নতুন ঋণ নিয়ে আলোচনায় আসছে আইএমএফের প্রতিনিধি দল

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৬, ১৭: ৩৩
আইএমএফ ও বাংলাদেশ সরকারের লোগো। স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং নতুন অর্থায়ন প্যাকেজ নিয়ে আলোচনার জন্য আগামীকাল থেকে সরকারের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে সপ্তাহব্যাপী বৈঠকে বসছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি প্রতিনিধি দল।

বাংলাদেশে আইএমএফ মিশনপ্রধান আইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের দলটি আগামী ১৭ জুলাই পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থান করবে। এ সময় সরকারের সংস্কার কর্মসূচি ও নীতিগত অগ্রাধিকার নিয়ে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবেন তারা।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সফরের প্রথম দিন অর্থ বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা সম্ভাব্য দ্বিতীয় রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটি (আরএসএফ) কর্মসূচির নীতিগত পরিকল্পনা, প্রস্তুতি প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় উপাদান নিয়ে আইএমএফ প্রতিনিধি দলের সামনে উপস্থাপন করবেন।

একই সঙ্গে সম্ভাব্য দ্বিতীয় আরএসএফ কর্মসূচির প্রধান কাঠামো ও বিভিন্ন শর্ত নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হবে।

আইএমএফ প্রতিনিধি দল প্রথম আরএসএফ কর্মসূচির আওতায় নেওয়া সংস্কার পদক্ষেপ ও অর্জনের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে। বাংলাদেশ ক্লাইমেট ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপের কার্যক্রমও পর্যালোচনায় আসবে।

সূত্র বলছে, দ্বিতীয় আরএসএফের আওতায় সম্ভাব্য সংস্কার কর্মসূচির পরিধি এবং কৌশলগত অগ্রাধিকার কী হতে পারে, তা নিয়েও প্রাথমিক আলোচনা হবে।

বাজেট থেকে ভর্তুকি—আলোচনায় বিস্তৃত অর্থনৈতিক এজেন্ডা

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সফরের প্রথম দিনেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ও মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো নিয়ে আলোচনা করবে আইএমএফ প্রতিনিধি দল।

এর মধ্যে থাকবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ও মূলধনী ব্যয়, বড় বিনিয়োগ প্রকল্প এবং সেগুলোর বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ও অর্থায়নের উৎস।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি, রাজস্ব আহরণের পদক্ষেপ, ব্যয়সীমা এবং ভর্তুকি ও সামাজিক সুরক্ষাবিষয়ক নীতির মতো মধ্যমেয়াদি বাজেট অনুমানও আলোচনায় থাকবে।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ বাজেট বরাদ্দ নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করবে আইএমএফ।

সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা, নতুন নিয়োগের পরিকল্পনা, বেতন কাঠামো, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির সূত্র এবং বিভিন্ন ভাতার বিষয় আলোচনায় আসবে।

বিদ্যুৎ-জ্বালানির ভর্তুকি ক্যাপাসিটি চার্জ পর্যালোচনা

সপ্তাহব্যাপী অর্থনৈতিক মূল্যায়নের সময় বিদ্যুৎ, প্রাকৃতিক গ্যাস, জ্বালানি তেল, সার, খাদ্য এবং অন্যান্য খাতের ভর্তুকি নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করবে আইএমএফ।

বিদ্যুৎ খাতের ক্যাপাসিটি চার্জ, আমদানি ব্যয় ও অন্যান্য খরচও আলোচনায় থাকবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) মধ্যে আর্থিক লেনদেন এবং ভবিষ্যতে বিদ্যুতের দাম আরও সমন্বয়ের পরিকল্পনাও পর্যালোচনা করবে প্রতিনিধি দলটি।

ব্যাংক সংস্কারে অর্থায়ন নিয়েও আলোচনা

ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলায় অর্থায়ন হবে এবারের আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ব্যাংক রেজল্যুশনে অর্থায়ন, সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা হবে।

একই সঙ্গে সরকারের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ও কাঠামো, বৈদেশিক অর্থায়ন, ঋণের অর্থছাড়, পাইপলাইনে থাকা অর্থায়ন এবং ঋণ নবায়নের প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনা করবে আইএমএফ।

বাণিজ্যিক ঋণ ও অ-রেয়াতি ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনাও আলোচনায় আসবে।

কিছু সংস্কারে অগ্রগতি, রাজস্ব ব্যাংক খাতে ঘাটতি

আগের ঋণ কর্মসূচির আওতায় সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা কয়েকটি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি চিহ্নিত করেছেন।

এর মধ্যে রয়েছে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার কাঠামোয় উত্তরণ, মুদ্রানীতি পরিচালনার আধুনিকায়ন, ব্যাংক রেজল্যুশন ও আমানত সুরক্ষা আইন প্রণয়ন এবং ঝুঁকিভিত্তিক ব্যাংক তদারকি ব্যবস্থা।

আরএসএফের আওতায় জলবায়ু সংস্কার এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনেও অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।

তবে বেশ কয়েকটি সংস্কার ক্ষেত্রে আরও পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে চিহ্নিত করেছে অর্থ বিভাগ।

কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আহরণ কম রয়েছে। আয়কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তরও সম্পন্ন হয়নি। মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাটব্যবস্থা যৌক্তিকীকরণ এবং কর অব্যাহতি সংস্কারও অসম্পূর্ণ রয়েছে।

আর্থিক খাত সংস্কারের কৌশল এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ব্যাংক রেজল্যুশন ও পুনঃমূলধনীকরণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুশাসনের ক্ষেত্রেও আরও পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা।

অর্থনীতির সামনে ছয় বড় চ্যালেঞ্জ

সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জও চিহ্নিত করেছেন অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা।

এর মধ্যে রয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতির উচ্চ অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন, বৈদেশিক অর্থায়নের চাপ, দুর্বল অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ, ব্যাংক খাতের ঝুঁকি এবং বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতার সীমাবদ্ধতা।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে আইএমএফ প্রতিনিধি দলের সফর শেষে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে তাদের মূল্যায়ন ওয়াশিংটনে সংস্থাটির সদর দপ্তরে জমা দেওয়া হবে।

মূল্যায়ন ইতিবাচক হলে আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার পর নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক দর-কষাকষির জন্য আইএমএফের আরেকটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসতে পারে।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা নতুন ঋণ প্যাকেজের আওতায় ৪০০ কোটি থেকে ৪৫০ কোটি ডলার অর্থায়ন পাওয়ার আশা করছেন। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে এই অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন তারা।

এর আগে ৫৫০ কোটি ডলারের আইএমএফ ঋণ কর্মসূচি বাতিল করে নবনির্বাচিত সরকার। সরকারের মূল্যায়ন ছিল, আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে নির্ধারণ করা অনেক সংস্কার কর্মসূচি বর্তমান পরিস্থিতিতে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

এ অবস্থায় নতুন সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকার ও সংস্কার পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইএমএফের সঙ্গে নতুন অর্থায়ন কর্মসূচির আলোচনা শুরু হচ্ছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত