ঢাবির ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রত্যাখ্যান, তাহসিনের তোপে প্রশাসন

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২: ৩০
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী এ আর তাহসিন জাহান। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী এ আর তাহসিন জাহান। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মর্যাদাপূর্ণ ‘ডিনস অ্যাওয়ার্ড’ প্রত্যাখ্যান করেছেন এআর তাহসিন জাহান। রাজনৈতিক পরিচয় ও মতাদর্শের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন এবং ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি এই পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে তাহসিন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর তোপ দেগেছেন। তিনি লিখেছন, কারাগারে থাকা সবচেয়ে গুরুতর অপরাধীরও শিক্ষা গ্রহণের অধিকার রয়েছে। অথচ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসন নিজেদের শিক্ষার্থীদের সেই অধিকার রক্ষায় কোনো অর্থবহ পদক্ষেপ নেয়নি। বরং তোফাজ্জল, মাসুদ, শামীমসহ আরও অনেক নিরপরাধ মানুষের রক্তের দায় এই প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতেও রয়েছে।

প্রশ্ন রেখে তাহসিন বলেন, সরকার পতনের পর যদি সত্যিই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়ে থাকে, তাহলে এই হাজার হাজার শিক্ষার্থী এখনো কেন নিজেদের ক্লাসরুমে ফিরতে পারছে না? এখন অজুহাতটা কী?

সোমবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে এক অনুষ্ঠানে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ১৬ বিভাগের মোট ৪৮ শিক্ষার্থীকে ডিনস অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়। একই অনুষ্ঠানে সেরা গ্রন্থ ও নিবন্ধের জন্য দুজন শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়া হয়।

তাহসিন জাহান উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগে সিজিপিএ ৪ এর মধ্যে ৩.৯৫ পেয়ে স্নাতক পর্যায়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছেন। ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের এই শিক্ষার্থী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার ইন পাবলিক পলিসি (এমপিপি) প্রোগ্রামে অধ্যয়নরত।

ফেসবুকে তাহসিন জানান, চার বছরের স্নাতক জীবনের শুরু থেকেই তিনি এই অ্যাওয়ার্ডের জন্য অপেক্ষা করছিলেন এবং এটি অর্জনের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালে আন্দোলনের সময় কোনো সহিংসতায় জড়িত না থাকা সত্ত্বেও শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তিনি মব হামলার শিকার হয়েছেন। এমনকি নিজ বিভাগে তিনি হুমকির মুখে পড়েন এবং তাঁকে চূড়ান্ত ভাইভায় অংশ নিতে ও স্নাতক থিসিস জমা দিতে বাধা দেওয়া হয়।

তাহসিন লেখেন, যে পুরস্কারটি অর্জনের জন্য এতটা পরিশ্রম করেছি, সেটি প্রত্যাখ্যান করা আমার জন্য সহজ কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। কিন্তু কোনো পুরস্কারের মর্যাদা আমার কাছে একটি প্রতিষ্ঠানের নৈতিক দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে নয়।

তিনি বলেন, এই পুরস্কার গ্রহণ করার অর্থ হতো এমন একটি প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি উদযাপন করা, যে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসন নিজেদের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন এবং ভবিষ্যৎ শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয় ও মতাদর্শের কারণে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখেও তাদের প্রতি নিজেদের দায়িত্ব পালন করেনি।

তাহসিন জানান, কয়েকজন শিক্ষক তাঁর পড়াশোনা শেষ করতে সহায়তা করেন এবং ক্যাম্পাসের বাইরে থাকা অবস্থায় অনলাইনে চূড়ান্ত ভাইভায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেন। তবে তাঁরা ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের’ কেউ নন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তাহসিন জাহান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার ইন পাবলিক পলিসি (এমপিপি) প্রোগ্রামে অধ্যয়নরত। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
তাহসিন জাহান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার ইন পাবলিক পলিসি (এমপিপি) প্রোগ্রামে অধ্যয়নরত। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

ফেসবুকে তাহসিন লেখেন, আমার শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা সত্ত্বেও আমি ভাগ্যবান ছিলাম যে শেষ পর্যন্ত ঢাবিতে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করতে পেরেছি এবং হার্ভার্ডে এসে নিজেকে আবার গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার মতো ১০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী সেই সুযোগ পায়নি। প্রশাসন নীরব থেকেছে এবং মৌলবাদী মবকে নীরবে সমর্থন করেছে এবং এখনো করে যাচ্ছে।

তিনি লেখেন, যেসব শিক্ষক আমাকে এত দূর আসতে সাহায্য করেছেন, তাদের প্রতি আমার অপরিসীম শ্রদ্ধা। আমার অর্জনের পেছনে তাদের অবদান রয়েছে এবং সেই কৃতিত্ব তাদের প্রাপ্য। কিন্তু তাদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি– যে প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসন হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জীবন ও ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যেতে দেখেও তাদের পাশে দাঁড়ায়নি, সেই প্রতিষ্ঠানের পুরস্কার গ্রহণ করে আমি নিজের অর্জন উদযাপন করতে পারি না।

তাহসিন জাহান বলেন, এই সিদ্ধান্ত কোনো পুরস্কারকে ছোট করার জন্য নয়। বরং সেই সহপাঠীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য, যাদের অপরাধ শুধু তাদের রাজনৈতিক পরিচয়, অথচ তার মূল্য তারা দিয়েছেন নিজেদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ দিয়ে। ন্যায়বিচার যদি সবার জন্য না হয়, তবে সেটি ন্যায়বিচার নয়।

ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নাঈম সুলতানা বলেন, ২০২৪ সালে তাহসিন বিভাগে যোগাযোগ করে চূড়ান্ত ভাইভা দিতে ক্যাম্পাসে আসতে ভয়ের কথা জানিয়েছিলেন। বিষয়টি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডিকে জানানো হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী তাহসিনকে ক্যাম্পাসে আসতে বলা হয়। কিন্তু বিদেশে অবস্থান করায় পরে তাঁর ভাইভা অনলাইনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

তাহসিনের ওপর মব হামলার বিষয়ে অবগত নন জানিয়ে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের পর তাহসিন বিদেশে আছেন বলেই আমরা জানি। তবে তাঁর সঙ্গে সহপাঠীদের ঠিক কী হয়েছিল, তা আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত