আয়া সোফিয়া: গির্জা থেকে মসজিদ, তারপর জাদুঘর, আবার মসজিদ
তানভীর অপু আগেরবার ইস্তাম্বুলের আয়া সোফিয়ায় গিয়েছিলেন পর্যটক হিসেবে, তখন এটি ছিল জাদুঘর। এবার তৃতীয়বার সেখানে গেছেন মুসল্লি হিসেবে, মসজিদে নামাজ পড়তে। প্রায় দেড় হাজার বছরের ইতিহাসের এই স্থাপনার গির্জা, মসজিদ ও জাদুঘরে রূপান্তরের নানা অধ্যায়, বাইজেন্টাইন ও উসমানীয় ঐতিহ্যের মেলবন্ধন এবং প্রাচীন গম্বুজের নিচে নামাজ পড়ার অভিজ্ঞতা নিয়েই এই ভ্রমণকাহিনি।

বহুদিন পর আবারও আয়া সোফিয়ার সামনে দাঁড়ালাম। এটি আমার তৃতীয়বারের মতো এখানে আসা। ইস্তাম্বুলে এর আগে যখন এসেছিলাম, তখন ২০১৮ সাল। সেবারের পর কেটে গেছে বেশ কয়েকটি বছর। এর মধ্যে পৃথিবী বদলেছে, বদলেছি আমিও।
এবার আয়া সোফিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো আমি যেন নিজের অতীতের সঙ্গেও দেখা করতে এসেছি। আশ্চর্যের বিষয়, তিনবার এসেও জায়গাটিকে আমার কাছে কখনো একই রকম মনে হয়নি। প্রতিবারই যেন নতুন কোনো ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়েছি।
ইস্তাম্বুল শহরের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা আয়া সোফিয়া প্রায় দেড় হাজার বছরের ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। সময়ের সঙ্গে এর পরিচয় বদলেছে, শাসক বদলেছে, সাম্রাজ্য বদলেছে, ধর্মীয় ব্যবহার বদলেছে, স্থাপত্যে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন অধ্যায় কিন্তু ভবনটি আজও দাঁড়িয়ে আছে। কখনো গির্জা, কখনো মসজিদ, কখনো জাদুঘর একটি স্থাপনার ভেতর যেন ইতিহাসের বহু স্তর পাশাপাশি জমাট বেঁধে আছে।
-01bd56.jpeg)
২০১৮ সালে দেখছিলাম আয়া সোফিয়া ছিল জাদুঘর। এবার এসেছি একজন মুসল্লি হিসেবে, নামাজ পড়তে। একই ভবন, একই বিশাল গম্বুজ, একই দেয়াল। কিন্তু এবার দেখার চোখটা আলাদা। একসময় যেখানে খ্রিস্টানরা প্রার্থনা করেছেন, পরে মুসলমানরা নামাজ পড়েছেন, আবার দীর্ঘ সময় মানুষ জাদুঘর হিসেবে দেখতে এসেছে, সেই একই জায়গায় এবার আমিও নামাজ পড়ব।
২
আয়া সোফিয়ার ইতিহাস শুরু হয় আজকের ভবনেরও বহু আগে। কনস্টান্টিনোপলের এই স্থানে প্রথম দিকের একটি গির্জা নির্মিত হয়েছিল চতুর্থ শতাব্দীতে। সেটি বিদ্রোহ ও অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর আবার নতুন করে নির্মাণ করা হয়। দ্বিতীয় স্থাপনাটিও টিকে থাকতে পারেনি। ৫৩২ সালের নিফা বিদ্রোহের সময় সেটিও আগুনে ধ্বংস হয়।
এরপর সম্রাট জাস্টিনিয়ান প্রথম এমন একটি স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নেন, যা শুধু তার সময়ের জন্য নয়, পরবর্তী দেড় হাজার বছরের স্থাপত্য ইতিহাসের জন্যও হয়ে উঠবে বিস্ময়ের বিষয়।
-b4ac64.jpeg)
৫৩২ থেকে ৫৩৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত তৃতীয় আয়া সোফিয়াই মূলত আজকের পরিচিত ভবনটির ভিত্তি। সেই সময়ের প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও স্থাপত্যের সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনা করলে এমন একটি বিশাল গম্বুজবিশিষ্ট ভবন নির্মাণ সত্যিই অবিশ্বাস্য। বিশাল কেন্দ্রীয় গম্বুজ, উঁচু ছাদ, মার্বেলের দেয়াল, মোজাইক এবং অসাধারণ অভ্যন্তরীণ বিন্যাস মিলিয়ে আয়া সোফিয়া নির্মাণের সময়ই যেন মানুষকে চমকে দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিল।
বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সময় প্রায় নয় শতাব্দী ধরে আয়া সোফিয়া ছিল পূর্ব খ্রিস্টীয় বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র। সম্রাটদের নানা অনুষ্ঠান ও ধর্মীয় আয়োজনের সঙ্গে এর সম্পর্ক ছিল। ১২০৪ সালে চতুর্থ ক্রুসেডের সময় কনস্টান্টিনোপল দখল হলে আয়া সোফিয়াও রোমান ক্যাথলিকদের নিয়ন্ত্রণে যায়। ১২৬১ সালে বাইজেন্টাইনরা শহর পুনরুদ্ধার করলে এটি আবার পূর্ব অর্থোডক্স গির্জায় ফিরে আসে। অর্থাৎ একই ভবনের দেয়াল বহু শতাব্দী ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে।
এরপর ১৪৫৩ সালে সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ (মুহাম্মদ ফাতেহ নামে পরিচিত) ২৯ মে কনস্টান্টিনোপল জয় করেন। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতন হয়, শুরু হয় উসমানীয় শাসন। আয়া সোফিয়াও মসজিদে রূপান্তরিত হয়।
-dd73cb.jpeg)
বিজয়ের কয়েক দিনের মধ্যেই এখানে মুসলমানদের নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা করা হয় এবং পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে এটি উসমানীয় রাজধানীর অন্যতম প্রধান মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মসজিদে রূপান্তরের পর আয়া সোফিয়ার স্থাপত্যেও ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসে। ক্রুশের পরিবর্তে অর্ধচন্দ্র স্থাপন করা হয়, মেহরাব ও মিম্বার যুক্ত হয়, ক্যালিগ্রাফির বিশাল ফলক স্থাপন করা হয় এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মিনার নির্মিত হয়। উসমানীয় স্থাপত্যের বিভিন্ন উপাদান ধীরে ধীরে বাইজেন্টাইন স্থাপত্যের সঙ্গে মিশে যায়। ফলে আয়া সোফিয়া হয়ে ওঠে এমন এক স্থাপত্য, যেখানে দুটি বিশাল সভ্যতার শিল্প ও স্থাপত্যের ছাপ পাশাপাশি দেখা যায়।
উসমানীয় আমলে আয়া সোফিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজনগুলোর মধ্যে মিনারগুলো অন্যতম। বিভিন্ন সময়ে নির্মিত চারটি মিনার ভবনটির বাইরের অবয়বকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দেয়। বিখ্যাত উসমানীয় স্থপতি মিমার সিনানও আয়া সোফিয়ার কাঠামোগত নিরাপত্তা ও সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। গম্বুজের ওপর প্রচণ্ড চাপ, ভবনের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিবেচনায় তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
৩
আয়া সোফিয়ার ভেতরে ঢুকলে প্রথমেই চোখে পড়ে বিশাল গম্বুজ। তার নিচে দাঁড়ালে নিজের অস্তিত্বটাকেই যেন খুব ছোট মনে হয়। এখানে ইসলামী ক্যালিগ্রাফির পাশাপাশি খ্রিস্টীয় যুগের মোজাইক ও শিল্পকর্মও রয়েছে। একদিকে আল্লাহর নাম, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদিনের নামসংবলিত বিশাল ক্যালিগ্রাফি, অন্যদিকে বহু শতাব্দী পুরোনো খ্রিস্টীয় মোজাইকের উপস্থিতি দুটি ভিন্ন ঐতিহ্য যেন একই ছাদের নিচে ইতিহাসের ভাষায় কথা বলছে।
-8c37f5.jpeg)
এবার এসে একটি পরিবর্তন বিশেষভাবে আমার চোখে পড়ল। ভেতরে খ্রিস্টীয় যুগের কিছু প্রতিকৃতি ও মোজাইক আগের মতো খোলা অবস্থায় নেই, বিশেষ করে যিশু খ্রিস্টের প্রতিকৃতির অংশটি আবৃত অবস্থায় দেখলাম। বিষয়টি দেখে আমার মনে হলো, আয়া সোফিয়ার বর্তমান ধর্মীয় ব্যবহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এর ভেতরের কিছু অংশে নতুনভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
১৯৩০ এর দশকে আয়া সোফিয়ার ইতিহাস আবার বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়। তুরস্ক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘদিন মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত এই স্থাপনাটি ১৯৩৫ সালে জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়। এরপর প্রায় ৮৫ বছর এটি জাদুঘর হিসেবেই পরিচিত ছিল। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে আসত ইতিহাস, স্থাপত্য, মোজাইক এবং বাইজেন্টাইন ও উসমানীয় ঐতিহ্যের এই অসাধারণ সংমিশ্রণ দেখতে।
আমি যখন ২০১৮ সালে এখানে এসেছিলাম, তখন আয়া সোফিয়াকে জাদুঘর হিসেবেই দেখেছিলাম। পর্যটকদের ভিড় ছিল, মানুষ ছবি তুলছিল, কেউ স্থাপত্য দেখছিল, কেউ ইতিহাসের নানা স্তর বোঝার চেষ্টা করছিল। সেই সময়ের স্মৃতি আমার এখনো মনে আছে। তাই এবার ফিরে এসে একই জায়গায় নামাজ পড়ার অনুভূতিটা আমার কাছে আরও গভীর হয়ে উঠেছে।

২০২০ সালে আয়া সোফিয়ার ইতিহাসে আবার বড় পরিবর্তন আসে। তুরস্কের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালতের রায়ের পর পুনরায় মসজিদ হিসেবে ব্যবহারের পথ খুলে যায়। ২০২০ সালের ২৪ জুলাই এখানে আবার জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে প্রায় ৮৫ বছর পর আয়া সোফিয়া আবার মুসলমানদের ইবাদতের স্থানে পরিণত হয়।
৪
এই পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে। কারও কাছে এটি ঐতিহাসিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, কারও কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধর্মীয় চরিত্র পরিবর্তন। কিন্তু একজন ভ্রমণকারী হিসেবে আমার কাছে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, একই ভবনের ভেতরে দাঁড়িয়ে আমি এর এতগুলো অধ্যায়ের চিহ্ন পাশাপাশি দেখতে পাচ্ছি।
সবচেয়ে ভালো লেগেছে এবার এখানে এসে নামাজ পড়তে পারা। কত সম্রাট, কত সৈন্য, কত ধর্মীয় নেতা, কত সাধারণ মানুষ, কত পর্যটক কত প্রজন্মের পদচিহ্ন এই মেঝের ওপর পড়েছে! কত শতাব্দী ধরে মানুষের প্রার্থনা, কান্না, আনন্দ, বিজয় আর পরাজয়ের গল্প এই ভবন নীরবে শুনে এসেছে!
-9e9c87.jpeg)
আয়া সোফিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে আমার কাছে সময়ের হিসাবটা হঠাৎ খুব অদ্ভুত মনে হয়। আমরা মানুষ হয়তো কয়েক দশক বাঁচি। অথচ সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভবনের ইতিহাস শুরু হয়েছিল আমাদের বহু প্রজন্ম আগে। সাম্রাজ্য এসেছে, সাম্রাজ্য চলে গেছে। শাসক বদলেছে, এর ব্যবহার বদলেছে। কিন্তু ভবনটি রয়ে গেছে।
২০১৮ সালে যে মানুষটি পর্যটক হিসেবে আয়া সোফিয়ায় ঢুকেছিল, আর আজ যে মানুষটি এখানে এসে নামাজ পড়ল দুজন একই মানুষ হলেও অনুভূতিতে যেন অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আয়া সোফিয়া থেকে বেরিয়ে শেষবার যখন পেছনে তাকালাম, মনে হলো এই ভবনটি হয়তো আরও বহু শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে। আমরা যারা আজ এখানে এলাম, তারা একসময় স্মৃতি হয়ে যাব। কিন্তু আয়া সোফিয়া থেকে যাবে। নতুন প্রজন্ম আসবে, নতুন মানুষ তার গম্বুজের নিচে দাঁড়াবে, নতুন গল্প তৈরি হবে।
.png)

-7c29dd-256x144.webp)



-4b1b03-256x144.webp)


