ্য বিক্রির পর বাকি অর্থ ফেরত দিতে গলদঘর্ম হচ্ছেন। অনেকে বাড়তি অর্থ দিয়ে খুচরা টাকা কিনেও সামলাতে পারছেন না।
বেসরকারি চাকরিজীবী ইফতেখার আহমেদ স্ট্রিম বলেন, তিনি মিরপুর-১ নম্বর থেকে মতিঝিলের অফিসে যাতায়াত করেন বাসে। ভাড়া পরিশোধে ১০০ বা ৫০ টাকার নোট দিলে বেশিরভাগ সময় বাসের কন্ডাক্টর তাকে পুরোনো ও ছেঁড়া নোট ফেরত দেন।
কামরুল হোসেন নামে আরেকজন বলেন, তিনি গাবতলী থেকে ইস্কাটনের অফিসে যান লোকাল বাসে। ১৫ টাকা ভাড়া নিতে কনডাক্টরকে ২০ বা ৫০ টাকার নোট দেন। কিন্তু কনডাক্টরের কাছে ৫ টাকার নোট বা কয়েনের ঘাটতি থাকায় প্রায়ই ভাড়া বেশি দিতে হয়।
শফিউল আলম নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, সম্প্রতি কেনাকাটার পর তাঁকে প্রায় অব্যবহারযোগ্য দুটি ২০ টাকার নোট দেওয়া হয়। পরে দোকানদার আশ্বস্ত করেন, অন্য কেউ না নিলে তিনি বদলে দেবেন।
এ নিয়ে বেসরকারি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি খুবই জরুরি। সরকারের উচিত দ্রুত এই সংকট নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া।
এদিকে, বাজারে খুচরা টাকার সংকট থাকলেও রাজধানীর ফুটপাতে অস্থায়ী টাকার দোকানগুলোতে চলছে রমরমা ব্যবসা। সেখানে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে নতুন টাকা। কোনো নোটের অভাবও নেই। শুধু ১০, ২০, ৫০, ১০০ টাকার নোটে ১ হাজার টাকার জন্য বাড়তি গুনতে হবে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিযুক্ত নোটের বদলে নতুন নকশার নোট ইস্যুর সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন নোট বাজারে ছাড়তে সাধারণত ১৫ থেকে ১৮ মাস পর্যন্ত সময় লাগে। মধ্যবর্তী এই সময় পুরোনো নোট না ছাড়ায় বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি নোটের ডিজাইন ঠিক করতেই কয়েকটি বৈঠক করা লাগে। এরপর ছাপার জন্য প্লেট তৈরি, নিলাম প্রক্রিয়ায় কাগজ-কালি আমদানি, জলছাপ ও নিরাপত্তা ফিচার নির্ধারণেও অনেক সময় যায়। এসব প্রক্রিয়া শেষে টাকা ছাপিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে দেওয়া হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্ট্রিমকে বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের পর হঠাৎ করে ১০ টাকার নোট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, আগেরগুলো আর চলবে না। পরে অবশ্য কিছুটা শিথিল করা হয়। ফলে সংকট অতটা দৃশ্যমান হয়নি। কিন্তু সরবরাহ সীমিতই থাকে। এখনও কিছু টাকা ভল্টে রয়ে গেছে।’
ওই সময়ে টাকা ছাপানো বন্ধ ছিল কিনা—প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আপনি যখনই বললেন যে, এই ডিজাইন আর হবে না, তখন পুরোনো প্লেট আর ব্যবহার করা যাবে না। নতুন করে ডিজাইন, কাগজ, সিকিউরিটি থ্রেড, কালি—সবকিছু দিয়ে আবার টাকা তৈরি করতে হবে। মানে একেবারে শুরু থেকে শুরু করা।’
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এটা এমন না যে বললেই কালকে নতুন ডিজাইনের নোট ছাপানো যাবে। পুরো প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। প্রতিটি নোটের ডিজাইন অনুযায়ী জলছাপ কোথায় থাকবে, সিকিউরিটি থ্রেড কোথায় থাকবে—এগুলো আলাদা আলাদা কার্যক্রম।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক কর্মকর্তা বলেন, টাকার একটা প্রবাহ থামিয়ে যদি আবার চালু করা হয়, তখন আগের গতি ধরে রাখা যায় না। নতুন নোট ছাপিয়ে বাজারে আনতে গেলে সময়ের যে ব্যবধান তৈরি হয়, সেটা দ্রুত ঠিক করা যায় না।
বাজারে টাকার সংকট নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘আমরা নিয়মিত টাকা ছাপাচ্ছি এবং সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের কাছে সরবরাহ করছি। ব্যাংকে নোটের ঘাটতি থাকলে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আসবে, আমরা নতুন নোট সরবরাহ করব।’
শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিসম্বলিত ছাপানো টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকে পড়ে আছে কিনা—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘একেবারে ভল্ট খালি করে বাজারে নোট ছাড়ার কোনো কারণ নেই। পৃথিবীর কোনো ব্যাংকই তা করে না। কিছু আনইউজড নোট সবসময় ব্যাংকে থাকে। নতুন নোট ছাপা হয়ে এলে তা ভল্টে যায়, আবার সেখান থেকে বাজারে যায়—এটা একটি চলমান প্রক্রিয়া।’
এর আগেও সংকট তৈরি হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গত বছরেও টাকার সংকট হয়েছিল। তখন আমরা যেভাবেই হোক বাজারে টাকা সরবরাহ করেছি। তখন মারাত্মক সংকট ছিল, ভল্টের টাকাও ব্যবহার করা হয়েছে।’
নতুন নোট বাজারে আসতে দেড় বছর সময় লাগে জানিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে ৯ ধরনের নোটের কাজ শুরু করেছি। তাই স্বাভাবিকভাবেই বাজারে কিছুটা ঘাটতি দেখা দেবে।’
রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনের ফুটপাত, গুলিস্তান, নিউমার্কেটসহ রাজধানীর বেশকিছু স্থানে নতুন নোট ও ছেঁড়া টাকার বেচাকেনার অস্থায়ী দোকান রয়েছে। ফুটপাতের এই দোকানগুলো মূলত জমে ওঠে ঈদের সময়। ঈদে সালামি দিতে অনেকেই এখান থেকে নতুন নোট কেনেন।
বাজারে খুচরা টাকার তীব্র সংকটে এই দোকানগুলোর পোয়াবারো। ব্যাংকের শাখায় খুচরা নোট না পেয়ে অনেকেই ছুটছেন এই খোলা বাজারে। ঈদের সঙ্গে নতুন চাহিদার সুযোগে দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন এসব দোকানিরা। ১০ ও ২০ টাকার এক বান্ডিলে (হাজার টাকা হিসাবে ১০০ ও ৫০টি নোট) বাড়তি নিচ্ছেন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত। নোটের কোনো সংকটও দেখা যায়নি এসব দোকানে।
গত ১৬ ও ১৭ মার্চ গুলিস্তান ও নিউমার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, টাকা বিক্রির স্টলগুলোতে মানুষের উপচেপড়া ভিড়। অতিরিক্ত দামের কারণে কেউ কেউ ফিরে গেলেও অনেকে বাধ্য হয়ে বেশি অর্থ দিয়ে নোট কিনছেন।
গুলিস্তানের কয়েকজন বিক্রেতা জানান, বর্তমানে ১০ টাকার নোটের এক হাজারের বান্ডিল (১০০ নোট) বিক্রি হচ্ছে ১৩’শ টাকায়। ২০ টাকার নোটের বান্ডিলে ২৫০, পুরোনো ৫০ টাকার নোটে ২০০ ও নতুনে ২৫০ টাকা বেশি নিচ্ছেন তারা। আর ১০০ টাকার ১০টি নোট বিক্রি করছেন ১১’শ টাকায়। ক্রেতা বেশি থাকলে এই দামও বেড়ে যায়।
পুরান ঢাকার চানখারপুর থেকে আসা শফিকুর রহমান নামের এক যুবক বলেন, ‘ব্যাংকে গিয়ে নতুন টাকা পাইনি। তাই ফুটপাত থেকে কিনতে এসেছি। এখানে চড়া দাম। কিন্তু বাধ্য হয়েই কিনতে হচ্ছে।’
নিউমার্কেটে আসা আব্দুর রহিম বলেন, ‘গতকালও এখানে এসেছিলাম নতুন টাকা কিনতে। আজ আবারও আসতে হয়েছে। সময় সময় টাকার দাম বাড়ে কমে। আজ দাম একটু বেশি।’
অভিযোগ উঠেছে, বাজারে নতুন টাকা না থাকলেও এসব দোকানে টাকা আসে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজন মতো বাজারে নতুন টাকা না ছাড়লেও প্রতিষ্ঠানটিরই কিছু কর্মকর্তা অস্থায়ী দোকানগুলোতে নতুন নোট সরবরাহ করছেন।
প্রতি বছর ঈদের সময় বাংলাদেশ ব্যাংক ভালো অঙ্কের নতুন নোট সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে সরবরাহ করে। তবে গত ৮ মার্চ কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, এবারের ঈদে নতুন নোট বিনিময়ের কোনো বিশেষ ব্যবস্থা থাকছে না। নতুন ডিজাইনের নোট তৈরির কাজ চলায় সরবরাহ সীমিত রাখা হয়েছে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের জন্য ঠিকই নতুন নোটের ব্যবস্থা করা হয়। অভ্যন্তরীণ এক আদেশে বলা হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক, পরিচালক, অতিরিক্ত পরিচালক ও যুগ্ম পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তারা প্রত্যেকে ১ লাখ ৮৩ হাজার টাকার সমপরিমাণ নতুন নোট নিতে পারবেন। পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও কর্মচারীরা পাবেন ৬৮ হাজার টাকা পর্যন্ত নতুন নোট।
এ বিষয়ে বেসরকারি ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তার অভিযোগ, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা–কর্মচারী বেতন–ভাতার চেয়ে বেশি নতুন নোট নিয়ে তা ফুটপাতে বিক্রি করে দেন। এটি একটি চক্র।

রাজধানীর বনশ্রীর একটি দোকানে গত ১৯ মার্চ মেয়ের জন্য খেলনা গাড়ি কিনতে দোকানিকে ৫০০ টাকার নোট দেন সালেহা বেগম। খেলনার দাম ৩৫৫ টাকা। তবে দোকানি ক্যাশ ড্রয়ার তন্ন তন্ন করে খুঁজেও পেলেন ফেরত দেওয়ার খুচরা টাকা। শেষপর্যন্ত পাশের দোকানে গিয়ে টাকা ভাঙিয়ে আনতে হয় সালেহাকে।
খুচরা টাকা নেই কেন—জানতে চাইলে দোকানি দুঃখ করে বলেন, এক দিন আগেই কয়েক হাজার টাকার ১০ ও ২০ টাকার খুচরা নোট কিনেছেন। এজন্য হাজারে বাড়তি গুণতে হয়েছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। পণ্য বিক্রি করতে করতে সেগুলোও শেষ হয়ে গেছে।
দেশে কম মূল্যমানের, বিশেষ করে ১০, ২০ ও ৫০ টাকার নোটের এই ঘাটতি চলছে কয়েক মাস ধরেই। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, ১০, ২০ টাকার নোটের বেশিরভাগই ছেঁড়া, সেটিও মিলছে না। এতে দৈনন্দিন জীবনে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বিশেষ করে ব্যবসায়ীরা পড়েছেন মহাবিপদে। পণ্য বিক্রির পর বাকি অর্থ ফেরত দিতে গলদঘর্ম হচ্ছেন। অনেকে বাড়তি অর্থ দিয়ে খুচরা টাকা কিনেও সামলাতে পারছেন না।
বেসরকারি চাকরিজীবী ইফতেখার আহমেদ স্ট্রিম বলেন, তিনি মিরপুর-১ নম্বর থেকে মতিঝিলের অফিসে যাতায়াত করেন বাসে। ভাড়া পরিশোধে ১০০ বা ৫০ টাকার নোট দিলে বেশিরভাগ সময় বাসের কন্ডাক্টর তাকে পুরোনো ও ছেঁড়া নোট ফেরত দেন।
কামরুল হোসেন নামে আরেকজন বলেন, তিনি গাবতলী থেকে ইস্কাটনের অফিসে যান লোকাল বাসে। ১৫ টাকা ভাড়া নিতে কনডাক্টরকে ২০ বা ৫০ টাকার নোট দেন। কিন্তু কনডাক্টরের কাছে ৫ টাকার নোট বা কয়েনের ঘাটতি থাকায় প্রায়ই ভাড়া বেশি দিতে হয়।
শফিউল আলম নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, সম্প্রতি কেনাকাটার পর তাঁকে প্রায় অব্যবহারযোগ্য দুটি ২০ টাকার নোট দেওয়া হয়। পরে দোকানদার আশ্বস্ত করেন, অন্য কেউ না নিলে তিনি বদলে দেবেন।
এ নিয়ে বেসরকারি ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি খুবই জরুরি। সরকারের উচিত দ্রুত এই সংকট নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া।
এদিকে, বাজারে খুচরা টাকার সংকট থাকলেও রাজধানীর ফুটপাতে অস্থায়ী টাকার দোকানগুলোতে চলছে রমরমা ব্যবসা। সেখানে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে নতুন টাকা। কোনো নোটের অভাবও নেই। শুধু ১০, ২০, ৫০, ১০০ টাকার নোটে ১ হাজার টাকার জন্য বাড়তি গুনতে হবে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিযুক্ত নোটের বদলে নতুন নকশার নোট ইস্যুর সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন নোট বাজারে ছাড়তে সাধারণত ১৫ থেকে ১৮ মাস পর্যন্ত সময় লাগে। মধ্যবর্তী এই সময় পুরোনো নোট না ছাড়ায় বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি নোটের ডিজাইন ঠিক করতেই কয়েকটি বৈঠক করা লাগে। এরপর ছাপার জন্য প্লেট তৈরি, নিলাম প্রক্রিয়ায় কাগজ-কালি আমদানি, জলছাপ ও নিরাপত্তা ফিচার নির্ধারণেও অনেক সময় যায়। এসব প্রক্রিয়া শেষে টাকা ছাপিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে দেওয়া হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্ট্রিমকে বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের পর হঠাৎ করে ১০ টাকার নোট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, আগেরগুলো আর চলবে না। পরে অবশ্য কিছুটা শিথিল করা হয়। ফলে সংকট অতটা দৃশ্যমান হয়নি। কিন্তু সরবরাহ সীমিতই থাকে। এখনও কিছু টাকা ভল্টে রয়ে গেছে।’
ওই সময়ে টাকা ছাপানো বন্ধ ছিল কিনা—প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আপনি যখনই বললেন যে, এই ডিজাইন আর হবে না, তখন পুরোনো প্লেট আর ব্যবহার করা যাবে না। নতুন করে ডিজাইন, কাগজ, সিকিউরিটি থ্রেড, কালি—সবকিছু দিয়ে আবার টাকা তৈরি করতে হবে। মানে একেবারে শুরু থেকে শুরু করা।’
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এটা এমন না যে বললেই কালকে নতুন ডিজাইনের নোট ছাপানো যাবে। পুরো প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। প্রতিটি নোটের ডিজাইন অনুযায়ী জলছাপ কোথায় থাকবে, সিকিউরিটি থ্রেড কোথায় থাকবে—এগুলো আলাদা আলাদা কার্যক্রম।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক কর্মকর্তা বলেন, টাকার একটা প্রবাহ থামিয়ে যদি আবার চালু করা হয়, তখন আগের গতি ধরে রাখা যায় না। নতুন নোট ছাপিয়ে বাজারে আনতে গেলে সময়ের যে ব্যবধান তৈরি হয়, সেটা দ্রুত ঠিক করা যায় না।
বাজারে টাকার সংকট নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘আমরা নিয়মিত টাকা ছাপাচ্ছি এবং সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের কাছে সরবরাহ করছি। ব্যাংকে নোটের ঘাটতি থাকলে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আসবে, আমরা নতুন নোট সরবরাহ করব।’
শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিসম্বলিত ছাপানো টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকে পড়ে আছে কিনা—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘একেবারে ভল্ট খালি করে বাজারে নোট ছাড়ার কোনো কারণ নেই। পৃথিবীর কোনো ব্যাংকই তা করে না। কিছু আনইউজড নোট সবসময় ব্যাংকে থাকে। নতুন নোট ছাপা হয়ে এলে তা ভল্টে যায়, আবার সেখান থেকে বাজারে যায়—এটা একটি চলমান প্রক্রিয়া।’
এর আগেও সংকট তৈরি হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গত বছরেও টাকার সংকট হয়েছিল। তখন আমরা যেভাবেই হোক বাজারে টাকা সরবরাহ করেছি। তখন মারাত্মক সংকট ছিল, ভল্টের টাকাও ব্যবহার করা হয়েছে।’
নতুন নোট বাজারে আসতে দেড় বছর সময় লাগে জানিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে ৯ ধরনের নোটের কাজ শুরু করেছি। তাই স্বাভাবিকভাবেই বাজারে কিছুটা ঘাটতি দেখা দেবে।’
রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনের ফুটপাত, গুলিস্তান, নিউমার্কেটসহ রাজধানীর বেশকিছু স্থানে নতুন নোট ও ছেঁড়া টাকার বেচাকেনার অস্থায়ী দোকান রয়েছে। ফুটপাতের এই দোকানগুলো মূলত জমে ওঠে ঈদের সময়। ঈদে সালামি দিতে অনেকেই এখান থেকে নতুন নোট কেনেন।
বাজারে খুচরা টাকার তীব্র সংকটে এই দোকানগুলোর পোয়াবারো। ব্যাংকের শাখায় খুচরা নোট না পেয়ে অনেকেই ছুটছেন এই খোলা বাজারে। ঈদের সঙ্গে নতুন চাহিদার সুযোগে দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন এসব দোকানিরা। ১০ ও ২০ টাকার এক বান্ডিলে (হাজার টাকা হিসাবে ১০০ ও ৫০টি নোট) বাড়তি নিচ্ছেন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত। নোটের কোনো সংকটও দেখা যায়নি এসব দোকানে।
গত ১৬ ও ১৭ মার্চ গুলিস্তান ও নিউমার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, টাকা বিক্রির স্টলগুলোতে মানুষের উপচেপড়া ভিড়। অতিরিক্ত দামের কারণে কেউ কেউ ফিরে গেলেও অনেকে বাধ্য হয়ে বেশি অর্থ দিয়ে নোট কিনছেন।
গুলিস্তানের কয়েকজন বিক্রেতা জানান, বর্তমানে ১০ টাকার নোটের এক হাজারের বান্ডিল (১০০ নোট) বিক্রি হচ্ছে ১৩’শ টাকায়। ২০ টাকার নোটের বান্ডিলে ২৫০, পুরোনো ৫০ টাকার নোটে ২০০ ও নতুনে ২৫০ টাকা বেশি নিচ্ছেন তারা। আর ১০০ টাকার ১০টি নোট বিক্রি করছেন ১১’শ টাকায়। ক্রেতা বেশি থাকলে এই দামও বেড়ে যায়।
পুরান ঢাকার চানখারপুর থেকে আসা শফিকুর রহমান নামের এক যুবক বলেন, ‘ব্যাংকে গিয়ে নতুন টাকা পাইনি। তাই ফুটপাত থেকে কিনতে এসেছি। এখানে চড়া দাম। কিন্তু বাধ্য হয়েই কিনতে হচ্ছে।’
নিউমার্কেটে আসা আব্দুর রহিম বলেন, ‘গতকালও এখানে এসেছিলাম নতুন টাকা কিনতে। আজ আবারও আসতে হয়েছে। সময় সময় টাকার দাম বাড়ে কমে। আজ দাম একটু বেশি।’
অভিযোগ উঠেছে, বাজারে নতুন টাকা না থাকলেও এসব দোকানে টাকা আসে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজন মতো বাজারে নতুন টাকা না ছাড়লেও প্রতিষ্ঠানটিরই কিছু কর্মকর্তা অস্থায়ী দোকানগুলোতে নতুন নোট সরবরাহ করছেন।
প্রতি বছর ঈদের সময় বাংলাদেশ ব্যাংক ভালো অঙ্কের নতুন নোট সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে সরবরাহ করে। তবে গত ৮ মার্চ কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, এবারের ঈদে নতুন নোট বিনিময়ের কোনো বিশেষ ব্যবস্থা থাকছে না। নতুন ডিজাইনের নোট তৈরির কাজ চলায় সরবরাহ সীমিত রাখা হয়েছে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের জন্য ঠিকই নতুন নোটের ব্যবস্থা করা হয়। অভ্যন্তরীণ এক আদেশে বলা হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক, পরিচালক, অতিরিক্ত পরিচালক ও যুগ্ম পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তারা প্রত্যেকে ১ লাখ ৮৩ হাজার টাকার সমপরিমাণ নতুন নোট নিতে পারবেন। পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও কর্মচারীরা পাবেন ৬৮ হাজার টাকা পর্যন্ত নতুন নোট।
এ বিষয়ে বেসরকারি ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তার অভিযোগ, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা–কর্মচারী বেতন–ভাতার চেয়ে বেশি নতুন নোট নিয়ে তা ফুটপাতে বিক্রি করে দেন। এটি একটি চক্র।

ইরান যুদ্ধের জেরে বৈশ্বিক তেলবাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা এখন আর শুধু ১০০ ডলারের ঘরে সীমাবদ্ধ নেই। বুধবার (১৮ মার্চ) ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলের হামলা এবং কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল-গ্যাস স্থাপনায় ইরানের পাল্টা আঘাতের পর তেলের দাম ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে
৩ দিন আগে
ঈদকে সামনে রেখে দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ফের বেড়েছে। বিশেষ করে গরু-খাসির মাংস, ব্রয়লার ও সোনালি মুরগি, পোলাওয়ের চাল, মশলা, শুকনা ফল ও ফলমূলের বাজার বেশ চড়া। সবজির দাম কিছুটা কমে স্বস্তি দিলেও সামগ্রিকভাবে দৈনন্দিন খরচ কমার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।
৩ দিন আগে
দেশের আর্থিক খাতে ডিজিটাল লেনদেন আরও জোরদার করতে নিজস্ব মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস চালু করছে প্রাইম ব্যাংক পিএলসি। বিকাশ, রকেট বা নগদের মতো এই সেবাটি তারা পরিচালনা করবে।
৫ দিন আগে
বিএনপি সরকার দেশে নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল লেনদেন তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে চায়।
৬ দিন আগে