ইতিহাসে প্রথমবার প্রতি আউন্স সোনার দাম ৫ হাজার ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিনিয়োগকারীরা সোনার দিকে ঝুঁকছেন ।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, প্রতি আউন্স সোনার দাম ৫ হাজার ডলার বা ৩ হাজার ৬৫৯ পাউন্ড ছাড়িয়েছে। ২০২৫ সালে সোনার দাম ৬০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধির পর এই নতুন রেকর্ড তৈরি হলো। সোনার পাশাপাশি রুপার দামও প্রতি আউন্স ১০০ ডলার স্পর্শ করেছে।
মূল্যবান ধাতুর এই আকাশচুম্বী দামের পেছনে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর মধ্যকার উত্তেজনাকে দায়ী করছে বিশ্লেষকরা। পাশপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর বাণিজ্য নীতিও বড় ভূমিকা পালন করছে বলে দাবি করেছে বিবিসি।
ট্রাম্প সম্প্রতি হুমকি দিয়েছেন, কানাডা যদি চীনের সঙ্গে কোনো বাণিজ্য চুক্তি করে তবে তাদের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। এই ধরনের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। যখন বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়, তখন বিনিয়োগকারীরা বন্ড বা শেয়ারের চেয়ে সোনা ও রুপার মতো নিরাপদ সম্পদকে (সেফ হেভেন অ্যাসেট) বেছে নেন।
এবিসি রিফাইনারির প্রাতিষ্ঠানিক বাজারের বৈশ্বিক প্রধান নিকোলাস ফ্রাপেল বিবিসিকে বলেন, ‘যখন আপনি সোনা কেনেন, তখন এটি বন্ড বা শেয়ারের মতো অন্য কারো ঋণের সঙ্গে যুক্ত থাকে না। এই চরম অনিশ্চিত বিশ্বে এটি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি চমৎকার বৈচিত্র্যময় সম্পদ।’
ওয়েলথ ক্লাবের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ সুজানা স্ট্রিটার মনে করেন, চলমান রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে সোনার দাম বাড়ার কোনো সীমা নেই। বিশেষ করে ট্রাম্পের শুল্ক নীতি বিনিয়োগকারীদের গভীরভাবে বিচলিত করেছে।
সোনার দাম বাড়ার অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মার্কিন ডলারের দুর্বল অবস্থান এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ব্যাপক হারে সোনা ক্রয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ এ বছর আবারও সুদের হার কমাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সুদের হার কমলে সাধারণত বন্ডের মতো বিনিয়োগে মুনাফা কমে যায়, ফলে মানুষ সোনার দিকে বেশি আগ্রহী হয়। পেপারস্টোনের গবেষণা কৌশলবিদ আহমেদ আসিরি বলেন, সরকারি বন্ডে টাকা রাখার চেয়ে সোনার মজুত করা এখন অনেক বেশি লাভজনক মনে হচ্ছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুসারে, বিশ্বে এ পর্যন্ত মাত্র ২ লাখ ১৬ হাজার ২৬৫ টন সোনা উত্তোলন করা হয়েছে, যা দিয়ে ৩ থেকে ৪টি অলিম্পিক সাইজের সুইমিং পুল ভর্তি করা সম্ভব। মাটির নিচে আরও প্রায় ৬৪ হাজার টন সোনা মজুত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হলেও সরবরাহ ভবিষ্যতে কমে আসতে পারে।
বিনিয়োগের বাইরে সাংস্কৃতিক কারণেও সোনা ও রুপার চাহিদা বাড়ছে। ভারতে দীপাবলি ও বিয়ের মৌসুমে সোনা কেনাকে শুভ মনে করা হয়। মর্গান স্ট্যানলির মতে, ভারতীয় পরিবারগুলোতে প্রায় ৩ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের সোনা রয়েছে, যা দেশটির জিডিপির প্রায় ৮৮ দশমিক ৮ শতাংশ।
অন্যদিকে বিশ্বের বৃহত্তম স্বর্ণ ব্যবহারকারী দেশ চীনেও নববর্ষ বা 'ঘোড়ার বছর' উপলক্ষে বর্তমানে সোনার ব্যাপক চাহিদার সৃষ্টি হয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, বাজার বর্তমানে সংবাদের ওপর ভিত্তি করে ওঠানামা করছে, তাই যেকোনো ইতিবাচক খবর দামের পতন ঘটাতে পারে।